somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপ্রেম [ছোট গল্প]

২৭ শে মার্চ, ২০১৫ রাত ১০:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তুমি মেয়েটার দিকে তাকাও - মনে হবে বছরের পর বছর ধরে সে একই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে, কোন একজনের জন্য ব্যাকুল এক প্রতীক্ষায়। তুমি তোমার হৃদয়ের দিকে তাকাও - দেখবে ওখানে অন্ধকারের ভেতর একজন মানুষ বসে ভাববার চেষ্টা করছে, সে একা নয়। কিন্তু তারপরও তুমি মেয়েটির ব্যাকুলতাকে পাশ কাটিয়ে যাও এই ভেবে যে, ও তোমার জন্যে নয়। হয়তো তোমার ধারণাই সত্যি, সেটার সম্ভাবণাই বেশী। আর এটাওতো সত্যি যে, জিনিসটা টেকসই হবে না জেনেও তুমি শুধুমাত্র অস্থির বাসনার বশবর্তী হয়ে প্রথম দোকান থেকেই জুতোজোড়া কিনে ফেলতে পারো না। আর সেই কাজ যৌক্তিকও হবে না, কারণ সামনে অনেক জুতোর দোকানই এখনও দেখা বাকী। এভাবে তুমি সবসময় তোমার অনুভূতিগুলোকে পাশ কাটিয়েছো এবং যান্ত্রিকভাবে সব সময়ই সঠিক বলে বিবেচিত হয়েছো। কিন্তু এ জীবনই কি তুমি চেয়েছিলে - নির্ভুল প্রায় ঘটনাহীন একটি জীবন, যা কিছুটা ভূতুড়েও!

জেরিনরা ওদের পাশের বাসা ও ব্যালকনি ছেড়ে চলে যাবার পর ফারুক প্রায়ই ভীড়ের মধ্যে ওকে দেখতে পেতো - কখনো মার্কেটে, কখনো বইমেলার ভীড়ে অনেক সামনে, কখনো পাবলিক বাসে; যদিও শেষপর্যন্ত কখনো খুঁজে পায়নি ওকে সশরীরে। ব্যাপারটা এতোবার ঘটল যে, ফারুক ভয় পেয়ে গেল। কোন মানসিক বিশেষজ্ঞের কাছে যাবার মত মানসিক শক্তি ওর কখনোই ছিল না। সুতরাং এ ব্যাপারে শেষপর্যন্ত এক জ্যোতিষীর কাছে পাথর চাইতে গিয়েছিল সে, উনি বললেন - যেহেতু জেরিন ওকে খুব ভালোবাসতো, এটা অসম্ভব নয় যে তার আত্মা এখনো ঘুরে ফিরে বেড়ায় ফারুকের আশেপাশে।

মৃতদের আত্মার ব্যাপারে এ ধরণের কথা শুনেছি, কিন্তু জীবিতদের আত্মার ক্ষেত্রে এটা কোনদিন শুনি নি আমি। - ফারুক বলেছিল।

আত্মা তো আত্মাই - তার আবার জীবিত কি, আর মৃত কি! - জ্যোতিষী হাসল।

আপনাকে খালেক সাহেবের ঘটনাটা তাহলে বলিই। উনি সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে বানিয়েছিলেন তাঁর রামপুরার বাসাটা, খুব শখের ছিল ওটা তাঁর। তারপর শেষবয়সে ছেলেমেয়েদের পরামর্শে ওটা বিক্রী করে দিয়ে ধানমন্ডিতে একটা ফ্ল্যাটে উঠে যান উনি, কিন্তু তাঁর চলে যাবার বহুদিন পর পর্যন্তও তাঁকে ঐ পুরোনো বাড়িটার ছাদে হেটে বেড়াতে দেখা গেছে। দেখেছে পাড়া-প্রতিবেশীরাই যারা তাঁকে ভালো করে চিনতো - বিশেষ করে ভর দুপুরে আর শেষ বিকেলে। দেখা যেত, তিনি তাঁর কালো লাঠিটা হাতে নিয়ে ছাদের এপাশ থেকে ওপাশে হেটে বেড়াচ্ছেন - নীরবে। কিন্তু তিনি তো এখনো জীবিতই আছেন, মারা যাননি যে আত্মা হয়ে ছাদে ছাদে হেটে বেড়াবেন। এর কি ব্যাখ্যা, বলুন! ওহো, বাড়িটার জন্য ভালো দামই পেয়েছিলেন তাঁরা - অথচ ভূতুড়ে বাড়ি বলে নাম হয়ে যায় ঐ বাড়িটার। কিন্তু আপনিই বলুন, জীবিত মানুষের কি ভূত হয়? হা, হা, হা ...

