somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধর্ম মানুষের জন্যে, মানুষ ধর্মের জন্য সৃষ্টি হয়নি।

১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইসলাম ধর্ম মতে প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টির সময় আল্লাহ তাআলা সব কিছুর নাম শিখিয়েছিলেন (আল-বাকারাত, আয়াত ৩১), যা ছিল পরীক্ষার ও খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য এক বিশেষ শিক্ষা; কিন্তু তা সর্বজ্ঞ বা সব রকম জ্ঞানের অধিকারী হওয়া নয়। মানুষ তখনই নিজের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা অর্জন করে, যখন সে পরিস্থিতির মোকাবেলা করে। অর্থাৎ সেখানে ভুল বা শুদ্ধ হবার ঘটনা ফিফটি ফিফটি। আল্লাহ তার বান্দার দুর্বলতা জানেন। তার ক্ষমতা এবং আচরন সম্বন্ধেও জানেন। তাই বান্দা ভুল করলে তাকে তওবা করার সুযোগ দিয়েছেন যাতে যে, আত্মসুদ্ধির মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরে আসে।

আল্লাহ বলছেন, আমি মানুষ ও জ্বিনকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছি। অন্য সকল সৃষ্টিকে তাদের উপকারের জন্যে। আয-যারিয়াত (সূরা নম্বর: ৫১), আল-বাকারাহ (আয়াত: ২৯)

মুসলিম শরীফের একটি হাদিসে আল্লাহ আরও বলছেন:
"হে আমার বান্দারা! তোমরা পূর্বের ও শেষের সব মানুষ এবং জিন যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরহেজগার মানুষের মতো হৃদয়ের অধিকারী হয়ে যাও, তবে তা আমার রাজত্বে বিন্দুমাত্র কিছুই বৃদ্ধি করবে না। আর তোমরা সবাই মিলে যদি সবচেয়ে পাপিষ্ঠ মানুষের মতো হয়ে যাও, তবে তা আমার রাজত্ব থেকে কিছুই কমাতে পারবে না..." (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৭৭)

অর্থাৎ একজন মুসলিমের কোঠর ইবাদতে যা অন্য বান্দার জন্য কষ্টদায়ক, তার ইবাদতেও আল্লাহর ভান্ডারে কিছুই পরিবর্তন ঘটবে না। কাজেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সমাজের অনেকে যে দাদাগিরি করে, তা দরকার নেই। আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টির পর তাকে পৃথিবীতে সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের শেষ 'গাইডবুক' বা 'জীবনবিধান' হিসেবে ইসলাম ধর্ম দিয়েছেন। অতএব, ধর্ম এসেছে মানুষের কল্যাণ, শান্তি ও মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে; মানুষ ধর্মের কোনো জড় নিয়মের দাসত্ব করার জন্য সৃষ্টি হয়নি। বরং আমরা ইসলামের উদ্দেশ্য কে বুঝতে না পেরে, মানুষের উপর চাপিয়ে দিচ্ছি। এ ব্যপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"নিশ্চয়ই দ্বীন (ধর্ম) অত্যন্ত সহজ। যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে কড়াকড়ি বা চরমপন্থা অবলম্বন করবে, ধর্ম তার ওপর জয়ী হবে (অর্থাৎ সে টিকতে পারবে না)।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৯)

এর মানে হল, ধর্মকে পুঁজি করে যারা কট্টর বা অমানবিক আচরন করছে, তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ বান্দার উপর নরম হয়ে বলছেন:
"তবে যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে পড়ে, কিন্তু সে অবাধ্য বা সীমালঙ্ঘনকারী নয়, তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৭৩)

ধর্ম নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ সর্তক করে বলছেন:
১.) "হে আমার বান্দারা! তোমরা পূর্বের ও শেষের সব মানুষ এবং জিন যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরহেজগার মানুষের মতো হৃদয়ের অধিকারী হয়ে যাও, তবে তা আমার রাজত্বে বিন্দুমাত্র কিছুই বৃদ্ধি করবে না। আর তোমরা সবাই মিলে যদি সবচেয়ে পাপিষ্ঠ মানুষের মতো হয়ে যাও, তবে তা আমার রাজত্ব থেকে কিছুই কমাতে পারবে না..." (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৭৭)

২.)"যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করবে, সে তো নিজের কল্যাণের জন্যই সৎপথ অবলম্বন করবে; আর যে পথভ্রষ্ট হবে, সে তো নিজের ধ্বংসের জন্যই পথভ্রষ্ট হবে।" (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ১৫)

অর্থাৎ আইন নিজের হাতে তুলে নেবার দরকার নেই। তবে আইনের শাষন প্রতিষ্ঠা করতে ক্ষমা বা নরম হবার আদর্শও গ্রহন করতে হবে। হাদিসে একটি দারুন ঘটনা বিদ্ধৃত আছে। ঘটনাটা এরকম:

এক যুবক রাসুল (সা.) কাছে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল। সাহাবিরা এতে ক্ষুব্ধ হলেও রাসুল (সা.) তাকে অপমান করেননি। কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি এটি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ করবে?’ যুবক বলল, ‘না।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘অন্য মানুষও তাদের মায়েদের জন্য এটি পছন্দ করবে না।’ এরপর কন্যা, বোন ও চাচির প্রসঙ্গ তুলেও একই উত্তর পেলেন। তারপর তাঁর বুকে হাত রেখে দোয়া করলেন, আল্লাহ যেন তাঁর পাপ ক্ষমা করেন, অন্তর পবিত্র করেন এবং তাঁকে সংযমী করেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ওই যুবক আর কখনো এমন অন্যায়ের দিকে পা বাড়াননি। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)

নবীজির শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, অপরাধপ্রবণ মানুষকে শুধু শাষন নয়, তার বিবেক ও মানবিকতাকেও জাগিয়ে তুলতে হয়। ভাল পথে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হয়।

এবার বলি এতসব কোরান হাদিসের রেফারেন্স কেন দিলাম ? নিচের দুটো ঘটনা মনকে ভীষনভাবে নাড়া দিয়েছে। তাই ভাবলাম, নোট রাখি এবং সবার সাথে শেয়ার করি। যদি কারও উপকার হয় !!!



