somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

পান্থজন জাহাঙ্গীর
আমি পান্থজন জাহাঙ্গীর নিতান্তই শাদা মনের মানুষ। যার কারণেই প্রথম দর্শনে যে কাউকে আপন করে নিতে চায় মন। এই জন্য মানুষ সহজেই আঘাত দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে আমি বিবাহিত। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। দর্শণ নিয়ে অধ্যয়ন করলেও আমি সাহিত্যের একজন সমঝদার মানুষ। শিক্ষকতার পাশ

ত্রিখন্ডিত

১৪ ই মে, ২০১১ রাত ৯:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভর দুপুরে হঠাৎ বেটকার চায়ের দোকান জমে ওঠল। জেলে পাড়ার ধীমান দাস মাঝ বয়সী, সাদাসিধে নিরস লোক। শীত বর্ষায় একখানা ধুতি ও গলায় সনাতন কাষ্ট নির্মিত প্ুঁতির মালা ছাড়া আর কোন বস্ত্র গায়ে জড়াত না। আধাপাকা ঝাঁকড়াচুল,পেছনে দুমড়ানো, কর্কশ কণ্ঠস্বর, বয়সের অনুপাতে চোখ কোটরে বসে গেছে, কপাল সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকালো, তীক্ষ্ম দৃষ্টি, লম্বা চেহারা, যেন এক ধূসর বাজ পাখি প্রত্যাশিত শিকারে ব্যর্থ হয়ে বসে আছে।
উদোম গায়ে দোকানের এক কোনে বসে ধীমান দুপুরের ঘুমের অবশিষ্ট ক্লান্তিটুকু চায়ের কাপে ও আকিজ বিড়ির ধূমে উড়িয়ে দিয়ে চলমান বিতর্কে যোগ দিলেন। তিনি বললেন, ‘ক্রসফায়ার দিচে।’ উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠল। তারপর একজন বলে উঠল, ‘দিনের বেলায় ক্রসফায়ার দ্যায় নাকি?’। লজ্জায় ধীমানের মুখমন্ডল বিবর্ণ হয়ে গেল। অনেকের অনেক কথা রচে কিন্তু ধীমানের একটি কথাও রচে না। ধীরে ধীরে ধীমানের বিড়ির টান সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে।

অত্যন্ত গোপন রহস্যময় এই খুনের ঘটনায় কেউ বলল, রফিক নির্দোষ, আবার কেউ বলল রফিক দোষী। নির্দোষ বলার পক্ষে সংখ্যা গরিষ্ট। দোষী বলার পক্ষে অনেক যুক্তির মধ্যে একটি যুক্তি ছিল, ‘হোগলা বনে তো সাবের ড্রাইভার, নজীর মাঝী ও ফরিদ মিয়াও লুকিয়েছিল, তাদের তো গ্রেপ্তার করে নি। রফিককে কেন গ্রেপ্তার করল?’ নিশ্চয় অস্ত্রটি তার কাছে পাওয়া গিয়েছিল। নির্দোষ প্রমাণ করার পক্ষে যাদের অকাট্য যুক্তি ছিল তাদের একটি হলো, ‘অস্ত্রটি তো আর হাতে পাওয়া যায় নি।’ এটি পাওয়া গিয়েছিল সে যে স্থানে লুকিয়েছিল তার থেকে হাত দশেক দূরে। বেটকা সওদাগর সহজ-সরল, নম্্র-ভদ্র লোক। সরল বিশ্বাস ও উদারতার জন্য তিনি মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত। তারও একটি যুক্তি ছিল, ‘অস্ত্রটি কি রফিকের হাতে পাওয়া গিয়েছিল না লুকানো স্থান থেকে দুরে পাওয়া গিয়েছিল তার প্রামাণিক তথ্য একমাত্র পুলিশই দিতে পারবে।’ কারণ পুলিশ দাওয়া দিয়েছিল আর মানুষ পালাচ্ছিল। বেটকা সওদাগরের এমন মিমাংসিত, সরল, সুবোধ্য যু্িক্ত শুনে সবার কন্ঠস্বর একটু নমনীয় হল। কেউ কেউ প্রীতও হল। তবে জনগণের আদালত রফিক কে যতই নির্দোষ প্রমাণ করুক না কেন, আইনের আদালতে রফিক ঠিকই দোষী সাব্যস্ত হল।



