
বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।
গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান নাই, উঠানের জায়গায় ঘাস, ঘাসের উপর আলো, আলোর ভিতরে গাড়ি, পাজেরো, প্রাডো, একটা লম্বা কালো কী যেনো, যার নাম নির্ঝর জানে না। দরোজা খুললে এমন ঠাণ্ডা এসে গায়ে লাগে যে মনে হয় বাইরের গরম ভুল, গরিবের অসুখ, টাকা থাকলে সারানো যায়।
আলহাজ্ব নূরুল হক চৌধুরী দুই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন। তাঁর গায়ে পাঞ্জাবি, আঙুলে তিনটা পাথর, মুখে চারটা ডেঞ্চার, এবং সমস্ত শরীর থেকে সুগন্ধি বেরোচ্ছে যেনো টাকার গন্ধ ঢাকার চেষ্টা, এবং যে চেষ্টা কোনোদিন সফল হয় না।
নূরুল হক বলেন, কবি সাব আসছেন! আইজকা আমার ঘরে চান্দ উঠছে। আমার কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা কিন্তু আপনেই লেখবেন, আর কারো হাতে আমি দিমু না।
নির্ঝর বলে, দেখি।
নূরুল হক বলেন, নাম ঠিক করছি — 'অন্তরের রক্তগোলাপ'। কেমুন লাগলো?
নির্ঝর বলে, যথার্থ নাম।
নূরুল হক খুশি হয়ে যান। মানুষ কখনো বুঝতে পারে না কোন কথার মানে কী।
বিরাট ঘর, যেনো কোনো মাঠ যার উপর ছাদ দেয়া হয়েছে। সাদা গ্লাভস পরা ছেলেরা ট্রে হাতে ঘুরছে। এক কোণে দুইজন সম্পাদক, এক কোণে একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব, এক কোণে টেলিভিশনের একটি মেয়ে যার হাসিই তার পেশা, আর মাঝখানে আছে কবিরা। তারা এসেছে কারণ ডাকলে না এসে থাকা যায় না, এবং না আসলে পরের বার ডাকবে না।
নির্ঝর পান করতে থাকে। ব্লু লেবেল। গ্লাসে বরফ পড়ার শব্দ হয়, মিষ্টি শব্দ, শব্দটাও কেনা।
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সে তলপেটে ছোটো নিরীহ ইশারা টের পায়।
ইশারা সে অগ্রাহ্য করে, কারণ কবিতা নিয়ে তখন একজন কথা বলছেন, তিনি বলছেন আলহাজ্ব নূরুল হক চৌধুরীর পঙ্ক্তিতে মাটির গন্ধ আছে। নির্ঝর ভাবে, মাটির গন্ধ যদি থাকতো তাহলে এই ঘরে দাঁড়ানোই যেতো না, মাটির গন্ধ ভয়ংকর, ওতে কবরের গন্ধও থাকে।
মিনিট বিশেক পর ইশারা আর ইশারা থাকে না। তলপেটে ছোটো জন্তু জেগে উঠেছে, এবং এখন সেটা আর ছোটো নাই।
নির্ঝর জিজ্ঞেস করে, টয়লেট কোন দিকে?
