১।।
চারদিকে পাহাড়। কোথাও উচুঁ,কোথাও নিচু। কোথাও কোথাও এরকম দু সারি পাহাড়ের মাঝখানে সমতল জমি। বেশির ভাগ জমি আগে খিল পরে থাকত। এখন জমিগুলো আবাদ হচ্ছে। নব্য আবাদ। নদীর করাল গ্রাসে সবকিছু হারিয়ে আসা মানুষদের এই জমিগুলো বছরে অন্তত একবার ফসল দেয়। তাও বর্ষাকালে। বর্ষায় পাহাড়ের ঢলে যখন জমিগুলো টুইটুম্বুর থাকে। এই এক ফসলা জমি;পাহাড়ের ঢালে পানের বরজ আর অদূরে কর্নফূলী চা-বাগানে দিন-পাল্টা কাজ-ই হচ্ছে নতুন লোকালয়ের মানুষের একমাত্র জীবিকা কিংবা বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। এখানে বসতি তেমন ঘন নয়। পাহাড়ের টিলায় টিলায় এক একটি গোষ্টীর আবাস। কোন কোন গোষ্টি সমুলে আসেনি। তবে সেখানেও কোন কোন পরিবার নদীর মায়া ছিন্ন করে চলে এসেছে। এই পাহাড়ী মহল্লায় এ রকম পরিবার অনেকটা একঘরে। যেমন শহরবানুর পরিবার। স্বামী মাজেদ মিয়া আর বৃদ্ধ শ্বাশুড়ীকে নিয়ে নদীর করাল গ্রাসে সবকিছু তুলে বুকে অনেক সাহস নিয়ে এই কুন্ডুর পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। তারপর দিন-রাত তিনজনই হাড়ভাঙ্গা খাঁটুনি দিয়ে পাহাড়ের টিলায় ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে, লাল শক্ত আঠালো পাহাড়ী মাটির সাথে পানি মিশিয়ে বাঁশ বেত দিয়ে তৈরী করেছিল একখানা বেড়ার ঘর। শহরবনুর এই চৌখন্ডির বয়স এখন দু’বছর। তবে ভিটে মাটিতে পূর্ব থেকে থাকা কিছু পাহাড়ীবৃক্ষ এবং দু’চারটি বয়সী কাঠাঁল গাছ শহরবানুর কুটিরকে নতুনের মধ্যেও প্রাচীনত্বের ছায়া দান করেছে। এর মধ্যেই কাটছে মাজেদ-শহরবানুর মান অভিমানের লাল নীল সংসার। শ্বাশুড়ী মারা যাওয়ার পর থেকে তাদের সংসারে পরস্পরের প্রতি মান অভিমান ক্রমে বাড়ছেই। কাল সারা রাত শহরবানুর ঘুম হয়নি। একতো ভ্যাপসা গরম ও সাংসারিক মনোমালিন্য তার ওপর আবার যৌন ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রনা। তাই সকাল সকাল ওঠে,প্রতি দিনের রুটিন অনুযায়ী ঘরকর্ম সেরে,স্বামীকে প্রস্তুত করে কাজে বের করে দেয়। তারপর চাপকলের ঠান্ডা জল দিয়ে সমস্ত অঙ্গ ধুয়ে হাল্কা স্নো-পাউডার মেখে, ব্লাউজবিহীন সুতির শাড়িটি পরে চিৎ হয়ে শুয়ে পরল শহরবানু। সারারাতের নির্ঘুম ক্লান্ত দেহটি যখনই ঠান্ডা জলের স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেল তখনই শহরবানুর বুক থেকে শাড়ির আঁচল খসে পড়ল। অন্যদিকে মাজেদ সাব্বিরের পাহাড়ী বাগানে দা-কোদাল নিয়ে জঙ্গল পরিস্কার ও মাটি কর্ষণে ব্যস্ত। বিলাসী কোন মালীর চাকরী নয় বরং পেশির জোরে ঘাম ঝরানো সকাল সন্ধা দিন-পাল্টা কাজ। মাঝখানে মধ্যহ্নে একবেলা আহারের বিরতি। তাও আবার নিজ ঘরে। দুই প্রস্থ কাজ শেষ করে তৃতীয় প্রস্থের জন্য যখনই মাজেদ কোদাল তুলল ঠিক তখনই সাব্বির বল্ল,‘মাজেদ মিয়া চালিয়ে যাও।’ আমি তোমার জন্য একটু চা-পানি নিয়ে আসি। এই বলে সাব্বির দোকানে না গিয়ে সোজাসুজি মাজেদের বাসায় চলে আসে। এসে দেখে মাজেদের ঘরের দরজা খোলা । উঠানে কয়েকটা মুরগী ছানা চাল কুটছে আর খোপের মধ্যে একজোড়া কবুতর একটা আর একটার বুকে মাথ লুকিয়ে ডাকছে। সাব্বির আর ডানে-বায়ে তাকাল না। ঘরে ঢুকে দেখে শহরবানু অর্ধাবস্ত্রাবস্থায় চিৎ হয়ে শোয়া। উদোম বুকে দু’টি নগ্ন স্তন নিঃশ্বাসের তালে তালে উঠানামা করছে। পলকহীন চোখে সাব্বির কিছুক্ষন বুঁদ হয়ে থাকে। যেন উর্বর সবুজ বাগানের ফলজ বৃক্ষের ডালে মৃদু সমীরণে দোল খাওয় দু’টি পরিপক্ক মোহনভোগ। সাব্বির মূহুর্তের জন্যও আর দেরি করল না। ধব্ধবে সাদা মোলায়েম ধুতিখানা খুলে চিৎহয়ে থাকা ঘুমন্ত শহরবানুর বুকের উপর শুয়ে পড়ল। সাথে সাথে যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে বহু প্রতিক্ষীত চাপা আগুনের উদগীরন হল। যৌনযুক্তির আনন্দে আদো জাগরন শহরবানু সাব্বিরকে অক্টোপাসের মতো আকঁড়ে ধরে। বহুদিন পর শহরবানু অনুভব করে এক নরম মাংসপিন্ড যেন তার দেহের গভীরতম পথের অতল বিন্দু স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। চৈত্রের তৃষ্ণার্ত মাটি যেন বহুদিন পর মেঘবৃষ্টির ছোঁয়া পেল। মিলনকাতর মৃতপ্রায় নদী যেন হঠাৎকরে তার গতি ফিরে পেল।
প্রায় সাতফুটের কাছাকাছি অসাধারণ পেশিবহুল সাব্বিরের যৌন উদ্দামতায় শহর বানুর দেহ যখন ধীরে ধীরে শীতল হয়ে আসতে লাগল তখন শহরবানুকে সন্দেহ ঘিরে ধরল। তার মনে হচ্ছে এ যেন তার হালকা পাতলা গড়নের মরুভূমির মৃতপ্রায় আগাছা সেই মাজেদ নয়। মাজেদের এ রকম হওয়ার কথা নয়। এ যেন ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্র যে তার বহু প্রত্যাশিত শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই ফাঁদ টপকানো সহজ নয়। সে আপ্রাণ চেষ্টাকরে চোখ খুলতে কিন্তু সাব্বিরের বুকের পশম তার প্রতিবন্ধকতা হওয়ায় সে পারে না। সে উঠতে চেষ্টা করে কিন্তু সাব্বির তাকে ছাড়ে না। অবশেষে সে সাপের মত প্যাঁচ দিয়ে সাব্বিরকে নিচে ফেলতেই দেখে তার ধারণাই সত্যি। এ হচ্ছে পাড়ার কুখ্যাত সাব্বির হোসেন ওরফে সাদ্দাম। যাকে এলাকার লোক ঘৃনা করে বিভিন্ন অপকর্মে যুক্ত থাকার জন্য। অবৈধ চর দখল,এলাকার গরীব দুঃখী মানুষদের ফাঁদে ফেলে তাদের ভিটেমাটি দখল,সর্বোপরী গাদ্দারী ও জোরপূর্বক প্রভাব বিস্তারের জন্য এলাকায় সে সাদ্দাম খ্যাতি পেয়েছে। দুর্বৃত্ত,দস্যু, লম্পট সেই সাদ্দামই শহরবানুর দেহ স্পর্শ করল আজ। অবিশ্বাস্য, দুর্লভ,চটুল যৌন পুলক মূহুর্তেই মাটি হয়ে শহরবানুর সমস্ত শরীর ক্ষোভে অপমানে ,ঘৃনায় রি রি করে উঠলো। সে সাদ্দামের বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বাক্যবান ছুটে দিল ‘তরে এড়ে হনে পাঠাইয়্যে দে?’ তুই ন জানছ ইয়্যান হাঁর ঘর?” সাদ্দাম লাম্পট্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘আঁরে তর নেক্ মাজেইত্তা পাঠাইয়্যে দে। মাজেইত্তা নাকি তরে ভালা গরি চুদিত ন পারে,আঁরে চুদি বল্যাই ...’ শহর বানু আর দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করলনা। সে উঠানে কাঁঠাল গাছে কপাল ঠেকিয়ে নিচের দিকে চেয়ে থাকে। সাদ্দাম বের হয়ে যাওয়ার পর সে আবার ঘরে ঢোকে। ‘নিজের মধ্যে বউ পোষার ক্ষমতা ন থাকিলে আরেঁ ছারি দিত, এত বছর আঁইন থাকিনে , আঁই কি ধাই গিইয়্যেনে? আজিয়া মাজেইত্তা আইওক্। আঁই ইতাত্তু পোছার লইয়্যম কিয়ল্লাই সাদ্দাইম্ম্যারে আঁর হাচে পাঠাইয়্যে? শহরবানু মাজেদের ওপর ভিষণ অভিমান করে। সে স্বামীকে যেন রিমান্ডে নেয়ার জন্য জেদ ধরে। তাছাড়া সংসারে প্রায় দাম্পত্য কলহের জের ধরে এক অপরকে সন্দেহ করত। বিশেষ করে মাজেদের চেয়ে শহরবানুর যৌবন জীবনে তেজ বেশী থাকায় মাজেদ কথায় কথায় তাকে পর পুরুষের সাথে তুলনা দিত। সেই সন্দেহ যে ভুল ছিল না তা প্রমাণ করতেই আজ নিজের সতীত্বের জলাঞ্জলি দিয়ে অপ্রকাশিত গোপন তথ্যকে ফাঁস করে কলঙ্কের তক্মা মাজেদের গায়ে মাখানোর জন্য শহরবানু বসে আছে। কিন্তু অকর্মা, আহাম্মক,দূর্বল,অক্ষম এই পুরুষের কাছে এই চটুলা নারীর ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এক মূহুর্তের জন্যও ভাবলনা। তাছাড়া উপায়ও নেই। আফ্রিকার এই বন্য যে ফাঁদ পেতেছে বরঞ্চ অপ্রকাশের গোপন যন্ত্রসায় দলছুট হরিণীর মতো তাকে মাঝে মাঝে যে শিকার হয়ে থাকতে হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? তখন মাজেদের কাছ থেকে বাঁচতে পারলেও শরীয়তের পাথর থেকে যে বাঁচতে পারবে তারও নিশ্চয়তা কোথায়? সুতরাং এসপার ওসপার যাই হবে তা এখনই হোক।
২।।
অর্ধদিনের ক্লান্তি মাথায় নিয়ে কোদাল কাঁধে করে মাজেদ যখন ঘরে ঢুকছে তখন দেখলো শহর বানু ঢুক গিলছে। পা দু’টো দরজায় ছড়িয়ে দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কি অভিমানে শহরবানু কাদছে তার গুরুত্ব না দিয়ে মাজেদ প্রশ্ন করে ‘‘তর কি অইয়্যে আবার? হাঁদর ক্যা?” সাথে সাথে গোপনীয়তার সকল আবরন ছিন্ন করে একটি শ্লেষযুক্ত উত্তর বেরিয়ে আসলো ,“না হাঁইদ্দ্যেমনে যে অষ্ট্রেলিয়ান বলদ পাঠাইয়্যচ”। এবার মাজেদ ভাল করে শহর বানুর দিকে তাকাল। আলু-তালু চুল , অগোছালো কাপড়ে শহরবানুকে দেখে মাজেদ আর বিলম্ব করল না , কাঁধের গামছাটা কোমরে শক্ত করে বেঁধে কোঁদাল উঁচিয়ে হালার পুঁত বলে সাদ্দামের বাড়ির দিকে ছুটে গেল। আর এতেই শহরবানুর কলঙ্কের কথা কাহিনী হয়ে বৃহৎ রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ল। ফলশ্র“তিতে শহরবানু আর সতী থাকতে পারল না।
