
যখন আরব জাতির সাহিত্যিক প্রতিভা তার চরম শিখরে পৌঁছেছিল, যখন কবিতা ছিল তাদের হৃদয়ের স্পন্দন, আবেগের প্রকাশ এবং ওকাজ মেলায় শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো সোনার অক্ষরে লিখে কাবার প্রাচীরে টাঙিয়ে রাখা হতো, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। এই গ্রন্থ ছিল না কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ, বরং সাহিত্যপ্রেমী আরবদের জন্য এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ, এক জীবন্ত মোজেজা যা তাদের ভাষার সৌন্দর্যকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কুরআনের প্রতিটি আয়াতে এমন গভীর সাহিত্যিক মাধুর্য, অপূর্ব ছন্দ, অসাধারণ চিত্রকল্প এবং সারগর্ভ অর্থের সমন্বয় রয়েছে যা মানুষের মনকে আকর্ষণ করে, চিন্তাকে জাগ্রত করে এবং আত্মাকে আলোকিত করে।
আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন যে তিনি মানুষের জন্য উপমা পেশ করেন, যাতে তারা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে, সত্যকে উপলব্ধি করে এবং জীবনের গভীর রহস্য বুঝতে পারে। এই উপমাগুলো প্রকৃতির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, প্রাণীদের আচরণ, মানবজীবনের চিরন্তন সত্য এবং দৈনন্দিন পরিচিত বস্তু থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে জটিল আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও দার্শনিক সত্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য, হৃদয়গ্রাহী এবং চিরস্মরণীয় হয়ে ওঠে। প্রকৃতির এই অপূর্ব ছবি আমাদের মনে বিস্ময় জাগায়, কৃতজ্ঞতা বাড়ায় এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ভয়কে আরও গভীর করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
“আর এসব উপমা আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা করে।” -সূরা আল-হাশর: ২১
আলোর উপমা: ঈমানের জ্যোতি
আল্লাহ তাআলা বলেন,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর আলো। তাঁর আলোর উদাহরণ একটি তাকের মতো, যাতে একটি প্রদীপ রয়েছে। প্রদীপটি একটি কাচের মধ্যে, কাচটি যেন একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রদীপটি জ্বালানো হয় একটি বরকতময় জয়তুন গাছ থেকে, যা না পূর্বমুখী না পশ্চিমমুখী। তার তেল আগুন না লাগালেও প্রায় জ্বলে ওঠে। আলোর উপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর আলোর দিকে পথ দেখান। আল্লাহ মানুষের জন্য উপমা পেশ করেন। আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী।” -সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৫
পবিত্র বাণী ও বৃক্ষ
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا ۗ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
“তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কীভাবে একটি পবিত্র বাক্যের উপমা দিয়েছেন, যা একটি পবিত্র বৃক্ষের মতো, যার শিকড় মজবুত ও শাখা আকাশে। এটি তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রতি মুহূর্তে ফল দান করে। আল্লাহ মানুষের জন্য উপমা পেশ করেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” -সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৪-২৫
আল্লাহর পথে ব্যয়: বীজের উপমা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
“যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ এমন একটি দানার মতো, যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে এবং প্রতি শীষে একশত দানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ প্রশস্ত ও সর্বজ্ঞ।” -সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬১
লোক দেখানো দান: নিষ্ফল পাথর
আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا ۖ لَا يَقْدِرُونَ عَلَىٰ شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
“যারা মানুষকে দেখানোর জন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে না, তাদের উদাহরণ এমন একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার উপর ধুলো পড়েছে। তারপর প্রবল বৃষ্টি এসে তাকে পরিষ্কার করে দিয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্ম থেকে কোনো ফল লাভ করতে পারবে না। আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।” -সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৪
আন্তরিক দান: উর্বর বাগান
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَتَثْبِيتًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَآتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ
“যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ও নিজেদের দৃঢ়তার জন্য সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ এমন একটি বাগানের মতো, যা উঁচু ভূমিতে অবস্থিত। প্রবল বৃষ্টি এলে সে দ্বিগুণ ফল দান করে।” -সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৫
দুনিয়ার জীবন: ক্ষণস্থায়ী সবুজ
