somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপহার

১৪ ই জানুয়ারি, ২০১৪ রাত ৯:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি একটা সুপার শপে চেক-আউট অপারেটরের কাজ করি। সোজা বাংলায় দোকানদার। অনেক দিন ধরে একই দোকানে কাজ করায় দোকানের নিয়মিত কাস্টমারদের সাথে আমার ভালো জানা-শুনা হয়ে গিয়েছে। এমনই আমার নিয়মিত এক কাস্টমারের গল্প বলছি। ভদ্রলোক অন্ধ, চোখে দেখেন না। অনেক বয়স। সব সময় উনার স্ত্রী’র সাথে শপিং এ আসেন। উনি এবং উনার স্ত্রী দুইজনই আমাকে খুব স্নেহ করেন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে দূরে থাকায় আমি এমনিতেই স্নেহের কাঙ্গাল। তাই উনাদের প্রতি আমার একটা অন্যরকম মায়া হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া আমার দাদা-দীদা’র সাথে উনাদের কোথায় যেন একটা মিল আছে। তাই গেলো বছরের ক্রীস্টমাসের সময় উনারা যখন শপিং করতে এলেন আমি তখন উনাদেরকে এক বাক্স চকলেট উপহার দিলাম। বাক্সটা হাতে ধরেই উনি বুঝে ফেললেন যে এটা চকলেটের বাক্স। উপহার পেয়ে বৃদ্ধ একেবারে বাচ্চাদের মত খুশি হয়ে উঠলেন। আমাকে বললেন যে শেষ কবে উনি ক্রিস্টমাসের উপহার পেয়েছেন মনেই করতে পারছেন না। আহারে বেচারা!
কারো কারো জন্য আসলে ঈদ-ক্রিস্টমাসের দিনগুলো খুশির কোন দিন তো নয়ই, বরং দিনগুলোতে উল্টো তাদের মন খারাপ হয়ে যায়। যেমন আমি দেশ ছেড়ে আসার পর থেকে প্রতি ঈদের দিন ফোনে আমার মা’কে কাঁদতে শুনেছি। এই দূরদেশে ঈদের দিনেও যখন নামাজ বাদ দিয়ে ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে যেতে হয়, তখন মনে হয় যে ক্যালেন্ডারে ঈদের দিনটা থাকার থেকে না থাকাই ভালো ছিলো। যাই হোক, আমার দোকান ভয়াবহ ব্যাস্ত। ক্রিস্টমাস এর বাজার। একেবারে ঈদের আগে আগে বাংলাদেশের নিউমার্কেটের মতন অবস্থা। তাই উনাদেরকে খুব বেশি একটা সময় দিতে পারলাম না। পরের কাস্টমারকে সার্ভ্‌ করা শুরু করলাম।
পরের কাস্টমার দেখি আবার ট্রলি ভর্তি করে উপহার কিনেছেন। তাঁর ট্রলি’র ভেতর অন্য অনেক উপহারের মধ্যে দেখি ‘মেরি-ক্রিস্টমাস’ লেখা দুই-তিনটা কুকুরের খেলনাও আছে। মেজাজ ভীষণ রকম খারাপ হল। কত মানুষের ঘরে খাবারই নেই, আর কত মানুষের আবার কুকুরের জন্য উপহার কেনার ক্ষমতাও আছে। পৃথিবী টা অন্যায় রকমের অসমান বলে মনে হল। নিজেকে এই বলে বোঝালাম যে, যার ক্ষমতা আছে, সে তো নিজের মত করে উদযাপন করবেই। অন্যদের কথা ভেবে তাঁর উদযাপন থেমে থাকবে কেন! আমি নিজেও তো দেশে থাকতে ঈদ উদযাপন করার সময় পথশিশুদের কথা ভাবতে পারতাম, একজন রিক্সা-শ্রমিককে নতুন একটা জামা কিনে দিতে পারতাম অথবা অনাহারী দুটো মানুষের মুখে ঈদের পোলাও-কোর্মা তুলে দিতে পারতাম। এসবের কিছুই যখন করিনি, তখন আমার এই ছেলে-ভুলানো মেজাজ খারাপ করার কোন অধিকার নেই। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ভদ্রলোকের জিনিসগুলো স্ক্যান করছিলাম। যে পরিমান জিনিস উনি কিনেছেন, সবগুলো স্ক্যান করা শেষ করতে আমার যে কতক্ষণ লাগবে আল্লাহ্‌ জানেন। এর মধ্যে ভদ্রলোক আবার আরও জিনিস আনতে গিয়ে দোকানের ভেতর উধাও হয়ে গেলেন। হায়রে উৎসবের বাজার! দোকানদারের জন্য উৎসবের বাজারের চেয়ে ভয়াবহ আর কিছুই হতে পারে না। যাইহোক, আমি আমার কাস্টমারকে অন্য জিনিস নিয়ে ফিরে আসার পর্যাপ্ত সময় দেবার জন্য ইচ্ছা করেই তাঁর জিনিস গুলো ধীরে-সুস্থে স্ক্যান করছি আর সাত-পাঁচ ভাবছি। হঠাৎ করে ডানদিকে তাকিয়ে দেখি যে আমার সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তখন উনাদের দিকে ফিরে জিগ্যেস করলাম, ‘সব কিছু ঠিক আছে তো!’
