এই মাত্র সাহিত্য সভা শেষ হল। ইদানিং সাহিত্য সভা আগের মতো জমছে না। সাহিত্য কর্মীরা একটু মাথা তুলে দাঁড়াবার আগেই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের সৃজনশীলতার দরজায় আঘাত হানছে। ফলে তিল তিল রসে প্রস্ফুটিত স্বপ্নের পাপড়িগুলো কর্পোরেট অঙ্গারে জ্বলে ফলে পরিণত হওয়ার আগেই আলকাতরা দিয়ে শেষ হয়। ক্যাম্পাস থেকে এসে জামিলের ক্লান্তিগুলো বিছানার বালিশে লুটোপুটি খাওয়ার আগেই সম্পাদকের ফোন সাহিত্য সভায় নতুন লেখা নিয়ে আসতে হবে। একান্ত অনিচ্ছা সত্বেও জামিল একটা কবিতা নিয়ে এসেছিল। বলা যায় অনেকটা পুরানো কবিতা। সিজনাল কবিতাগুলো সিজন শেষে এমনিতেই পুরানো হয়ে যায়। যাই হোক, তাতে কি। সাহিত্য সভাতে কোন একটা লেখা নিয়ে গেলেই লেখকের মোটামুটি একটা অবলম¦ন হয়ে যায়। কিন্তু লেখা পুরানো হোক বা নতুন হোক লেখা নিয়ে লেখকের মধ্যে সব সময় একটা আবেগ, অনুভূতি, ভয়, শিহরণ ইত্যাদি কাজ করে। ফলে সমালোচনার সময় লেখক সত্তা বায়বীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হয়। আলোচক কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করবে তা নিয়ে লেখকের মনে সদা টেনশন নানা জল্পনা কল্পনা কাজ করে। কখনো কল্পনা ও বাস্তবতার মিশ্রণের দোলাচালে লেখক সত্তা কর্পূরের মতো উবে যেতে থাকে। আজকে কিন্তু জামিলের এরকম আবেগ অনুভূতি কিছুই নেই। লেখা ভাল হোক,মন্দ হোক, পূর্ব থেকেই তার সিদ্ধান্ত ছিল সে কোন কিছু আমলে নিবেনা। তাই সাহিত্য সভার আলোচনায় সারাক্ষণ সে অন্য মনস্ক থাকল। তবে মাঝে মাঝে আলোচনার প্রতি গুরুত্ব¡ দেয়ার ভান করে মাথাও নাড়ছে। স্রেফ আধা ঘণ্টায় দুই জনের লেখার আলোচনা হয়ে গেল। তার মধ্যে আবার একজন লেখক চট্টগ্রাম গিয়েছে। তাই লেখার দৈন্য দশা দেখে লিটল মেঘের তরুন সম্পাদক সময়ের পরিধি বাড়ানোর জন্য নিজ দায়িত্বেই তার লেখা গুলো পাঠ করল। তার পর আলোচনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে সভার দৈর্ঘ্য কিছুটা বাড়িয়ে সমাপ্তি ঘোষণা করল।
জামিল আজ নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করল। সভা শেষ হওয়ার সাথে সাথে পাঁচতলা থেকে নেমে কিছুক্ষণ ফুটপাথে বাসের জন্য অপেক্ষা করল। অনেকক্ষণ দাঁড়ানোর পর বাস আসার সম্ভাবনা না দেখে সে কিলোপথ হেটে যাবে আর বেঁচে যাওয়া বাড়া একটা সিগারেটের দামের যোগান দিবে। শেষ মেশ সেটাই হলো।
- সিগারেট আছে?
- কি সিগারেট?
- গোল্ড লিফ।
- আছে।
- একটা দেন।
জামিল একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে দিল।
- ভাই ভাংতি নেই , আরেকটা দিয়ে দিই?
