লেখার শুরুতেই ডিস্ক্লেইমার দিচ্ছি ; আমি কোন ইসলামিক স্কলার নই।
তবুও বিষয়বস্তু নিয়ে লিখতে বসার মত আস্পর্ধার কারন আমাদের ধর্মের একটা বিশেষ দিক এবং এই সংশ্লিষ্ট কিছু খুটি নাটি আচার দেশভেদে নিজস্ব সাংস্কৃতির প্রভাবে কত ভিন্ন ভিন্ন আদলে উপস্থাপিত হয় যা অনেক সময় বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে- এ বিষয়ে পর্যবেক্ষন ও পর্যালোচনা করে আল কোরআনের মূল নির্দেশনাটায় আলোকপাত করা।
আমার বসবাসরত দেশ জাপান। ধর্মহীন মানুষদের দেশ । তাই তাদের কিছু নির্দোষ প্রশ্ন দিয়েই এর অবতারণা ।
আমার নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতাই হুবুহু তুলে ধরছি ;
ঘটনাঃ ১। “ ও তো কেক- ব্রেড, কেক যেগুলিতে *সর্টেনিং আছে – সেগুলি খায়না, ম্যাকডোনাল্ডসের খাবার খায়না, তোমরা খাও কেন? আর তোমরা কি অন্য রকম মুসলমান – অন্য গোত্র? ”
-“ না, ইসলামে কোন class, division নেই।“
“ তাহলে কি ও ভাল মুসলমান – তোমরা খারাপ মুসলমান? “
* (সর্টেনিং -মূলত প্রানীজ ফ্যাট- যা অমুসলিম দেশে হালালভাবে জবাইকৃত প্রানীর হয়না সাধারণত ।)
ঘটনাঃ ২। “ তুমি আর ও যে প্রার্থনা করতে যাও কয়েকবার- অন্য ২ জন করে না কেন?”
ঘটনাঃ ৩। ফিসফিস করে আমাকে দেখিয়ে আমার জাপানীজ প্রফেসর কাম ডিরেক্টরকে ক্লায়েন্টের প্রশ্ন- “ মেয়েটা মিশরীয়, ইরানী না তুর্কী ?”
-“ না না, বাংলাদেশী”
“কি বাংলাদেশী!! বাংলাদেশী এমন মাথা ঢাকা মেয়ে স্যুট পড়ে?”
— মঙ্গোলীয়ান ধাচের চেহারা হলে দূর প্রাচ্যের কোন দেশের ভেবে নিতো। তখন এতো প্রশ্ন উঠত না- কারন, ওদের কেউ কেউ টি-শার্ট, টপস – এমনকি shaped গেঞ্জির সাথেও শুধুই মাথায় স্কার্ফ পড়েই “হিজাব/ পর্দা ” করে। কিন্তু তারা অবশ্যই খুবই ভাল মুসলিম, কারণ ইসলামের সমস্ত আহকাম- আরকান সচরাচর সবাই খুবই নিয়মতভাবে অনুশীলন করে।
ঘটনাঃ ৪। “ রাস্তায় ঐদিন বাঙ্গালী এক পরিবার দেখেছি সাইকেল চালিয়ে যেতে ।”
---“ কোন এলাকায় ? ”
“গাক্কেনতসী। ”
--“ গাক্কেনতসীতে তো এমন কোন বাঙ্গালী নেই তো ! কেন মনে হল যে বাঙ্গালী? ”
“ঐ যে, তোমার মতো মাথা ঢাকা ছিল! ”
-“ওহ, ওটা মুসলীমা’র চিহ্ন, বাঙ্গালীর চিহ্ন না।“
“ তাই নাকি? তা তোমাদের কতভাগ মেয়ে মাথা ঢেকে রাখে? অর্ধেকও না? যারা মাথা ঢেকে রাখে তারা ভাল মেয়ে – যারা ঢাকেনা তারা খারাপ মেয়ে, তাই না? তাহলে তোমাদের দেশে এতো এতো খারাপ মেয়ে? ”
মাথায় একদম খুন চেপে যাবার অবস্থা!!!