ঘটনা ১:
সৌদিতে দুজন বাংলাদেশী, নজরুল ইসলাম এবং সুইটি আকতারকে গেল সপ্তাহে শিরচ্ছেদ দেয়া হয়েছে। কারন ছিল, স্থানীয় একটি মসজিদ চত্তরে লোক চক্ষুর আড়ালে একটি দেয়ালের পেছনে যৌন সঙ্গম করেছিল। সেটা পাকিস্থানী এক লোক লুকিয়ে লুকিয়ে ভিডিও করে ভাইরাল করে। পাকিস্থানীর ২০ বছরের কারাদন্ড হয়েছে।

আমার কথা হল, মসজিদ এলাকায় একটি যৌন সঙ্গম , তাতেই কি দুজন মানুষের জীবন নেয়া যায়? আল্লাহর সৃষ্টি, আশরাফুল মাখলুকাতের জীবনের মূল্য এতই কম? ঐ দুই বান্দার মৃত্যুদন্ডের বিনিময়ে কি মসজিদের পবিত্রতা ফিরে এসেছে? তাদেরকে কি ভুল শোধরানোর সুযোগ দেয়া যেত না? আল্লাহ কি ক্ষমাশীলদের পছন্দ করেন না?




ঘটনা ২:
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি অডিও ফোন রেকর্ড কে ভিত্তি করে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যা করেছেন মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী, যিনি কিনা স্থানীয় সমজিদের একজন সাবেক ইমাম এবং বর্তমানে ভাড়ায় বাইক চালক । উল্লেখ্য যে, শামীম ২ বছর মানসিক চিকিৎসার ওষূধ সেবন করে আসছেন এবং সৎ, সাধারন মানুষ যার পেশা টমটম চালানো, ঘরে কম বয়সী স্ত্রী এবং দুটি ছোট ছোট বাচ্চা আছে। মনোমালিন্য শুরু পাসেঞ্জার নিয়ে। সেই আক্রোশ শেষ ধর্মকে পুজি করে জীবন হরনের মাধ্যমে। ব্যক্তি আক্রোশ না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু এক পাড়ার ২০০র মত মানুষ সবাই কি বিবেগহীন নাকি, প্রতিবন্ধি? ধর্ম নিয়ে অপছন্দনীয় একটি ফোন কলে কথা বলায়, কি ইসলাম ধর্ম শেষ হয়ে গেল? আল্লাহ, আল্লাহর রসূলের অস্তিস্ত্ব বিলীন হয়ে গেল? নাকি সমাজ রসাতলে গেল?

একটা অর্ধশিক্ষিত দিন আনা দিনে খাওয়া মানুষকে যে কোন কারনেই হোক, তাকে ৩ বার আলাদা আলাদা সময়ে টিটাতে হবে ? মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত? বুঝলাম, শামীম ইসলাম ধ্বংস করে ফেলেছে, ওর মৃত্যুতে কি ইসলাম আগের অবস্থানে ফিরে এসেছে? নাকি জীবন দিয়ে সে প্রমান করে গেল, ঐ এলাকায় ২০০র বেশি বিবেগহীন, জ্ঞানবুদ্ধিহীন ধর্মান্ধ প্রতিবেশীদের মাঝে থেকে সে নানা যন্ত্রনায় পস্তাচ্ছিল। সে যদি ভুল কথা বলেও থাকে, তাকে তো ইসলামিক নির্দেশনা দেয়া যেত হাদিস কোরানের সাপেক্ষে। অথবা মাফ করে দেয়া যেত, তাই না? এই যে কম বয়সী স্ত্রী বিধবা হল, দুটো সন্তান এতিম হল, এর দায় ভার কে নেবে? ঐ ২০০ প্রতিবেশী? রাষ্ট্র? ঐ কুলাঙ্গার ইমাম?

ঐ বাচ্চা দুটো কাকে বাবা বলে ডাকবে? ঐ বিধবা বোন কে কুপ্রস্থাব যে দেবে না, তার কি নিশ্চয়তা? মব এমনি এমনি সৃষ্টি হয় না। মানুষ এমনি এমনি সুইসাইড করে না। পরিবারের দিকে তাকিয়ে সন্তানরা এমনি এমনি সন্ত্রাসী বনে যায় না। বিচারে ভারসাম্য থাকতে হয়। ইসলামকে ব্যবহার না করে, নিজের ভেতরে ধারন করতে হয়।

সবশেষে আবারও বলব, ধর্ম এসেছে মানুষকে দিক নির্দেশনা দিতে, মানুষের জীবনকে সুন্দর সঠিক পথে চালনা করতে। সেই মানুষকে ধর্মের বলি বানানো ভুল। খোদা না করুন, সেই বলির পাঠা আপনি বা আপনার আপন জনও হতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৯
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বঙ্গভঙ্গ থেকে চব্বিশ, পূর্ব বাংলার ইতিহাস ও বাংলাদেশের আত্মপরিচয়

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বর্তমান সময়ে একটি বিরাট পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে যা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং আত্মোপলব্ধির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ পনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:১১

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

১৪ অক্টোবর মক্কায় দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×