somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেই কবে (গল্প)

২৬ শে মার্চ, ২০১১ বিকাল ৪:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক
কয়েকদিন থেকেই খোকাকে অস্থির লাগছিলো। কোথায় কোথায় যেনো ছুটে বেড়াচ্ছিলো। যে খোকা বাড়ি মাথায় তুলে রাখতো, যতক্ষণ রাড়িতে থাকতো সারাক্ষণ আমার পিছে পিছে ঘুরে এ কথা সে কথা বলতো, আমার সে খোকা কয়েকদিন থেকে বাড়িতে তেমন থাকছিলো না। যেটুকু সময় থাকছিলো সে সময়টাতেও নিজের ঘরে বসে থাকতো আর মনে হতো কী যেনো ভাবছে। আমি তেমন পাত্তা দেই নি। দেশটাই যখন অস্থির তখন আমার খোকা তো একটু অস্থির হতেই পারে!
কিন্তু সেদিন সকালবেলা খোকা যখন আমার সামনে দাঁড়ালো তখন বুকটা ধ্বক করে উঠেছিলো। আমি তখন উঠোন ঝাট দিচ্ছিলাম। খোকা তার ঘর থেকে বেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘাড়ে একটা ব্যাগ, পরনে শার্ট-প্যান্ট, মাথায় বাংলাদেশের পতাকা বাঁধা। আমি হা করে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ও আমর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমি যাচ্ছি মা, দোয়া করো।’
আমি বুঝতে পেরেছিলাম খোকা কোথায় যেতে চাইছে। তবুও বিস্মিতভাবে বললাম, ‘কোথায় রে বাবা!’
‘দেশের ভেতরে হায়েনার দল বাসা বেঁধেছে, আমাদের মাটিতে থেকে আমাদেরই আক্রমণ করছে, আমাদের রক্ত-মাংস নিয়ে উল্লাস করছে-ওদের তাড়াতে হবে মা।’
দুহাত দিয়ে খোকার দুগাল চেপে ধরলাম, একটু আকুতি করে বললাম, ‘না বাবা, তুই ওসবের মাঝে যাস নে। তোকে ছাড়া বুকটা সারাক্ষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে।’
খোকা আমার দুহাত চেপে ধরে বললো, ‘মা, তুমি কি জানো, প্রতিদিন কতো মায়ের বুক ফাঁকা হচ্ছে? কতো স্ত্রী বিধবা হচ্ছে, কতো সন্তান এতিম হচ্ছে, কতো বোনের সম্মান যাচ্ছে, তা কি জানো মা?’
‘জানি না, আমি জানতেও চাই না। তোকে কোত্থাও যেতে দেবো না, তোকে হারাতে চাই না আমি। তোকে ছাড়া আমি এক মুহূর্ত থাকতে পারবো না।’
যে খোকা আমার সাথে এতোটুকু গলা উঁচিয়ে কোনোদিন কথা বলে নি, সে খোকা আমাকে ধমকে উঠলো, ‘এমন করে বলো না তো মা! আমাকে যেতেই হবে। হায়েনাদের উল্লাস আমি ঘরে বসে দেখতে পারবো না মা।’
খোকা ওর ডান হাতটা আমার কাঁধে রেখে নরম করে বললো, ‘তুমি কি মনে করো মা, হায়েনাগুলো এ বাড়িতে হামলা করবে না। এ গাঁয়ের এ বাড়িতে তোমার বুকে মাথা গুঁজে থাকলেই কি আমি নিরাপদ? তুমি নিরাপদ? এখন আমরা কেউ নিরাপদ নই মা। গায়ে যখন শক্তি আছে তখন ঘরে বসে থেকে কী হবে! একটু চেষ্টা করে দেখি না মা, হায়েনাদের তাড়াতে পারি কিনা।’
‘ওকে বাধা দিও না খোকার মা।’ খোকার বাবা কোথায় থেকে যেনো ছুটে এসে বললো, ‘ওরাই তো আমাদের ভরসা। ওরা না গেলে এই দেশটা যে আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। পরাধীন দেশে কোন ভিটেয় মাথা গুঁজবো বলো খোকার মা!’