সহকর্মীটির কথায় ওয়েবে খুজে দেখি বাংলাদেশী মহিলা/ মেয়ে দিয়ে সার্চ দিলে ১% ও হেজাব করা মেয়ের ছবি আসে না। অথচ অন্য যে কোন মুসলীম দেশেই তাই আসে! অথচ আমাদের দেশ ৯০% মুসলিমের দেশ, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম- ৪র্থ বৃহত্তম মুসলিম দেশ।
জাপানীজ সহকর্মীকে বললাম “ হেজাব করেনা মানেই খারাপ আর করে মানেই ভাল – এমন কোন যুক্তি নাই। “হেজাব” অর্থ cover. এটা স্রেফ একটা মুসলিম মেয়ের কস্টিউম! মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশ আছে যাতে ৯৯% মুসলিম – দেশের ভিতর বোরখা ছাড়া চলা যায়না- কিন্তু সাধারণত তারা ঘরোয়া/ দাপ্তরিক সব পার্টিতেই যথেচ্ছ মদ খায় যেটা আমাদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আর জাপানে আমি আজ অব্ধি সেই দেশের যতজন মেয়েদের দেখেছি –পরিচয় না দেয়ার আগে তাদের কিছুতেই চিহ্নিতও করতে পারিনি - কারণ, দেশের বাইরে পা রাখা মাত্রই এরা ওয়েস্টার্নদের চেয়েও বেশী ওয়েস্টার্নাইজড হয়ে গেছে এবং তাদের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই এটাই এখন কমন । ”
“ বুঝলাম, কিন্তু তোমাদের নিজের দেশের কথা আগে বল শুনি- তোমাদের ধর্মে কি বলেছে? হেজাব করতে বলেছে- - নামাজ পড়তে বলেছে? - না কি বলেনি? ”
--“ বলেছে। ”
“ তাহলে তো পরিষ্কার, যারা মাথা ঢাকছে না তারা খারাপ, তারা God এর কথা শোনে না”
প্রশ্নটা পিঠের উপর চাবুকের মত পড়তে লাগলো! আমি নিশ্চিত, যারা পরবাসে যান – তাদের কম বেশী এই জাতীয় প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হয়। বিশেষ করে জাপানের মত মূলত ধর্মহীন একটা দেশে এইসময় কোন “Gray area / অস্পষ্ট এলাকা” রাখা যায়না- হয় সাদা- নয় কালো। এবং এই Identity crises থেকেই অনেক মেয়ে প্রবাস জীবনে হিজাব শুরু করে, এর উদাহরণ, আমি নিজেই। রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম- ১০ বছর থেকে পাঞ্জেগানা নামাজ- ৩০ রোজা ফরয, কামিজ-উড়না বাধ্যতা মূলক, স্কুল –কলেজে যাবার সময় হিজাব করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেই বিয়ে হয়ে গেল- স্বামী ধার্মিক নন- নিজেও কেন জানি আর তাগিদ অনুভব করলাম না হেজাবের, ( অথচ, ধর্মীয় অন্যসব ফরজ আলহাদুলিল্লাহ কোন ব্যাত্যয় হয়নি )। এবং এই ব্যাপারটা আমি আমার সমসাময়িক অনেকের ক্ষেত্রেই দেখেছি!
