আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, সিলেট রুটের ট্রাক ড্রাইভাররা খুব ভাল চালায়, রোড সিগন্যাল মানে এবং ধৈয্যের পরিচয় দেয়। এদিকে উত্তরবঙ্গের ট্রাক ড্রাইভাররা জঘন্য চালা্য়। এর প্রমান দুর্ঘটনার পরিমান।
আবার চিটাংরোড সিলেট আর ফরিদপুর যশোর রোডের বাস ড্রাইভার রা খুব বাজে চালায়। প্রাইভেট কারের কথা বললে ঢাকা চিটাগাঙ বা ঢাকা সিলেট রোডের চালকরা ভংয়কর চালায়। আমি হাইওয়ের কথা মাথায় রেখে বললাম। রাতের বেলা এরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ঢাকার ড্রাইভাররা যে কিভাবে চালাই কমবেশি সবারই খারাপ অভিঙ্গতা আছে।

দীর্ঘ রাইডিঙের অনেক টুকটাক ঘটনার ভেতরে এবার কিছু মজার ঘটনা শেয়ার করব ভাবছি।
ঘটনা ১:
সেবার ৩ দিনের ছুটি কাটিয়ে গাজিপুর থেকে সিলেট যাব। প্রচন্ড গরম আর রোদ। আম কাঁঠালের সময়। আমার স্ত্রী আর আমি তাই সাড়ে ৩ টায় রওনা দিলাম যাতে রোদ পিঠে পড়ে। গাজিপুর চৌরাস্তা হয়ে ঘোড়াশাল রোড দিয়ে নংসিংদী উঠলাম। পড়ন্ত বিকেল। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাস সাই সাই করে ওভারটেক করে চলে যাচ্ছিল।
নরসিংদী সিলেট রোডে এক হাটে কাঁঠাল আর লটকন দেখে ব্রেক দিলাম। কাঁঠালের গন্ধে মন তখন দিওয়ানা। ২টা কাঁঠাল কিছু লটকন কিনে ফেললাম। মন টা ফুরফুরে। দুজনে বিকেলটা উপভোগ করতে করতে স্বন্ধ্যা নেমে গেল। চা নাস্তা করে আবার রওনা দেই মাগরিবের নামাযের পর।
খেয়াল করলাম রাস্তায় নতুন কার্পেটিং। বাইক জার্কিং করছে। স্পিড স্লো করে ফেললাম এই ভয়ে যে বিয়ারিং ভেঙে না যায়। একসময় এমন হল যে স্পিড স্লো করে পিচ ঢালা বড় বড় নুড়ি পাথরের জন্যে বাইক নরবর নরবর করছিল। আমি ভেবেই নিয়েছি, পেছনের চাকার বিয়ারিং গেছে।
সেজন্যে সাইড করলাম ফাকা জায়গায়। আশে পাশে কিছু নেই কয়েকটা গাছপালা ছাড়া। জায়গাটা মাধবদির প্রায় শেষ প্রান্তে। ডবল স্ট্যান্ড করে চেক করলাম পেছনের চাকা নড়ছে কিনা। সব ঠিকঠাক। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করলাম। আবার বাইক স্টার্ট দিলাম। সাথে সাথে ৩ জন পুলিশ অন্ধকারের ভেতর রাস্তার অপর পাশ থেকে বলে উঠল: এই থামা। গাড়ি রাখ।
আমি একটু অবাক হলাম। এরা আবার কারা। কোত্থেকে এলা। কাউকা কাদেরের মত মনে মনে বললাম। কাছে এসে সবচেয়ে কম বয়সীটা বলল: কোথায় যাওয়া হচ্ছে? এই মহিলা কে?