নূরুল হক হাত নাড়েন, ওইদিকে যান কবি সাব, আটটা আছে, যেইটা ইচ্ছা।
আটটা। এই বাড়িতে আটটা শৌচাগার। নির্ঝর হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, মানুষের প্রস্রাবের একটাই ফুটা, তাহলে আটটা কেন? কারণ সংখ্যা। সংখ্যা ছাড়া এই লোকদের আর কোনো ভাষা নাই। এরা সৌন্দর্য বোঝে না, এরা গুনতে পারে।
প্রথম শৌচাগারটা ঝকঝক করছে। মেঝেতে মার্বেল, ইতালির; সোনালি কল; তোয়ালে ভাঁজ করে রাখা হয়েছে রাজহাঁসের মতো এবং কে না জানে রাজহাঁস বানানো তোয়ালের অর্থ হলো এই তোয়ালে দিয়ে কেউ হাত মুছবে না। নির্ঝর দরোজা লাগায়, জিপার নামায়, এবং তখন চোখ তোলে।
কমোডের ঠিক সামনে, চোখের সমান উচ্চতায়, একটা বাঁধানো ছবি। নূরুল হক চৌধুরী হাত মেলাচ্ছেন একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে। দুজনের গলায় মালা। দুজনেই হাসছেন।
নির্ঝর জিপার তুলে দেয়।
ছবিটা এখানে টাঙানো হয়েছে ইচ্ছা করে, মেপে, নিখুঁতভাবে। যাতে প্রত্যেক অতিথি তার সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে, প্যান্ট খোলা অবস্থায়, একলা, মুখ তুলে দেখে এই লোকটি কাকে চেনে। এটা শৌচাগার না, এটা নোটিশ বোর্ড। মানুষ শৌচাগারে ছবি টাঙায় তখনই, যখন ছবি টাঙানোর জায়গা ফুরিয়ে গেছে।
নির্ঝর দরোজা খুলে বেরিয়ে আসে। বলে, এই নোংরায় আমি পারবো না।
করিডোর ধরে সে হাঁটে। দুই পাশে দরোজা, দরোজার পর দরোজা।
একটা দরোজা খুলে দেখে, ঘরভরা শাড়ি। দেয়ালের গায়ে কাচের আলমারি, আলমারিতে সারি সারি শাড়ি, প্রত্যেকটা পলিথিনে মোড়া, প্রত্যেকটার গায়ে দোকানের ট্যাগ এখনো লাগানো। তিনশো, চারশো, কে জানে। একটাও কেউ পরে নাই। পাশের দেয়ালে জুতা, একই রকম, একই ভাবে। ন্যাপথলিনের গন্ধ। মৃতের ঘরের গন্ধ।
নির্ঝর দাঁড়িয়ে থাকে। তার তলপেট চিৎকার করছে। কিন্তু সে পারে না, কারণ যা কোনোদিন ব্যবহার হয় নাই তা নোংরা না, তা মৃত; এবং মৃতের উপর প্রস্রাব করা তার কাজ না।
সে বলে, এই কবরে আমি পারবো না।
পরের দরোজাটা লাইব্রেরি। দেয়ালজোড়া তাক, তাকভরা বই, সব বইয়ের মলাট চামড়ার, সব বইয়ের শিরদাঁড়ায় সোনালি অক্ষর। বইগুলি রঙ মিলিয়ে সাজানো। এক তাকে সব লাল, আরেক তাকে সব নীল। নির্ঝর একটা টেনে বের করে। রবীন্দ্র রচনাবলীর খণ্ড। সে পাতা ওলটাতে যায় এবং পারে না; পাতাগুলি এখনো কাটা হয় নাই, ছাপাখানার আঠা এখনো ধরে আছে। বই কখনো খোলাই হয় নাই। বইটি বই না, বইটি আসবাব।
সে আরেকটা বের করে। একই। আরেকটা। একই।
তারপর সে নিজের বই দেখতে পায়। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। মলাটটা সে চেনে, কারণ মলাট নিয়ে প্রকাশকের সঙ্গে ঝগড়া করেছিলো। সে বইটা নামায়। বুড়ো আঙুল বুলায় পাতার কিনারায়।
পাতাগুলি একসাথে লেগে আছে। নির্ঝর অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বই হাতে নিয়ে, তলপেটে আগুন নিয়ে, এই সোনালি কবরখানার মাঝখানে। তার ইচ্ছা করে জিপার খুলে এই তাকের উপর, এই সমস্ত না খোলা সোনালি শিরদাঁড়ার উপর, সব শেষ করে দিতে।
সে করে না। বইয়ের উপর প্রস্রাব করলে বইয়ের অপমান হয় না, হয় তার। সে নিজের বই ঠিক জায়গায় ফিরিয়ে রেখে দেয়, যত্ন করে, যেভাবে কেউ মৃতের হাত বুকের উপর গুছিয়ে দেয়।
তার পরের ঘরটা সে খোলে প্রায় দৌড়ে। ঘরভরা প্যাকেট। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত। বাক্স, ঝুড়ি, মোড়ানো কাগজ, ফিতা, কারো কারো গায়ে খাম আটকানো। কোনোটাই খোলা হয় নাই। এটা উপহারের ঘর। লেনদেনের ঘর। মানুষ এই ঘরে যা রেখে গেছে তার কোনোটাই উপহার না, প্রত্যেকটা একটা প্রশ্ন, যার উত্তর তারা পরে চাইতে আসবে।
এইখানে পারা যায়। এইখানে পারা উচিত। এইখানেই তো করা উচিত। জিপারে হাত দিয়ে নির্ঝর একটা খামের উপর নাম পড়ে ফেলে। নামটা সে চেনে। ভদ্রলোক সপ্তাহে একটা করে কলাম লেখেন সততা নিয়ে; তাঁর গদ্য পরিচ্ছন্ন, তাঁর যুক্তি ধারালো, তাঁর ছবি পত্রিকার উপরে ছাপা হয় গোল ফ্রেমে।
নির্ঝরের হাত থেমে যায়। কারণ একটা ভাবনা আসে, এবং ভাবনাটা তাকে জবাই করে ফেলে: এই ঘরে কি আমার নাম আছে?