সেই তাগিদ পেলাম প্রবাস জীবনে । না, নিজের দেশের মতো রাস্তা ঘাটে নোংরা দৃষ্টি – আর গায়ে অনৈতিক নোংরা ছোঁয়া থেকে বাঁচতে না।
এই উপলব্ধি থেকে যে, একজন মুসলীমের জন্য ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ মেনে চলা যেমন ফরয। হেজাব বা পর্দাও একটা ফরয।
যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইউনিফর্ম আছে- ইউনিফর্ম না পড়লে স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে ঐ স্কুলে প্রবেশাধিকারই নাই বা কোনদিন কোন বিশেষ কারণে চলে গেলেও শাস্তি পেতে হবে - এটা তেমনি একটি বিষয়।
অন্যদিকে, নামাজ- রোজা- জাকাত- ইমান ভাবতে পারি স্কুলের টিউশন ফি’র সমতুল্য - না দিলে নাম কাটা যাবে স্কুল থেকে, কিন্তু দিলে ফার্স্ট হবার সাথে কোন সম্পর্ক নেই।
তাই, অনেকেই যে বলেন, “নিয়মিত নামাজ, রোজা করি – তাও আল্লাহ আমার চাওয়া পূরণ করেন না”। এর উত্তর হচ্ছে, নিয়মিত নামাজ না পড়লে শাস্তি আছে – কিন্তু পড়লেই এতো এতো পাবার কোন গ্যারান্টি নাই। সেটা আপনার আমল, নিয়ত, নিষ্ঠা, মানবীয় গুনাবলী বা কি দিয়ে পাড় পাবেন তা একান্তই আল্লাহ পাকের মর্জি ।
আর প্রবাসে ভিনদেশীর এসব প্রশ্নের সামনে, খুব অনিয়মিত ভাবেও যারা নামাজ পড়ে বা অন্যান্য স্তম্ভগুলি মেনে চলে তাদেরও নিজেকে “খারাপ মুসলমান” বা “ নাস্তিক” হিসেবে ঘোষণা দিতে অনেক বড় কলিজা লাগে!
জাপানে আমাদের ছোট্ট শহরেই ৩০টির মত দেশের মুসলিম দেখে নিজেই খুজতে শুরু করলাম, যে, কেন আমাদের পর্দা মেনে চলার পরিমান এতো কম? কেন একেক দেশে হেজাবের রূপ একেক রকম? একটা দেশের নিজস্ব সাংস্কৃ্তি ধর্মকে কতটা প্রভাবিত করে? এবং সর্বোপরি-ফিকাহ শরীফ- বুখারী শরীফ না- খোদ “আল কোরআনে” হিজাবের নির্দেশনা কি দেয়া আছে?
পবিত্র আল কোরআনের ৩০টি পাড়ায় আমাদের পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যাবস্থার নীতি নিয়ম নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে এবং রাসুল (সাঃ) এর সারাজীবনই আল কোরানের Practical example. আমার খুব স্বল্প জ্ঞান এবং সময় খরচে আমি পবিত্র কোরআনে যা পেয়েছিলাম তা নীচে দেয়া হল;
খুব অল্প কথায় সুনির্দিষ্টভাবে আল কোরানে সুরা আল নূর, আয়াত, আয়াতঃ ৩০-৩১ এবং সুরা আহজাব, আয়াতঃ ৫৮-৫৯ এ “মুসলীম নারী- পুরুষ” উভয়কেই শালীন পোশাক পরিধানের নির্দেশ দিয়েছে। পরিষ্কারভাবেই প্রথমেই পুরুষের পর্দার কথা বলা হয়েছে- চোখ (দৃষ্টিকে অবনত করতে )ও মনের পর্দা করতে । এরপর নারীর প্রতিও বলা হয়েছে, দৃষ্টিকে অবনত করতে, মনের পর্দা করতে এবং অতঃপর শরীরের পর্দা করতে। শরীরের পর্দা হবে এমন যে, নারীর সহজাত/ জন্মগত সৌন্দর্য ও সাধারণ অলঙ্কার ( আটপৌরে ব্যবহার্য) ছাড়া অন্য কিছুই স্বামী এবং মাহরাম ব্যাতীত কারো সামনে প্রদর্শিত হবে না। এখানে মাহরাম কারা তাও পরিষ্কার ভাবে বলে দেয়া হয়েছে। মাহরাম তারাই যাদের সাথে আমার বিবাহ সম্পর্ক নিষিদ্ধ । অর্থাৎ, বাবা, ভাই, চাচা, মামা, নিজের ছেলে, ভাই- বোনের ছেলে, উন্মাদ কিংবা জাগতিক বোধের বয়স হয়নি তারা মাহরাম ।