
ঈদ মানেই হাসি। ঈদ মানেই আনন্দ।ঈদ মানেই সব ভেদাভেদ ভুলে একই সুরে মেতে ওঠা। তাই ঈদে আনন্দের ছোঁয়া থেকে বাদ যায়না কোন শ্রেণীর মানুষগুলো। কোনো ধরণের প্রতিকূল আবহাওয়াও বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা তাদের উৎসবে। বাড়িতে মায়ের হাতে রান্না করা সেমাই আর নতুন জামা পড়ে বেরিয়ে পড়ে শিশু কিশোরের দল। গরীব ধনী নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর বাবা-মা'ই যার যা সামর্থ্য আছে তা দিয়েই পরিবারকে খুশি করার চেষ্টা করে ।
তবে ভিন্ন চিত্রও থাকে । তীব্র দারিদ্রের কষাঘাতে অনেক ঘরেই থাকেনা ঈদের সেই চিরচেনা খুশির আমেজ। হয়তোবা বাচ্চা ছেলেটি তার বন্ধুদের মতো করে পরতে পারেনা ঈদে নতুন একটি জামা,কোনো বাবা হয়তো অন্য অনেক বাবার মতো তার ছেলেমেয়েদের কিনে দিতে পারেননা একটি নতুন জামা,ঘরে সেমাই রান্নার উপাদানগুলো নেই বলে কতো মা'ই রান্না করতে পারেননা তাঁর বাচ্চাদের জন্য। এই কষ্টে অনেক বাবা-মা,শিশু ছেলে কিংবা মেয়েটি মলিন মুখটি ভার করে বসে থাকে পুরো ঈদের দিনটি। অথচ আমরাই পারি তাদের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটাতে।
আমারই পরিচিত এক আন্টিকে দেখি প্রতিবছর হিসাব করেন এ বছর মেয়ের জন্য মাত্র পাঁচটি জামা কিনেছি,জুতো কিনেছি দু'জোড়া।আমার নিজের জন্য বাবুর আব্বু তিনটা ড্রেস দিয়েছে,আর বাবুর বাবা একটামাত্র পাঞ্জাবী কিনেছে। এই দৃশ্যে দেখা গেলো বাবাদের জন্যে ঈদের আনন্দ খুবই সীমিত। একটা পাঞ্জাবীতেই বাবার ঈদ শেষ। আর বাচ্চা মেয়েটির জন্য পাঁচটা জামা যেখানে তার মায়ের জন্যই মাত্র,সেখানে অবুঝ বাচ্চাটিতো আরো পাবার আশা করতেই পারে।এই বাচ্চাটিকে বুদ্ধি হবার পর থেকেই দু-তিন-চারটা করে জামা দিয়ে দিয়ে অভ্যাস করা হয়েছে। এতে তার কোনো দোষ নেই। হ্যাঁ,একটা সময় এই শিশুটি এই পাওয়াতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। সে প্রত্যাশা করে তার জন্য এবার কমপক্ষে পাঁচটা জামা থাকছেই ,এটা তার স্বাভাবিক ভাবনা। আরো বেশী পেতেই পারে। এই অভ্যাসটা গড়ে তুলছে কিন্তু বাবা-মা ই। এই বাবা-মা-ই পারে শিশুর অভ্যাস পরিবর্তন করতে। বুদ্ধি হবার পর থেকে একটি শিশুকে আমরা যেভাবে বড় করবো,যা শিখাবো শিশুটি ঐভাবেই বড় হতে থাকবে। কোমলমতি শিশুদের মনে সব থেকে আকর্ষণ করে তাদের বাবা-মার সকল কার্যকলাপ। বাবা-মা যাকিছু করে তা-ই দেখে, তা-ই শুনে তা-ই করে একটি শিশু।
অতএব বাবা-মা যদি একটু খেয়াল করে তবেই লক্ষ্য করতে পারতো পাশের বাসায়ই তাদের মেয়ের সমবয়সী একটি মেয়ে আজ মলিন মুখ করে বসে আছে ; ঈদে তার নতুন জামা নেই বলে। অসহায় বাবা মেয়ের ভার মুখ দেখে হয়তো ঘর থেকেই বের হচ্ছেননা অন্য বাচ্চাদের আনন্দ উল্লাস তাঁর চোখে পড়বে দেখে। মা হয়তো মেয়েটিকে বুঝ দিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন ; আমরা গরীব,সম্বলহীন, আমাদের ঈদ থাকতে নেই। কিন্তু আজকে যদি ঐ মা তাঁর মেয়ের জন্য পাঁচটা জামা না কিনে দুটি জামা কিনে আনতেন,আর তাঁর বাচ্চার হাতে তুলে দিয়ে বলতে পারতেন যে ''একটা তোমার জন্য অন্য জামাটি পাশের ঘরের তোমার বন্ধুকে তুমি উপহার দিবে"। তবে কিন্তু কোমলমতি শিশুটি কখনোই না করতোনা । বরং খুশি হয়ে যেতো সে ; দুইজনে একই রকম জামা পরবে এই ঈদে তাই । একই দিনে পাঁচটা জামা পরবর্তন করে পরার অভ্যাস গড়ে উঠতোনা এই শিশুটির । একইভাবে এই শিশুটি যখন সকালে ঈদের সেমাই খাবে তখন মনে পড়ে যাবে পাশের ঘরের বন্ধুটির কথা। সে নিজ হাতে তার খাবারের এক অংশ তোলে দিয়ে আসবে বন্ধুটির জন্য। ছোটবেলা থেকেই সে এই শিক্ষা নিয়েই বড় হতো। তখন সে আর এই গরীব-ধনীর ভেদাভেদটা বুঝতোনা।
প্রতিটি ঘরে যদি এরকম একটি শিশুও গড়ে উঠতো তবে হয়তো আমাদের সমাজে উচু-নিচু,ধনী-গরীব এই ভেদাভেদটুকু থাকতোনা। সবাই মিলেমিশে একই সাথে সকল আনন্দ উপভোগ করতে পারতাম, অন্যের দুঃখে দুখী হতে পারতাম ; অন্যজনের দুঃখের ভার বয়ে বেড়ানোর সক্ষমতা তৈরী হয়ে যেতো। একটা সুস্থ্য সুন্দর ভেদাভেদহীন সমাজ গঠনে আর পিছিয়ে পড়তে হতোনা কাউকে। ঈদের দিনে গরীবের সাথে কোলাকোলি করতে অবুঝ শিশুটি আড়চোখে তাকাতোনা ঐ গরীব মানুষটির দিকে।
আর ক'দিন পরই আসছে মুসলিম ধর্মালম্বীদেের পবিত্র ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল ফিতর। প্রতিটি মুসলমানের ঘরে তাই ঈদের আনন্দ বয়ে আসুক । ঈদের এই আনন্দ সকলের মনে সমান ভাবে প্রবাহিত হোক। এই কামনা করি।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০১৬ রাত ১:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


