(পর্ব-২)
.
সভ্যতায় মোকাবেলাঃ ইসলাম ও আধুনিকতা
.
১.
ক্ষমতা সমাজে দুইভাবে কাজ করে; কেউ ক্ষমতাকে অধিকার করে আর অন্যরা তার অনুগত কিংবা বাধ্য থাকে। ক্ষমতার প্রয়োগ ও অনুশীলন যদিও ব্যক্তির মাধ্যমে চর্চিত হয়, তবুও ব্যক্তিসত্ত্বার শক্তি কিংবা প্রেরণা হিসেবে যা কাজ করে_ তা হচ্ছে, রীতি-নীতি,ধ্যান-ধারনা বা আদর্শ। পরিবারের ক্ষুদ্র পরিসরে তার চর্চা স্বল্পভাবে। সমাজ পরিচালনায় তা কিছুটা সম্প্রসারিত হয় আর রাষ্ট্র পরিচালনায় এগুলো পরিণত হয় আইনে। আর এই ধ্যান-ধারনা বা আদর্শের মৌলিক দিকগুলো একটা সভ্যতা সভ্যতা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কিছু সাধারন নীতিমালা ও দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে, যা গড়ে ওঠে সমাজের বাস্তবতায় আবার কখনো শুধুমাত্র ক্ষমতার চর্চায়।
.
সভ্যতা কী? _মানুষ যা ভাবে, চিন্তা করে, সেটা হচ্ছে সংস্কৃতি আর মানুষের যা অবদান তা-ই সভ্যতা। সংস্কৃতি একটা চলমান প্রক্রিয়া কিন্তু সভ্যতা থেমে যায়, কারন সভ্যতার সাথে মানুষের সৃষ্টি অর্থ্যাৎ সমাজের দৃশ্যমান রূপের সম্পর্ক আছে। ‘সুপরিয়র কালচার’-ই সভ্যতায় রূপ লাভ করে। সংস্কৃতির বস্তুগত ও মানসিক জীবন পদ্ধতির সার্বিক ও সামগ্রিক উত্তরাধিকার-ই সভ্যতা।
.
২.
আমরা বর্তমান সময়টাকে বলি আধুনিক সভ্যতার যুগ। আধুনিক সভ্যতা কী? কীভাবে এর উদ্ভব? এই সভ্যতা কোন ধরণের সাধারন নীতিমালা তৈরি করছে? মানুষের উপর কোন ব্যপারে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ তৈরি করছে?_এই প্রশ্নগুলোর সুরাহা হলেই ইসলামের সাথে এর মিল-অমিল কিংবা মোকাবেলার ধরণটাকে স্পষ্ট করা যাবে।
.
আধুনিক সভ্যতা বিকাশের শুরুর সময়টা হচ্ছে ইউরোপের রেনেসাঁ। চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যার শুরু। তৎকালীন সময়ে ক্রিশ্চিয়ানিটি ছিল একটা লিভিং ফেনোমেনন। ধর্মের নামে সেখানে একটা বিশাল জটিলতা তৈরি করা হয়েছিল। কোন কিছুর সাথে তুলনাহীন ঈশ্বরকে তারা পাতালে নামিয়ে এনেছিল। ধর্মের কাছে মানুষ ছিল গৌণ। চার্চের আধিপত্য অর্থের বিনিময়ে সব অপকর্মের স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছিল, স্বর্গ কেনাবেচা হতো অর্থের বিনিময়ে। এ রকম একটা সময়ে প্রাচীন ‘গ্রিকো-রোমান মানবতাবাদে’র পূণর্জাগরণের লক্ষ্যে ইতালিতে শুরু হয়েছিল রেনেসাঁ, যা পরবর্তীতে পুরো পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। রেনেসাঁ ছিল মূলত সাহিত্য, শিল্প ও রাজনৈতিক চিন্তায় মধ্যযুগের থেকে ভিন্নতা।
.
চৌদ্দ শতকের শেষ দিকেই ইউরোপে লক্ষ্য করার মত আরেকটি বিষয় হচ্ছে ‘রিফর্মেশন’। ক্যাথলিক চার্চ_ যা মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর বিশাল নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছিল, দুর্নীতি-অনিয়ম-নির্মমতার প্রতিক হয়ে উঠেছিল, পোপেরা ক্রুসেড আহবান করত, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত –সাধারন মানুষসহ উইক্লিফ, হুসিট, মার্টিন লুথার -এর মত কিছু ধর্মযাজকরাও এই অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এইসব ধর্মযাজকরা বড় ধরনের সংস্কারের আহবান জানালো এবং এর মধ্য দিয়েই উদ্ভব হয়েছিল ‘প্রোটেস্টানিজম’এর। লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে তারা কিন্তু ধর্মকে খারিজ করে দেয়নি। পরবর্তীকালে এই ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্টান্টরা বিশ্ববাসীকে অনেকগুলো যুদ্ধ উপহার দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে দেখবেন তাদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কী ভয়ংকর রুপ ধারণ করেছিল। সতের শতকের শুরুর দিকে তাদের মধ্যকার ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পরিণতিতে ‘ওয়েস্টফালিয়া’ চুক্তির মাধ্যমে ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ তার শিকড় গেঁড়েছিল।
.
