somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন করিমুদ্দিন এবং একটি ছোট্ট প্রতিরোধ !!!

২৬ শে মার্চ, ২০১০ রাত ১০:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গ্রামের অশিক্ষিত, খেটে খাওয়া মানুষ করিমুদ্দিন ... অল্প বয়সেই বাবার সাথে যৌথ সংসারের হাল ধরায় ক্লাস ৫ এর পরে আর পড়া হয়নি তার ... যখন তার বয়স ২০ তখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ ... মুক্তির আকাঙ্খায় উদ্বেলিত বাবা ছেলে দুজনের মধ্যেই যুদ্ধে যাওয়ার চরম ইচ্ছে থাকলেও বাবার আদেশে ঘরের দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে সেই যে বাবা কে ভোর রাতে বিদায় দিয়েছিল, সেই শেষ ... বাবার সাথে আর দেখা হয়নি ... এর পরে একে একে কেটে গেছে ... দিন, মাস ... বছর .... এত বছরে করিমুদ্দিনের সংসার হয়েছে, ঘরে এসেছে অপরূপ সুন্দরী বৌ রহিমা সেই সাথে হয়েছে দুটো ফুটফুটে বাচ্চা ... রহিম আর আলেয়া ... করিমুদ্দিনের বড় স্বপ্ন ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা শিখাবে, মানুষের মত মানুষ বানাবে ... এমন ভাবে বড় করে তুলবে যেন ওরা তার চোখের শান্তির কারন হয় ... তাই তো শখ করে ওদের দু ভাই বোন কে একসাথে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে বেশ ভালভাবেই কেটে যাচ্ছিলো ওদের জীবন ...

কোন এক শীতের সকালে দরজায় ঠক ঠক শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখা গেল নুরানী চেহারার একজন দাড়িয়ে আছে, সাথে আরো কয়েকজন। তিনি বললেন -- আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিতে এসেছি । হতচকিত করিমুদ্দিন জিজ্ঞেস করে, সে তো মুসলমান , তাকে আবার কেন ইসলামের দাওয়াত দেয়া হচ্ছে ? ... নুরানী চেহারার মানুষটি এই প্রশ্ন শুনে সেখানেই দাড়িয়ে উর্দু-বাংলা মিশিয়ে ছোটখাটো এমন এক বক্তৃতা করলেন যার সারমর্ম হলো - আজকাল দেশে বেদাতি কাজ-কারবার এমন বেড়ে গিয়েছে যে মানুষ চেনা দায় হয়ে গিয়েছে, আর ধর্ম তো অনেক দুরের কথা ... তাই তিনি নিজের গরজেই মানুষকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করে চলেছেন ... তার পদক্ষেপ হিসেবেই এখানে গ্রামের কিছু মানুষের সহযোগীতায় তিনি একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করবেন সেই সাথে একটি পাকা মসজিদ ... ইসলামের নুরে এই গ্রামকে আলোকিত করার লক্ষ্যে আমৃত্যু তিনি কাজ করে যাবেন বলে নাকি পণ করেছেন। এমন একজন কামেল ইসলামের খাদেম এর সাথে পরিচিত হতে পেটে ধর্মভীরু করিমুদ্দিনের আর খুশির সীমা নেই, ঐ মুহুর্তে সে কি করবে না করবে কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না ... কিন্তু দরাজ দিলের অধিকারী নুরানী চেহারার ভদ্রলোক তাকে শান্ত হতে বলে বললেন - আমি এখানের মসজিদের পাশেই উঠেছি, প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে ধর্মীয় আলাপ আলোচনা হবে, আপনি সময় করে আসবেন .... অশিক্ষিত গরীব করিমুদ্দিনকে এভাবে সম্মানের সাথে কেউ ডাকে না, সেখানে এমন একজন গন্যমান্য ব্যাক্তি তাকে যেতে বলেছে তাও ধর্মের কথা শুনতে সে কি আর না গিয়ে পারে ?