একগাল হাসি মুখে নিয়ে বৃদ্ধের স্ত্রী উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ বাবা, সব ঠিক আছে।’
-“তাহলে এখনও দাঁড়িয়ে আছেন যে...”
বৃদ্ধা আমাকে বললেন যে আমি এখন যে কাস্টমারের জিনিস স্ক্যান করছি এই ভদ্রলোক নাকি উনার ছেলে। শুধুমাত্র শপিং সেন্টারে আসলেই উনাদের দেখা হয়। তাই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য। ছেলের শপিং শেষ হলে ছেলের সাথে কথা বলবেন।
আমি একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। বৃদ্ধার কথা শুনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। নিজের অজান্তেই আমার গলায় বিস্ময় ফুটে উঠলো।
“আপনার ছেলে তো ট্রলি ভর্তি করে উপহার কিনেছে...”
-“হ্যাঁ, তাতে কি হয়েছে?” বৃদ্ধার গলায়ও বিস্ময়।
বৃদ্ধার বিস্ময় দেখে আমার বিস্ময় আরো বেড়ে গেলো। আমি হা-হা করে জিগ্যেস করলাম,
-“এই মাত্র যে আপনার স্বামী বললেন যে উনি শেষ কবে ক্রিস্টমাসের উপহার পেয়েছেন, সেটা উনি ভুলেই গিয়েছেন।”
বৃদ্ধা হেসে বললেন,
-“হ্যাঁ, আমি এখন আর চাকরি করিনা তো, তাই ওকে উপহারও কিনে দিতে পারি না।”
নাও ঠেলা, আমি কী বলি, আর উনি কী বোঝেন। আমি তাই এবার সরাসরিই জিগ্যেস করে ফেললাম,
-“কেনো, তোমাদের ছেলে তোমাদের উপহার কিনে দেয় না!”
বৃদ্ধ বললেন যে, -“শুধু আমাকে দেয়, ওর বাবাকে দেয় না।”
-“কেন?”
-“বাবার উপর রাগ। কারণ ওর ধারণা ওর বাবা ওকে আজীবনে কোনদিন কোন উপহার কিনে দেননি।”
বুঝলাম না এটা কি করে সম্ভব। তাই আবারো জানতে চাইলাম,
-“এটা কি শুধুই একটা ধারণা, নাকি আসলেই তোমার স্বামী নিজের ছেলে কে কোনদিন কোন উপহার দেননি!”
তখন বৃদ্ধা যা বললেন তা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না মোটেই,-

-“আমাদের ছেলে অন্ধ ছিলো। ওর দ্বিতীয় জন্মদিনের সময় ওর বাবা ওকে নিজের চোখ উপহার হিসেবে দিয়েছেন। এই বিষয়টা জানলে ছেলে কষ্ট পাবে দেখে উনি সারাজীবন ছেলের কাছ থেকে ব্যাপারটা গোপন রেখেছেন। নিজে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় এরপর থেকে তাঁর আর কোন চাকরি ছিলো না। আমার একার সীমিত উপার্জনে টানাটানি করে কোন রকমে সংসার চলতো। উপহার কেনার সামর্থ্য আমাদের ছিলো না। আর ছেলের পড়াশুনার খরচ দিতো সরকার। এটা নিয়েও ওর খুব ক্ষোভ ছিলো। ছোটবেলা থেকে এরকম অভাব-অনটনে থেকে হঠাত বড় ধনী মানুষ হয়ে যাওয়ার চাপ ও সামলাতে পারেনি। বাসার সমস্ত পুরনো ফার্নিচার পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদেরকে ওল্ড-হোম্‌ এ রেখে এসেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো...
বৃদ্ধা সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা আর বলার সময় পেলেন না। তাঁর আগেই উনার সুপুত্র শপিং শেষ করে চেক-আউট এ ফিরে এসেছে। তাই উনাকে চুপ মেরে যেতে হলো। মনে মনে ভাবলাম, মজার ব্যাপারটা না শুনতে পেরে মনে হয় ভালোই হলো।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×