এইবার জামিলের চেহারাটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভেবেছিল আড়ই টাকা বাকি অর্ধেক পথের ভাড়া দিবে। কিন্তুু বাঁচা আর গেলনা। অনেকটা নিরবেই জামিল সম্মতি দেয়। শীতকালের রাতে হাঁটতে গেলেই জামিল সিগারেট জ্বালাতে ভালোবাসে। পেট ক্ষিধে অনেকটা অভূূূক্তি সত্ত্বেও সে দুইটা সিগারেটের একটা মুখে দিয়ে আগুন জ্বালায়। বিশ-পঁচিশ গজ হাঁটতেই সিগারেট ছাই। সামনের মোড়েই বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাস এখানে অনেকক্ষণ পর্যন্ত থামে। ড্রাইভার থেকে শুরু করে হেলপার পর্যন্ত সব নাছোড় বান্দা। একজন যাত্রির জন্য প্রয়োজনে একঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার জায়েজ রয়েছে বাস অলাদের অলেখিত সংবিধানে। জামিল তা আগে থেকে জানতো। তাই পাশের ফুটপাতে হকারের ষ্টলে গিয়ে ঝটপট দুইটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য ম্যাগাজিন বাছাই করল। জামিল জানে এগুলো দুই টাকার কমে বিক্রি করে না। তবু সে জিজ্ঞেস করল,
- একটা কত করে?
- ২ টাকা মামা
- তিন টা কত?
- ৬ টাকা দিবেন?
- ধরো ৫ টাকা নাও
হকার আর উচ্চ বাচ্য করল না জামিল ম্যাগাজিন তিনটির হাতে নিয়ে অন্য হাতে ঝটপট বাসের হ্যান্ডেল ধরে উঠে পড়ল। তারপর ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে চোখ বুলালো
২
পত্রিকার সাহিত্য ম্যাগাজিন এক সময় প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। এ আগ্রহ একাডেমিক পড়ার চেয়ে অনেকগুন বেশি। তাই বাসায় এসে কাপড় চোপড় বদলে ক্ষুধা থাকা সত্তেও বসে পড়ল। ভাত পানির চেয়ে সাময়িকী কি কি কাভার করছে তা দেখার জন্য তার মধ্যে আগ্রহের কমতি নেই। প্রথমে একটা ম্যাগাজিন হাতে নিল তার পর আবারও প্রচছদে চোখ বুলাতে লাগল। এরপর পৃষ্টা উল্টাতে শুরু করল। দেখা গেল প্রথম পৃষ্টায় বিজ্ঞাপন। তারপর জামিল আর পৃষ্টা উল্টালনা। বিজ্ঞাপনে বিরক্ত হয়ে সে এবার সাময়িকীর বিপরীত দিক থেকে পড়তে শুরু করল। দেখা গেল এদিকেও প্রথম ও দ্বিতীয় পৃষ্টায় বিজ্ঞাপন। পরের পৃষ্টা উল্টনো হল। এখানেও ‘যে আপনাকে ফোন করবে সে শুনবে গান।’ এরকম ষোল পৃষ্টার ম্যাগাজিনে ছয় পৃষ্টাই বিজ্ঞাপন। এতক্ষণ পর জামিলের চান্দিটা হট হয়ে গেল। চাপার স্বরে একটা বুলি আওড়াল ‘কুত্তার পো...।’ পাশের টেবিলে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ফারুক জিজ্ঞেস করল।
-কি হল জামিল ভাই?
-প্রতারিত হয়েছি।
-আপানাকে কে প্রতারিত করল আবার?
-জামিল নিরুত্তর
-ফারুক আবার জিজ্ঞেস করল।
এবার জামিল বলতে শুরু করল, আগামীকাল সকালের নাস্তার টাকা খরচ করে তিনটা ম্যাগাজিন কিনলাম। যার প্রত্যেকটিতে ছয় পৃষ্ঠা করে বিজ্ঞাপন। তাহলে আর পড়ার কি থাকল? বত্রিশ পৃষ্টার ম্যাগাজিন কে কমিয়ে ষোল পৃষ্টা করল আবার সেখানেও এত বিজ্ঞাপন? অথচ এই ম্যাগাজিনগুলো নিয়ে দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকদের মনে গর্বেরও কমতি নেই।
-তুমি মনে কর আমি প্রতারিত হয়নি?
