somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নৈশ শিকারী
জীবন সংগ্রামে হেরে যাওয়ার মাঝে কোনো বীরত্ব থাকেনা; তাই জীবনের এই যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহসীকতার সাথে লড়াই করার মাঝেই জীবনের প্রকৃত বীরত্ব লুকিয়ে থাকে, আর ভাগ্য সবসময় সাহসীদের পক্ষেই কাজ করে।

পরকীয়া প্রেম যখন ধর্মের অংশ এবং সূফি তত্ত্বের পিছনের রূপ।

২৬ শে এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শ্রীচৈতন্যের প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণব ধর্মের একটি বিশিষ্ট অঙ্গ হলো পরকীয়া প্রেম। অর্থাৎ বর্তমান যুগের ভাষায় পরস্ত্রীর সাথে অবৈধ প্রেম ও ব্যভিচার। বিখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার তার লিখিত ‘বাংলা দেশের ইতিহাস’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে বলেছেন, বর্তমান কালের রুচির অমর্যাদা না করে এর বিস্তৃত বর্ণনা করা অসম্ভব। তার মতে, আশ্চর্য বিষয় এই যে, এই পরকীয়া, অর্থাৎ পরিণীতা স্ত্রীর সাথে বৈধ প্রেম অপেক্ষা আধ্যাত্মিক দিক থেকে অনেক শ্রেষ্ঠ ভাবা। বৈষ্ণবরা মনে করতেন এবং এখনো মনে করেন, প্রেমের মাধ্যমে ভগবানের সঙ্গ লাভ সম্ভব। আর এই প্রেমের প্রথম সোপান হচ্ছে পরকীয়া। পরকীয়ার মাধ্যমে ভগবত প্রেমের আবির্ভাব ঘটে। সম্ভব হয় প্রেমের স্বরূপ উপলব্ধির। আর এই প্রেমের সাধনার মাধ্যমে লাভ করা যায় ভগবানের সান্নিধ্য। (দ্রষ্টব্যঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস,দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৭, মাঘ ১৩৮০; জেনারেল প্রিন্টার্স, কলকাতা)

আমার বাড়ি রাজশাহী শহরে। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে, উত্তর- পশ্চিমে খেতুর নামে একটি জায়গা আছে। এখানে সুপ্রসিদ্ধ বৈষ্ণব মহাজন নরত্তম ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। ১৫৮২ সালে (১৫০৪ শকাব্দে) নরত্তম ঠাকুর খেতুরে চৈতন্যবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তিনি আহ্বান করেছিলেন এক বিরাট বৈষ্ণব সম্মেলন। খেতুর হয়ে ওঠে তখনকার সারা বাংলার বৈষ্ণবদের বিশেষ তীর্থ। এই তীর্থ উপলক্ষে, সেখানে প্রতি বছর বহুলোকের সমাগম হতে আরম্ভ করে। পরে নরত্তম ঠাকুরের তিরধান উপলক্ষে মাঘ মাসের শেষে সাত দিন একটি বড় মেলা বসতে আরম্ভ করে। এই মেলায় বিভিন্ন ধরনের কাঠের আসবাব, বাঁশ ও বেতের তৈরি দ্রব্য, সুন্দর নকশা আঁকা শখের হাঁড়ি বিক্রি হতো। যারা বৈষ্ণব নন, তারাও যেতেন ওই মেলায় এসব জিনিস কিনতে।

বাংলাদেশে এ সময় যত মেলা বসত, তার মধ্যে খেতুর মেলা ছিল খুবই প্রসিদ্ধ। এ সময় মেলায় প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ হাজার লোকের সমাগম হতো। এই মেলা এ সময় কার্যত হয়ে উঠত একটি বড় অস্থায়ী ব্যবসাকেন্দ্র। এই খেতুর মেলায় লোকসমাগম হওয়ার অন্য আর একটি কারণও ছিল। তা হলো, বৈষ্ণব যুবতী মেয়েরা (বৈষ্টমী) আপাদমস্তক চাদরে ঢেকে কেবল এক হাতের তালু বাইরে বের করে রাখত। তাদের হাতের এই তালুতে কিছু অর্থ দিলে এসব বৈষ্ণব মেয়ে যেকোনো লোকের অস্থায়ী যৌনসঙ্গী হতো। এই প্রথাও হয়ে উঠেছিল কিছুটা বৈষ্ণব ধর্ম সাধনারই অঙ্গ। বৈষ্ণব মতে দাস্য সখ্য বাৎসল্য শৃঙ্গার এই চারি রস। চারি রসে ভক্ত যত কৃষ্ণ তার দাস।

উল্লেখ্য, বৈষ্ণবরা কৃষ্ণের পূজারী। কৃষ্ণকে মনে করা হয় দেবতা বিষ্ণুর অবতার। রাধা ও কৃষ্ণকে নিয়ে গড়ে উঠেছে বিরাট বৈষ্ণব সাহিত্য। আর রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার বর্ণনা আজকের মাপকাঠিতে মনে হয় খুবই অশ্লীল। আমি একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতাম। বহু দিন হলো অবসর জীবন যাপন করছি। শুনলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি অনেক প্রগতিশীল অধ্যাপক বলছেন বৈষ্ণব ধর্ম হলো একটি মানবতাবাদী ধর্ম। আর তার মধ্যেই খুঁজে পেতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির আদিম উৎসকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষ্ণব পরকীয়া সাধনপদ্ধতি শুরু হলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কোনো পরিবেশ কি অবশিষ্ট থাকবে? বৈষ্ণব কবি জ্ঞানদাস বলেছেন রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর। প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষা বিদ্যমান ছেলেমেয়েরা এখানে একসাথে লেখাপড়া করে। এখানে যদি তারা বৈষ্ণব হয়ে ওঠেন, তবে তাদের লেখাপড়ার পরিস্থিতি বাস্তবে কী দাঁড়াবে, সেটা সহজেই অনুমান করা চলে।

