আমার শব্দরা হারিয়ে গেছে, আমার হারাবার যা কিছু হারিয়ে গেছে তোমার মধ্যে। আর আমি? আমিও কি হারিয়ে যাব না, আমিও কি হারিয়ে যাইনি? প্রেম বড় পুরনো নয়, কিন্তু কি বা পুরনো নয়? সূর্য পুরনো, চাঁদ পুরনো, প্রয়োজন, তাও পুরনো। প্রত্যেক দিন তো দেখি সূর্যকে। তবু কি তাকে দেখে কোনদিনও চোখ বুঝতে ইচ্ছে করে? কোনদিন কি মনে হয় সূর্য পঁচে গেছে? পুরনো হয়ে গেছে, ওর আর কি দেখব? প্রেমও কি তাই? প্রেমও কি সূর্যের মতো নয় জীবনে? যত রঙ, যত কল্পনা, যত আশা-আকাঙ্খা, জীবনের সব কিছুর মূলে কি এই প্রেম নয়?
যুক্তিতর্কে পান্ডিত্যে পন্ডিতের কাছে হয়তো হার মানব, তবু মনে মনে একথা বলতে আমার ভাল লাগে, তোমার কানে কানে এ কথা বলতে আমার ভাল লাগে- আমাদেও ভাল লাগে প্রেম, ভাল লাগে প্রেমের কবিতা, আর কল্পনা, আমরা ভালবাসি পরস্পরকে।
ওটাই তো তোমার অভিযোগ; আমি চিঠি লিখতে পারি না, জমিয়ে রাখি তোমার চিঠিগুলো। আমারও তো বলার মত কতা জমে রয়েছে, কিন্তু কথা যে আমি গুছিয়ে লিখতে পারি না। কিন্তু নাই বা পারলাম, শুনতে তো পাব। তুমিই আমার কথা। তোমার ভাষাই আমার ভাববস্তু।
তুমি একবার বিয়ের কথা বলেছিলে না- বিয়ের সবচেয়ে বড় অভিশাপ কি জান? অতি অল্পদিনের মধ্যে সব পুরনো হয়ে যায়। কোন নতুনত্ব থাকে না। কোন কৌতুহল থাকে না পরস্পরের কাছে | দুজনে দুজনের কাছে হয়ে পড়ে ঘরের সাধারণ আসবাবের মত। পুরম্নষ ডুবে যায় কাজকর্মে, বিষয় সম্পত্তিতে; মেয়েরা সনত্মান রালন আর ঘরকন্নায়। এবং আর একাল ( কি স্ত্রী, কি পুরুষ দুই-ই পাওয়া যায় এ দলে) অত অল্পে হাল ছাড়ে না, তারা খুজে নেয় ভালবাসার জন্য, মুগ্দ হওয়ার জন্য নতুন পাত্রপাত্রী। আমরা দুজনে তৃতীয় কোন দল কি গড়তে পারতাম না? আর পারতাম না কি নিজেকে পরস্পরকে নিত্যনতুন কেও সৃষ্টি করতে।
তোমাকে বালবাসি, তোমাকে পেয়ে আমি চরিতার্থ-কথাগুলো কিভাবে যে বলব ভেবে পাইনি! তবু বলতে ইচ্ছে হয়। সহজ-সাদা কথায় এসব কথা বলা চলে না। উৎসবের সজ্জা আলাদা। সেখানে চাই বিচিত্র বর্ণেও সমাহার। আনন্দেও প্রকাশ বাহুল্যের মধ্যে, বৈচিত্রের মধ্যে। আমার বনানী, কানে কানে ডাকতে ইচ্ছা করছে তোমার নাম ধরে।
আমার শরীরের কোন খবর দেই না বলে অভিযোগ করেছ। ভয় দেখিয়েছ, তুমিও শারীরিক খবর দেবে না এরপর থেকে। এমন কের কি কোন দিনও জানতে চেয়েছ এর আগে? তুমি তো জান, এই শরীরই আমাদের সব। যুদ্ধ করতে এসেছি তো এই শরীর ভালোর জন্যই। তুমি দেখে নিও আমরা এ দেশকে শত্রম্নমুক্ত করেই ছাড়ব। তবুও বলতে পারছি না, তোমাকে লেখা এটাই আমার শেষ চিঠি কি না।
আমি তোমাকে ছেড়ে এই এতদূরে পড়ে আছি, তাই মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, আমাকে তোমার কেমন লাগে? তুমি ভাববে এতদিন পর এই প্রশ্ন কেন? কিন্তু এ প্রশ্ন চিরদিনের নয়? কাল যাকে ভাল লেগেছে আজ তাকে ভাল নাও লাগতে পারে। তাছাড়া পরস্পরকে ভাল লাগল কি লাগল না এ ধরনের অনুভূতিটাই নষ্ট হয়ে যায়। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, সংসার করা, সবই শারীরিক অব্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তাই পরস্পরের অসিত্মত্ব পরস্পরের কাছে অনুবূত করাতে হয় বারবার প্রশ্ন কেও ‘আমাকে ভালবাস তো?’
পারিপার্শ্বিকের নানা প্রতিকুলতাকে জয় করতে হবে, একটু একটু করে স্বাধীন করতে হবে দেশ, যোগ্য করতে হবে নিজেকে। এসব আমার সঙ্কল্প, দুশ্চিনত্মা নয়। অপূর্ণতার জন্য বেদনাবোধের মধ্যেই রয়েছে পূর্ণতার আশ্বাসবাণী। তুমি দেখে নিও এবার আমরা স্বাধীন হবই।
তোমার কথা যখন মনে হয়, যকন ভাবি, আমার কৃতকার্যের জন্য, আমার গৌরবের জন্য তুমি প্রতিড়্গা করে রয়েছ তখন ভারি ভাল লাগে, ভারি আনন্দ হয় মনে। আমার গৌরবে তোমার গৌরব, তোমার আনন্দে আমার আনন্দ। কিভাবে মিশে আমরা এক হয়ে গেছি।
ঊনানী, ছোটবেলা থেকে তোমাকে তুই বলে ডাকতাম। তুই থেকে কেন যে বড় বেলায় তুমি বলা শুরম্ন করেছিলাম তা এখনো জানি না। চিঠির শেষে তোমাকে তাই আবার তুই কেও বলতে ইচ্ছে করছে। যদি দেশ স্বাধীন হয়, যদি আমি বেঁচে না থাকি...
ঊনানী, আমি তোকে প্রচন্ড ভালবাসি। তোর জন্য আমি এ দেশটাকে আমার জীবন দিয়ে হলেও দেশ স্বাধীন করব। কিন্তু তোর ভালোবাসার মানুষটাকে, এই আমাকে তোর হাতে হয়তো দিতে পারব না- বনানী, আমাকে ঘৃণা করিস।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