-অব্যশই
এমনিতে তার কক্ষটা ভ্যাপসা গরম। সেখানেও আরও সম্পাদকের ওপর রাগ। সুতরাং জামিলের চান্দিটা একেবারেই গরম হয়ে গেল। জামিল কিছু একটা ভাবছিল। ম্যাগাজিন তিনটি একপাশে পড়ে রইল। একসময় এ পত্রিকার ম্যাগাজিন গুলোর প্রতি জামিলের দূর্বার টান ছিল। শুক্রবার হলেই ফুটপাতে ধর্ণা দিয়ে দুই টাকার সাহিত্য ম্যাগাজিন দশ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসতো । তারপর পড়ে সুন্দর করে ভাজ। টেবিলে এখনো ছোট-বড় আড়াইশো তিনশো ম্যাগাজিন তরে তরে সাজানো । তার সাথে দর্শন সাহিত্য ইতিহাসের গ্রন্থ। জামিল ধীরে ধীরে মাথায় হাত রাখল। তারপর কপাল থেকে মাথার চান্দি পর্যন্ত বেশ কয়েকবার হাত বুলাল। ঘর্ম সিক্ত চান্দিতে যে কয়েকটা চুল পড়ার বাকি আছে তা বন্যায় রোপা আমন চারার মতো লেপ্টে আছে। জামিল একটু নিচু হয়ে চান্দিতে হাত রেখে কিছু একটা ভাবছিল। হয়তো ক্যারিয়ার গঠন বা পেট বাচাঁনোর কথা। এমন সময় পাশের কক্ষ থেকে সাজ্জাদ এসে সরাসরি ঢুকে পড়ল। তাপর জামিলের পাশে বসল। খাট টা একটু মড়মড় করে উঠল। জামিল একটু হতচকিত হল। না তার আশংকা অমুলক। কারন খাটটি বেশ মজবুত শক্ত ও দামি।
লম্বা, চওড়া, ওজনদার সাজ্জাদ। ইকোনোমিক্্ের মাস্টার্স। ভার্সিটি থেকে বের হল প্রায় দু’ বছর হল। বেকার। অলরেডি বিভিন্ন প্রতিষ্টানে প্রায় বত্রিশটি ইন্টারভিউ দিয়েছে। কিন্তু চাকরি হয়নি। তার বড় দুঃখ পঁচিশ নম্বরের পরিক্ষায় তেইশ নম্বর পেয়েও একটি বিদেশী ব্যাংকে চাকরি হলো না। জামিলের চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র তবু জামিলের সাথে একটু ভাবসাব বেশি। একজন তরুন কবি হিসেবে সমকালীন চিন্তা চেতনায় ও সৃজনশীলতায় সাজ্জাদ চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাই সিনিয়র-জুনিয়রের ব্যাবধান সাজ্জাদ তেমন আমলে নেয়না। জামিলের সাথে ভাল শেয়ার করে। সে জামিলের কাঁধে হাত রাখল। তারপর জামিলের টেবিলে সারি সারি বইয়ের স্তুপে নজর দিল। কিছুক্ষণ তাকানোর পর বলল,
-তোমার মিয়া এতগুলো বইয়ের মধ্যে একটা বইও কাজের না।
-কাজের বইতো অনেক গুলো কিনছেন কিন্তু কাজতো করতে পারেন নি।
সাজ্জাদ আর কোন মন্তব্য করতে চাইল না। সোজাসুজি রোমে গিয়ে চাকুরির বই পত্রগুলো ঘাটতে লাগল। জামিল আবার চিন্তায় মগ্ন হল। সে কি লেখালেখিকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিবে না কোন চাকরি বাকরি খুজবে? বাস্তবেই সাজ্জাদ চেয়ে জামিলের পারিবারিক অবস্থাটা আরো বেশি খারাপ।
৩