প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সাদ্দামের বাড়ি। বাড়ির চারদিএক পাকা দেয়াল। একটাই গেইট। গেইটে গ্রিলের দরজা। ভেতরের দিকে তালা । দুই সন্তানের জনক সাদ্দাম বহু বছর মধ্যপ্রা”্যে কাটিয়েছে। মাজেদ সাদ্দামের আলীশান ভবনের সামনে গিয়ে শক্তি হারিয়ে ফেলে। সে দেখে ভেতরের দিকে ইয়া বড় একটা ষ্টিলের তালা ঝুলছে। বিকালের কড়া রোদে তালাটির গায়ে চিক্ চিক্ করছে আরব্য বিয়ালের মেদ। নিরূপায় মাজেদ দরজায় দমাদম দু’টা বারি দিয়ে বৃথা আস্ফালন করে চলে আসে। বাড়ি ফিরে সে শহরবানুকে বেদম প্রহার করে। সাথে চলে অজস্র গালি গালাজ“ মাগির জাত, ছুতমারানী,পেট ভাজানী হউত্তো। তুই আঁর হান্দানর গৌরব নাশ গইজ্জচ, তুই এহন আর গরত্তো বাইর অইজা। আঁই ছুদানীর পোঁয়া মাড়ত্ হাম্ গইত্তে গইত্তে মরি জাইর গই, রতরে রত ন চাইর আর তুই আলগা বেড়াল্যাই খেলা হর। যা, যাগই, তর এরইম্যা বউ আঁর তো ন লাইব।
প্রতিবেশী সুফিয়া শহরবানুর মাথায় পানি ঢালে। হুঁশ ফিরলে তাকে লেবুর শরবত খাওয়ায়। মাজেদ আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়। এবার শহরবানু চিৎকার করে ওঠে ‘যাইয়্যমবয়ই, তর ভাত না হাইয়্যাম। আর কেয়ালত দুখ আচ্ছিল যেই তর এরইম্য বেড়ারে বিয়া গজ্জিলামজে । তর মদ্দামী আছে না বেড়া? চঁইয়্যা ছারা গওঁর। আগে দুয়া বিয়া গই্জ্জচ। এ দুনোয়াও দাইয়্যে। এনে দাইয়্যেনে বেড়া? তর শরম ন লাগে? মরি যইছনা?’।
এই বলে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁেদ। মাজেদ আর কাজে গেল না। সে দু’ চোখের জল ছেড়ে দেয়। শান্ত শিষ্ট, নিরীহ স্বভাবের মাজেদ। ক্ষিণ-কায়,দুঃখী শরীর। এলাকার কারো সাথে তার বিবাদ নেই। এই দুঃখ-দারিদ্রে জর্জরিত সংসারে আগেও দু’টা বউ এসেছিল। একটাও টিকেনি। বিদায় নিয়েছে। শেষমেষ তার বাবা সয়ফুল মূলুক কর্নফুলীর দক্ষিণ পার থেকে ৩ নং বউ হিসেবে শহরবানুকে নিয়ে আসে। সয়ফুল মুলুক যখন কর্ণফুলী নদীতে যখন সাম্পান বাইতো তখন শহরবানুর মায়ের পান তামাকের আবদার ফেলতো পারতোনা । তাদের মধ্যে এত ভাল খাতির ছিল যে মাঝে মধ্যে গাছের ডাব ও ঝুনা নারিকেল ও সয়ফুল মুলুকের জন্য রেখে দিত। বিয়াইনের মর্যদা দিয়ে সয়ফুল মুলুকও তার প্রতিদান দিয়েছিল। এ দু’জন মাজেদ-শহরবানুকেও ওয়াদা করিয়েছিল যে একজন যেন আরেকজনের গেলাসের সরবত খেয়ে মরে। কিন্তু ক্ষুধা দারিদ্রের সংসারে যেখানে ক্ষুন্নিবৃত্তি ও বনিবনা মহা দায় সেখানে সুখের কাটির নাগাল পাওয়া বড়ই দুঃসাধ্য হয়ে যায়। মাজেদের ভিতর থেকে কিছু অজগরি নিঃশ্বাস বের হয়ে যায়।
রাতে মাজেদ খেয়ে ঘুমাতে যায়। কিন্তু শহরবানু খায়নি। সে বসে রইল। হঠাৎ তার মধ্যে শোক উতলায় উঠল। সে মা’র নামে বিলাপ ধরল। তার বিলাপের সাথে সাথে খোপের কবুতর জোড়াও ডেকে ওঠে। মাজেদর ঘুম আসেনা। সে পান চিবায়। শহরবানুর বিলাপে তার মনটাও কোমল হয়ে আসে। তার জন্য মাজেদের সহানুভূতি ও অনুতাপ প্রকট হয়। অবশেষে মাজেদ ডাক দেয়, ‘শহরবানু এই শহরবানু...’ শহরবানুর কান্না আরো বেড়ে যায়।