তারপর থেকে অনেক রাতে, বিকেলে এবং দুপুরে ফারুক চেয়ে থেকেছে একটানা জেরিনদের ঐ বারান্দাটার দিকে, মাঝে মাঝে ছাদেও; কিন্তু সৌভাগ্যক্রমেই হোক আর দুর্ভাগ্যক্রমেই হোক - জেরিনের আত্মা কিংবা ভূত কোনটারই দেখা পায় নি সে আজ পর্যন্ত।

তারপর একদিন জেরিনের মায়ের সাথে তার দেখা হলো এক শপিং মলে। মোটা, পান চিবোচ্ছেন, এবং যথারীতি রুচিহীন - কিন্তু জেরিনের সাথে তার চেহারার মিল তখনো অত্যন্ত তীব্রভাবে বোঝা যাচ্ছিল। জীবন একঘেয়ে এবং হয়তো এটা ছিল তার সান্ত্বনামূলক একটা চিন্তা যে জেরিনও সময়ের আবর্তনে পরিণত হবে এমন একটি আশ্চর্য বোধহীনতায়ই। শাকিলকে যখন ঘটনাটা বলল সে, হাসতে হাসতেই ও অস্থির - তার মতে, ওটা আসলে জেরিনের মা ছিলো না কখনোই বরং ওটাই ছিল জেরিনের ভূত।

তখন থেকে ফারুক বেশি বেশি সময় কাটাতো তিনতলার সিড়িকোঠায় বসে থেকে আর রোদের নীরব দুপুরে দূরের ছাদগুলোতে কাপড়গুলোর রোদে উড়ে উড়ে শুকানো দেখে।

এভাবেই তার দিন কাটছিলো - অনেকদিন। তারপর একদিন খুব বৃষ্টি নামে।

ফারুক ছাদে উঠে আসে, কিন্তু বৃষ্টিতে গা ভেজায় না। সে সিড়িকোঠায় বসে থাকে বৃষ্টি দেখার জন্য। একসময় সামনের গলিটা জলে ভরে ওঠে। একসময় বৃষ্টির ঝাপটা ওর গায়ে এসে লাগে। ফারুক একটু সরে বসে।

ঠিক তখন মেয়েটা বেরিয়ে আসে। জেরিনদের ছাদের দরোজা খুলে সে সন্তর্পনে পা রাখে বৃষ্টিতে, তারপর তামাটে মুখ তুলে তাকায় আকাশের দিকে। আবার বৃষ্টির ঝাপটা গায়ে এসে লাগে, অন্ধকারে স্থির বসে থাকা ফারুকের শার্টের কলারটা পানিতে ভিজে যায়। তার হঠাৎ মনে হয় সে স্বপ্ন দেখছে, হয়তো মনে মনে প্রার্থণাও করে ঘুমটা ভেংগে না যাবার জন্য।

মেয়েটা হাত দু’টো সামনে বাড়িয়ে দেয়, পৃথিবীর সমস্ত বৃষ্টি হাত দু'টোকে স্পর্শ করার জন্য ছুটে চলে। আরামদায়ক এক আলস্যে সে চোখ বুঁজে ফেলে, তারপর একসময় ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করে - এলোমেলো। ভিজে জবজবে হয়ে থাকা তার কালো স্কার্ট একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে জলের বিন্দু ছড়ায়। ভিজে জামাটা তার ধীরে ধীরে শরীরের আকৃতি নেয়, অসংখ্য আলোকবিন্দু ছুটে আসে সিড়িঘরের বিস্মিত ঐ চোখগুলোর দিকে - ফারুক নতুন শহরের অনাবি®কৃত নির্জন পথে চলার অনুভূতি নিয়ে বসে থাকে অদ্ভুত এক অন্ধকারে। তারওপর একসময় মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়ে, বুকের ওপর হাত দু’টো জড়ো করে সে অপেক্ষা করে। বৃষ্টি আরো একটা ঝাপটা দিয়ে যায় পুরনো সিড়িকোঠায়।

তারপর হঠাৎ করেই দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। মেয়েটার শরীরের বাঁকগুলোকে টান টান করে সরলরেখা করে দিচ্ছে কেউ। ফারুক দেখে, মেয়েটার বাঙ্ময় শরীর কৃশ হতে হতে একসময় কামনাহীন এক মাত্রিকতায় প্রবেশ করছে। সে ভালো করে লক্ষ্য করে দেখে, মুখের ওপর উদ্ভাসিত উচ্ছলতা মেয়েটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অনিশ্চিত রূপান্তরের দিকে এবং বৃষ্টির বেগ কমে আসার আগেই মেয়েটি পরিণত হয়েছে একটি প্রাণোচ্ছল কিশোরীতে। ফারুক ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড কেঁপে ওঠে। কয়েক মিনিট আগে অনুভব করা বাঁকগুলোর কথা ভেবে সে অবাক হয়। কিন্তু কামনাহীন বিস্ময় তার ভালো লাগাকে পূর্ণতা দেয়।

এই মেয়েটি জেরিন নয়, জেরিনের ভূতও নয়। ও শুধু অন্য একটি মেয়ে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি পেয়ে বসে ফারুককে। জেরিনের ভূত নয় - এমন একটি মেয়ে যখন জেরিনের ছাদটাকে দখল করে নিতে পেরেছে, তাহলে সামনের কোন একদিন অন্য কোন জ্যান্ত নারী তো এই মেয়েটির বারান্দাটিকেও দখল করে নিতে পারবেই।

কিছুই নিশ্চিত নয়, কোনকিছুই অমোঘ নয় এবং কোন সম্পর্কই মলিনতার ঊর্ধ্বে নয়।

ফারুকের মেয়েটিকে ভালো লাগতে শুরু করে, কিন্তু এই ভালোলাগাটাই আবার অর্থহীন করে দেয় তার পূর্বের সমস্ত ভালোলাগাগুলোকে। দু’জনের প্রতি দুর্বলতা উভয়ের অপ্রয়োজনীয়তাকেই মূলত: স্পষ্ট করে তোলে।

ফারুক আকাশের দিকে তাকায়। ওর কেন যেন মনে হয়, এই বৃষ্টিটা অনেকক্ষণ ধরে চলবে।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×