আমার দিকে তাকিয়ে খোকার বাবা মিনতি করে বললো, ‘ওকে যেতে দাও খোকার মা। তারপর অপেক্ষা করো নতুন একটা সূর্যের, নতুন একটা ভোরের।’
আমি আর বাধা দিতে পারলাম না। দিতে পারলাম না অনুমতিও। আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠলাম।
খোকা আমায় কদমবুচি করে বললো, ‘আসি তাহলে মা। আমায় নিয়ে কিচ্ছু ভেবো না তুমি। দেখো, এই দেশটা একদিন স্বাধীন হবে। ওই হায়েনাগুলোকে আমরা তাড়াবোই। স্বাধীন বাংলার একটা পতাকা নিয়ে তোমার কোলে আবার আমি ফিরে আসবো। দেখো তুমি।’
আমি একটু জোরে কেঁদে উঠলাম। খোকা অস্থির হয়ে বললো, ‘ও কী মা! কাঁদছো কেনো তুমি! দেখে নিও, আমার কিচ্ছু হবে না। এই বাংলা থেকে হায়েনাগুলোকে তাড়াবোই, তারপর তোমার কোলে আবার ফিরে আসবো স্বাধীন বাংলার একটা পতাকা নিয়ে। তুমি শুধু দোয়া করো, ওদের সাথে যেনো আমি পেরে উঠি।’
খোকার বাবা খোকাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। খোকার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, ‘সবসময় বুকে সাহস রাখবি। মৃত্যুর ভয়ে পিছিয়ে আসবি না একবারও। তোদের হাতেই এ দেশের হাল। দরিয়ায় দেশটাকে ভেসে যেতে দিস না, তীরে ফিরিয়ে নিয়ে আয়। যা বাপ, যা। পিছে আর ফিরে তাকাবি না।’
খোকা আর পিছে ফিরে তাকালো না। দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেলো গ্রাম পেড়িয়ে বহুদূরে।
কত দূরে? থাকবে কোথায়? খাবে কী? খোকা বলে চিৎকার দিতেই থেমে গেলাম। আমার চিৎকার কি খোকার কানে পৌঁছাবে? যদি পৌঁছায়, যদি ও পিছে ফিরে তাকায়, তবে ওর অমঙ্গল হতে পারে। তাই তো থেমে গেলাম।
খোকার সেই ছোট্ট ঘরে ঢুকলাম। বিছানা-বালিশ সব এলোমেলো হয়ে আছে। টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বই-খাতা। আলানায় ঝুলছে জামা-কাপড়। দেয়ালে খোকার একটা ছবি টাঙানো। কী মায়াবী চেহারা আমার খোকার! বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। কতো বয়স হবে খোকার? ওর জন্মের সালটা মনে নেই। ষোলো-সতেরো হবে। মনে মনে ভাবছিলাম খোকার এবার বিয়ে দেবো, মিষ্টি একটা বউ আনবো। অথচ কী হলো এসব! খোকা যে আজ যুদ্ধে গেলো সবকিছু ফেলে! কান্না আসতেই চেপে দিলাম। কেঁদে কী হবে! পাকিস্তানি হায়েনাগুলোকে তো তাড়াতে হবে। খোকারাই তো তাড়াবে, আর কারা তাড়াবে! খোকার বাবার মতো বয়েসি মানুষগুলো তো পারবে না। বুকটা হু হু করলেও তাই কাঁদলাম না আর। মনকে বুঝ দিলাম, খোকা ওই হায়েনাগুলোকে তাড়িয়ে স্বাধীন বাংলার একটা পতাকা নিয়ে আবার আমার বুকে ফিরে আসবে। নিশ্চয় আসবে।

দুই
একদিন-দুইদিন, এভাবে বহুদিন কেটে গেলো। আমি আর খোকার বাবা অপেক্ষায় থাকি, কবে এই দেশটা স্বাধীন হবে, কবে আমার খোকা বুকে এসে জড়াবে! খোকার বাবা ট্রানজিস্টরে প্রতিদিন যুদ্ধের খবর নেয় আর বলে, ‘খোকারা পারছে খোকার মা, খোকারা পারছে!’
