নূর হোসেন দিবস অথবা স্বৈরাচার বিরোধী দিবস। যাই বলুন না কেন গত ১০ নভেম্বর সেই দিবসটি চলে গেছে। আগের মত অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালিত না হলেও মাইক বাজিয়ে জনা বিশেক মানুষের উপস্থিতিতে কয়েকটি উত্তেজনাকর বক্তব্যের মাধ্যমে অত্যন্ত ছোট পরিসরে হলেও দিনটিকে স্মরন করা হয়েছে। যারা দিনটিকে স্মরন করেছেন তাদের কাছে নূর হোসেন নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞ থাকবেন। কারণ দেশের সরকার এবং মানুষ গণতন্ত্র কি তা বুঝতে গিয়ে স্বৈরাচার কি সেটাকেই ভুলে বসে আছে। স্বৈরাচার বিরোধী দিবস পালন তো আরও পরের কথা। তবে একটা চিত্র দেখে নূর হোসেন নিশ্চয়ই আনন্দিত হোন। তার আন্দোলনের দুই সাথী পরবর্তিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সেই দুই সাথী ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসে কতটা গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রদর্শন করেছেন, তা দেখলে হয়তো নূর হোসেন এর বুকে গুলি খাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ ফজলে রাব্বি হলের বট গাছটিতে স্বউদ্যোগে ঝুলে পড়তেন।

স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া এবং তার দল বিএনপি ক্ষমতার আসনটি অলংকৃত করলেন। দেশে চলল গণতন্ত্রান্ত্রিক সরকারের নামে স্বৈরাচারের আচরন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলল, বেগম জিয়ার ছাত্র সংগঠনের একছত্র আধিপত্য। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা কর্মীদের হাতে নিহত হতে থাকে বিপরীত দলের নেতা কর্মীরা। এমন স্বৈরাচারি আচরন প্রদর্শনের পর বেগম জিয়ার ঘাড়েও এরশাদের প্রেত আত্না ভর করতে শুরু করল। তিনিও এরশাদের মত স্বৈরাচার হতে চাইলেন। স্বৈরাচার হতে গিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিলেন। কিন্তু সেসময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামিলীগসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তারা জামায়াত ইসলামের তত্বকালীন আমীর যুদ্ধাপরাধের অপরাধে অভিযুক্ত অধ্যাপক গোলাম আযম এর দেখানো তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইলেন। কিন্তু বেগম জিয়া নিজের স্বৈরাচারি মনোভাবে অটল থাকলেন। রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীকে বিরোধীদের দমনের লক্ষ্যে লেলিয়ে দিলেন। তারপর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করলেন। ফলাফল যা হবার কথা ছিল তাই হল। বিএনপি লোক দেখানো নির্বাচনের মাধ্যমে আবারো ক্ষমতা দখল করল। কিন্তু মাত্র ১৬ দিন। হ্যা মাত্র ১৬ দিন এই স্বৈরাচারি সরকার টিকে ছিল। বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে বেগম জিয়া পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। তারপর তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামিলীগ সরকার তথা শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেন।

এরপর মাঝখান দিয়ে কেটে গেল অনেকগুলো সময়। সেই সময়গুলোতে মনে হল বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশ থেকে স্বৈরাচারের কালো মেঘ হয়তো চিরদিনের জন্য কেটে গেছে। সেই কালো মেঘ হয়তো বাংলাদেশ এবং এই দেশের মানুষকে আর কখনো আচ্ছন্য করতে পারবে না। কিন্তু ২০০৬ সালে বাংলাদেশের ঘাড়ের উপর খাপটি মেরে বসে পড়ল মঈন এবং ফকরুদ্দীনের তত্বাবধায়ক সরকার। তারা দুই বছর নিজেদের ইচ্ছামত সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে দেশ পরিচালনা করে গেলেন।

সেই মঈন ফকরুদ্দীনের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামিলীগ সরকার গঠন করল। সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করলেন। শাসনের সময়কাল যত বাড়তে লাগল দেশের মানুষের কাছে গণতন্ত্রটি যেন ততোটাই ঝাপসা হতে লাগল। দমন নিপিড়ন চলল বিগত যেকোন সময়ের চেয়ে কয়েকগুন বেশি হারে। এই দম নিপিড়ন বাংলার মানুষের কাছে খুব একটা অপরিচিত নয়। এমন নিপিড়ন স্বাধীনতার আগেও যেমন ছিল আজও তেমনি আছে। মাঝখান থেকে শুধু শাসক বদলেছে। আগে বিদেশীরা ছিল আমাদের শাসক। আজ দেশীয় মানুষরাই শাসকের চেয়ারে বসে মুখে চাপা হাসি লাগিয়ে শোসন করে যাচ্ছে। সেই চাপা হাসির আড়ালে যে স্বৈরাচার হাসতেছে তা হয়তো নূর হোসেন প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারতেন কিন্তু বাংলার মানুষ বুঝতে পারেন নি।



সেই স্বৈরাচাররের কালো মেঘ বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশকে আবারো অন্ধকার করে দিয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী দলীয় সরকারের অধীনে নামমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আবারো স্বৈরাচারী সরকার জেকে বসেছে। গ্রামের ভাষায় যাকে বলে জামড়ি মেরে বসা। যে বসার বলে দেয়, আমার বসবার নিয়ম আছে কিন্তু উঠবার কোন নিয়ম নাই। আমি নিয়মের ধোড়াই কেয়ার করি। আর ধোড়াই কেয়ার বোধ থেকেই নূর হোসেন এর সেদিনের স্বৈরাচার বিরোধী মিছিলের সাথী আজ কিনা এরশাদকেই পরম বন্ধু বানিয়ে ফেলেছেন। সেই স্বৈরাচার এরশাদই আজ বঙ্গবন্ধু কন্যার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিও লজ্জায় মুখ লুকাতেন। যে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে স্বৈরাচারের শাসন থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়ে দেশ স্বাধীন করলেন, সেই বঙ্গবন্ধুর কন্যাই কিনা আজ স্বৈরাচারের আসনে মুখে চাপা হাসি লাগিয়ে বসে আছেন। শেইম! শেইম! বঙ্গবন্ধু তোমার জন্য শেইম!
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