এর বাইরে যারা, মানে যাদের সাথে বিবাহ সম্পর্ক সম্ভব তারাই “ মাহরাম নন” এবং এক কথায় তারা কেউ আমার মুখ, কব্জিসহ হাত ছাড়া শরীরের আর কোন অংশ কিংবা তার আকৃতিও দেখতে পাবেনা ।
নারী পুরুষ উভয়েরই শরীর আবৃত করা পোশাকটি দিয়ে শরীর ঢাকলেই শুধু চলবে না- শরীরের আকৃতিও বোঝা যাবে না।
এবং বলা হয়েছে এসবই আপনাকে বিশেষায়িত করবে, রক্ষা করবে অসন্মান থেকে।
কাজেই, আপনার বয়ঃপ্রাপ্ত ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে সমান ভাবে এর প্রয়োজনীয়তা একেবারে নিজের উপলব্ধি, উদাহরণ দিয়ে না বুঝিয়ে জোড় করে মেয়েটাকে ধরে খালী বোরখা পড়িয়ে দিলে চলবেনা কিংবা শুধু মেয়ের ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করে ছেলের চোখ, মন , দেহের পর্দার ব্যাপারে উদাসীন থাকলেও হিতে বিপরীতই হবে। আর ছেলে মেয়েতে এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা বৈপরীত্য আরেক ঐশীর জন্ম দেবে! মেয়ে দেখবে তার ভাই একটা ইভ টিজার - আর বাবা মা সেটা আমলেই আনেন না, এমন বাবা –মা কি মেয়ের কাছে বাধ্যতা কিংবা যথাযত সন্মান আশা করতে পারেন? উপরন্ত আপনার মেয়েই রাস্তায় একই ভাবে অন্য যে ছেলে এমন শিক্ষা পায়নি তার দ্বারা অসন্মানিত হবে। তাই যার যার ঘর থেকেই শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় উদ্যোগ নিন ধর্মীয় অনুশাসনেই।
মনে পড়ে যায়, আমার দোতলায় থাকা থাই মুসলিম পরিবারের কথা। সদ্যজাত কন্যা সন্তান দেখতে গেছি- দিন সাতেকের বাচ্চা- মাথায় হেজাব- শরীরে শুধুই ডায়পার ! কারণ কি? “ আরে মেয়ে না? হিজাব তো করতে হবে!” এই হল দেশ ভেদে হেজাবের কনসেপ্ট । মাথায় একটা কিছু থাকলেই হল, ব্যাস, শরীরে যাই থাক~!
মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশের প্রতিবেশী বান্ধবী, ৫ সন্তান ও স্বামীসহ হজ্জ করেছেন- আমাকে দেখলেই আড্ডার শেষে অবশ্যই বলতো “কেন তুমি হেজাব করোনা? কেন তুমি সাজসজ্জা করো? আজ এখুনি হিজাব শুরু করে দাও- কারণ, তুমি জাননা এক মুহুর্ত পরেও তুমি বেচে থাকবে কিনা!” কিন্তু আড্ডার ফাকে নামাজের সময় হলে আমি বাড়ি যাবার জন্য উসখুস শুরু করতে করতে তার নির্বিকার ভাব দেখে এক পর্যায়ে ওয়াক্ত চলে যাবার আগে বাড়ি এসে নামাজ পরে পার্কে গিয়ে দেখতাম নামাজের ওয়াক্ত পাড় হয়ে গেছে—সে পার্কেই আছে!