কিছু দিন পরের ঘটনা, নুরানী চেহারার মৌলভী সাহেবের হৃদয় শিহরিত কথামালায় বিগলিত করিমুদ্দিন ইসলামের খেদমতের জন্য তৈরী করতে রহিমকে স্কুল থেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলো... আর ছেলে মেয়ে একসাথে ক্লাস করা ইসলামে নাজায়েজ শুনে সাথে সাথে আলেয়া স্কুল ও বন্ধ করে দিলো ... মেয়েকে শিক্ষিত করে বড় করার স্বপ্নের কথা মৌলভী সাহেবকে বলার সাথে সাথেই তিনি আলেয়াকে নিজে পড়াবেন বলে আশ্বাস দেওয়ায় করিমুদ্দিনের জীবনের সব আশা যেন স্পষ্ট হতে শুরু করলো ... মাস ছয় ঘুরতে না ঘুরতে রহিম আর আলেয়ার মাঝে কেমন যেন এক অন্যরকম পরিবর্তনের আভাস লক্ষ্য করা গেল ... যদিও স্কুলের তুলনায় অনেক কম পড়ালেখা করেও সে আজকাল অনেক ভাল ফলাফল করছে, আলেয়াও আজকাল শুধু ঘরের বাইরেই নয় বরং ঘরের ভিতরেও পর্দা করা শুরু করেছে ... ওদিকে আলেয়াকে নাকি মৌলভী সাহেব কি কাজ দিয়েছেন তাই আজকাল মা মেয়ে মিলে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ী বাড়ী গিয়ে ইসলামের সেবা করে আসছে ... সেদিন ফজলু মিয়া নালিশ করলো ... ওরা নাকি তার বাড়ী গিয়ে বৌ এর হাত ধরে বলেছে সামনের মাসে ওরস হবে ওদের বাড়ী ৩ টা গরুর মাঝে যে কোন একটা ইসলামের সেবার উৎসর্গ করতে বলেছে ... নাছোড়বান্দার মত তাকে রাজি করিয়ে নাকি হাত ছেড়ে বোরখার তলা থেকে ছোট্ট কোরআন শরীফ বের করে বলেছে - আপনি কোরান ধরে কথা দিয়েছেন এখন এ মত কাজ না করলে কি হবে তা তো বুঝতেই পারছেন ..... এসব নালিশ শুনতে শুনতে হঠাৎ খেলার মাঠের হট্টোগোল শুনে ওরা দুজনেই ছুটলো কি হয়েছে দেখার জন্য ... গিয়ে দেখে রহিম আর তার কয়েকজন বন্ধু মিলে এক অচেনা আগন্তুককে চরম মারপিট করছে ... আগন্তুকের রক্তাক্ত চেহারা দেখে এক মুহুর্ত দেরি না করে করিমুদ্দিন আর ফজলু মিয়া ওদের থেকে তাকে রক্ষা করে একপাশে এনে ক্ষতস্হান গুলোকে পরিষ্কার করে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো -- আপনি কে, কোথা থেকে এসেছেন, ওরা কেন ই আপনাকে মারছিল ?