কোর্ট-কাছারি, আইন-আদালত সম্পর্কে রফিকদের কোন অভিজ্ঞতা নেই। কারণ তাদের কোন এগুলোর কখনো দরকার পড়েনি। তাদের পরিবার ছিল নির্মল, নিষ্কণ্টক। তাই রফিকের শাস্তি খবর তার মায়ের কাছে বড়ই নির্মম ঠেকল। প্রকৃতির আড়মোড়া ভেঙ্গে তার মধ্যে যেন একটি ভয়ংকর কালবৈশাখী বয়ে গেল। যার তান্ডবে তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন যেন নিমিষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল। ছেলের দন্ডের খবর তার হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে সেই ক্ষতে চিতার আগুন যেন দগদগ করে জলে ওঠল।

জজ সাহেবের বিচারে যাবত জীবন কারাদন্ড হওয়ার পর হাতকড়া পরিহিত রফিককে পুলিশের ভেন কারাগারে পৌঁছিয়ে দিল। কারা পুলিশ তাকে তার নির্দিষ্ট কক্ষে প্রবেশ করিয়ে দেয়ার পর কয়েক জন কয়েদি এসে তাকে বেদড়ক পিটিয়ে দিল। আচ্ছামত কিল ঘুষি ও বেতানোর পর একজন বলল, ‘ ঠিক আছে ?’ এরফান সিকদার বলল, ‘ ঠিক আছে।’

জন্মের পর থেকে রফিকের মা তার ছেলে কে একটা ফুল কাঠিরও বারি দেয় নি । যাবত জীবন সশ্রম কারা দন্ড হওয়ার পর রফিক ভেবেছিল তাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যতœ কারাগারে থাকতে হবে আর শ্রম দিয়ে খেতে হবে। কিন্তু কারা প্রকোষ্টে ঢোকার পর এমন অসৎ আচরণ, পাপিষ্টের শিকার হতে হবে তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। অথচ যুগ যুগ ধরে এই পাপাতœারা এমন দুরারোগ্য কুমতলবে ভূগে জীবীকা নির্বাহ করছে। রফিকের চোখ দুটো অন্ধকার দেখছে, মাথাটা বোঁ বোঁ করছে। পৃথিবীর সবকিছু যেন নিরস ঠেকছে। কোন কিছু সে বুঝে উঠতে পারছে না। খেয়েছে কি খায়নি তাও স্মরণ নেই। জেলখানার প্রথম রাতটা তার এভাবেই কাটল ।

পরের সপ্তাহে রফিকের মা ও তার দুই বোন জেলখানায় দেখতে আসল। এমন নির্মল নিদাগী ছেলেকে জেলখানার কোটরে দেখে মায়ের আবেগ উপচে পড়ল। যে ছেলের মধ্যে কখনো একটি পিপীলিকার প্রতিও জিঘাংসা বোধ দেখেনি সেই ছেলে আজ খুনের দায়ে দন্ডিত। মায়ের দুই চোখে যেন শ্রাবনের ঢল নেমে যায়। জেলখনা থেকে মা বিদায় নেওয়ার পর মাথার ওপর হাটু গুজে রফিক ভাবতে লাগল। সবকিছু যেন তার ওলট পালোট হয়ে গেল । এমন সময় কারারক্ষী এসে একটি পুটলি থেকে এক পেকেট চানাচুর, এক পেকেট মুড়ি ও এক পেকেট বেনসন সিগারেট বের করে দিল। তারপর তার কানের কাছে গিয়ে বলল, এরা পুরানো পাপী । এদের একটু সমীহ করতে হয় । এরফান সিকদার দ্বিতীয় দফা শাস্তি ভোগ করতেছে। বয়স ষাটোর্ধ। মুখে চাপ দাড়ি। বিভিন্ন রাষ্ট্রিয়ও ধর্মীয় উৎসবে জেলখানায় সেমাই, সিন্নি ও মাংস রান্নার ক্ষেত্রে তার জুড়ি নেই। তাছাড়া জেলখানায় কয়েদি ও হাজতিদের জন্য প্রতিদিনকার রন্ধনের পাত্র তাড়াতাড়ি নামার ক্ষেত্রেও তিনি খ্যাতির শীর্ষে। তাই উর্ধ্বতন অফিসারদের সাথে তার একটু ভাবসাব বেশি। নতুন হাজতি ও কয়েদিদের মাঝে মাঝে মনে হয় এই পুরো জেলখানাটাই সংগঠিত পুরানো পাপীদের। মতলব মুন্না , ট্যারা আনোয়ার এবং এরফান সিকদার সহ বেনসনের পেকেট খানা ছুঁ মেরে নিয়ে ভাগ করে নিল। রফিক পুরানো পাপী নামটা আগেই শুনেছে, কিন্তু তাদের কর্মকান্ডের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তার নেই। তবে আজ নতুন পাঠ নিল। সেই পাঠে মার আছে, ব্যথা আছে, আছে বিড়ম্বনা



রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একটি ঘটনা একটি কৌতূহল তাকে যে জীবনের এতদুরে নিয়ে আসবে তা সে কখনো ভাবেনি। কিন্তু ওসি মাসুদ মিয়া তার এস.আই সহ সকল কনেষ্টবলদের বন্দুক ও গুলির বেল্ট পরীক্ষা করল। তার ফোর্সদের কোনো দোষ ত্রুটি খুঁজে পায়নি। তাই পুলিশের সমীক্ষণে সে খুনী। কিন্তু অধিকাংশ গ্রামবাসীদের মতে এ যেন অন্ধ রাখাল কে গরু চুরির জন্য অভিযুক্ত করার মতো। কারণ তার কাছে অস্ত্র থাকার তো দুরের কথা সে এ রকম অস্ত্র কখনো পুলিশের কাছে ও দেখেনি ।

নদীর জল থেকে ডলফিনের মত প্রায় আড়াই হাত লাফিয়ে উঠছিল সে। গুলিটা ঠিক বুকের মাঝখানেই বিধেছিল। নদীল জলে রক্ত মিশে একাকার হয়ে রক্তজল স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। অন্য দশজনের মতো রফিকও দাঁড়িয়ে দেখছিল।

দুইপাশে বিস্তৃত সবুজ গ্রাম। নদীর উভয় পাশে পলি বিধৌত বিরাট চর। চরের ফসলি জমিতে কৃষকরা কর্মে ব্যস্ত । গরু-মহিষের পাল ছেড়ে দিয়ে রাখালরা প্রতিদিনের অভ্যস্ত মাছ ধরা, ঘাস কাটা ইত্যাদি কাজে মগ্ন । দক্ষিণ পারের শুকনো চরের বুকের ওপর দিয়ে থানা সদর থেকে চলে আসা শহর সংযোগ সড়ক কাচা রাস্তায় বসানো ইটগুলো কোথাও কোথাও উঠে গেছে ধুলিময় এমন সড়কের আশে পাশে ক্ষেত-খামারের লোকজন ছাড়া দুরের যাত্রায় বের হওয়া মানুষজন স্বভাবতই হাটেঁ না। গাড়িই তাদের একমাত্রই অবলম্বন। এই সড়ক নদীর যেখানে এসে মিলেছে সেই নদীঘাটই ফেরি ঘাট বলে পরিচিত। দক্ষিণ পার থেকে ফেরি এক খ্যাপ নিয়ে যে উত্তর পারে গেছে আসার আর সুযোগ হয়নি। তাই দক্ষিণ পারে যানবাহনের দীর্ঘ সারি স্থির হয়ে আছে । শহরে পৌছার জন্য লোকজনের অধীর প্রতীক্ষা । নদীর দক্ষিণ ঘাটে বেশ কয়েকটি চায়ের দোকান, ফল ফলাদির দোকান, পান বিড়ির দোকান। টেক্রিঅলা, রিক্শাঅলা ও ঘাটের অন্যান্য পেশার লোকজনদের জন্য দোকানগুলো সবসময় থাকে সরগরম । যাত্রীদের আর তর সইতেছে না। তাই কেউ কেউ গাড়ি থেকে নেমে চা ও পান বিড়িতে টান দিচ্ছে আবার কেউ কেউ শ্যালো ইনজিন চালিত বোট মারফত দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে ওপারে চলে যাচ্ছে। আকাশের সূর্য দক্ষিণ দিকে একটু হেলে পড়েছে। তারপরেও ফেরি ঘাটের কর্মচাঞ্চল্য এতটুকু কমেনি। হঠাৎ একটা সোরগোল শুনা গেল। তারপর একটা ভয়ংকর আর্তনাদ সমস্ত ঘাট প্রকম্পিত করে দিল । মুহূর্তের মধ্যে লোকজনের ছুটাছুটি বেড়ে গেল। চরে জলচর পাখির ঝাঁক উড়াউড়ি শুরু করে দিল। কিছু একেবারেই উড়ে গেল আর কিছু কয়েক পাক উড়ে কিছুদূর গিয়ে আবার মাটিতে পা’ রাখল। গরু বাচুরের দল লেজ তুলে ইতস্ত চুটাছুটি করার পর মায়ের পাশে গিয়ে স্থির
দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। গ্রীস্মের উত্তপ্ত রোদ থেকে পরিত্রাণ জন্য যে মহিষগুলো নদীতে গা ডুবিয়ে নাক উচিয়ে আসমানের দিকে তাকিয়েছিল সে গুলোও চরে উঠে আসল।