এর পরেই ইউরোপে আমরা দেখি ‘সায়েন্টিফিক রেভ্যুল্যুশন’ এবং ‘এনলাইটমেন্ট’। ষোল শতকের শেষ দিক থেকে শুরু করে একেবারে ঊনিশ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত। কোপারনিকাস, কেপলার, গ্যলিলিও, নিউটন-দের বিজ্ঞান বিপ্লব পশ্চিমাদের ধ্যান-ধারণা অনেকটাই বদলে দেয়। এর পরে তাদের ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতিতে পূণর্গঠন শুরু হয়। ক্রিশ্চিয়ানিটিকে খারিজ না করেই তারা এর সাথে ‘রিজন’ যুক্ত করে। নারীদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দেয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। দার্শনিকেরা যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া শুরু করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সাধারন মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এর পরেই বৃটিশ কলোনি থেকে মুক্ত হয়ে আমেরিকা স্বাধীন হয় (১৭৭৬ সালে)। ফ্রেঞ্চ বিপ্লব (১৭৮৯ সালে) সংঘটিত হয়। ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় বললেও রাজনীতিতে ধর্মীয় লিগেসি তারা অস্বীকার করেনি।
.
এই প্রায় পাঁচ’শ বছরের এক বিশাল ধারাবাহিকতায় তারা জন্ম দেয় আধুনিকতা, আধুনিক রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সেক্যুলারিজমের, লিবারেলিজম, গ্লোবালাইজেশনসহ আরো বহুকিছুর।
.
৩.
সমস্যা হচ্ছে, পশ্চিমের এই ভাঙ্গা-গড়ার সময়ে মুসলিম বিশ্বে কী ঘটছে সে বিষয়ে আমরা সচেতন নই। শুরু থেকে ইসলামি শাসনের একটা সাধারন চিত্র যদি আঁকি তাহলে_ সপ্তম শতক থেকে চৌদ্দ শতক পর্যন্ত সময়টাকে বলা যায় Universal Period. পনের শতক থেকে ঊনিশ শতক পর্যন্ত বলা যায় Fragmentation Period. এবং বিশ শতকের পরের সময়টাকে National Period। ইউরোপে রেনেসাঁর কাছাকাছি সময়ে ১২৯৯সালে ওসমানি খিলাফতের সুচনা হয়। ইসলাম এর আগেই একটা সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সর্বোপরি মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক জীবনে বৃহত্তর নৈতিক বিপ্লব সাধন করেই বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামের নৈতিক ভিত্তি বিশ্বব্যপী মানুষকে এক ‘উম্মাহ’য় অন্তর্ভূক্তির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো। যার ফলে ক্ষমতার জোরে নয় সাধারন মানুষের সমর্থন নিয়েই ইসলাম বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পরে। যদিও খিলালাফতের প্রথম ত্রিশ বছরের পরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম ইতিহাসকে কিছুটা কালিমা লেপন করেছে। রাজনৈতিক ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও প্রায় ১৩০০ বছর ইসলামের এই শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ মোটেই সাধারন ঘটনা নয়। নাগরিক অধিকার, সুশাসন, উন্নয়ন কোন দিক দিয়েই এই ব্যবস্থা ভঙ্গুর কিংবা ক্ষতিকর ছিলনা। বাগদাদ কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের বিশাল পরিসর।
.
৪.
তবে কথা হচ্ছে, এই জায়গা থেকে মুসলমানদের কেন পতন ঘটলো? আধুনিকতার সাথে ইসলামের বিরোধের জায়গাটা ঠিক কী? এবং উত্তোরনের উপায় কী?
.