নিশ্চয় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাই না এ রকম কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হোক। লালন ফকিরকে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। তাকে নিয়েও কিছু আলোচনা হয়ে উঠেছে প্রাসঙ্গিক। ‘ফকির’ শব্দটি আরবি (বহুবচনে ফকরা)। মুসলিম বিশ্বে একসময় সৃষ্টি হয়েছিল একাধিক ফকির সম্প্রদায়। ফকিরেরা মনে করতেন মানবজীবনে ঝগড়া ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয় সম্পত্তিকে ঘিরে। তাই শান্তিময় জীবনযাপন করতে হলে অনুসরণ করতে হবে ফকির বা নিঃস্ব মানুষের জীবন। লালনকে অনেকে বলেন, ফকির লালন শাহ্। কিন্তু লালন মুসলিম বিশ্বের ফকির আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন না। মুসলিম ফকিরেরা একত্রে বাস করতেন আশ্রমে। আশ্রমকে আরবিতে বলে রিবাত। আর ফারসিতে বলে খানঘা। বাংলায় খানঘা শব্দটা রূপান্তরিত হয়েছে খানকা শব্দে। লালন শাহ ঠিক কোনো আশ্রমবাসী ফকির ছিলেন না। বাংলাদেশে প্রধানত চারটি ফকির সম্প্রদায় ছিল। এরা হলো, কাদেরিয়া, নকস্বন্দী, সুরাবর্দী ও চিশতিয়া। এসব ফকির সম্প্রদায়ের মধ্যে একসময় সবচেয়ে বড় ফকির সম্প্রদায় ছিল কাদেরিয়া।

কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হলেন, আবদ আল্- কাদির জিলানী (১০৭৭-১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)। ইনি ছিলেন বাগদাদ শহরের লোক। ইনি তার রিবাদ গড়েন বাগদাদ শহরের উপকণ্ঠে, যা মুসলিম বিশ্বে হয়ে উঠেছিল খুবই খ্যাত। জিলানী তার অনুসারীদের বলেছেন, জনকল্যাণে ব্রতী হতে। দুস্থদের সাহায্য করতে এবং অসুস্থদের সেবাযত্ন করে সারিয়ে তুলতে। জিলানীর অনুসারী ফকিরেরা বিভিন্ন ধরনের বনৌষধি জানতেন, যা দিয়ে তারা চাইতেন রোগীকে রোগমুক্ত করতে। একে বলা হতো ফকিরি চিকিৎসা। আবদ আল্- কাদির জিলানীকে বাংলায় বলা হতো বড় পীর সাহেব। উপরিউক্তভাবে লালন ফকিরের শিষ্যরা কোনো দিনই এভাবে ধর্মসাধনা করেননি। তাদের মধ্যে কাজ করেছে বৈষ্ণব ধ্যানধারণা।

আমি একবার অনেক দিন আগে (প্রায় ৪২ বছর) লালন ফকিরের আখড়ায় গিয়েছিলাম, কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। সেখানে গিয়ে দেখেছিলাম কিছু নর-নারীকে একত্রে গঞ্জিকা সেবন করতে। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলোম, গঞ্জিকা সেবিনী ওই সব নারী যাপন করে খুবই শীথিল যৌনজীবন। ইসলামে নেশাভাঙ ব্যভিচার করা নিষিদ্ধ। লালন (১৭৭৪-১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ) জন্মেছিলেন হিন্দু কায়স্থ পরিবারে। তিনি একবার তীর্থে যাওয়ার সময় পথে আক্রান্ত হন গুটিবসন্ত রোগে। তার সহযাত্রী বন্ধুরা তাকে পথে ফেলে রেখে চলে যান। অসুস্থ লালনকে একটি মুসলমান পরিবার পথ থেকে তুলে এনে সেবাসুশ্রষা করে সারিয়ে তোলেন। লালন মুসলমানের গৃহে অন্ন গ্রহণ করার জন্য আর ফিরতে পারেন না হিন্দুসমাজে। কিন্তু লালনের ধ্যানধারণা থেকে যায় হিন্দুভাবাপন্ন হয়েই।

আর তার ওপর পড়ে বিরাট বৈষ্ণব প্রভাব। আমি এসব কথা বলছি কারণ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল অধ্যাপক বলছেন আমাদের হওয়া উচিত লালন অনুসারী। কিন্তু লালন অনুসারীরা এখন ভিখারি ছাড়া আর কিছুই হন না। তারা একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে ভিক্ষা করে খান। লালন অনুসারী হলে আমরা পরিণত হব ভিখারির জাতে। কিন্তু সবাই ভিখারি হতে গেলে প্রশ্ন দেখা দেবে, ভিক্ষাটা আসবে কোথা থেকে? আমি এসব কথা বলছি, কেননা, সম্প্রতি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুন হয়েছেন। আর এই খুনের কারণ হিসেবে অনেকে বলছেন, তিনি ছিলেন লালনপন্থী ও বৈষ্ণবভাবাপন্ন। করতেন পরকীয়ারও চর্চা। মুসলিম মৌলবাদীরা তাই তাকে খুন করেছেন। প্রকৃত ঘটনা আমরা এখনো জানি না। তার খুনের মামলা আদালতে গৃহীত হয়েছে মামলার সওয়াল জবাবের মাধ্যমে জানা সম্ভব হবে তার খুনের প্রকৃত কারণ। বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৫:৩৩
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×