দিন দুপুরে এমন একটি খুনের ঘটনা ঘাট ঘরের ব্যস্ততা আরো বাড়িয়ে দিল। ঘাট ঘরের সব দোকানি, রিক্শাঅলা, টেক্্িরঅলা, ছেলে-বুড়ো সবাই ভিড় জমাল। দুই তীরের গ্রামবাসীদের মধ্যেও এই ঘটনা বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করল। নদীর অপর পারের ঘরের বৌ-ঝি সবাই বের হয়ে নদীর কিনারায় এসে দেখছিল।

জেলে পাড়ার নগর বাশিঁ জলদাস অনতি দুরেই নৌকা থেকে জাল ফেলে মাছ ধরছিল। প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী আজও জাল ফেলতে তার ঘন্টা খানিক সময় লেগেছে। চৌদ্দ পুরুষের জেলে পেশার অজ্ঞিতা অনুযায়ী জালে মাছ আটকাতে ন্যূনতম ঘন্টা দু’য়েক সময়ের দরকার। কিন্তু দুই পারে লোকজনের এমন ছুটাছুটি, সমাগম, নানা জনের নানা হাঁক-ডাক লক্ষ্য করে নদীর মাঝখানে নৌকা জাল নিয়ে পড়ে থাকতে তার আর ইচ্ছা হলো না। সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পেরে সে একবার জাল নদী থেকে নৌকায় ওঠায় আবার নৌকা থেকে নদীতে ফেলে । অবশেষে আতœচিৎকার ও কান্নার বিলাপ যখন বেড়ে গেল তখন অতি সত্তর জাল গুটিয়ে কৃষ্ণকায় ছিপছিপে নাগর বাশিঁ বৈঠা মেরে তীরে চলে আসল। যে নদীতে সে ধরে মাছ সে নদীতে মানুষের লাশ। তাই রাত্রি বেলার দুুুমুটো অন্নের যোগান দিতে পারবে না জেনেও সে কাজের ইতি টেনে জন সমাগমে মিশে গেল ।

