‘ঘরের মধ্যে বাবাকে দেখে কেমন লাগে, ব্রাজিল’?
ফাইনালে ওঠার পর রিও ডি জেনিরোয় এক ব্রাজিলিয়ানকে উদ্দেশ করে খোঁচাটা দিয়েছিলেন এক আর্জেন্টাইন। পরে তা গানে রূপান্তরিত করা হয়। আকাশি-সাদার সমর্থকরা তারই সুরে ঢেউ তুলতে চেয়েছিল মারাকানায়। যেন ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়টা ছিঁড়ে-খুঁড়ে যায়! ঈশ্বর মুচকি হেসেছিলেন। তাই মারাকানাকে দেখতে হলো মুদ্রার অপর পিঠ। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পরই প্রমাণ হয়ে গেল গ্যারি লিনেকারের সে কথাটি একেবারেই সত্যি ‘ফুটবল খুবই সরল একটি খেলা। যেখানে বাইশ জন মিলে নব্বই মিনিটব্যাপী একটি বলের পিছু ধাওয়া করে এবং শেষ পর্যন্ত জার্মানরাই সব সময় জিতে থাকে।’
লিনেকারের এ কথাকে ব্রাজিলিয়ানদের বিশ্বাস করতেই হবে। ১-৭ বলে কথা! কিন্তু রিও ডি জেনিরোকে যারা কয়েকদিনের জন্য আর্জেন্টাইন কলোনি বানিয়ে ফেলেছিল, সেই লক্ষাধিক আকাশি-সাদার সমর্থক সাবেক ইংলিশ ষ্ট্রাইকারের এ কথাটি শুনলে নিশ্চিতভাবেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ত কোপাকাবানার জলে! কেউ কেউ হয়তো উল্টো প্রশ্নও ছুঁড়ে দিতে পারে,' তাহলে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে মারাকানাকে ঢেলে সাজানো কেন? আর, কেনই বা রোজারিওতে ম্যারাডোনার মন্দিরে মেসির নামে পুজো?
এক কথায়, আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাছে মারাকানার ফাইনালটা ছিল মেসির ম্যারাডোনা হয়ে ওঠার মঞ্চ। কিন্তু তাদের মধ্যে অন্তত একজন ব্যক্তিও কি ঘুর্ণাক্ষরেও টের পেয়েছিলেন, ২৪ বছর আগে রোম স্টেডিয়ামে জন্ম নেয়া সেই ক্ষতটা টিকে যাবে এবারও?
টিভি পর্দায় মেসিদের গায়ে নীল জার্সি দেখে ’৯০-এর ফাইনাল ম্যাচটা দেখা আর্জেন্টিনার অনেক প্রবীণ সমর্থক নিশ্চয়ই চমকে উঠেছেন? আরে! এটা তো সেই অভিশপ্ত জার্সি! যেটা পরে জার্মানির কাছে হেরেছিল ম্যারাডোনার দল। আর, রানার্সআপের পদক গলায় পরার সময় অঝোরে কেঁদেছিলেন স্বয়ং ম্যারাডোনা।
আচ্ছা, মেসিরা কি তাহলে শপথ করে নেমেছিলেন যে, ম্যারাডোনার সেই চোখের জল আজ নীল জার্সিতেই মুছে ফেলব! কিন্তু, ম্যারাডোনা থেকে মেসি হয়ে দুই যুগ পরও আর্জেন্টিনার জন্য নীল জার্সিটা অভিশাপ হয়েই থাকল। আর্জেন্টাইনরা ফুটবলকে এখন ‘দুনিয়ার নিষ্ঠুরতম খেলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও তাদের তিল পরিমাণ দোষ দেওয়া যাবে না। পেটে ২৮ বছরের ক্ষুধা থাকলে অমন ভুল-ভাল অনেকেই বলে থাকে !
ফাইনালে ব্রাজিলিয়ানদের জন্য টিকিটের সর্বনিম্ন মুল্য ছিল ৮৭ পাউন্ড। বাদবাকিদের পকেট থেকে টিকিটপ্রতি খসেছে ৪৪০ মার্কিন ডলার। ম্যাচ শেষে মারাকানার বাইরে হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকা এক আর্জেন্টাইন কিশোরীর হৃদয়ের আর্তি তুলে দিলাম, ‘হে ঈশ্বর, পোপ আমাদের। মেসি আমাদের। তাহলে বিশ্বকাপটাও কেন আমাদের নয়?’
