
এবার শেখরনগর কালীপূজার মেলায় গিয়ে সন্ধ্যার পর ভাগ্নি আর এক দাদার মেয়েকে বললাম, ‘চল, তোদের অন্য এক জীবন দেখাই।’
সরু গলি দিয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলাম পিছনদিকে যেখানে সাধু-সন্ন্যাসীরা অস্থায়ী তাঁবু গেঁড়েছেন। গলিতে ঢুকতেই গাঁজার ধোঁয়া আর গন্ধ। ছোট ছোট তাঁবুর মধ্যে নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধুরা কেউ গান গাইছেন, কেউ গাঁজা-কলকের দোকান সাজিয়ে বসে আছেন, কেউ গাঁজা বানাচ্ছেন, কেউবা গাঁজায় টান দিচ্ছেন, কেউ শিঙা বাজাচ্ছেন, কেউ ত্রিশূল কিংবা শিবের ছবিতে ধূপ জ্বালাচ্ছেন। দুটো মেয়েকে দেখে তাদের কেউ কেউ অবাক চোখে তাকালেন, কারণ ওই গলিতে স্থানীয় নারীরা ছাড়া বাইরের কোনো মেয়ে যায় না। ঘুরে ঘুরে সাধুদের কর্মকাণ্ড ওদের দেখালাম। দেখে ওদের খারাপ লাগেনি, লজ্জা লাগেনি, ভয় লাগেনি। অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে ওরা। সাধুরা কেবল ওদের দিকে তাকিয়েছেন, কেউ কোনো বাজে কথা বলেননি।
কিন্তু আমি কি ওদেরকে জামায়ত বা হেফাজতের কোনো ইসলামী জলসায় নিয়ে যাবার সাহস করতাম? ওরাও যেত? এমন নির্ভিক চিত্তে ঘরত? কোনোটাই নয়।
এই সাধুরা কারো কোনো ক্ষতি করেন না, নিজেদের মতো থাকেন, একটু গাঁজা বা ভাঙের নেশা করেন। সেটা এই উপমহাদেশের সাধু-সন্ন্যাসীদের খুব প্রাচীন রীতি। হিন্দুধর্মের কোনো কোনো পূজায় গাঁজা-কলকে রাখা হয় বা খাওয়া হয়। হিন্দুদের থেকেই এই রীতি ঢুকেছে মাজারে, সুফীবাদীদের মধ্যে। কেউ হয়ত বলবে, ‘গাঁজা খাওয়া হারাম, মাজারপন্থীরা প্রকৃত মুসলমান নয়।’
ব্যাংকের সুদ খাওয়াও তো হারাম। ঢাকায় এত বার, অথচ মদ খাওয়া হারাম। ছবি আঁকা বা তোলা হারাম। মাজারপন্থীদের দিকে আঙুল তোলার পূর্বে নিজের এই অভ্যাসগুলোও বর্জন করা উচিত। আধুনিক সমাজে টিকে থাকার জন্য একজন মুসলমানকে প্রতিদিন অসংখ্য হারাম, শিরক, বিদাত কাজ করতে হয়। এমনকি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী বা কট্টর ওহাবীদেরকেও।
গাঁজা খাওয়ার অভিযোগে মাজারে হামলা হয়, খুন করা হয়, মেলায় বন্ধ করা। কিন্তু আমরা কখনো দেখি না মাদ্রাসায় কোনো মেয়েকে ধর্ষণ বা কোনো ছেলেকে বালাৎকার করলে, মাদ্রাসা বন্ধ করা হয়। নিশ্চয় বালাৎকার বা ধর্ষণের চেয়ে গাঁজা খাওয়া উত্তম। নিশ্চয় গণিমতের মাল হিসেবে নারী ধর্ষণের চেয়ে গাঁজার নেশায় বুদ হয়ে ভাবের রাজ্যে বসবাস করা উত্তম।
এই যে আমি গাঁজা খাওয়ার পক্ষে সাফাই গাইছি, তার মানে এই নয় যে আমি গাঁজা খাই। জীবনে কোনোদিন সিগারেটেও টান দিয়ে দেখিনি। কৈশোরে আমাকে আর আমার বাল্যবন্ধু বিজনকে অন্যরা একসঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধেছিল সিগারেটে টান দেওয়ানোর জন্য। তাও তারা পারেনি। আমি গাঁজা খাই না বলে অন্যরা কেন খেতে পারবে না? তারা তো মেলার মাঝখানে এসে গাঁজা খাচ্ছে না। বিশাল মেলার এককোনার দিকে সাধুরা গাঁজা খান, অন্যরা সেখানে না গেলেই পারে। জনবহুল জায়গায়, বাসে-ট্রেনে সিগারেট-গাঁজা খাওয়ার বিরোধিতা আমিও করি। পরশুদিন জামালপুর থেকে ট্রেনে ফেরার পথে এক লোক সিগারেট ধরিয়েছিল, ধমক দিয়ে সিগারেট ফেলতে বাধ্য করেছি।
গাঁজার ঝাঁজালো গন্ধে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না, তবু কোনো মেলায় সাধুরা থাকলে, তাদের দেখতে যাই, একটু গান শুনি। জীবনের এই বৈচিত্র দেখতে আমার ভালো লাগে। বৈচিত্রে ভরা এই পৃথিবী, কোথাও সমতল, কোথাও পাহাড়, কোথাও সমুদ্র, কোথাও বরফ পড়ে, কোথাও তীব্র গরম। বৈচিত্রে ভরা মহাবিশ্ব, তবে মানুষ কেন একই রকম হবে? মানুষের সংস্কৃতি কেন একই রকম হবে? থাকুক না বৈচিত্র।
আর মেলা মানে শুধু সাধুদের গাঁজা খাওয়া হয়, মেলা মানে গ্রামীণ অর্থনীতির ধাবমান চাকা। ওই অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও কুটীর শিল্পীরা সারা বছর মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। মৃৎশিল্পীরা পুতুল, খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল বানান মেলা উপলক্ষে। বাঁশ-বেতের শিল্পীরা নানান পণ্য তৈরি করেন। মিষ্টি, কদমা, খোরমার কারিগররা পসার সাজিয়ে বসেন। এরকম আরও কত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পসার সাজিয়ে বসেন।
মেলা মানে তাদের পণ্য বিক্রি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, একটু ভালো খাওয়া, ভালো পরা, হয়ত খানিকটা বিলাসিতাও। মেলা তাদের অধিকার। ধর্ম-ব্যবসায়ী ওয়াজীরা মেলা বন্ধ করতে চায়। কারণ মেলা তাদের একচেটিয়ে ধর্ম-ব্যবসার পথে বড় বাঁধা। কোনো এলাকায় মেলা, সার্কাস, পুতুলনাচ, যাত্রা থাকলে মানুষ ওয়াজ শুনতে যায় না। ফলে ধর্ম-ব্যবসায়ী চক্রটি মেলা বন্ধ করতে চায়।
সব মেলায় কিন্তু সাধু-সন্ন্যাসীদের উপস্থিতি থাকে না, তাদের গাঁজা খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকে না, গাঁজা খাওয়াও হয় না। তবু সেই সব মেলা বন্ধ করতে চায় ধর্ম-ব্যবসায়ীরা, বন্ধ করেও। কিন্তু কেন? আসলে গাঁজা হচ্ছে তাদের ঢাল, গাঁজা নামক ঢালকে সামনে রেখে তারা মেলা বন্ধ করতে চায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের জন্য।
চাঁদপুরের মতলবে লেংটার মেলা বন্ধ করার প্রতিবাদ জানাই।
ঢাকা
২ এপ্রিল, ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