অনুশ্রী বৈদ্যের স্বামী সুবির বৈদ্য। প্রতিদিন বাথরুমে ঢুকে দু’একটি কাজ একত্রে না করে বের হতো না। যেমন একদিকে ইয়ের কাজ সারবে অন্য দিকে পানির ট্যাপ খুলে দিবে । সাঁ সাঁ করে জল পড়ে যখন বদনা পূর্ণ হয়ে উপচে পড়ে ধীরে ধীরে গন্ধ কমবে ; তার পর শুরু করবে জলের রসায়ন। বদনার জলে তর্জনী ভিজিয়ে দেয়ালে প্রতীক, সংকেত, যোজনী লিখে চর্চার চিরচারিত অভ্যাস শুরুু করে দিবে। মিসেস বৈদ্য ভাত পানি রেডি করে তার আগমনের আশায় তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতো। গোসল ইয়ে ইত্যাদি কাজের ক্ষেত্রে এাই বেহুদা অভ্যাসে বিরক্ত হয়ে যেন মিসেস বৈদ্য গলা চ্যাচিয়ে চিৎকার করতো তখন তার স্বামীর জল রসায়নের শেষ হতো। অথচ আজ তিনি কয়েক মিনিটের মধ্যেই বের হয়ে আসলেন। কারন গোল মাল হট্টগোল বাথরূমে তার কানে এলোমেলোভাবে ধ্বনিত হচ্ছিল

আশি উর্ধ্ব কালা ফুতুর মা। । নিজের ঘাটা অতিক্রম করে অনেক দুরে চলে আসল। তারপর তার নাতি কে ডাকতে লাগল আর হাঁপাতে লাগল । পুরনো আমলের মানুষ-কালা ফুতুর মা। চিনা বাদামের মতো ডিজাইন করা গলায় ঝুলানো প্রায় আধা ডজন তাবিজ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সাক্ষী বহন করছে। ফুতুর মা খুন খারাবি কে ভীষণ ভয় পেলেও কথায় ঠনঠন। পাড়ার ইছড়ে পাকা ছেলের দল কুটনি বলে ক্ষেপায়। কখনো রাগে গজ গজ করে ট্যাং করে হাতের লাঠি টি নিক্ষেপ করতো। কিন্তু আজ ছেলে গুলো তার দিকে তাকাচ্ছেও না। দুইহাতে লাঠিতে ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে তিনিও সকৌতুহলে ঘাটঘরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ তার নাতি খুন দেখতে পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের দলে যোগ দিয়েছে।



পুলিশের দুই কনেস্টবল পুরানো আমলের সেই থ্রি নট থ্রি রাইফেলদ্বয় এস আই জসিমের হাতে দিয়ে পায়ের বুট যুগল খুলে নদীতে নেমে পাজা কুলা করে লাশটি তুলে নিল। সুঠাম দেহ । পেরে উঠতে পারছিলনা । কোন রকম এনে দোকানের সামনে উপ্তত মাটির ওপর রাখল। লাশটি ঘাটঘরের দোকানি ছেরাজুলের। দোকনদারি ছাড়াও তার যে আরেকটি ভীতিকর পেশা ছিল তা স্থানীয় লোকজনের অজানা নয়। তবু সহজ সরল এই মানুষ গুলো অহেতুক এই জটিল মারপ্যাচে জড়িত হতে চাইতো না। ঘন্টাখানিক পর থানা থেকে আরেক প্লাটুন পুলিশ এসে নামল। কৌতূহল উদ্দীপ্ত জনতাকে পেছনে সরিয়ে ওসি সাহেব একপলক দেখে লাশ তুলতে আদেশ দিল । লাশ জিপে তুলার সাথে সাথে গাড়ি র্স্টাট দিল। উপস্থিত জনতাদের মধ্যে কেউ কেউ মূর্ছিত ছেরাজুলের মাকে সরিয়ে নিল।

পুলিশ লাশ নিয়ে থানার অভি মুখে রওয়ানা হওয়ার পর কয়েকজন অটো রিক্শাচালক ছেরাজুলের দোকানে বসে গল্প জুড়ে দিল। একজন বলল, ‘বহুদিন খাইছে শালারা।’ অন্য জন মাথা নাড়ল।