আমি খুব অবাক হতাম যে, ইসলামের মূল ৫ স্তম্ভের মধ্যে হলো নামাজ – আর পাশাপাশি হেজাব স্রেফ আরো অনেক ফরযের মধ্যে অন্যতম ! মূল স্তম্ভের ৫ ফরজের চেয়ে দৃশ্যমান ফরজের প্রতি এতো গুরুত্ত্ব!! অথচ অন্তর থেকে যাবতীয় আহকাম আরকান না মেনে লোক দেখানো ধর্মীয় রীতি পালন কিন্তু “পরোক্ষ শীরক”! দেশ ভেদে এই হলো ইসলামের ব্যাখ্যা এবং প্রথা।
আবার দেশে দুটো প্রচলন দেখেছি-
১। “ঘরের ভেতর পরিবারের মানুষের সামনে হেজাব লাগবে না” - এদের মধ্যে ভাশুর, বোনের জামাই, দেবর সবাই আছে- যারা নন মাহরাম ( বিবাহ সম্পর্ক করা যাবে এমন, অর্থাৎ বিবাহ সম্পর্ক বহির্ভূত নন) !
২। অপর পক্ষে এও দেখেছি পরিবারের বা কারোর নাবালক শিশুপুত্রের সামনেও কোন কোন মহিলা ঐ ঘরেই প্রবেশ করেন না।
উপরে উল্লেখিত দুই গ্রুপের জন্যই পরের প্যারাগ্রাফটি দ্রষ্টব্য।
না জেনে কিছু হয়ে গেলে আল্লাহ মাফ করার মালিক। কিন্তু অনেকেই এসব পড়েও এখন তর্ক করবেন- “ বলা আছে ঠিক আছে, কিন্তু বেশী করলে ক্ষতি কি?” এর উত্তরঃ এই ক্ষতি এমন ক্ষতিও হতে পারে, যেমনটি কোন বিশেষ দিবসে কোন নফল রোজা বা নামাজের উল্লেখ নাই জেনেও তা করলে বিদ’আর গুনায় দোষী হতে হয় । এখানে কোন সোয়াবের প্রশ্নই নেই। আর আল্লাহ পাক কোন কিছুইতেই বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না আমরা মুসলিম মাত্রেরই তা জানা উচিৎ।
এখন আসি নিজ দেশের আত্মপক্ষ সমর্থনে (তথ্যে ভূল ত্রূটি অনিচ্ছাকৃত। স্বল্প জ্ঞান ও স্বল্প সময় ব্যায়ের ফল; অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি) ;
বঙ্গের উৎস বিবেচনায় খৃষ্টপূর্ব ১০০০ সন হতে বাংলাভাষী দ্রাবিড়, তীব্বতীয় ব্রাহ্মনদের পদচারনায় জাগ্রত এই ভূমিতে খৃষ্টপূর্ব ৩২২ থেকে ময়ুর, গৌড়, পাল সাম্রাজ্য পর্যন্ত চলল বৌদ্ধ শাসনামল- - ১০৭০ সাল থেকে ১২০৪ পর্যন্ত স্থানীয় হিন্দু সেন শাসনামল। ১২০৪ এ তার্কীশ ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী দিল্লীর সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেকের পৃষ্ঠপোশকতায় শাসক লক্ষন সেনকে পরাস্ত করে মুসলিম শাসনামল শুরু করেন। ১৭৫৭ সাথে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দোউলা’র পর্যুদস্তের পর ব্রিটিশ শাসন শুরু হয় বাংলায় এবং ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের পর পাকাপাকিভেব ব্রিটিশ- ইন্ডিয়া স্থাপিত হয় শুরু হয় ব্রিটিশ রাজ। এরপরের ইতিহাস সবার জানা।
লক্ষ্য করুন, আমাদের শাসকেরা ( পাল শাসকেরা ব্যাতীত) কখনওই স্বদেশী / বাঙ্গালী ছিলেন না। কাজেই, তাদের মাধ্যমে যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতির পলিমাটি আমাদের সাংস্কৃতিতে গোড়া পত্তন করে গেছে।
আর ভারতবর্ষ ধর্মের ভিত্তিতে ভেঙ্গে ইন্ডিয়া –পাকিস্তান হবারও অনেক আগে বাংলা ভাষীদের ভিত্তিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বঙ্গ আলাদা করেছিলেন যা পরবর্তীতে ইন্ডিয়া পাকিস্থান দেশ ভাগের পর পশ্চিম বাংলা ,পূর্ব বাংলায় রুপান্তর হয়েছে। এবং এরও ৪২ বছর পরই হয়েছে ধর্মভিত্তিক অসম্পূর্ণ একটা বিভক্তি, ইন্ডিয়া পাকিস্তান।