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّمَا مَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنْزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ وَالْأَنْعَامُ حَتَّىٰ إِذَا أَخَذَتِ الْأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَازَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَنْ لَمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ ۚ كَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
“পার্থিব জীবনের উদাহরণ এমন পানির মতো, যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি। তা দিয়ে মাটির উদ্ভিদ জন্মে, যা মানুষ ও পশু খায়। যখন পৃথিবী সজ্জিত হয়ে ওঠে এবং তার অধিবাসীরা মনে করে তারা এর উপর ক্ষমতাবান, তখন রাতে অথবা দিনে আমার আদেশ আসে এবং তা এমনভাবে কাটা হয় যেন গতকাল সেখানে কিছুই ছিল না। এভাবেই আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি।” -সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৪
দুনিয়ার জীবন: শুকনো খড়
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاضْرِبْ لَهُمْ مَثَلَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنْزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيمًا تَذْرُوهُ الرِّيَاحُ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ مُقْتَدِرًا
“তাদের জন্য পার্থিব জীবনের উদাহরণ পেশ করো, যেমন আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করা হয়, তা দিয়ে মাটির উদ্ভিদ জন্মে, তারপর তা শুকিয়ে যায় এবং বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।” -সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ৪৫
মিথ্যা উপাস্য: মাছির উপমা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُوا لَهُ ۚ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَنْ يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ ۖ وَإِنْ يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَا يَسْتَنْقِذُوهُ مِنْهُ ۚ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ
“হে মানুষ! একটি উপমা দেওয়া হয়েছে, তা মনোযোগ দিয়ে শোনো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকো, তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়। আর যদি মাছি তাদের কিছু ছিনিয়ে নেয়, তারা তা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। দুর্বল সেই যে চায় এবং যাকে চাওয়া হয়।” -সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭৩
মাকড়সার ঘর: দুর্বল নির্ভরতা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْلِيَاءَ كَمَثَلِ الْعَنْكَبُوتِ اتَّخَذَتْ بَيْتًا ۖ وَإِنَّ أَوْهَنَ الْبُيُوتِ لَبَيْتُ الْعَنْكَبُوتِ ۖ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
“যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তাদের উদাহরণ মাকড়সার মতো, যে একটি ঘর বানিয়েছে। নিশ্চয়ই সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর, যদি তারা জানত।” -সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৪১
সত্য ও মিথ্যা: ফেনা ও স্থায়ী বস্তু
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌ بِقَدَرِهَا فَاحْتَمَلَ السَّيْلُ زَبَدًا رَابِيًا ۖ وَمِمَّا يُوقِدُونَ عَلَيْهِ فِي النَّارِ ابْتِغَاءَ حِلْيَةٍ أَوْ مَتَاعٍ زَبَدٌ مِثْلُهُ ۚ كَذَٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبَاطِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
“তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, ফলে উপত্যকা তাদের ক্ষমতানুযায়ী প্রবাহিত হয়। বন্যা উঁচু ফেনা বহন করে। আর যা আগুনে গলানো হয় অলংকার বা সামগ্রীর জন্য, তাতেও অনুরূপ ফেনা থাকে। এভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের উপমা দেন। ফেনা চলে যায়, আর যা মানুষের উপকারে আসে তা মাটিতে থেকে যায়। এভাবে আল্লাহ উপমা পেশ করেন।” -সূরা আর-রা’দ, আয়াত: ১৭
আলো হারানো মানুষ
আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَا يُبْصِرُونَ
“তাদের উদাহরণ এমন ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালিয়েছে। যখন তা তার চারপাশ আলোকিত করল, আল্লাহ তাদের আলো নিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারে রেখে দিলেন, যেখানে তারা কিছু দেখতে পায় না।” -সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭
মরীচিকা: প্রতারণাময় আমল
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتَّىٰ إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللَّهَ عِنْدَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ ۗ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ
“যারা কুফর করেছে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার মতো, যাকে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। যখন সে কাছে আসে, তখন কিছুই পায় না। সে আল্লাহকে তার কাছে পায়, যিনি তার হিসাব পূর্ণ করে দেন। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত।” -সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৯
ঝড়ের দিনে ছাই
আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ ۖ لَا يَقْدِرُونَ مِمَّا كَسَبُوا عَلَىٰ شَيْءٍ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الضَّلَالُ الْبَعِيدُ
“যারা তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে কুফর করেছে, তাদের কর্ম ঝড়ো দিনে বাতাসে উড়ে যাওয়া ছাইয়ের মতো। তারা তাদের কৃতকর্ম থেকে কোনো ফল লাভ করতে পারবে না। এটাই দূরবর্তী বিভ্রান্তি।” -সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১৮
দুনিয়ার জীবন: খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ ۖ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا ۖ وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ ۚ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
“জেনে রাখো, পার্থিব জীবন খেলা-ধূলা, অলংকার, পরস্পরের মধ্যে গর্ব ও সম্পদ-সন্তানের প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা। এর উদাহরণ বৃষ্টির মতো, যার উদ্ভিদ কাফিরদের মুগ্ধ করে। তারপর তা শুকিয়ে হলুদ হয়ে যায়, অতঃপর খড়কুটো হয়। আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া কিছু নয়।” -সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২০
দুই সমুদ্রের বৈপরীত্য
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا يَسْتَوِي الْبَحْرَانِ هَٰذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ سَائِغٌ شَرَابُهُ وَهَٰذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ ۖ وَمِنْ كُلٍّ تَأْكُلُونَ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُونَ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَا ۖ وَتَرَى الْفُلْكَ فِيهِ مَوَاخِرَ لِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“দুই সমুদ্র সমান নয়। একটি মিষ্টি, সুপেয়, অন্যটি লবণাক্ত, তিক্ত। উভয় থেকে তোমরা তাজা মাছ খাও এবং অলংকার বের করো যা তোমরা পরিধান করো। তুমি দেখো, জাহাজগুলো পানি কেটে চলছে, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” -সূরা ফাতির, আয়াত: ১২ (প্রকৃতির বৈপরীত্যের উপমা)
মানবজন্ম ও জ্ঞান
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ ۙ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন, যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ ও হৃদয় সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” -সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৭৮ (মানবজীবনের উপমা)
মানুষের অবস্থা: পশুর মতো খাওয়া
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا ۖ وَكَذَٰلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَىٰ
“আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য রয়েছে সংকীর্ণ জীবিকা। আর আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থায় উঠাব। সে বলবে, হে আমার রব! কেন তুমি আমাকে অন্ধ করে উঠালে অথচ আমি তো দেখতে পেতাম? আল্লাহ বলবেন, এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আর আজ এভাবেই তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে।” -সূরা ত্বা-হা: ১২৪-১২৬
(এখানে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখতার ফলকে সংকীর্ণ জীবিকা ও অন্ধত্বের উপমায় বর্ণনা করা হয়েছে।)
দুনিয়ার মোহ: পশুর মতো খাওয়া
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُونَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَهُمْ
“আর যারা কুফর করেছে তারা ভোগ করে এবং খায় যেমন পশু খায়। আর জাহান্নামই তাদের আবাস।” -সূরা মুহাম্মদ: ১২
(দুনিয়ার ভোগ-বিলাসকে পশুর মতো নির্বোধ খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করে আখিরাতের শাস্তির কথা স্মরণ করানো হয়েছে।)
কাফিরদের কর্ম: ছাইয়ের স্তূপ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ ۖ لَا يَقْدِرُونَ مِمَّا كَسَبُوا عَلَىٰ شَيْءٍ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الضَّلَالُ الْبَعِيدُ
“যারা তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে কুফর করেছে, তাদের কর্ম ঝড়ো দিনে বাতাসে উড়ে যাওয়া ছাইয়ের মতো। তারা তাদের কৃতকর্ম থেকে কোনো ফল লাভ করতে পারবে না। এটাই দূরবর্তী বিভ্রান্তি।” -সূরা ইবরাহীম: ১৮
মুমিনের অন্তর: নরম মাটি
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا ۖ فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
“তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না যাতে তাদের এমন অন্তর হয় যা দিয়ে তারা বুঝতে পারে অথবা এমন কান যা দিয়ে তারা শুনতে পারে? নিশ্চয় চোখ অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় সেই অন্তর যা বুকের মধ্যে রয়েছে।” -সূরা আল-হজ্জ: ৪৬
কুফরের পরিণতি: শুকনো গাছ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَبِيثَةٍ اجْتُثَّتْ مِنْ فَوْقِ الْأَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَارٍ
“আর অপবিত্র বাক্যের উদাহরণ অপবিত্র গাছের মতো, যা মাটির উপর থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে, তার কোনো স্থায়িত্ব নেই।” -সূরা ইবরাহীম: ২৬
মুমিনের দৃঢ়তা: পাহাড়ের মতো