বুকটা আমার সুখে ভরে ওঠে। মনে মনে বলি, ওরা তো পারবেই, ওদের তো পারতেই হবে। কিন্তু প্রতিদিন যখন খোকার ঘরে যাই, দেয়ালে টাঙানো ছবিতে খোকার মায়াভরা মুখটা দেখি, বুকের ভেতর তখন কেমন যেনো চিনচিন করে ওঠে। কান্নাটাকে চেপে রাখি বহু কষ্টে।
মাঝে মাঝে জানতে খুব ইচ্ছে হয় খোকা কোথায় আছে, কী করছে, কী খাচ্ছে। কিন্তু জানা হয় না। সেই যে খোকা গেলো, কোথায় গেলো, কীভাবে গেলো, কিছুই আর জানালো না।
খোকার বাবাকে বলি, ‘ওগো, একটু খোঁজ নাওনা খোকা কোথায় আছে।’
খোকার বাবা বলে, ‘খোঁজ কি আমি নেই না! ওরা কি ঢোল পিটিয়ে বেড়াবে যে কোথায় আছে! তবুও তো চেষ্টা করছি খোঁজ নেয়ার। খোকাটাও যে কি! কোথায় গেলো একটা খবরও দিল না।’
আমি আর কিছু বলি না। আড়ালে গিয়ে চেপে চেপে কাঁদি।
এর মধ্যে একদিন গ্রামে মিলিটারি এলো। অনেক মানুষ মারলো, যুবতি মেয়েদের ধরে নিয়ে গেলো, ঘরের মালপত্র লুটপাট করলো। বাধা দিতে চেষ্টা করলে কয়েকটা বাড়ি আগুনে পুড়লো। মিলিটারিরা যতটা না করলো, তার চেয়ে বেশি করলো মিলিটারিদের চামচা এ গাঁয়েরই কিছু লোক।
আমি আর খোকার বাবা বাড়ির পেছনে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। নারকীয় দৃশ্যগুলো আমরা কাপুরুষের মতো ঝোপের আড়াল থেকে দেখলাম, কিছু করতে সাহস পেলাম না। কী-ই বা করতাম আমরা! অতগুলো অস্ত্রধারী মিলিটারিকে আমরা এ গাঁয়ের নিরস্ত্র মানুষগুলো কীভাবে ঘায়েল করতাম! তবুও মনের ভেতরে খচখচ করতে লাগলো, একজন মুক্তিযোদ্ধার বাবা-মা হয়ে আমরা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থেকে নারকীয় দৃশ্যগুলো উপভোগ করলাম!
আমাদের বাড়িতেও লুটপাট হলো। এদিক-ওদিক আমাদের খুঁজলো। ঝোপের দিকেও এসেছিলো, কিন্তু আমাদের খুঁজে পেলো না। বেঁচে গেলাম আমরা।
এরপর আরো কয়েকদিন কেটে গেলো। ২৪ ঘণ্টায় কেবল একটিই ভাবনা, কবে দেশ স্বাধীন হবে, কবে খোকা আমার বুকে এসে মাথা রাখবে।
একদিন সকালবেলা কোথায় থেকে যেনো হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলো খোকার বাবা। অস্থির হয়ে বললো, ‘কোথায় গেলে খোকার মা!’
আমি তখন চুলোর পাড়ে। হুটোপুটি করে ছুটে এলাম, ‘কী গো, কী হলো?’
‘আরে খবর আছে তাজা!’
বুকের ভেতর কেনো জানি আনন্দের একটা স্রোত বয়ে গেলো।
‘কী খবর শুনি, খোকা ফিরছে নাকি!’
খোকার বাবা কেমন করে যেনো হাসতে লাগলো, বললো, ‘আর কোনো চিন্তে করো না, খোকা শিগগিরই ফিরবে। হায়েনাগুলো নাকি আর পেরে উঠছে না, কোনো মতে নাকি জান নিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। আর দুদিন বাদেই নাকি দেশ স্বাধীন হয়ে যেতে পারে!’
‘ইস! সত্যি বলছো। ভুল শুনছি না তো! স্বপ্ন দেখছি না তো!’
