somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাশ্মীরের কান্না আজও ধামেনি.......

১৯ শে জুলাই, ২০১৬ দুপুর ১২:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চুরাশি হাজার বর্গমাইল বেষ্টিত পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ জুম্মু এবং কাশ্মীর। এই কাশ্মীরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ঘটনা! এই গ্রামের চারটি বাচ্চা! যাদের বয়স মাত্র ৫ বছর! এই বয়সটা খেলাধুলা করার উৎকৃষ্ট সময়। এই বয়সের বাচ্চারা বিভিন্ন কল্পিত বিষয় নিয়ে খেলতে ভালোবাসে! যেমন তারা নিজেদেরকে সুপারম্যান অথবা স্পাইডার ম্যান মনে করে বিভিন্ন ধরনের খেলা করে! কিন্তু কাশ্মীর বলেই হয়তো এই বাচ্চারাও একটু ব্যতিক্রম! তারা কাঠের তৈরী ক্লাশনিকভ নিয়ে খেলছে! তারা দু’জন করে দু’পক্ষ হয়ে যায়! একদল হয় কাশ্মীরের মুজাহিদ বাহিনী এবং অপরদল হয় হিন্দুস্থানী সেনাবাহিনী। দু’দলেই একে অপরকে গুলি করতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে গিয়ে হিন্দুস্থানী সেনাবাহিনী পরাজয় বরন করে। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, ৫ বছর বয়সের এই বাচ্চারা সামান্য খেলার মাঝেও নিজেদেরকে হিন্দুস্থানী ভাবতে চায় না। তাই কারা হিন্দুস্থানী হবে তা নিয়ে টস করতে হয়। টসে যারা হেরে যাবে তারাই হবে হিন্দুস্থানী সেনাবাহিনী। আর প্রতিবার জয়লাভের পর সেই বাচ্চারা গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে বলবে, “হাম কিয়া চাহতে? আযাদী! আযাদী কা মতলব কিয়া? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। ( আমরা কি চাই? মুক্তি। মুক্তির উৎস কী? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ) কাশ্মীরের একটি শিশুও স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসটাও বেশ পুরনো।



জুম্মু,কাশ্মীর ও উত্তর এলাকাসমূহ নিয়ে এই উপত্ত্যকা ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ! এই উপত্যকার ৮৫ ভাগ মানুষই মুসলিম। সেনুপাতে সংখ্যালঘু হিসেবে এখানে হিন্দুরা প্রথম সংখ্যালঘু এবং শিখরা দ্বিতীয় সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করে। ১৮৪৬ সালে বৃটিশরা পাঞ্জাবের অমৃতসরে বসে জুম্মু ও কাশ্মীরের মুসলিম আবাসভূমি শ্রীনগরকে মাত্র ৭৫ লাখ টাকার বিনিময়ে জনৈক পাঞ্জাবী গোলাব সিং ডোগরার হাতে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু শ্রীনগরের মানুষ দেশ বিক্রির এই খেলাকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে তারা ডোগরার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে। কিন্তু ডোগরা রাজশক্তি এবং বৃটিশ সৈন্যদ্বারা এই বিদ্রোহ দমন করে এবং ডোগরার রাজ্য শাসন প্রতিষ্ঠা করে। তারপর থেকেই কাশ্মীরের এই মানুষরা স্বপ্ন দেখে আসছে, একদিন বৃটিশ শাসনের অবসান হবে সেই সাথে ডোগরার রাজ্য শাসনেরও পরিসমাপ্তি ঘটবে। স্বাধীন কাশ্মীরে তারা আবার স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে পারবে।

১৯৪৭ সালে মুসলমানদের আন্তনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি বাস্তাবায়নের শর্তেই দেশ ভাগ হয়েছিল। কথা ছিল মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুসিত অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত হবে মুসলিমদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি Seperete Muslim Homeland Pakistan. এখানে উল্লেখ্য, ভারত বিভাগের পূর্বে বৃটিশ শাসনের অধীনে ৫৬২টি দেশীয় করদরাজ্য ছিল। যারা বৃটিশ সরকারকে কিছু বা রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে মোটামুটি স্বাধীন ভাবেই রাজ্য শাসন করতো। দেশ বিভাগের সময় ১৯৪৭ সালে ভারতের আইনে বলা হয়, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্টের পর দেশীয় রাজ্যগুলোর উপর থেকে বৃটিশ নিয়ন্ত্রন অবসান হলে রাজ্যগুলো স্বীয় ইচ্ছামত ভারত অথবা পাকিস্তানে কিংবা স্বাধীন থাকতে পারবে। অথচ তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এবং স্বয়ং ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেনের গোপন ষড়যন্ত্রের কারণে স্বাধীনতা আইনের এই নীতিটিকে কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। দেশ বিভাগের নীতিটি সততার সাথে অনুসৃত হলে জুম্মু ও কাশ্মীর পাকিস্তানের অংশ হওয়া উচিত ছিল। সে ক্ষেত্রে কাশ্মীর সমস্যা বলে কোন সমস্যাই তৈরী হতো না।