শহরবানুর বিলাপ দীর্ঘতর হতে দেখে মাজেদ বিছানা থেকে উঠে শহরবানুর পাশে এসে দাড়াঁয়। তার পর বলে, “অইয়্যে আর না হাঁদিচ। উঠ ভাত হায়্ ল। ভাত হায়রে ঘুমাইতে আয়।” অবশেষে তার কান্না থামে কিন্তু ভাত খায়না। সে বিছানার এক পাশে গিয়ে শুয়ে থাকে। সারাদিন উত্তপ্ত রোদ টেনে পাহাড় ঘুমায় আর সেই পাহারের টিলায় নির্মিত শহরবানুর কুটিরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ধেয়ে আসা ঝিরঝির বাতাসে নিরবতা নেমে আসে। মাজেদ ধীরে ধীরে গা ঘেষে শহরবানুর কপালের ওপর হাত তুলে দেয়। সাথ সাথে শহরবানু চেঁচিয়ে ওঠে। ‘আঁই তো বেশ্যা মাগি। আঁর কোয়ালত হাত রাখি লাভ নাই।’
মাজেদের চেয়ে লম্বা ,ছিমছাম,বুক উচা শহরবানুর গায়ের রং ফর্সা। রাজহাঁসের মত লাস্যময়ী গ্রীবা। গরীব ঘরের মেয়ে হলেও অতি সুন্দরী। মাজেদ জানে একমাত্র বাবার কারণে তার সাথে এই মেয়ের জোড় বন্ধন হয়েছে। তাই আগের গুলোর চেয়ে এই বউয়ের প্রতি তার ভালবাসাও অন্যরকম। এই বউয়ের প্রতি সে যথেষ্ট দূর্বল। তার পরেও মাজেদের সংসারে এই শহরবানু কিছূ একটার অভাব বোধ করে। মাজেদও তা বুঝতে পারে। বিশেষ করে আজকের ঝগড়ার পর থেকে এই অভাব বোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
শহরবানু জানে মাজেদ তাকে কিছুতেই ছাড়বেনা। মাজেদও প্রায় তাকে বলত,‘তুই অয়দ্দে আঁর শেষ বউ। তুই জীবনেও আঁর, মরণেও আঁর। শেষ হাড়াইল্লা তুই যদি হনোদিন আঁরে ফেলাই যচ্গই তইলে আঁই ন বাইচ্চম।’
পরের দিন মাষ্টার নূর হোসেন, সাদ্দাম ও শহরবানুর ঘটনার বিচার করে দেয়। বিচারে মহল্লার আরো দুইজন লোক ছিল। তাদের একজন হচ্ছে আবুল হোসেন ও এয়াকুব হোসেন। এরা দু’জন মাষ্টারের দুইপাশের চেয়ারে বসে মাষ্টারের ফয়সালাকে সায় দিয়ে যায়। বিচার শেষে দু’টি পাঁচশ টাকার নোট তারা শরবানুর হাতে গুঁজে দিয়ে চোঁখ টেপে। শহরবানু চোখের এই ভাষা ভাল করেই বোঝে। সে এই দু’জনকে চেনে। আবুলহোসেন চালের ব্যবসায়ী। ঘরে বউ আছে কিন্তু নিঃসন্তান। নিঃসন্তান এই লোক এয়াকুব হোসেনের ভাল বন্ধু। জুয়াখেলা ও মদ্যপানের সঙ্গী। এয়াকুব হোসেন হচ্ছে বিদেশ ফেরত। এক সন্তানের জনক। তার স্ত্রী ভিষণ গরম ও প্রতিবাদী। দুজনই বিত্তশালী ও এলাকার নেতৃত্ব স্থানীয়। রাতে জুয়ার আসরে যাওয়ার সময় সিগারেটের আগুনের ভান করে শহরবানুর নিকট আসত। শহরবানু চুলার পাশ থেকে দেয়াশলাইটা সযতেœ তাদের হাতে তুলে দিত। পরের দিন মাজেদ বহু চেষ্টা করেও শহরবানুর অভিমান ভাংতে পারেনি। সে এখন ভাবছে এটা কোন অভিমান নয় বরং এ হচ্ছে তার প্রতি চরম ঘৃনা। মাজেদ ভাবে এই ঘৃনার উদ্রেককারী কি সাদ্দাম নাকি অন্য কেউ? মাজেদের সন্দেহ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়।