সংক্ষেপে যা জানা গেল তা হলো উনি একজন সাংবাদিক, যুদ্ধাপরাধীদের বর্তমান অবস্হার উপরে একটি রিপোর্ট তৈরীর জন্য আজকে এখানে এসেছিলেন। তার কাছে পাক্কা খবর আছে - এ গ্রামের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাতা একজন স্বনামধন্য রাজাকার ছিল, আর এখনো সে তার কথার মায়াজালে বন্দী করে অনেক সহজ সরল মানুষকে ইসলামের নামে বিপথগামী করে তুলেছে ... এ খবরের সত্যতার খোজেই তিনি এখানে এসেছেন.... পথের মাঝে দেখা হয়েছে রহিমদের সাথে। তাদের শিক্ষককে রাজাকার বলার সাথে সাথে আর কিছু না শুনেই ওরা মারধর শুরু করেছিল, একবার জিজ্ঞেসও করেনি তার কাছে কোন প্রমান আছে কি না ... ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দাড়ানো রহিমকে এ কথার সত্যতা জিজ্ঞেস করতেই সে নিজের বাবার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো -- এদেশে কখনো কোন মুক্তি যুদ্ধ হয়নি, যেটা হয়েছিল তার ছিল একটি গৃহযুদ্ধ মাত্র যার মাঝে এক পক্ষ ছিল ইসলামের পক্ষের অন্যটি ইসলামের বিপক্ষে... সত্য সবসময় ই সত্য তাই সে সময় ইসলামের পক্ষের শক্তির পরাজয় হলেও অচিরেই এমন একদিন আসবে যেদিন চারদিকে শুধুমাত্র তাদেরই জয়জয়কার শোনা যাবে ... রহিমের কথায় যেন করিমুদ্দিনের কান ঝাঝা করে বেজে উঠলো, সে জিজ্ঞেস করলো - তবে কি বলতে চাস, তোর বাবা ঐ সময় ইসলামের শত্রু ছিল ? বলতে চাস - তোর দাদা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর ফেরত আসেন নি ? ... আজ যে দেশের মাটিতে তুই দাড়িয়ে আছিস সেটিও কি তবে ----- .... করিমুদ্দিনের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রহিম বলে উঠলো -- বাবা বলে তোমায় আমি ভালবাসি সম্মান করি, আপনার কাছে আমার অনুরোধ আগে যা করেছেন, করেছেন সামনে আর ইসলামের খেলাফ কৈ বাত নেহি কারনা .... তা না হলে আমি ভুলে যেতে বাধ্য হবো যে আপনি আমার বাবা ... গা শিউরে উঠা এ কথা শুনতেই যেন করিমুদ্দিনের চোখে অন্ধকার নেমে এলো, হঠাৎ যেন মনে হলো যেন পায়ের নীচে মাটি সরে যাচ্ছে ... এতদিনের দাবিয়ে রাখা বিষবৃক্ষ নিরবে নিভৃতে এমনভাবে বিস্তৃতি লাভ করে শেষমেষ বাড়ীর ভিতরে পর্যন্ত প্রবেশ করেছে তা তার কল্পনাতীত ছিলো ... হতবিহ্বল করিমুদ্দিন আজ নিজেকে বড় দুর্বল অনুভব করছে, উদ্ভ্রানতের মতো এলোমেলো পায়ে কোন রকমে নিজের অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে বাড়ী পর্যন্ত পৌছুলো ... আজ সে এমন অসহায় যে ঐ দেশদ্রোহীর বিপক্ষে দাড়ানোর মত শক্তি যেন আজ যে পাচ্ছে না , এর মাঝেই মনের সকল শক্তিকে এক করে একটুকরো কাগজে ছোট্ট কয়েকটি কথা লিখে দরজার লাগিয়ে দিলো -- সকল রাজাকার আর তাদের সহযোগী অমানুষদের প্রবেশ নিষেধ !

হোক সে আর একলা, হোক সে দুর্বল তবু নিজের অবস্হান থেকে নিজের ক্ষমতায় যট্টুক সম্ভব যে প্রতিরোধ আজ সে শুরু হয়েছে তা সে চালিয়েই যাবে ... এই মুহুর্ত থেকে আমৃত্যু ...



সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০১০ রাত ১১:০২
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ওভারব্রীজ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৪

বেশ অনেকদিন আগের কথা। আমি কোন এক দুর্ঘটনায় পা এ ব্যাথা পাই। হাসপাতালে ইমারজেন্সি চিকিৎসা নেই। কিন্তু সুস্থ হতে আরো অনেক দেরী। সম্ভবত চিটাগাং রোডে (নারায়ণগঞ্জ) এ রাস্তা পার হবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৈচিত্রে ভরা মহাবিশ্ব, তবে মানুষ কেন একই রকম হবে?

লিখেছেন মিশু মিলন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৯



এবার শেখরনগর কালীপূজার মেলায় গিয়ে সন্ধ্যার পর ভাগ্নি আর এক দাদার মেয়েকে বললাম, ‘চল, তোদের অন্য এক জীবন দেখাই।’
সরু গলি দিয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলাম পিছনদিকে যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫


ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন , তখন তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের ক্লান্ত অভিমান। একটা মুসলিম দেশ, কোটি কোটি মুসলিম মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহর সুন্নাতের পরিবর্তে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন মতের অনুমোদন সংক্রান্ত হাদিস বাতিল হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।
ইউনূস ক্ষমতা দখল ছিল লুটের উদ্দেশ্যে। কেন শিশুদের টিকা দেয়া হয় নাই? তাদের দায়িত্ব ছিল টিকা পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×