জামিলের ধ্যানমগ্নতা একটু প্রশমিত হল কিন্তু অভিমান, ক্ষোভ বেড়ে গেল। ‘আসলেই এই বইতো কোন কাজের না। সব অকাজের বই। এই বই কি দানা পানির যোগান দিতে পারে? কিছুই পারে না। হ্যাঁ প্রতিটি ধ্বনি, প্রতিটি শিরা উপশিরাতে রক্তকে বেগবান করতে পারে। রক্তকে কখনো ঠান্ডা কখনো গরম করতে পারে। কখনো উত্তাল সমুর্দ্রে সুনামির মত লন্ড ভন্ড করে দিতে পারে। হৃদয় তন্ত্রের তারে বীণার মতো ঝংকার তুলতে পারে কিন্তু রক্ত মাংশ মজ্জা না থাকলে এগুলোর দরকার কি? অস্তিত্বের সংগ্রামে এগুলোর কি প্রয়োজন আছে? কবিতা টবিতা কিছুই না। এটা স্বপ্ন মায়া খেলার মতো যা রাত্রে দেখলে সকালে সকালে শেষ হয়ে যায়। টাকাতো বাচ্চা প্রসব করতে পারে। কবিতা কি পারে? পারেনা। টাকাতেই মানুষের স্বাধীনতা, টাকাতেই বন্ধু-বান্ধব, টাকাতেই মান- মর্যাদা, টাকাতেই সব সুখ, টাকাতেই সব।’ জামিল মনে মনে তার কবিতার সমালোচককে অভিশাপ দিতে থাকে। অভিশাপ দিতে থাকে সাহিত্য সভার প্রথম সংগঠককে যে তাকে প্রথম কবিতার আড্ডায় দাওয়াত দিয়েছিল। ‘অমানুষের বাচ্চারা কেন যে বলে দিল না কবিতা গরীবের জন্য আসেনি, যার পেটে ক্ষিধা তার কিসের আবার কবিতার চর্চ্চা? যাদের পেটে রিয়াল-ডলার-বিয়ারের মেদ তারা তো কবিতার চর্চ্চা করেনা? তারা তো কবিতা পড়েনা? তাদের ছেলে মেয়ে সুরম্য অট্টালিকায় থাকে। হাই টেকনোলজির গাড়ি হাকিয়ে ফাস্টফুডের দোকানে যায়, তারা তো কবিতার চর্চ্চা করেনা। সংসারের ডানা ভেঙ্গে শিল্পের ডানা বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা কি কোন ছা-পোষা কবির আছে?’ জামিলের চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা জল ট্যাপ ট্যাপ করে গড়িয়ে পড়ল।
কথাগুলো জামিলের মুখ দিয়ে যেভাবে গদ গদ করে চলে আসল বাস্তবে অন্তর থেকে সে ভাবে আসে নি। অন্তর থেকে যদি আসতো তাহলে অনেক যুক্তি-তর্ক ব্যাখা বিশ্লেষনের বেষ্টনী ভেদ করে আসতে হতো। তবে যেভাবেই আসুক কথাগুলো যে একবারেই মিথ্যে, তা নয়। আকার গত ভাবেও সত্যি। জামিল তার পিতার মুখটি কল্পনা করল। সাদা কালো দাড়ির ধূসর সে মুখ। অক্ষি গোলক কোটরে ঢুকে গেছে। মাথার চান্দিও তালু টকটকে লাল হয়ে গেছে। মেরুদন্ড আস্তে আস্তে বাক নিয়েছে। বাহু ও বুকের পেশি শুকিয়ে গেছে। পায়ের পাতা ও আঙ্গুলে জট ধরে গেছে। বুকে ও হাটুতে ব্যাথা। দুঃখী শরীর। সারাদিন পরের ক্ষেতে মজুরি খাটে। তারপর রাতে ঘুমের বিছানায় আর্ত চিৎকার ‘ওরে বাপ ওমা ও আল্লূাহ উহু হু হু...।’