সোফিয়া ওজেদা পেশায় কারখানার শ্রমিক। বিশ্বকাপ শুরুর আগে দুই মাস ওভারটাইম খেটে সে ব্রাজিলে আসার অর্থ জোগাড় করেছে। ’৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা যখন কাপটা উঁচিয়ে ধরেছিলেন, তখন তার জন্মও হয়নি। চার বছর পর রোম স্টেডিয়ামে ম্যারাডোনা যখন কাঁদছিলেন, তখনও নয়। অথচ ’৯০-এর সেই জ্বালার পুরোটাই বুকে আগলে রেখেছেন আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের এ প্রতিনিধি। ও গ্লোবোর সঙ্গে আলাপচারিতায় সেই ফাইনালের শেষ দিকে মেক্সিকান রেফারি এডগার কোডেসালের বিতর্কিত পেনাল্টির প্রসঙ্গ উঠতেই সোফিয়ার চোখে শ্রাবণের অঝোরধারা! ‘তখন আমার জন্ম না হলেও পরিবারের বাকিদের মুখে সেই ফাইনালের গল্প শুনেই বড় হয়েছি। আমার দাদা এখনও জীবিত। তিনি এখনো ম্যারাডোনার কথা বলেন। কিন্তু হায়! তার আক্ষেপ এবারও ঘুচল না'- সোফিয়ার আর্তি।
সোফিয়ার মতোই আর্জেন্টিনা থেকে ব্রাজিলে উড়ে এসেছেন জোসেফ। ’৮৬ বিশ্বকাপ তার কাছে শৈশবের অষ্পষ্ট কালিঝুলি মাখা স্মৃতি। কিন্তু ’৯০-এর জ্বালা ভালোই পুষে রেখেছেন। তাই বললেন, ‘আমি শপথ করে বলছি, সামনের দিনগুলোতে ব্রাজিলের মাটিতে এই হার কখনোই ভুলতে পারব না।’
আর্জেন্টিনার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ত্রিশের নিচে। সেখানকার প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ এর আগে কখনোই তাদের দেশকে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে দেখেনি। স্বপ্নটা পূরন হলেও তার শেষটা হলো বিরহ দহন নিয়ে। কিন্তু ব্রাজিলিয়ানদের উল্লাস তাতে কমেনি, বৈকি বেড়েছে! ‘মারাকানাতে আর্জেন্টিনার জয় ব্রাজিলিয়ানরা কখনোই দেখতে চায় না। তেমন কিছু ঘটলে আমাদের আজীবন কৌতুকের শিকার হতে হতো। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি' মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন গ্যাব্রিয়েল আলভিন নামে এক ব্রাজিলিয়ান।
ফাইনালের এই হারে আর্জেন্টিনা কিন্তু ’৯০-এর মতো অদৃষ্টকে দোষারোপ করতে পারবে না। অন্তত দুটি পরিষ্কার গোলের সুযোগ তারা পেয়েছিল। বুয়েন্স এইরস তাই এখন কান্না-হাসির মিশেলে এক অদ্ভুত ভুতুড়ে নগরী। সেখানে কেউ প্রার্থনায় নিমগ্ন, কেউ আবার চোখে জল ছেড়ে মেতেছে ধ্বংসযজ্ঞে। আহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। তাই দেখে নিশ্চয়ই এক গাল হেসে নিচ্ছেন রিও ডি জেনিরো শহরের মেয়র এদুয়ার্দো পেইস ? বিশ্বকাপ শুরুর আগে তিনি নিজেই তো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ফাইনালে আর্জেন্টিনা যদি ব্রাজিলকে পরাজিত করে, তাহলে আমি আত্নহত্যা করব। ওদের মেসি এবং পোপ আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সবকিছু জিতে নিবে।'
ঈশ্বর যা করেন ভালোর জন্যই করেন। '৮৬-তে তার হাত আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছিল বিশ্বকাপ। এবার সেই একই হাত বাঁচিয়ে দিল এদুয়ার্দো পেইসের প্রাণ। পার্থক্য একটাই, ২৪ বছর আগে হাতটা ভর করেছিল দিয়াগো ম্যারাডোনার ওপর। কিন্তু এবারের ফাইনালে অমন দুটি গোল মিসের পর যে কেউই বলবেন, আর্জেন্টিনা হয়তো নিজে থেকেই চায়নি !
তাই, লিওনেল মেসিরও আর ম্যারাডোনা হয়ে ওঠা হয়নি।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ১০:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