আমি বললাম, গাজিপুর থেকে আসতেছি, যাব সিলেট। আমরা হাসবেন্ড ওয়াইফ।
পুলিশ: ধুর ব্যাটা মিথ্যা কথা বলিশ। আমরা তো দেখছি, তুই এই মাত্র তারে ভারা করে বাইকে তুললি।
এই কথা শুনে আপনার ভাবি একদম খেপে গেছে। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম:
আপনার ভুল হচ্ছে অফিসার। সে আমার মিসেস। আমার পকেটে ম্যারেজ সার্টিফিকেট আছে। মোবাইলে বিয়ের ছবি আছে।
বিদ্র: যেহেতুু যখন তখন ট্যুর দেই। হোটেলে থাকতে হয়। ম্যারেজ সার্টিফিকেট আর এন.আই.ডি র কপি সব সময় আমার মানিব্যাগে থাকে।
পুলিশ: কৈ যাবি তুই? এত বড় ব্যাগ ক্যান? ফাপড় মারিস?
আমি: আমি সিলেটে জব করি। কাল অফিস ধরতে হবে। আর মেয়ে লোক সাথে থাকলে ব্যাগের সাইজ একটু বড়ই হয়।
এর ভেতরে আর একজন বয়স্ক পুলিশ রাস্তার ওপার থেকে আসল। মুখ ভর্তি দাড়ি। উনি বললেন, আপনার অফিসের কোন ভিজিটিং কার্ড আছে?
আমি: জ্বি আছে। আপনি চাইলে আমার ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে পারেন।
বয়স্ক পুলিশ: ভিজিটিং কার্ড দেখতে দেখতে দেখতে বলল, আপনি এখানে থামছেন কেন? এই জায়গাটা ভাল না। আমরা ডিউটি দিচ্ছি। থামতে হলে লোকজন দোকানপাট আছে সেরকম জায়গায় থামবেন।
আমি: আসলে পেছনের চাকা ডিস্টার্ব দিচ্ছিল। চেক করতে ইমিডিয়েট থেমেছি। এতকিছু ভাবিনি।
বয়স্ক পুলিশ: তাড়াতাড়ি চলে যাও বাবা। মহিলা আছে। দেরি করো না।
আমি: জ্বি আচ্ছা। থ্যাঙ্ক ইউ। আসসালামু আলাইকুম।
ঘটনা ওখানেই শেষ। দেখলাম জুনিয়র অফিসারদের আচরন উগ্র আর সিনিয়র দের প্রফেশনাল। পুলিশদের সবাই যে খারাপ তা না।
ঘটনা ২:
সিলেট থেকে শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি ফেঞ্চুগজ্ঞ রোড হয়ে। দূর থেকে দেখলাম পুলিশ বাইক ধরছে। ৪-৫টা বাইকের জটলা। আমাকে দেখে এক হাইওয়ে পুলিশ লাঠি তুলল। একজন বাশি বাজালো বাইক থামাতে। আমি স্লো করছিলাম। ২০ হাত সামনে থাকতেই আমাকে না থামার নির্দেশ দিল। দেখলাম তারা হাসতেছে। আমিও মাথা ঝুকিয়ে হাসি মুখে টান দিলাম। অন্য বাইকাররা মুখ গোমরা করে চেয়ে আছে।
আসলে প্রথমে ভাবসে, আমার পেছেনে কোন পুরুষ পিলিওন। কাছাকাছি যেতেই তারা যখন দেখল মহিলা, তাও মাথায় হেলমেট, পায়ে কেডস, আমার পায়ে রাইডিং কেডস, মাথায় হেলমেট... বুঝে নিয়েছে আমরা ট্যুরিস্ট। ট্যুরিস্টদের বাইকের পেপারস সব সময় ঠিক থাকে। আর আমার তো থাকেই। আমি কখনও বাইকে কোন পুলিশ কেস খাইনি। যদিও ৩০ বছর ধরে বাইক চালাই।

ঘটনা ৩:
সেবার সিলেটে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত। শীতের সময়। বাইক চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। তো ভৈরবের হাই ওয়ে ইন এ আবাসিক হোটেলে যাই কোন রুম ফাকা আছে কি না জানতে? ম্যানেজার আমাদের দুজন কে খুব ভাল করে দেখলো। তারপর বলল, সব রুম বুকড। ফিরে আসছিলাম, হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে বলে, একটা ছোট সিঙ্গেল রুম দিতে পারি, ৫০০০ টাকা লাগবে। আমি শুধু বললাম, ভাই ৪ ঘন্টা পর সকাল হবে। ভোরেই চলে যাব। দেখেন কিছু কনসিডার করা যায় কিনা।
ম্যানেজারের গলা আরও কড়া হয়ে গেল। বলল: এই রেট এই থাকতে হবে। আমি ৪ ঘন্টায় ৫০০০ টাকা দিতে মন থেকে সায় পেলাম না। চলে আসার সময় পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম বেচারার মুখ শুকিয়ে গেছে। আসলে পুরো হোটেল টা্ই ফাকা ছিল সেদিন। কেননা পার্কিং লটে কোন গাড়ি ছিল না। গেস্ট থাকলে অনেক গাড়ি পার্ক করা থাকে। সে হুদায় পাট নিছে। ভাবছে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে গেছি, যা চাইবে উহাই দিতে বাধ্য থাকিবো।
ঘটনা ৪:
সিলেট থেকে গোপালগজ্ঞ যাব। পদ্মা ব্রিজে তখন মটরসাইকেল যেতে দিচ্ছে। তো ভাঙ্গা রাস্তা দিয়ে ধুমায়া টান দিছি। রাস্তায় ঐ অংশে তখন ডিভাইডার নেই। ফাঁকা রাস্তা, মেঘলা দিন। আহ কি শান্তি। বিদেশ বিদেশ লাগছিল। হঠাৎ দেখি একটা পিকআপ ভ্যান একবার ডানে একবার বামে যায়। যেন নকিয়া ১১০০ ফোনের সাপ(স্নেক গেম) খেলা খেলছে।
সে তো অপজিট ডিরেকশান থেকে আসছে। দেখি ঐ গাড়ি পুরাই আমার ডান থেকে বাম দিকে চেপে আসছে। আমি তো হর্ন মারা শুরু করেছি। শেষে স্লো করে ফেলছি বাইক। কাছে আসলে দেখি, হেলপার ঘাড় কাৎ করে ঘুমাচ্ছে আর ড্রাইভার ঝিমাচ্ছে। ২০ হাত সামনে এসে বেচারার ঘুম ভাঙ্গল। কোন ক্রমে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুড়িয়ে নি্শ্চিত এক্সিডেন্ট থেকে বাঁচল এবং আমাদের বাঁচালো। পেছন ফিরে দেখি, সামনে গিয়ে সে সাইড করে চোখে মুখে পানি দিচ্ছে।
আমিও একবার দুই এক সেকেন্ডের জন্যে বাইকে বসেই ঘুমিয়ে পরছিলাম। আমার মিসেস বলে, এই বাইক ডানে যাচ্ছে কেন? সামনে তো ট্রাক। শীতের সময়, সিলেট রোডে,তখন হবিগজ্ঞের আউশকান্দি এলাকায়। কুয়াশায় সব কিছু ঝাপসা। চিৎকার শুনে চোখ খুলেই দেখি যবুথবু হয়ে ধীরগতিতে এক ট্রাক আসছে। শুধু হেডলাইট দুটো জ্বলছে বলে বোঝা গেল, একটা কিছু সামনে থেকে আসছে। কন্ট্রোল করলাম। তারপর থেকে চিৎকার করে ঘুম তাড়াতে গাইতে থাকলাম নানা পদের গান: হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরা লাল দোপাট্টা ...
আরও বহু ঘটনা আছে। ব্লগ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। রাত গভীর হয়ে আসছে। এসব অনরোমানটিক বা অরাজনৈতিক লেখা হয়ত কারও ভাললাগবে না।
তারচেয়ে নাক ডেকে এক ঘুম দেয়া ভালো। সবাইকে শুভ রাত্রি।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০২৫ রাত ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