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَوْ أَنْزَلْنَا هَٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ۚ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
“যদি আমি এই কুরআন কোনো পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি দেখতে পেতে যে সে আল্লাহর ভয়ে নত হয়ে যাচ্ছে এবং চিরে যাচ্ছে। আর এসব উপমা আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা করে।” -সূরা আল-হাশর: ২১
আখিরাতের দৃশ্য: উল্টে যাওয়া আকাশ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انْتَثَرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ وَإِذَا الْقُبُورُ بُعْثِرَتْ
“যখন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, যখন নক্ষত্রসমূহ ছিটকে পড়বে, যখন সমুদ্রসমূহ ফেটে বেরিয়ে পড়বে, যখন কবরসমূহ উল্টে দেওয়া হবে।” -সূরা আল-ইনফিতার: ১-৪
কুফরের অন্তর: পাথরের চেয়েও কঠিন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَٰلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً ۚ وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهَارُ ۚ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَشَّقَّقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ الْمَاءُ ۚ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
“তারপর এর পরেও তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে, তা পাথরের মতো বা তার চেয়েও কঠিন। অথচ পাথরের মধ্যে এমনও আছে যা থেকে নদী প্রবাহিত হয়। আবার এমনও আছে যা ফেটে যায় এবং তা থেকে পানি বের হয়। আবার এমনও আছে যা আল্লাহর ভয়ে নিচে নেমে আসে। আর তোমরা যা করো আল্লাহ তা থেকে অমনোযোগী নন।” -সূরা আল-বাকারা: ৭৪
আল্লাহর রহমত: বৃষ্টির পর জীবন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
**وَهُوَ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ ۖ وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا لِنُحْيِيَ بِهِ بَلْدَةً مَيْتًا وَنُسْقِيَهُ مِمَّا خَلَقْنَا أَنْعَامًا وَأَنَاسِيَّ كَثِيرًا
“আর তিনিই সেই সত্তা যিনি তাঁর রহমতের পূর্বে সুসংবাদস্বরূপ বাতাস প্রেরণ করেন। আর আমি আকাশ থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করি, যাতে আমি তার দ্বারা মৃত ভূখণ্ডকে জীবিত করি এবং তা থেকে আমি আমার সৃষ্ট অসংখ্য পশু ও মানুষকে পান করাই।” -সূরা আল-ফুরকান: ৪৮-৪৯
দুনিয়ার মোহ: সবুজ শ্যামলতা থেকে শুকনো খড়
আল্লাহ তাআলা বলেন:
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ ۖ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا ۖ وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ ۚ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
“জেনে রাখো, পার্থিব জীবন খেলা-ধূলা, অলংকার, পরস্পরের মধ্যে গর্ব ও সম্পদ-সন্তানের প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা। এর উদাহরণ বৃষ্টির মতো, যার উদ্ভিদ কাফিরদের মুগ্ধ করে। তারপর তা শুকিয়ে হলুদ হয়ে যায়, অতঃপর খড়কুটো হয়। আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া কিছু নয়।” -সূরা আল-হাদীদ: ২০
কাফিরদের কর্ম: মরুভূমির মরীচিকা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتَّىٰ إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللَّهَ عِنْدَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ ۗ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ
“যারা কুফর করেছে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার মতো, যাকে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। যখন সে কাছে আসে, তখন কিছুই পায় না। সে আল্লাহকে তার কাছে পায়, যিনি তার হিসাব পূর্ণ করে দেন। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত।” -সূরা আন-নূর: ৩৯
আল্লাহর আয়াত অস্বীকার: অন্ধকারে পড়া
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوْ كَصَيِّبٍ مِنَ السَّمَاءِ فِيهِ ظُلُمَاتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ مِنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ ۚ وَاللَّهُ مُحِيطٌ بِالْكَافِرِينَ
“অথবা আকাশ থেকে বর্ষিত বৃষ্টির মতো, যাতে অন্ধকার, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ রয়েছে। তারা বিদ্যুতের ঝলকানিতে মৃত্যুর ভয়ে কানে আঙুল দেয়। আর আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” -সূরা আল-বাকারা: ১৯
আল্লাহর রহমতের দরজা: বৃষ্টির পর সবুজ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَهُوَ الَّذِي أَرْسَلَ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ ۖ وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا لِنُحْيِيَ بِهِ بَلْدَةً مَيْتًا وَنُسْقِيَهُ مِمَّا خَلَقْنَا أَنْعَامًا وَأَنَاسِيَّ كَثِيرًا
“আর তিনিই সেই সত্তা যিনি তাঁর রহমতের পূর্বে সুসংবাদস্বরূপ বাতাস প্রেরণ করেন। আর আমি আকাশ থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করি, যাতে আমি তার দ্বারা মৃত ভূখণ্ডকে জীবিত করি এবং তা থেকে আমি আমার সৃষ্ট অসংখ্য পশু ও মানুষকে পান করাই।” -সূরা আল-ফুরকান: ৪৮-৪৯
আল্লাহর ক্ষমতা: আকাশের স্তম্ভহীন উত্থান