৩।।
পরের রাতে মাজেদ ঘুমায়না। সে ঘুমানোর ভান করে শুয়ে থাকে। এদিকে শহরবানুর ভেতরে যৌন আকাঙ্খা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সে তার প্রতিটি লোম কূপ ঘষে ঘষে সাদ্দামের সাথে সঙ্গমশ্রমের সেই বিরল ঘামের কথা কল্পনা করে আর তার সাথে যোগ করে এয়াকুব ও আবুলহোসেনের চোখ টেপার নতুন রহস্য। তার জন্য মাজেদের সংসার এখন বড় ফাঁদ। তার ভেতরের চড়–ই পাখি মাজেদের পিঞ্জর থেকে বের হওয়ার জন্য ডানা ঝাপ্টায়। মাজেদ তার কাছে এখন ধোয়া তুলসিপাতা।
চাঁদনী পসর রাত। কাঁঠাল পাতাগুলি বাতাসে পত্পত্ করছে। বেড়ার ফোকর দিয়ে চাঁদরশ্মি তির্যকভাবে ঘরে ঢুকে পড়ছে। শুনশান নিরবতা। এক কাব্যিক রাত। শহর বানু উদ্ধ্যত গোখরার মতো ফনাতুলে একবার মাজেদের দিকে তাকায়। মাজেদের অভিনয়ের শ্বাস-প্রশ্বাস তাকে স্বাভাবিক ঘুম এনে দেয়। এবার শহরবানু কোমরে আঁচল বাধেঁ। অদূরে এয়াকুব হোসেন টর্চের আলো ফেলে তার অবস্থান পরিস্কার করে। এয়াকুব হোসেন রাতের জুয়াখেলায় অনেক হারছে কিন্তু এই জুয়ায় সে হারতে চায় না। শহরবানুর উপর অনেক আগ থেকেই তার চোখ পড়ছে। কিন্তা দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারেনি। আজ রাত হবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ জুয়াখেলার রাত। এ খেলায় আবুলও আছে। তবে প্রতিপক্ষ নয়; পক্ষ।
শহরবানু বদনাটা হাতে নিয়ে বের হয়। মাজেদ চোঁখ খুলল। ‘আসলেই কি শহরবানু পায়খানায় যাচ্ছে?’ মাজেদ নিজের হ্যাঁ না ভোটে কালক্ষেপন করে। কিন্তু ততক্ষনে শহরবানু চম্পট দিল। যে রাস্তায় পিপড়া একবার মধুর স্বাদ পেয়েছে, সেই রাস্তায় সে তো হাঁটবেই। এয়াকুব সআদরে শহরবানুর গালে একটা চুমু বসিয়ে দেয়। তারপর প্রপ্তির দূর্লভ আনন্দে গনিমতের মালের মতো তাকে কাধে তুলে বীরদর্পে হেঁটে উম্মুক্ত আকাশের নিচ দিয়ে গোপন দূর্গে নিয়ে যায়। যে দূর্গে শুধু ব্যাঘ্র সম্রাটের বিচরণ।
মাজেদ বিছানা থেকে প্রথমে দরজায় দাঁড়ায়। এরপর উঠানে পায়চারী করতে থাকে। না বিলম্ব আর সয়না। এবার মাজেদ লন্ঠন জ্বালিয়ে পায়খানায় উঁকি মারে। দেখে শহরবানু পায়খানায় নেই।
এবার মাজেদের রক্ত মাথায় ওঠে। টেনশনে সে মাথার চুল ছিড়ে। অবশেষে সে আরেকবার ঘরের চারদিকে খোঁজাখুঁজি করে। না, শহরবানু মাজেদের ত্রিসীমানায়ও নেই। মাজেদের মাথা থেকে যেন আগ্নেয়গিরির অগ্নি বাষ্প বের হচ্ছে। মাজেদ বুঝতে পারে আসল নাটের গুরু কে।
অবশেষে মাজেদ পাহাড়সম কৈফিয়তের মিথ্যার বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুমাতে যায়। সকালে ঘুমথেকে উঠেই দু’জনের মধ্যে এক প্রস্থ ঝগড়াঝাটি হয়ে যায়। প্রতিবেশি সুফিয়াকে মাজেদ তার জ্বালা-যন্ত্রনার সাতকাহন শুনাতে বাধ্য করে। কিন্তু সুফিয়া তেমন গুরুত্ব দেয়না। কারণ সে মনে করে আগের ঘটনার রেশ দু’জনের আজও রয়ে গেছে। তাই তারা পরস্পরকে দোষারোপ করছে। তাই গতরাতের ঘটনার ঘটনার সত্যতা মানতে সে রাজি নয়। তবে সুফিয়া শহরবানুকে মাজেদের কাছথেকে মাফ চাওয়াই নেয়। মাজেদ ক্ষমা করে দেয়।