জামিল মাঝে মধ্যে বাড়িতে গেলে জনকের আর্তচিৎকারে রাত ঘুমাতে পারেনা। তার মগজে যেন রাজ্যের বিষাদ নেমে আসে। দারিদ্রতা যেন তাকে কুরে কুরে খায়। কল্পনা রাজ্যে সব রঙিন স্বপ্নগুলো যেন জানালা দিয়ে পালিয়ে যায় আর জামিল সেই রাজ্যের নির্মম বাস্তবতাকে বুকে নিয়ে ধুকে ধুকে বালিশ ভিজায়। জামিলের কবি সত্তা যেন তার সাথে প্রতারণা করে। যে পিতা এত বড় সংসারের দায়ভার কাধে নিয়ে পচিঁশ টি বছর ধৈর্য ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পর্যন্ত পাঠিয়েছে সাহিত্য চর্চ্চা করে সেই পিতার ঋন কি শোধ করা সম্ভব? দুইটা বোন কলেজে আরেক ভাই ভার্সিটিতে, পিতা আর কত দিবে? পিতার এই অপরিসীম কষ্টের টাকা খরচ করতে জামিলের বুকটা যেন হু হু করে ওঠে। সুতরাং পিতার এই বার্ধক্যে যদি দু’ দন্ড শান্তি দিতে না পারে তাহলে কিসের কবিতা টবিতা? দেশে একজন জামিল না লিখলেই বা কি? কত কবি যে অকালে ল্যাঙ মেরে বসে। দেশে তো আর কবির অভাব নেই। কাকের মতো কবি। অগণিত কবি।
‘কাকের মতো কবি’ কথাটা ভাবতে জামিলের কেমন জানি বিশ্রি লাগে, খটকা লাগে। বন্ধুদের কেউ যখন কথাটা তাচ্ছিল্য ভরে উচ্চারণ করতো তখন তার হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠতো। ঘৃনায় তার পিত্তটা সংকুচিত হতো। কারণ সে তো কবি উপজাতির অর্ন্তভূক্ত কিন্তু আজ জামিলেরও কষ্ট হলো না, খুব সহজে বলা হয়ে গেল।
৪
রাত সাড়ে দশটা জামিল সজীবের কম্পিউটারে এম এস ওয়ার্ড প্র্যাকটিস করেছিল। সাত জনের মিলের মধ্যে ফারুক ভুল করে ছয়জনের মিল দিয়েছে। তাই খালাও ছয় জনেরই মিল রান্না করে চলে গেছে। কিছুক্ষণ হলো জামিলের পাকস্থলিটা মোচড় দিয়ে উঠল কিছুই করার নেই মেসের লাস্টম্যান আর্গুমেন্ট পড়েছে সে। সুতরাং রান্না করে খেতে হবে। জামিল বাটন চাপতে থাকে। এমন সময় খালার কন্ঠ স্বর শোনা গেল, ‘কিউ বাবা গো ভাত টাত সবার অইচি? জামিল একটু খুশি হলো যাক বাবা রান্না করতে হবে না, খালা আবার এসে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি অলার সাথে ছাত্রদের বাড়াবাড়ি হলো। ইদানিং ছেলেদের সাথে গ্যানজাম করা বাড়ি অলার রুটিন হয়ে দাড়িয়েছে। প্রথম প্রথম জামিল বের হতো। দুই পক্ষের তর্ক বিতর্ক শুনতো। কখনো কখনো মধ্যস্থতা করতো কিন্তু এখন এগুলো আর ভালো লাগেনা। জামিল রাসেলের রুম থেকে বের হয়ে ডাইনিং রুমে তিন মহিলাকে দেখতে পেল। শকুনির মা ও লাইজুর মা। জামিল বুয়াকে খালা বলে ডাকে। জামিল জানতো এত রাতে খালা নিশ্চয় টাকার জন্য এসেছে। জামিল কে দেখা মাত্রই খালা বলতে শুরু করলো, ‘বাবা গো তোমাগো এখানে তো আমি কাজ করি। তোমাগো টাকা নিয়া সংসার চালাই। আল্লাহ কখনো তো ঠেহাই রাখে নাই। আজকেও রাখবে না- আমি জানি। কি কিস্ত যে নিছি বাবা এক্কেবারে শেষ হইয়া গেছি। তাই কালকেই কিস্তর মানুষ আইব। তাই আমার তিনশো টেকা যে লাগবে বাবা।’ কি যে চমৎকার উপস্থাপনা বা ; জামিল মনে মনে ভাবে কিন্তু তার মধে কি যেন একটা দাউ দাউ করে জলে উঠে। কারণ এর আগেও এই একই উপস্থাপনা আরও তিন বার করতে হয়েছে। অরণ্য রোদন হয়েই খালা জামিলের কাছে হাত পাতলো কিন্তু রুঢ় বাস্তব হলেও জামিল গদ গদ করে বলে দেয় ‘ খালা আমার অবস্থা তো জানেনই। কি আর করবো খালা? জামিল জানে একথাগুলো খালা অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে মানতে পারছেনা। আর এতেই তার বড় দু:খ। জামিল জিতু কে দেখিয়ে দেয়। খালা জিতুর জন্য তীর্থের কাকের মতো বসে থাকে । অবশেষে তাও গুড়েবালি। জিতু এই নিরক্ষর মহিলাটিকে পরম তুলে দেখায় যে, তার নাকি ফরম ফিলাপ করতে হবে। কিন্তু খালা নাছোড়বান্দা। সে বলে, বাবা আমি কালকেই দিমু, হেইখান থেইকো আমাকে তিনশো টাকা দ্যাও।’ অবশেষে জামিলের অনুরোধে জিতু টাকা দেয়। এদিকে ভাত যে চুলায় উঠিয়েছে কারও খবর নেই। পুড়ে ছাই জামিল জাল নিবিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে সিলিং এর দিকে চেয়ে থাকে। ব্যাপার না কত বেলা যে এক সময় উপোস থেকেছি সে সময়ের ছেয়ে এ সময় অনেক ভাল। জামিল নাক টানতে থাকে আর চিবুক বেয়ে দু ফোটা গরম জল গড়িয়ে যায়।
৫
বহুদিন পর জামিল বাড়ি যায়। পৌঁছামাত্র মা আচল থেকে সরবতের গেলাস বের করে দেয়। জামিল গেলাসটি হাতে ধরে। মা পাখা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর এক চুমুকেই গেলাসটি খালি করে দেয়। এমন সময় জেবা-মুক্তা এসে হাজির। জামিল লজ্জাবোধ করে। নিজেকে সে অপরাধী মনে করে। জেবা খালি গেলাসটা নড়াচড়া করতে থাকে। সে গেলাসের তলায় চোখ রাখে জামিল মায়ের কথা ভাবে, ‘মা কি তাহলে এই অবুজ শিশুদের ফাঁকি দিয়েই এক গেলাস শরবতের আয়োজন করেছিল? আহা মা তোমার কাছে এই দুই পিচ্ছির চেয়ে আজও আমি শিশুপুত্র।’ জামিলের মনটা হাসে। সেই হাসি শুকনো কাঠের শক্ত। সেই হাসি দাঁতের গোড়ালি পর্যন্ত এসে থামে। এই হাসি কে ঠোঁট ফেটে বের করার জন্য পৃথিবীর কোন স্থানকে জামিলের উপযুক্ত মনে হচ্ছে না। অবশেষে সেই কষ্টের বাতাসগুলো জলজ শুশুকের প্রশ্বাসের মতোা জামিলের মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়। এমন সময় মসজিদে এশার নামাজ শেষ করে ঘরে ঢুকে জামিলের পিতা। জামিল একটু নড়েচড়ে বসে। জামিল সালাম দেয়। সালামের উত্তর দিয়ে চৌ-খাটের সামনের চেয়ারে মুখোমুখি হয়ে বসে পিতা। জামিল কুশল বিনিময় করে।
- কেমন আছেন বাবা?
- আছি বাবা, আছি...