‘না গো না, সত্যিই বলছি। প্রতিক্ষার পালা এবার শেষ হতে চলেছে।’

তিন
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। খোকার বাবা উঠোনে মাদুর পেতে বসে ট্রানজিস্টরটা ঘোঁচাঘুঁচি করছে অনেকক্ষণ ধরে। যেটা ধরতে চাইছে সেটা আসছে না। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলছে, ‘ধুত্তেরিকা!’
আমি উৎসুক হয়ে খোকার বাবার পাশে বসলাম।
‘আজ কি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছে!’
‘হুম্ম্!’ খোকার বাবা অন্যমনস্কভাবে বললো।
আমি আবার বললাম, ‘অনেকক্ষণ থেকে ট্রানজিস্টরটা নিয়ে পড়ে আছো, কি ব্যাপার বলো তো!’
‘বেশি বকো না তো! আগে স্বাধীন বাংলা বেতার ধরতে দাও।’
খোকার বাবার বিরক্তির ঝাঁঝাঁলো কথা শুনে আমি চুপ করে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর ট্রানজিস্টরে ধরা দিলো স্বাধীন বংলা বেতার। খোকার বাবা বিচলিত হয়ে উঠলো। একটা দেশাত্মবোধক গান বাজছে। হঠাৎ গানটা বন্ধ হয়ে গেলো। এবং সেখান থেকে কে যেনো কথা বলে উঠলো। কথাগুলো শুনে খোকার বাবা লাফিয়ে উঠে আনন্দে চিৎকার দিলো। আমিও আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।
খোকার বাবা লাফাতে লাফাতে চিৎকার দিয়ে বললো, ‘শুনলে খোকার মা শুনলে! দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে!’
‘ইস! কি যে ভালো লাগছে! আচ্ছা খোকা কি তবে আজ ফিরে আসছে?’
‘আজ মনে হয় আসতে পারবে না। কাল আসতে পারে।’
‘ইস! কতোদিন খোকাকে দেখি না! এতোদিনে নিশ্চয় অনেক শুকিয়ে গেছে। রোদে রোদে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে হয়তো। নিশ্চয় অনেক কালো হয়ে গেছে! এতোদিন না জানি কি খেয়ে রাত-দিন কাটিয়েছে!’
নিজের মনেই কথাগুলো বলছিলাম। খোকার বাবা আমার দিকে তাকিয়ে থেকে শুনছিলো। আমি খোকার বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘খোকার বাবা, পাটিশাপটা খোকা খুব পছন্দ করে। যাওনা, নারকেল কিনে আনো।’
‘যাচ্ছি।’ বলে সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে গেলো খোকার বাবা। খানিকবাদেই ফিরলো মস্ত দুটো নারকেল হাতে।

চার
রাতে ভালো ঘুম হলো না। একটু পর পর ঘুম ভেঙে যাচ্ছিলো। কেবলই মনে হচ্ছিলো খোকা বুঝি দরজায় কড়া নাড়ছে।
সকাল সকাল উঠে গিয়ে চুলোর পাড়ে বসলাম। খুব যত্ন করে পাটিশাপটা বানালাম। খোকার বাবাও সকাল সকাল উঠে গেলো। আমাকে পাটিশাপটা বানাতে সাহায্য করলো।
পাটিশাপটা বানিয়ে আমি আর খোকার বাবা বারান্দায় মাদুর পেতে বসলাম। কখন খোকা আসবে, এই ভাবনায় ভেতরটা ছটফট করতে লাগলো। খোকা কতদূরে আছে, কখন আসবে তার কিছুই জানতে পারি নি। খোকার বাবা একটু পর পর বাইরে থেকে ঘুরে আসছিলো। আশেপাশের গ্রামে অনেকেই নাকি ফিরে আসছে। আমার খোকা কখন আসবে, এই অপেক্ষায় আমি আর খোকার বাবা বসে রইলাম।
পথের পানে চেয়ে চেয়ে সারাটাদিন পার হয়ে রাত নেমে এলো। এ গাঁয়ের দুজন ফিরে এলো। তাদের নিয়ে অনেক হইচই হলো। কিন্তু আমার খোকা ফিরলো না। খোকার বাবা সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘অস্থির হয়ো না খোকার মা। খোকা মনে হয় অনেক দূরে আছে। এজন্যই বোধহয় আজ আসতে পারলো না। কাল আসবে নিশ্চয়।’