তারপর দু’দিন শহরবানুর সাথে মাজেদের সম্পর্ক ভাল যায়। তবে মাজেদের বামপাশে থাকি থাকি বিষযন্ত্রনা উপচাই ওঠে। একতো লোক সমাজে পুরুষত্বের খর্বতা তারপর শহরবানুর অবাধ্যতা। তাছাড়া শহরবানুর কলঙ্ক মানেই তো মাজেদের কলঙ্ক। আজ রাতে মাজেদের প্রতি হঠাৎ শহরবানুর দরদ যেন বেড়ে গেল। সে অন্য দিনের চেয়ে আজ ফুরফুরে মেজাজে ভাত-পানি রান্না করে। মাজেদ আসার সাথে সাথে তাকে গামছা, পানি হাতে তুলে দেয়। তারা অনেকদিন পর খাইতে বসে। খাওয়ার পর পানের বাটা টা কাছে টেনে নিয়ে শহরবানু সুপারি বের করে। এরপর সে একটা সুপারির চিলকা ছাঁচে আর মাজেদের সাথে বিয়ের স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা তোলে। মাজেদ পান চিবায় আর মাঝে মাঝে শহরবানুর কথায় সায় দেয়। কিছুক্ষণ পর শহরবানুও এক খিলি পান মুখে পুরে দেয়। তারপর তর্জনী দিয়ে চুনের বোতল থেকে চুন খসে মুখে দেয়। পান রসে তার ঠোট আনারের মত লাল হয়ে যায়। মাচা থেকে সে সুগন্ধি তেলের বোতলটা নামায়। এরপর দুইবার হাতের তালুতে তেল নিয়ে সে মাথায় মালিশ করে আর বলতে থাকে ; ‘বদ্দ্যিন অই গিয়্যেগই মাথায় তেল ন দিত্দে।’ এরপর মাথায় চিরুনী চালিয়ে চুলগুেিক পেছনে ফেলে ফিতা দিয়ে বাধে। একগুচ্ছ অসম চুল শহরবানুর কপালে আচড়ে পরে। ফর্সা মুখের এক কোনায় একটি ছোট্ট তিল তার অবস্থান পরিস্কার করে। কানের লতিতে মাজেদের দেয়া একমাত্র নিশানা একজাড়া দুল ঝিলিক দিচ্ছে। মাজেদ বিছানায় দুই হাতের বন্ধনীর ওপর মাথা রেখে অপলক দৃষ্টিতে শহরবানুর দিকে চেয়ে থাকে। শহরবানু জিজ্ঞেস করে ,“কি চাইতো লাইগ্য দে?” মাজেদ কোন উত্তর দেয়না একটু মুচকি হাসি দেয়। আর এই হাসির মধ্যেই গোঁম হয়ে রইল রাজ্যের যতসব দাম্পত্য কলহের গোপন সন্দেহ। এই সন্দেহের দূর্গ ভেদ করা সরল সিধা শহরবানুর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ল।
অবশেষে শহরবানু মাজেদের পাশে গিয়ে শোয়ে। একটি হাত মাজেদের বুকে রাখে। নির্মেদ হাড্ডিসার মাজেদের বুকের কোমল লোমগুলেতি সুড়সুড়ি দেয়। বিকারগ্রস্ত রোগীর মতো মাজেদের হার্ট বিট বেড়ে যায়। কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর সে খুঁনসুটি দেয় কিন্তু তা নিতান্তই একতরফা। এরপর শররবানু ও মাজেদ দু’জনই বুঝতে পারে যে আজ রাতে দু’জনই পরস্পরের অতন্দ্র প্রহরী।