পিতা চোখ দুটো নিচের দিকে দেয়। জবাবটা দিতে কেমন জানি তার ভিতর খচ খচ করে উঠল। সাত সন্তানকে মানুষ করতে যার সারাটা জীবন দুঃখের সাথে পার হয়ে গেল সেই মানুষটা আর কেমন থাকবেন? এই প্রশ্নের উত্তর বিনিময়ে কি পরিমাণ কষ্ট হবে তা জামিল আগে থেকেই জানতো। তারপরও এ যে প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। পিতা কিছুক্ষণ নিরব থাকে। তারপর হাতে কপালটা চুলকায়। সাদা টুপিটা তালুর দিকে সরে গিয়ে পক্ষীর ঝুটির মতো বেশ ধারণ করে। ভাঙ্গা হাটুর উপর একহাত রেখে অন্য হাতে আধা পাকা ধূসর দাড়িতে হাত বুলায়ে আলতো ভাবে সোজা নিচের দিকে বাঁকা করে নামিয়ে দেয়। জল টলমল কালো চোখে ডানা ভাঙ্গা হুদহুদ পাখির মতো জামিলের দিকে কিছুক্ষণ নিথর দৃষ্টি নিবদ্ধ করার পর বলল, ‘আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে আমি খেটে যাব, বাবা তোরা পরিবারের জন্য চিন্তা করিসনে।’
তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়ার অভ্যাস জামিলের নেই। কিন্তু রাতে সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায়। অনন্যোপায় হয়ে জামিল ঘুমিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই পিতার গুঙানি শুরু হল। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাত্রে তার পেশিগুলো চাপড়াতে থাকে। সারা শরীরের অস্থিসন্ধিগুলোতে বিষ ছড়াতে থাকে। বিষ বেদনায় কাতঁরাতে কাঁতরাতে কখনো চিৎকার দিয়ে উঠে। তারপর আবার ছন্দে ছন্দে নাক ডাকতে ডাকতে ঘুমিয়ে যায়। পিতার যন্ত্রণায় জামিলের দুঃখ আরো বেড়ে যায়। তার আর কিছুতেই ঘুম আসেনা। সে এপাশ ওপাশ করে। রাজ্যের সকল দ্ঃুখ যেন তাকে গ্রাস করে। তার মাথায় জ্যাম লেগে যায়। এ জ্যাম সহজে ছাড়ে না। মগজের স্বায়ুগুলোতে কি যেন কিলবিল কিলবিল করে। কাঠ ঠুকুরার মতো মগজে যেন কুট্ কুট্ কুত্ কুত্ কুট দিতে থাকে। তারপরও জামিল জোর করে ঘুমাতে চেষ্টা করে। সে পা’ দুটো সোজা করে দিয়ে জোরে জোরে দম নেয় আর ছাড়ে। চোখের পাতা দুটো এমনভাবে মুদে যেন শৈশবের কোন খেলার সাথি এসে কপালে মৃদো টোকা মেরে চলে যাবে।
সকালে উঠেই জামিল ব্যাগ ঠ্যাগ গুছিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এর মধ্যে মা’ ঘরে ঢুকে। তারপর জিজ্ঞেস করে
- কিরে তুই চলে যাচ্ছিস?
- হ্যাঁ মা ।
- এত তাড়াতাড়ি কেন যাবি?
কাজ আছে মা।
- তাহলে আসছিস কি জন্য যাচ্ছিসও কি জন্য?
তারপর মায়ের অভিমানি কন্ঠ বকে যাচ্ছে, - ‘তোরা তো মেহমান। ছয়মাসে-নয়মাসে একবার আসবি তারপর চলে যাবি। আমাদের সুখ দুঃখের কেউ কি ভাগি হবি? ঘরের মধ্যে দিয়ে আল্লাহ দেখা যায়। ঘরটাও বাধা হলো না। মেয়েটারও বিয়ে দেওয়া হল না। ছেলেটারও বয়স চলে যাচ্ছে-তোরা কি সারা জীবন পড়ে পড়ে থাকবি ?’ নিরব নিস্তব্দ, বিশালতর গ্রামীন জীবনের এই প্রানস্পন্দনের মধ্যে কিছুক্ষণ নিরবতার বিশালতা নেমে আসল। জামিলে ডান কাধে ব্যাগ আর বাম হাতে কয়েকটা বই। মা’ জামিলের দিকে চেয়ে আছে আর জামিল নিচের দিকে চেয়ে আছে। জামিলে চোখ দিয়ে কয়েক বিন্দু জল টপ টপ করে মাটিতে পড়ে শুকিয়ে যায়। মাও আচল দিয়ে চোখ মুছে। তারপর মাকে সালাম করে জামিল। বাবা নেই। বাবা মাঠে। পাড়ার মসজিদের ইমাম সাহেবের বেতনের চাঁদা দিতে না পারায় কিছু পাথর পাথর বাধাই করে দিচ্ছেন। যুগযুগ ধরে অদৃষ্টকে বিশ্বাসের পাথরে যেভাবে বাধাই করে যাচ্ছেন।
সহকারী শিক্ষক
ইউসেপ-সি এফ এস ডি
মোবাইল:০১১৯০২২০৭০০
ই-মেইল: ফযঁশশর@মসধরষ.পড়স
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ১:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