আল্লাহ তাআলা বলেন:
اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ۖ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ ۖ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ ۖ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى ۚ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوقِنُونَ
“আল্লাহই সেই সত্তা যিনি আকাশমণ্ডলীকে স্তম্ভ ছাড়াই উঠিয়েছেন, যা তোমরা দেখতে পাও। তারপর তিনি আরশে সমাসীন হয়েছেন। আর তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়োজিত করেছেন, প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলছে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন। তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন যাতে তোমরা তোমাদের রবের সাক্ষাতে দৃঢ় বিশ্বাসী হও।” -সূরা আর-রা’দ: ২
প্রকৃতির সাক্ষ্য: পাহাড়-পর্বতের কথা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَٰكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ ۗ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
“আর এমন কোনো বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহকারে তাসবীহ পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পার না। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাশীল।” -সূরা বনী ইসরাঈল: ৪৪
এসব উপমাসমৃদ্ধ আয়াত মাত্র কয়েকটি নমুনা। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারিমে ভোরের শিশিরের মতো ঝলমল করা অসংখ্য উপমা ছড়িয়ে রয়েছে। এই অতুলনীয় ভাষাশৈলী আমাদের বিস্ময় ও মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেয় এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি ভালোবাসা নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
আল্লাহ তাআলার উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতি
মহান আল্লাহ তাআলার বাণীতে উপমা ছিল এক অপরিহার্য অংশ। প্রাত্যহিক জীবনের পরিচিত বস্তু ও প্রকৃতির ছবি টেনে এনে তিনি জটিল বিষয়কে সহজ করে তুলতেন। তাঁর উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সখ্য ফুটে ওঠে। এসব উপমা থেকে বোঝা যায়, তিনি সৃষ্টিকে কত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এসব উপমা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আল্লাহ তাআলা প্রকৃতিকে অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর অসাধারণ, অনন্য এবং অনুপম উপমাগুলো জটিল ধর্মীয় ও নৈতিক সত্যগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য, হৃদয়গ্রাহী এবং চিরস্মরণীয় করে তুলেছে। এই অতুলনীয় উপমা-প্রয়োগের ধারা ছিল তাঁর অসীম জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং মানুষের মনকে সহজে স্পর্শ করার অসাধারণ ক্ষমতারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
উপসংহার
কুরআনের উপমাগুলো শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের নিদর্শন নয়, বরং এগুলো মানবজীবনের গভীর বাস্তবতা, আধ্যাত্মিক সত্য এবং নৈতিক শিক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম। প্রকৃতি, প্রাণী, আলো, পানি, বৃক্ষ, বৃষ্টি, এমনকি ক্ষুদ্র মাছি বা মাকড়সার মাধ্যমেও আল্লাহ তাআলা এমন শিক্ষা দিয়েছেন যা যুগে যুগে মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে।
এই উপমাগুলো আমাদের শেখায় চিন্তা করতে, উপলব্ধি করতে এবং সত্যের পথে চলতে। প্রতিটি উপমা যেন একটি দরজা, যা খুলে দেয় জ্ঞান, ঈমান ও প্রজ্ঞার নতুন দিগন্ত। যে ব্যক্তি এসব উপমা গভীরভাবে চিন্তা করে, তার হৃদয়ে জাগে আলোর সঞ্চার, আর সে ধীরে ধীরে আল্লাহর নৈকট্যের পথে অগ্রসর হয়।
রেফারেন্সঃ
-সূরা আল-হাশর: ২১
-সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৫
-সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৪-২৫
-সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬১
-সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৪
-সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৫
-সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৪
-সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ৪৫
-সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭৩
-সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৪১
-সূরা আর-রা’দ, আয়াত: ১৭
-সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭
-সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৯
-সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১৮
-সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২০
-সূরা ফাতির, আয়াত: ১২
-সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৭৮
-সূরা ত্বা-হা: ১২৪-১২৬
-সূরা মুহাম্মদ: ১২
-সূরা ইবরাহীম: ১৮
-সূরা আল-হজ্জ: ৪৬
-সূরা ইবরাহীম: ২৬
-সূরা আল-হাশর: ২১
-সূরা আল-ইনফিতার: ১-৪
-সূরা আল-বাকারা: ৭৪
-সূরা আল-ফুরকান: ৪৮-৪৯
-সূরা আল-হাদীদ: ২০
-সূরা আন-নূর: ৩৯
-সূরা আল-বাকারা: ১৯
-সূরা আল-ফুরকান: ৪৮-৪৯
-সূরা আর-রা’দ: ২
-সূরা বনী ইসরাঈল: ৪৪
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