রাত চলে যাচ্ছে। মাজেদের আরামের ঘুমের রাত । কর্ম-ক্লান্ত মাজেদের চোঁখের পাতায় ঝরঝর করে ঘুম ঝরে। উপায়ান্তর না দেখে মাজেদ অতি সন্তর্পনে তার লুঙ্গির সাথে শহরবানুর আঁচল দিয়ে গিট্টু দেয়। তার পর আরামে ঘুম দেয় নিধিরাম সর্দার। এদিকে আবার এয়াকুবের অপেক্ষার যন্ত্রনা শেষ হয়না। তারা ঘরের চালে টর্চের আলো ফেলে। শহরবানু টের পায়। মাজেদ নাক যখন ডাকতে শুরু করল তখন শহরবানু উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু মাজেদের লুঙ্গির সাথে তার শাড়ীর আচলের বন্ধন তাকে শুয়ে থাকতে বাধ্য করে। ফলে সে আবার বালিশে মাথা দেয়।
এবার শহরবানু তার জীবনের ঝুঁকি নেয়। এ ঝুঁকি লাভ ক্ষতির দুটোরই আশংকা রয়েছে। এই ঝুঁকি জীবনের শ্রেষ্ট ঝুঁকি। সে উঠে বসে। সাথে সাথে একটি নেঁটি ইঁদুর মাজেদের উপর দিয়ে দৌঁড় মেরে অদূরে খালি টিনের জগের সাথে ধাক্কা খায়। শহর বানুর বুকটা ধপকরে ওঠে। তারপর সে আবার কিছুক্ষণ মাজেদের ঘুমের পোষ্ট মর্টেম করে । তারপর লুঙ্গি থেকে তার আচলের বন্ধন ছিন্ন করে। এরপর সিঁধেল চোরের মত এক পলক স্বামীর দিকে তাকিয়ে দরজা খুলে অতি সন্তর্পনে খালি পায়ে কাঠাল গাছের তল দিয়ে গিয়ে আবুলদের সাথে মিলিত হয়। সাথে সাথে মাজেদও বিছানা থেকে উঠে শহরবানুর গতি বিধি লক্ষ্যকরে। কিন্তু তেমাথায় আবুল এয়াকুবদের দেখে সে আর সামনে আগানোর চেষ্টা করে না। তাদের শক্তির কাছে মাজেদ নিতান্তই একটা মাকড়সা। একটা ঢলা দিলেই শেষ। একথা মাজেদের বুঝতে আর বাকি থাকেনা।
অবশেষে সকল আশংকা ,সন্দেহ,দূর্বলতা ও কলঙ্কের তক্মা এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে মাজেদের ভেতরের খুনের নেশাকে গাঢ়তর করে তুলল। আত্মলজ্জার অসহ্য যন্ত্রনায় নিরূপায়, সর্বশান্ত মাজেদ এবার বারুদের মতো জ্বলে উঠল। তফাজ্জলদের পাহাড়ে কাজ করার জন্য পিটিয়ে রাখা চকচকে ধারালো দা-টা সে বের করল। তারপর শান্ত্রী প্রহরীর মতো দরজার আড়ালে বসে রইল।
হার জিতের যুদ্ধে যেদিন থেকে হারছে মানুষ, মাঠে-ময়দানে, শৌর্ষ-বীর্যের কাছে,পরাজিতের সে বেদনা কালান্তরে সামষ্টিক স্রোতে ব্যবৃত হয়ে যায়। কিন্তু ব্যর্থতার যে প্রকট বেদনা নগ্ন চোরের মত লজ্জার পাহাড় ডিঙ্গায়; যাতনার সে দহন যতদিন প্রশমিত হবে না, ততদিন তার আবরণে নগ্ন চোরের চৌর্যপ্রবৃত্তির তক্মা লেগে থাকবে।
জোছ্না রাত। শুকতারা ধীরে ধীরে পূর্বাকাশে হেলে পড়ছে। ঝিঁ-ঝিঁ পোকার মৃদু ডাক ও পাহাড়ী বাতাসের তীব্রতা কম্ছে। কাঁঠাল গাছে একটি ঘু-ঘু পাখির নিরবিচ্ছিন্ন আর্তনাদের পরিসমাপ্তি একটি রাতের শেষ প্রহরের ঘোষাণা করছে এবং তার সাথে শেষ হলো মাজেদেরও একটি প্রতীক্ষার প্রহর। যেই মাত্র ভীত-সন্ত্রস্ত শহরবানু নিজ আলয়ের ক্ষুদ্র দরজা দিয়ে প্রবেশের জন্য মাথা নোয়াল ঠিক তখনই মাজেদের দুই হাত সজোরে একটি কোপ তার ঘাড়ে বসিয়ে দিল। সাথে সাথে একটি আর্তনাদ পাহাড় থেকে পাহাড়ে,আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হল। সেই আর্তনাদ কেউ শুনল আবার কেউ শুনলনা।
সমাপ্ত
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