সে কিছু আনে নাই। সে কোনোদিন কিছু আনে নাই। কিন্তু সে এসেছে। এই বাড়িতে এসে সে গ্লাস হাতে দাঁড়িয়েছে, একটা কথায় হেসেছে, যথার্থ নাম বলেছে। উপস্থিতিও একধরনের উপহার, এবং সবচেয়ে সস্তা উপহারই সবচেয়ে দামে বিক্রি হয়।
সে জিপার তুলে দেয়। বলে, এইখানে আমি পারবো না, কারণ এইখানে আমিও আছি।
করিডোরের একদম শেষ মাথায়, বাঁয়ে, একটা দরোজার নিচ দিয়ে সরু আলো আসছে। নির্ঝর ধাক্কা দেয়।
একটা ছেলে, বারো কি তেরো, পড়ার টেবিলের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। এখনো চশমা চোখে, একদিকে বেঁকে আছে। ডান হাতের আঙুলে কলম, কলম ছাড়ে নাই। খাতার উপর অঙ্ক, অঙ্ক শেষ হয় নাই।
দেয়ালে একটা রুটিন, বড়ো করে ছাপানো, লেমিনেট করা।
৫:০০ — কোরান
৬:০০ — গণিত (হুজুর নয়, স্যার)
৭:৩০ — ইংরেজি
... রাত ১১:০০ — ঘুম
নির্ঝর শেষ পর্যন্ত রুটিন পড়ে। সাতজন শিক্ষক। ছেলেটার নিজের জন্যে দিনে কুড়ি মিনিট বরাদ্দ, রুটিনে লেখা আছে 'অবসর'।
সে ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত বারোটা বেজে গেছে। ছেলেটা এক ঘণ্টা দেরি করে ফেলেছে, এবং কাল সকালে এর জন্যে তাকে জবাব দিতে হবে।
তলপেট জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু এই ঘরে নির্ঝর কোনো কথা বলতে পারে না, একটা বাক্যও তার মুখে আসে না। কারণ এই বাড়ির একমাত্র এই ঘরে এমন এক মানুষ আছে, যে এখনো কেনা হয় নাই, এবং যাকে কিনতে আর বেশি দিন বাকি নাই।
সে দরোজা টেনে দেয়, আস্তে, যাতে শব্দ না হয়। সারা রাতে এই একটা কাজেই ঘৃণা ছিলো না।
বসার ঘরে ফিরে এসে দেখে রাকিব সুলতান মেঝেতে। কবি রাকিব সুলতান পাঁচ ছেলেমেয়ের বাপ, দুইবার বিয়ে করেছে, তিনবার পুরস্কার পেয়েছে। এখন সে ইতালীয় মার্বেলের উপর কাত হয়ে পড়ে আছে, আর তার প্যান্টের নিচ থেকে সরু ধারা বেরিয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
কেউ তাকায় না। একজন সাদা-গ্লাভস ছেলে হাঁটু গেড়ে বসে খুব শান্তভাবে, দক্ষভাবে, কাপড় দিয়ে চারপাশ মুছে যাচ্ছে, যেভাবে আসবাবের চারপাশ মোছে। পাশে দাঁড়িয়ে দুইজন কবিতা নিয়ে কথা বলছেন। তাঁদের একজন বলছেন, চিরকালীনতা।
নির্ঝর কবি রাকিবের বগলে হাত দিয়ে টানে। রাকিব চোখ খোলে না, শুধু বিড়বিড় করে, কী বলে বোঝা যায় না। নির্ঝর ছেড়ে দেয়।
এই রাতে নির্ঝর একজনকেই বাঁচাতে পারবে, এবং সেই একজন সে নিজে। আর বুঝতে পারে, রাকিব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে। এই ঘরে রাকিবই একমাত্র সৎ লোক। সে খোঁজে নাই, সে বিচার করে নাই, সে হার মেনেছে। রাকিবের সঙ্গে তার তফাত সাকল্যে পনেরো মিনিটের।
নির্ঝর হাঁটতে শুরু করে। দরোজা, বারান্দা, সিঁড়ি, ঘাস, আলো, পাথরের সিংহ। গেটের ছোটো দরোজা খোলা।