কাজেই, আমরা আদতে, আগে বাঙ্গালীর পরিচিতি পেয়েছি, অনেক পরে পেয়েছি মুসলমানের পরিচিতি । আমাদের সাংস্কৃতিতেও তারই প্রতিফলন।
আরো অনুঘটক ছিল আমাদের ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন অপব্যাখ্যাজনিত অন্ধত্বর কারণে একদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জ্ঞান চর্চায় ইংরেজদের সাহচার্যে অনেক এগিয়ে যাওয়া যা প্রগতিশীল, সংসারমুক্ত মুসলিমদের অনুপ্রাণিত করেছে তাদের মত করে চলতে ফিরতে ( অবশ্যই ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বেগম রোকেয়ার মত অনেকেই স্বমহিমায় ভাস্বর ছিলেন- যারা তাদের শেকড়বিচ্যুত হননি)।
তখন এই প্রগতিশীলরাই আমাদের পথ প্রদর্শক -অগ্রজ -প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে উঠেছিলেন নিঃসন্দেহে- তাই নবজাগরণের আলোকে উদ্ভাসিত হতে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা মনে করলাম- তাঁদের মত করেই চলন বলন হতে হবে! নচেৎ আমরা আর কাকে অনূসরণ করব? আর সেই থেকে শুরু হয়ে গেল ইংরেজদের আর হিন্দু সাংস্কৃতি অনুকরণে চলা- অর্থাৎ আমাদের মনে গ্রথিত হয়ে গেল যে শিক্ষিত, সভ্য এবং উৎকৃষ্টতার (classy) রূপই এটা!
- অন্যদিকে পরবর্তীতে ধর্মচর্চায়/ মাদ্রাসার ধর্মীয় শিক্ষায় সাধারণত (ব্যাতিক্রম অবশ্যই আছে) পরিবারের সবচেয়ে কম বুদ্ধি সম্পন্ন ছেলেগুলিকে পাঠানো হত যাদের অন্য কোথাও ভবিষ্যত নাই বলেই আশঙ্কা হত। আর এদের অনুবাদিত ও তাফসীরকৃত ইসলাম আমাদের দেশে এখন প্রতিনিধিদ্ধ করে যা ভুল, বিভ্রান্তি আর বিদ’আয় (reprehensible innovation) আকন্ঠ নিমজ্জিত।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মসজিদের শহর ঢাকায় জন্ম- বেড়ে ওঠা আমি – জীবনেও কোন মসজিদের সীমানা প্রাচীর ডিঙ্গাতে পারিনি, অনুমোদন ছিলনা। আর ধর্মহীনদের এই দেশে তিরিশের বেশী মুসলিম দেশের ইসলামিক স্কলারদের সান্নিধ্যে আমি দেখতে পেলাম- বিভিন্ন কমিউনিটির মেয়েদের থেকে স্বেচ্ছাসেবক প্রতিনিধি নিয়ে “সিস্টার’স লীডার” গ্রুপ - যারা সব ক্ষেত্রেই মসজিদে নানাবিধ কর্মকান্ডে মূল ভূমিকা রাখে।
মসজিদ আমার কাছে এখন নিষিদ্ধ কোন জায়গা না- সবচেয়ে শান্তির জায়গা।
কয়েকদিন আরবী ক্লাস করেছিলাম, নিজে আরবী বুঝে আল কোরআন পড়বো বলে। ইমাম সাহেব, লিবিয়ান ডঃ নূরুদ্দীন ( PhD On Electrical Engineering) ক্লাস নিতেন। বললেন, আল কোরানের অন্যতম ছোট যে সুরা, সুরা আল ইখলাস, সেখানে যেই লাইনটা “ আল্লাহুস সামাদ---“ এই “সামাদ” শব্দের অর্থ শতকরা ৯৯% আরবও জানেনা। হতোদ্যম হয়ে গেলাম! আসলেই তো! আল কোরান তো একমাত্র আদি অকৃত্তিম অবিকৃ্ত ঐশ্বরিক বানী, কোন মানুষের লেখা বা মানুষের দ্বারা পরিবর্তিত নয়! কাজেই, এই পবিত্র গ্রন্থের ভাষার গাঁথুনি তো এমন ঐশ্বরিক আর অনন্যসাধারণই হবে!
