“এই এই ফুলগুলি মাড়াইসনে! জানিস,ফুলগুলি মাড়িয়ে যখন সবাই চলে যায় তখন আমার খুব কষ্ট হয়,মনে হয় যেন তারা আমার বুকের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। ”প্রতিদিন খুব ভোরে সে উঠত। তারপর র্ফাস্ট ট্রেনে একেবারে ক্যাম্পাসের জারুল তলায়। বুদ্ধিজীবী চত্তরে জারুল গাছের বিশাল চাদোয়া। জারুফোটা দিনে এই চত্তর যেন কোমল পুষ্পশয্যা। সারারাত ধরে শিশির সমেত যে ফুলগুলি টিপ্ টিপ্ করে ঝরে পড়তো তা সকালেও শেষ হতো না। ভোরের পাখি বেলি কেউ মাড়ানোর আগেই সেই অপরুপ দৃশ্য লুপে নিতে সেখানে গিয়ে হাজির হতো। তারপর কাঁধে বেগ ঝুলিয়ে গোলাপি চাদরটা জড়িয়ে আমার জন্য অধীর প্রতীক্ষা। সেকেন্ড ট্রেন পৌঁছলে আমরা একসাথে চাকসুতে নাস্তা সেরে ক্লাসে যেতাম। সাহিত্য আড্ডার সূত্র ধরে বেলির সাথে আমার প্রথম পরিচয়। তরুন কবি হিসেবে তখন কবিতার প্রতি ছিল আমার টান টান উত্তেজনা। ল্যাটিন সাহিত্য নিয়ে আমরা সবসময়আড্ডায় বসতাম। প্রথমবর্ষ থেকেই বোদলেয়ার বোর্হেস জন দেরিদা নিয়ে বেলির আগ্রহ ছিল উত্তুঙ্গে। তাছাড়া সে ছিল সাহিত্যের ছাত্রী।
থার্ড ইয়ারে কির্য়েকেগাদ নীটশে র্সাত্রে ইত্যাদি অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের নিয়ে সে কি তুমুল বিতর্ক। ক্যাম্পাসে কখন যে সন্ধ্যা নামতো টেরই পেতাম না। বেলি কে আমি সবসময় উৎসাহ দিতাম। বেশিভাগ ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস ত্যাগের সময় তার ইচ্ছাকে প্রধান্য দিতাম। বেলির যেদিন প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল সেদিন তার কি উত্তেজনা। রাতে সে ঘুমাতে পারে নি। সকালে আমি তাকে জীবনান্দ সমগ্র দিয়ে অভিনন্দন জােিনয়েছি লাম। বেলির সাথে সবচে মজার স্মৃতি হচ্ছে-মাঝে মাঝে সে হঠাৎ আড্ডার ফাঁকে সে আমার বুক পকেটে হাত ঢুকিয়ে আমাকে চমকিয়ে দিত। তারপর আমি যে কবিতাগুলো তাকে না দেখাইতে চাইতাম সেগুলিসে জোরে পাঠ করতো আর মজা করতো। আর তার কবিতাতো প্রথমে আমাকে পড়তেই হবে। এভাবে আমরা এতই কাছকাছি চলে এসেছি যে বেলির যেমন আমাকে ছাড়া চলেনা তেমনি আমারও বেলিকে ছাড়া চলেনা। সকালেই উঠেই বেলির সাথে দেখা তারপর সারাদিন কাটিয়ে বাসায় ফেরা। কবিতা,গান, নাটক,আড্ডা,বিতর্ক,শিল্পকলা,ডিসিহিল,থিয়েটার ইত্যাদিতে আমরা একেবারেই মজে গেলাম। ফিরতে দেরি হলে মাঝে মাঝে বেলির মা নিজেই চলে আসতো। জীবনান্দ ছিল আমাদের দুজনেরই খুব প্রিয়। আকাশলীনা, বনলতা সেন, আটবছর একদিন পরে আর সোনালী কাবিনের সনেটগুচ্ছ সে রাত জেগে মোবাইলে শুনাতো। তাকে এগুলো মাদকের মতো টানতো। চন্দ্রমল্লিকা ছিল তার সবচে প্রিয়। আমি বর্ষায় ফোটা কদম ফুলসহ তাকে সব সিজনাল ফুলগুলি দিতাম। কিন্তু চন্দ্রমল্লিকা দেয়ার মতো সে খুশি হতো না। একদিন বোটানিকেল গার্ডেন থেকে চন্দ্রমল্লিকা চুরি করতে গিয়ে চারশ এক টাকা জরি মানা দিতে হয়েছিল। কিন্তু একথা কোনদিন তাকে বলিনি। কারণ সে আমাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসতো। আমি কোনদিন তাকে কষ্ট দিতে চাইনি। মাঝে মাঝে বেলি আমার জন্য বাসা থেকে বিভিন্ন ধরণের পিঠা তৈরি করে নিয়ে আসতো। সেদিন সকাল থেকেই বেলিকে খুব হাশি খুশি দেখাচ্ছিল। খুব ইয়ার্কি করছিল সে। হঠাৎ সে ফাস্ট ট্রেনে যাওয়ার জন্য জেদ ধরল। যুক্তি ছিল সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা তাই থাকলে সময় নষ্ট হবে। আমি আর জোর করলাম না। অনার্সের সার্টিফিকেট তোলার জন্য চলে গেলাম। আমর মনে কেমন জানি কু ডাকতে লাগল। আমি সময় নষ্ট করলাম না। দ্রুত কদম ফেলেই কাটাপাহাড় দিয়ে স্টশনে এসে দেখি বিশাল লোকের কুন্ডলি। ভিড় টেলেই দেখি আমার বেলি।“তাড়াড়ি উঠতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ছে!”
শুধু রক্তেরঞ্জিত বেলির মুখের দিকে একবার তাকালাম। তারপর আমি সেন্সলেস হয়ে গেলাম। আমার স্বপ্নের কবি, আমার স্বপ্নের চন্দ্রমল্লিকা বেলুমণি সেদিন সবাইকে ছেড়ে চলে গেল। যে ট্রেনে করে সকাল সকাল ক্যাম্পাসে চলে আসতো সেই ট্রেনই তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্নকে ভেঙ্গে চুরমারে করে দিল । ক্ষমা করো বেলু আমি তোমাকে বাঁচাতে পারিনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