বাইরে গরম। বাইরে গন্ধ। বাইরে অন্ধকার। বাইরে বাংলাদেশ।
বাউন্ডারি দেয়ালের গা ঘেঁষে, ল্যাম্পপোস্টের আলোর বাইরে, নির্ঝর দাঁড়ায়।
এবং তারপর বাঁধ ভেঙে যায়। জ্যৈষ্ঠের ঢল নামে, নদী তার সমস্ত পাড় ভাসিয়ে দেয়, কীর্তিনাশা কীর্তি নাশ করতে করতে ছোটে, তলপেটের ভিতর থেকে গোটা বর্ষাকাল বেরিয়ে এসে ইটের গায়ে আছড়ে পড়ে। নির্ঝরের চোখ বন্ধ হয়ে আসে, হাঁটু কেঁপে ওঠে, এবং তার মনে হয় সে এই মুহূর্তে যা করছে তা তার লেখা যে কোনো কবিতার চেয়ে বেশি সত্য, বেশি বিশুদ্ধ, বেশি অনিবার্য। ঈশ্বর যদি কোথাও থেকে থাকেন তিনি এই মুহূর্তে খুশি হচ্ছেন, কারণ তিনি মানুষকে এইভাবেই বানিয়েছিলেন, মার্বেল তিনি বানান নাই, মার্বেল বানিয়েছে মানুষ, নিজেকে লুকানোর জন্যে।
একটা টর্চের আলো এসে তার পিঠে পড়ে। দারোয়ান। বুড়ো, রোগা, বড়ো ইউনিফর্ম।
দারোয়ান বলে, এই, এইখানে কী করেন? দেয়ালে মোতেন ক্যান?
নির্ঝর জবাব দেয় না, কারণ জবাব দেয়ার মতো অবস্থায় সে নাই।
দারোয়ান আলো মুখের উপর তোলে, চিনতে পারে, এবং সঙ্গে সঙ্গে তার স্বর বদলে যায়।
দারোয়ান বলে, ও, সাব, আপনে। মাফ কইরা দিয়েন।
তারপর সে টর্চ নিভিয়ে নির্ঝরের পাশে এসে দাঁড়ায়, একটু দূরে, এবং নিজের প্যান্টের বোতাম খুলতে থাকে।
দারোয়ান বলে, রাগ কইরেন না সাব। আমিও রাইতে এইখানেই সারি। এগারো ঘণ্টা খাড়াইয়া থাকি, ভিতরে যাওনের হুকুম নাই।
দুইজন লোক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই দেয়ালে প্রস্রাব করে। একজন এসেছে আট আটটা মার্বেলের শৌচাগার প্রত্যাখ্যান করে, একটা গোটা রাতের নৈতিক বিচার শেষ করে, ভাষার সমস্ত অস্ত্র নিয়ে। আরেকজন এসেছে কারণ তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়া হয় না।
নির্ঝর কিছু বলে না। সে সারা রাত ধরে যে বিচার করছিলো, এই লোক সেই বিচার এগারো বছর ধরে করে আসছে, এবং তার জন্যে এই লোকের একটা শব্দও লাগে নাই।
দারোয়ান বোতাম লাগিয়ে বলে, ভিতরে যাইবেন না সাব? খাওয়াদাওয়া তো শ্যাষ হয় নাই।
নির্ঝর বলে, না।
সে হাঁটতে শুরু করে।
পেছনে বাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকে, সব বাতি জ্বলছে, একটা জানালাও খোলা নাই। সামনে শহর। ফুটপাত, ল্যাম্পপোস্ট, ভাঙা দেয়াল, নর্দমা, ঘুমন্ত রিকশা, আর ঘুমন্ত রিকশাঅলা রিকশার উপর, পা দুইটা দুই দিকে ঝুলিয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে নির্ঝর বুঝতে পারে এই শহরের সমস্ত পরিচ্ছন্ন জায়গা বাইরে; সব দেয়ালের বাইরে, সব ছাদের নিচ থেকে বেরিয়ে, সব খোলা আকাশের তলে।
ভিতরে কোনো পরিচ্ছন্ন জায়গা নাই। ভিতরে শুধু মার্বেল।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