তাই এখন কোন কিছুতে প্রশ্ন বা confusion এলেই সরাসরি তাঁকে/ তাঁদেরকে ইমেইল করি- এদের মধ্যে বিশ্বসেরা ইসলামিক বিদ্যাপীঠ মিশরীয় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারও আছেন। তাঁরা detail তাফসীর করে লিঙ্ক দিয়ে বুঝিয়ে দেন।
ঈদের দিনের ইমামতীতে মিশরীয় ডঃ হামদী (Professor, Chemical Engineering Department, Kyushu University) তার সবচেয়ে দামী স্যুট পড়ে দাড়ী -গোঁফ ছেটে, চুল ছেটে ঝাঁ চকচকে ফিট ফাট হয়ে আসেন- কোন আলখাল্লা না।
- কেন?
- কারণ, রাসুল (সাঃ) বলেছেন ঈদের দিনে তুমি তোমার সবচেয়ে সুন্দর এবং পরিষ্কার পোশাক পরিধান করবে। আর ইসলামী পোশাক বলে তো কিছু নেই ! আছে পোশাক কেমন হতে হবে তার নির্দেশনা। শরীর ও তার আকার ঢাকা থাকতে হবে। আমার স্যুটেও তো শরীর এবং শরীরের আকার ঢাকা আছে! আলখাল্লা- জোব্বা তো ইসলামিক পোশাক নয়! আরবের প্রচন্ড রোদে চামড়া ঝলসে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য তৈরি হয়েছে -- জাপানে তার দরকার কেন?
-------------------------------------------------------------
বিধর্মী দেশে চাকরীরতা অনেক মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করে হেজাব করলে চাকরী থাকবে তো? কি করে এর সমন্বয় সাধন সম্ভব? আমি সবসময়েই তাদের বলি, আমি এখনও হিজাবের শতকরা ৮০% ও অনূসরণ করতে পারিনি। ইনশাল্লাহ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কারণ, এটা ফরয- তাই এর কোন মাফ নেই। আর হ্যা, কোন দেশেই- কোন অফিসেই (স্পেনের কিছু উদ্ভট ব্যাতিক্রম ঘটনা উদাহরণ হতে পারেনা) ইনশাল্লাহ হেজাবের জন্য কখনই আটকাবে না।
তবে অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য যে, আপনি কাজকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে এর সাথে ব্যালেন্স করে (অর্থাৎ, জরুরী মিটিং ফেলে নামাজে চলে না গিয়ে, জামায়াতে নামাজে গিয়ে আড্ডাতে অফিসের কাজের সময় অপচয় না করে) , অজু করার সময় সমস্ত বেসিন ভিজিয়ে নষ্ট না করে, অফিসের ড্রেসকোড ও হিজাবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আপনার রিজিকের প্রতি শতভাগ সৎ ও নিষ্ঠাবান হয়ে চলবেন।
আর আমাদের ধর্মেও মেয়েদের ঘরের বাইরে কাজের কোন নিষেধাজ্ঞা কখনোই নেই- এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বিবি খাদিযা (রাঃ) যিনি সবসময়েই তাঁর ব্যাবসা বানিজ্য পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চালিয়ে গেছেন রাসুল (সাঃ) এর নিয়মিত উৎসাহ ও সহযোগিতায়।
শুভকামনা এবং এতো বড় লেখাটি যারা পড়তে পেরেছেন তাদের অসীম ধৈর্য’র জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