শুরুতেই বলেছি, ‘সুপরিওর কালচার’-ই সভ্যতা হয়ে ওঠে। আধুনিকতা মুলত ক্রিশ্চিয়ানিটির বর্তমান সংস্করণ। পাশ্চাত্যে আধুনিকতা যে কালচার তৈরি করেছে এবং সারা বিশ্বে রপ্তানি করেছে এটা পুরোপুরি-ই গড়ে উঠেছে বস্তুবাদী মানসিকতার উপর। মানুষ সবকিছুতে সক্ষম। যুক্তির বাইরে কোন কিছুই গ্রহনযোগ্য নয়। জ্ঞানতত্বে তারা যে ‘মেটাফিজিক্সে’র কথা বলে তাও হতে হয় যুক্তির নিরিখে। এই ধারনায় মানুষ নিজেই তার আইন তৈরি করে। ‘ঈশ্বর’কেও তৈরি করে মানুষ, ঈশ্বর মানুষের রূপ নিয়ে মানুষকে রক্ষা করতে পৃথিবীতে এসেছে, এ জন্যই যিশু হয়েছেন Jesus Christ। মানুষের পক্ষে ‘সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রে’র বাইরে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। মানুষের সব নিবেদন-ইচ্ছা-অনিচ্ছা রাষ্ট্রের আপেক্ষিকতায়। স্বার্থবাদিতা উস্কে দেয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি আলাদা হয়ে পড়ছে সমাজ থেকে, উস্কে দিচ্ছে যৌনতা-অর্থপ্রীতি। সফলতা-ব্যর্থতার সব হিসেব-নিকেশ পৃথিবীতেই চুকে যায়। নৈতিকতার বয়ান সম্পর্কিত_ মানুষ আর শাস্তির সাথে। এই দুইটা ব্যপার এড়িয়ে যেতে পারলে সব ঠিক। পশ্চিমের হত্যা-ধর্ষনের পরিসংখ্যান দেখলেই পরিস্কার বুঝা যায়। শুধু আমেরিকাতেই প্রতি তিন সেকেন্ডে একটি খুন হয়, শুধু এ বছর-ই স্কুলে বন্দুকধারীর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি।
আধুনিকতা একই সাথে দুইটা কাজ করে_ ব্যক্তিকে শক্তিশালী করে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙ্গে দেয়, একই সাথে রাষ্ট্রীয় ও পুঁজিবাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদি প্রতিষ্ঠান করার মধ্য দিয়ে শিক্ষিত মানুষকে গোলামে পরিণত করে।
আধুনিক চিন্তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল, জীবন, জগত ও সৃষ্টিকে মানুষের সূত্রে ব্যাখ্যা । মানুষ যা নিশ্চিত করতে পারে, যুক্তিতে প্রমাণ করতে পারে। আধুনিক কালে তাই তথ্য-ও তত্ত্ব আকারে মূল্যায়িত হয়। জ্ঞানের এই মানবিকরণের মাধ্যমে বিষয় ও সৃষ্টিকে যেমন ব্যাপকভাবে পাঠ করবার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি মানুষ ও তার তার জ্ঞানের বিষয়ের মধ্যে নতুন সম্পর্কও সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ জ্ঞানের মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে, জ্ঞানও প্রভাবিত হচ্ছে মানুষের মাধ্যমে। এই দ্বিবিধ সম্পর্ককে বিচার না করে আধুনিক-জ্ঞানে নিশ্চিতি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
৫.
সবমিলিয়ে পশ্চিমের এই দৃশ্যমান-আদৃশ্যমান নিয়ন্ত্রন_ পরীক্ষাগারে আসা মহান পথের আর লক্ষ্যের অনুসারী মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা না, হয়নিও। মুসলিম দেশগুলোতে ‘আধুনিতা’র যে কোন ফর্ম-ই বুমেরাং হয়েছে। জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমের ক্রোধের আর হত্যার শিকার হয়েছে মুসলিমরা, সেই শুরু থেকেই। কী পুঁজিবাদ-গনতন্ত্র_ কী সমাজতন্ত্র_ আধুনিকতার সব প্রোডাক্টের-ই শিকার মুসলিমরা- সেই স্পেন, রাশিয়া, ইউক্রেন, বৃটেন, চেচনিয়া, বসনিয়া, আফগানিস্তা্ন, সিরিয়া, ইরাক, রোহিংগা কিংবা ফিলিস্তিন। পন্থা বদলেছে আধুনিকতা_ লক্ষ্য বদলায়নি কখনো। (রাজনীতি পর্বে আরো আলোচনা আসবে)।
মুসলিম শাসনের পতনের শাসনের পতনের সাথে-সাথেই পশ্চিমারা রাজনীতি, সামাজিক কর্মকান্ড, বাজার, সংস্কৃতি, ইতিহাসচর্চা সবকিছুতেই ‘লিবারেলিজম’ আর এখন ‘গ্লোবালাইজেশন’র নাম করে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যুদ্ধ তো আছেই। সংকটের এই জায়গাটা আমাদের বুঝতে হবে। সচেতন হতে হবে, সচেতন করতে হবে। সভ্যতার এই নিয়ন্ত্রণটা আমাদের প্রত্যেকটি প্রবণতাকে, সেটা ব্যক্তি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক ব্যপার পর্যন্ত, ভুল পথে পরিচালিত করে। সেই ভুল পথ থেকে বের হওয়ার ইচ্ছার সাথে সমস্ত মানুষকে সংযুক্ত করতে হবে। মনে রাখার বিষয়- আধুনিকতার রুপটা একদিনে পূর্ণতা পায়নি। মুসলিমদেরকেও তাদের লক্ষ্যের জন্য প্রচেষ্টা আর ধৈর্য আব্যাহত রাখতে হবে। চোখ মেলে দেখেন_ যুদ্ধ চলছে; ইসলামের সাথে অন্যদের। সভ্যতার যুদ্ধ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ১:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




