somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মুক্তমনা ব্লগার
আমি বিশ্বাসী, কিন্তু মনের দরজা খুলে রাখাতে বিশ্বাস করি। জীবনে সবথেকে বড় অনুচিত কাজ হল মনের দরজা বন্ধ রাখা। আমি যা জানি সেটাই সত্য, বাকি সব মিথ্যা…এটাই অজ্ঞানতার জন্ম দেয়।

সেথায় স্বর্গ

১৩ ই মে, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আসরের আজান হয়ে গেছে। সন্ধ্যে হতে আর বড়জোর তিন ঘণ্টা। রমজানের দিন, বড় কষ্টের দিন। কষ্টের পরে কেষ্ট আছে। পরপারে জামানত আছে ভালমানুষের জন্যে, পূণ্যবানদের জন্যে। খোদের জন্যে আছে ঝাটা, আর আগুন। আগুন থাকে মরুভূয়ের বাতাসে আর জমিনে। রমজান আসলে তাই শুকনো মরুর কথা মনে আসে খোদের। সারা দিন ঠায় দাড়িয়ে থেকে একটা খদ্দের জোটে নাই তার কপালে। অন্যসবার অবস্থাও প্রায় তাই, তবে তার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। পেটখান বুঝি আর চলে না। রমজান আসলেই তার কুফা লাগে গতরে, আর ব্যবসায়। চরম নোকসান গুণতে হয় তাকে। নোকসান গোণে এই ইংলিশ রোডের চৌহদ্দীতে ছড়ানো ছিটানো অগুণতি ছাপড়া হোটেলওলারাও। পর্দা টাঙ্গিয়েও খদ্দের জোটে না আজকাল। আগে জুটতো। আজকাল ভালমানুষের সংখ্যা বেড়েছে- ভাবে খোদে কানা গলির ঘুপচিতে দাড়িয়ে দাড়িয়ে।

শেষবেলায় বড়শিতে মাছ বিঁধেছে খোদের। তারে নিয়ে সাড়েতিন ফুট উচু খাটের উপরে বসে চলছে তার পুটুর পুটুর। ছোট্ট একখান ঘর তার। ভাড়া মাসে দশ হাজার। ঘরের এককোণায় আবছা অন্ধকারে খাটের নীচে বসে আছে তার মা ‘আলোচুলা’ নিয়ে। তার উপরে চড়িয়েছে ভিজে ছোলা। চুলায় জ্বাল ধরানোর অপেক্ষায়। সাথে খোদের বাপও আছে। তারা শুকনো মুখে কিছু একটা পাওয়ার আশায় খাটের দিকে চেয়ে আছে। খাটের মাঝ বরাবর পর্দা দিয়ে আড়াল করা, তবু দেখা যায় খাটে সওয়ার মানুষের পা, শুনা যায় চাপা কথা। বড় বেশী গুজুর গুজুর করছে খোদে আজকে। একসময় ধৈর্য্য হারায়ে ফেলে তার মা নীচে বসে।
-খোদে এট্টু জলদি কর। তোর বাপ কিন্তুক রোজা। পিয়াজ কিনতি যাতি হবি।
বাজারের পেয়াজে আগুন। ঘরে একটুকরো পেয়াজ নেই। খোদের পয়সা দিয়ে পেয়াজ উঠবে কড়াইয়ে। তৈরি হবে ইফতার। মায়ের চড়া গলা শুনে জ্বলে উঠে খোদে, তবে খদ্দেরের সামনে চেতে উঠতে পারে না।
-তোরে না কইছি মাও, আমারে খোদে ডাকবি না। লাভলি কতি লজ্জা লাগে?
গলার ঝাল টের পায় মা। চুপ হয়ে যায় সন্ধ্যার তক্ষকের মতন।
পর্দার আড়ালে বসে বাপ-মা পাহারদার কুকুরের মতন চারকান খাড়া করে শোনে খাটের উপরের তাবৎ কথাবার্তা।