আবারো সকাল সকাল উঠে পাটিশাপটা বানিয়ে বারান্দায় বসলাম। কেবলই মনে হতে লাগলো এই বুঝি খোকা ফিরে আসছে, এই বুঝি আসছে। চোখের কোণা দিয়ে এক-দু ফোঁটা পানি পড়তে লাগলো মাঝে মধ্যে।
খোকার বাবা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে বেড়ালো সারাদিন। অনেকেই ফিরে আসছে। কেবল আমার খোকার কোনো খবর নেই।
একে একে দিনের সবকটা বেলা পেড়িয়ে আবার রাত নেমে এলো। আমার খোকা ফিরলো না তবুও। খোকার বাবা আবার সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘এতো চিন্তে করো না তো, খোকা নিশ্চয় ফিরবে।’

পাঁচ
একদিন নয়, একমাস নয়, পুরো বছরটাই পেড়িয়ে গলো। আমার খোকা এখনো ফেরে নি। আজও আমি খুব সকালে পাটিশাপটা বানিয়ে বসে থাকি খোকার ফিরে আসার প্রতিক্ষায়। খোকার বাবা এর কাছে-ওর কাছে কতো যে খোঁজ নেয়। আমার খোকা কোথায় আছে কেউ বলতে পারে না। আমাদের এই পথ চাওয়া কি তবে শেষ হবে না! খোকা কি তবে...
না, ভাবতে পারি না, এটা মোটেও ভাবতে পারি না। খোকাই ছিলো আমাদের একমাত্র সন্তান। ও যদি না থাকে, তবে এ প্রাণ বাঁচবে কী করে!
খোকার একটা বোন ছিলো। পরী। খোকার দুবছর পর জন্মেছিলো পরী। মাত্র সাতদিনের মাথায় পরীটার যে কী হলো! হঠাৎ দেহ নিঃপ্রাণ হয়ে গেলো। খোকা ছিলো বলে সামলে উঠেছিলাম তখন। এতোদিন সেভাবে মনেও পড়ে নি পরীর কথা। কিন্তু এখন সামলাবো কী করে! খোকাও যদি চলে যায় বাঁচবো কীভাবে!
এসব ভেবে যখন জোরে কেঁদে উঠি, খোকার বাবা তখন বলে, ‘কেঁদো না তো মিছে!’
তারপর আবার সান্ত¡না দিয়ে বলে, ‘তুমি কেমন করে ভাবলে খোকা মরে গেছে! দেখো, নিশ্চয় খোকা ফিরে আসবে।’
মিথ্যে সান্ত্বনায় এভাবে কেমন করে মনকে বুঝ দেই! একদিন-দুইদিন তো নয়, একটা বছর যে কেটে গেছে! সবাই উল্লাসে মেতে উঠলো ১৬-ই ডিসেম্বরে। শুধু আমার বুকটা খালিই পড়ে রইলো, হাহাকারেই ভরে রইলো।
তবুও খোকার বাবা সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘মিছেমিছি এতো ভাবছো কেনো বলো তো! দেখো, খোকা নিশ্চয় ফিরে আসবে, আমি বলছি ফিরে আসবে।’

ছয়
আরো বহুদিন পর...
গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলো আমার। মনে হলো, দূর থেকে কে যেনো আজ ডাকছে, কে যেনো খুব করে ডাকছে আমাকে। আমি বিছানা থেকে উঠে বাইরে বের হলাম।
চারিদিক অন্ধকার। এদিক-ওদিক চোখ ঘোরালাম। এর মাঝে কাউকে চোখে পড়লো না আমার।
খোকার বাবা টের পেয়ে উঠে এসে পাশে দাঁড়ালো।
‘কি হলো খোকার মা, এতো রাতে বাইরে বের হলে যে!’
‘মনে হলো দূর থেকে ডাকলো কে যেনো!’
খোকার বাবা দূরে তাকিয়ে কাকে যেনো খুঁজতে লাগলো। আমিও দূরে অনির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘ওগো, সেই কবে খোকা যুদ্ধে গেলো! এতোদিন হয়ে গেলো, খোকা ফিরে এলো না তো!’

২৪ মার্চ, ২০১১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×