কিন্তু ভিন্নদিকে ভারতের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের সামান্য একটি উদাহারণ দিচ্ছি। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট জুনাগড় রাজ্যের শাসক ছিলেন মুসলমান। তিনি পাকিস্তানে যোগদানের কথা ঘোষনা করলে ভারতীয় নেতৃবৃন্দ, হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্তানে যোগদানের ঘোষনা দেশ বিভাগ নীতির পরিপন্থি বলে চেঁচামেচি শুরু করে। এরপর সেখানে তারা সেনাশক্তি নিয়োগ করে জুনাগড় দখল করে নেয়। অপরদিকে দু’মাস পরই পঁচাশি ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত জুম্মু এবং কাশ্মিরের হিন্দু রাজা হরি সিং ভারতে যোগদানের কথা ঘোষনা করল। কিন্তু তখন সেটাকে দেশ বিভাগ নীতির বরখেলাপ বলা হলো না। ভারতীয় নেতারা হরি সিং ভারতভুক্তিকে সমর্থন জানালেন। এমনকি রাজা সিং এর বেআইনী ঘোষণায় জনগন যখন প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠল,তখন ভারত তলে তলে রাজার পক্ষ নিয়ে প্রজা পীড়নে উৎসাহ দিতে লাগল। রাজা সিং এর ভারতভুক্তির প্রতিবাদে আরোপিত আন্দোলন ধীরে ধীরে গণআন্দোলনে পরিণত হল। গিলগিট এজেন্সির জনগন পাকিস্তানের সাথে তাদের একাত্ততা ঘোষনা করে। একই সাথে পুঞ্জ এবং মীরপুর জেলার জনগনের সাথে দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ৬০ হাজার সৈনিক একত্রিত হয়ে হরি সিং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে। রাজা হরি সিংও তার বাহিনী দিয়ে আন্দোলন কারীদের উপর দমন নীপিড়ন চালাতে থাকে। ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উস্কানিতে এবং হরি সিং ডোগরার প্রত্যক্ষ মদদে কাশ্মীরি পুলিশ এবং শিখরা মিলে প্রায় দুই লাখ কাশ্মীরি মুসলিমতে গুম অথবা হত্যা করে।

হরি সিং এর নিষ্ঠুরতা ওখানেই থেমে থাকেনি। ঐ বছর হরি সিং ঘোষনা দেন, যারা পাকিস্তানে চলে যেতে চায় তাদের জন্য ৬ নভেম্বর বাস প্রস্তূত থাকবে। ৬ নভেম্বর পঁচিশটি বাস ভর্তি কাশ্মীরি মুসলিম নর-নারী,আবাল বৃদ্ধ বনিতা এবং শিশুকে নিয়ে পাকিস্তান অভিমুখে যাত্রা করে। কিন্তু বাসগুলো সামবা নামক সড়কে পৌছার পর হরি সিং এর সৈন্যরা বাসগুলো থামিয়ে এলাপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করে। পরে সেই পঁচিশটি বাসে আগুন লাগিয়ে মুসলিমদের পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পরের দিনও পয়ত্রিশটি বাসভর্তি মুসলিমদেরকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। কাশ্মীরিরা আজও সেই ৬ নবৈম্বরকে কালো দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এসব নির্মম ঘটনার স্বীকার হয়ে অনেক কাশ্মীরি বাধ্য হয়ে পাকিস্তানে চলে যায়। ভিন্ন দিকে কাশ্মীরি মুসলিমদের উপর জুলুম নিপিড়ন দেখে মুজাহিদ বাহিনী দলে দলে জুম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশ করতে শুরু করে। মুসলমান মুাহিদের ভয়ে রাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য কামনা করে। আর ভারত যেন ঠিক এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল। তারা আন্তজার্তিক সকল নিয়ম কানুন উপেক্ষা করে কাশ্মীরে সেনাবাহিনী ঢুকিয়ে দেয়। সেই যে ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে প্রবেশ করল, আজও তারা কাশ্মীর দখল করে রয়েছে। আজও তারা একইভাবে কাশ্মীরি মুসলিমদের উপর নির্যাতন করে চলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীর আজাদী আন্দোলনের নেতা বুরহানকে অন্যায় ভাবে হত্যা করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। তারপর থেকে আজাদী কাশ্মীর আন্দোলনের পালে হাওয়া বৈতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত শতাধিক কাশ্মীরি নিহতের সংবাদ পাওয়া গেছে। দমন নিপিড়ন চালিয়ে একটি জাতিকে স্বাধীনতা থেকে বিমুখ করা যায় না, তার জলন্ত প্রমাণ জুম্মু ও কাশ্মীর।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০১৬ দুপুর ১২:১১
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইশরাকের পদত্যাগ নয়, মাদক নির্মূলে রাষ্ট্রের জবাবদিহি জরুরি

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১


বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাদক আজ আর কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও আমাদের আগামী প্রজন্মের অস্তিত্বের খুটিতে আঘাত হানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের এই সুযোগ কি আরেকবার আসবে? বা তারাই-কি এটা হাত ছাড়া করবে???

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০

ইরানী নেতা খামেনি শহীদ হওয়ার পরে ইরান কি বলেছিল মনে আছে???

ইরান কইছিলো, ইরানের এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী সেই বেবাক দেশকে রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হবে।
প্যান্ট খুলে ছেড়ে দিবে-(এটা আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া কি ছিল?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭



কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া হলো উদ্ভব। কারণ সৃষ্টি বা তৈরী কারক না থাকা। তাতে কী উদ্ভব হবে এটা অনিদৃষ্ট। কারণ এটা নিদৃষ্ট করার কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×