-তুমি ভদ্দরনোকের ছেলে পয়সা দিয়ে, কাজ না করে চলে যাইতে চাও কেন বাপু? আমার প্যাটে লাথি মারতি চাও? এইসব শুনলি সর্দার আমারে কাইটে ভাসাবে।
-আমাকে মাফ করে দেন। আমি এমনি একটু দেখতে এসেছিলাম এখানে কি হয়। আমি ছাত্র, আমার কাছে যা আছে তাই নেন। আমাকে ছেড়ে দেন। এমন জায়গায় আগে কোন দিন আসিনি আমি।
-রাখো…। ছেদো কতায় কাজ হবে না। কাম তোমার করাই লাগবে।
খোদের মা-বাপে শোনে। সব শুনে চাপা গলায় গজর গজর করে নিজেদের ভিতরে।
-হারামজাদা মেইয়ে এট্টা দুধের বাচ্চা ধইরে আনিছে। ঝাটা ওর কপালে।

একসময় খদ্দের লক্ষি চলে যায় কাজ সেরে। চড়া দামের পেয়াজ দিয়ে ছোলা ভাজা হয়। ইফতার তৈরি হয় খোদের ঘরের খাটের নীচে আলোচুলার ওমে। যুদ্ধের সতর্ক সংকেতের মতন তীব্র নিনাদে সাইরেন বেজে যায়, ইফতারের সাইরেন। কোটরাগত চোখে পূণ্যদৃষ্টি নিয়ে এইঘরের একমাত্র রোজাদার খোদের অশীতিপর বাপ শুরু করে ইফতার, সঙ্গে মাও। হঠাৎকরে কোথা থেকে খোদে এসে হাত ঢুকিয়ে দেয় ইফতারির থালায়। খাওয়া ছেড়ে রাগে গজগজ করে থালা সামনে ঠেলে দেয় বুড়ো।
-নাপাক হইয়ে গেইছে সব। আমি খাবো না।
সোয়ামীর কথা শুনে অবাক চোখে নিস্পলক তাকিয়ে তাকিয়ে থাকে বুড়ি। ভাষায় কুলায় না তার।
মায়ের ভাষার ভাড়ারে শব্দ বাড়ন্ত হলেও, মেয়ের শব্দ ভাণ্ডারে ওঠে মহাপ্লাবন।
-ইহহ—-। মেইয়ের চিপা-নিংড়ানো টাকা নাপাক হয় না, নাপাক হয় তার হাত। বুড়ো ভাম! এইডেরে বিদেয় কর মাও। অমন বাপের আমার দরহার নেই।
গঙ্গার সুচীজল বা কৈলাশের বান, কোনটাই ভাসালো না খোদের চোখ। তবে কি যেন এক অচেনা কাঁপুনী শোনা গেল তার গলায়। “যা তোর নাপাক খাওন লাগবো না”- পায়ের এক ঘায়ে থালাটা উল্টে দিয়ে, আর কথাকটি উগরে ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল সে। সেকি কান্না লুকালো? গেরস্ত ঘরের কোন বউ-ঝির মতন?

মোয়াজ্জিনের মলিন কণ্ঠে শেষ হয় মগরিবের আজান। কিন্তু তার রেশ যেন জড়ায়ে থাকে নিষিদ্ধ পল্লির জমাট অন্ধকারকেও। একটা অপুষ্ট তিনপেয়ে নেড়িকুকুর খোদের ঘরের দরজায় এসে কুইকুই করে অকারণে কেঁদে চলে। মনে হয়, একমাত্র সেইই যেন জেনে ফেলেছে তার খোদে থেকে লাভলী, আর লাভলী থেকে খোদে জীবনে আসা যাওয়ার ইতিবৃত্ত।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১৭ রাত ৮:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেয়ালের ছবি আর বই এর পাতায় আধিপত্য দেখে ! অথচ বন্দর আর কড়িডোরের অসম চুক্তিতে সব শিয়ালের এক রা॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:১২


দেশ বিক্রির পরীক্ষিত ঠিকাদার....



দেয়ালের ছবি দেখলেই ভারতীয় আধিপত্য, আর বন্দর বেচে দিলে নীরবতা কেন?

দেয়ালে একটা ছবি আঁকা দেখলেই যাদের মুখে ফেনা উঠে যায় - "বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×