কয়েকটি পুরানো হাই বেঞ্চ তার উপরে কয়েকটি জগও টিনের গেলাস সাজানো রয়েছে। জগের তলায় আয়রনের হলুদাভ দাগ দেখা যাচ্ছে। ক্যাশের পাশের টেবিলে একখানা ছোলার তাল ও তাতে কিছু অবিক্রিত ছোলা। তার পাশে একটি মুড়ির টিন। দোকানের। অপর অংশে একটি তাক রয়েছে। এখানে মাল পত্র রাখা হয়। পূর্ব দিকে বেড়ার পাশে একটি উইয়ের ঢিঁবি। কাস্টমাররা পানি ফেলে বিধায় তা স্যাঁত স্যাঁতে অবস্থা বিরাজ করছে। এমন সময় অটো রিক্শাচালক হারুন মিয়া পেসেঞ্জার নামিয়ে দোকানে ঢুকল এবং বলল, ‘ছেরাজুল

একটা চা দে।’ পাশের টেবিলে আলাপরতদের একজন বলল, ‘ছেরাজুল তো নেই ছেরাজুলের লাশও নেই।’ হারুন মিয়ার মাথায় যেন বাজ পড়ল।
কি কস? ছেরাজুলের কি অইচে?
-ছেরাজুলকে পুলিশের লোাক দাবাড় দিইছিল। পুলিশের হাত হইতি পালাতে গিইয়েই বিলের মধ্যি দিয়ে দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিইছিল। পুলিশের সবাই বন্দুক তাক কইরছিল এবং স্যালেন্ডার কইরতে বইলছিল। ও আত তুইলা স্যালেন্ডার ও কইরছিল। কিন্তু হঠাৎ কোথা থিক্যে তাকে ফায়ার কইরে দিল। তখন আমরা সবাই পালাতে থাইকল্যাম।
-কিডা গুলি কইরলো?
-ইডাই তো বড় রহস্যো। পুলিশের লোক কিছুক্ষন ভ্যবাচ্যাকা হইয়া একে অপরের মুখের দিকে চাইয়্যা রইছিল। আর আমরা তো পলাই ছিলাম।
-তারপর?
-তারপর পুলিশ আবার দাবাড় দিছিল। পাশের হোগলা বনে থেইক্যা রফিককে ধইরা আনলো। তার পাশে নাকি একটা অস্ত্র পাইছিল।
-কিন্তু রফিক তো ভাল পোলা ?
-আমরাতো হেইডাই কইতেছি।
-মাইনু কোথায়?
-মাইনুকে ঘটনার আগই দেইখছিলাম। এখন আর তো দ্যাখতাছিনা।

ছেরাজুল ও মাইনুর সাথে হারুন মিয়ার ভাবসাব ঘাট ঘরের অন্য চালকদের চাইতে একটু বেশি ছিল। ভাবসাবের বড় কারন হচ্ছে গল্প গুজব আড্ডা আলাপে এই দুই জনের সাথে হারুন মিয়ার কখনো বচসা হতো না। যে কোন ব্যাপারে উভয়েই বিনা বাহাসে পরস্পরে প্রতি সাই দিত। মাঝেমধ্যে উমর ড্রাইভারের কাছ থেকে ছেরাজুল চা নাস্তার ও টাকা নিত না। ছোট বউ নিয়ে পৃথক থাকলেও বড় বউয়ের ঘরের প্রবাসী ছেলেটা প্রতি মাসে হাজার দুয়েক টাকা পাঠাতো কিন্তু পর পর বেশ কয়েক মাস টাকা পাঠায়নি বিধায় অনেকটা অভিমান করে বিশ বছরের পুরানো সেই ড্রাইভারি পেশাকেই বেছে নিল। বেটে সেটে, মিষ্ট ভাষি এই লোকটি আকস্মিক খুনের ঘটনায় বড়ই বিমূঢ়। দোকানে বেঞ্চির ওপর এক পা তুলে মাইনুর আশায় বসে রইল।



বিধবা সাফিয়ার বড় ছেলে মাইনু। পরিবারের একমাত্র অধিকর্তা। সুখ-দুঃখের প্রতিটি মূহুর্তে সাফিয়া ও স্বামীর মধ্যে বনিবনা ছিল খুব। দু’জনের মিলিত সিদ্বান্তে ই সব সমস্যার সমাধান হতো। বাবার সব বৈশিষ্ট্য মাইনুর মধ্যে ও বিদ্যমান। মা ছেলের মধ্যে বোঝা পড়া খুব ভাল। মায়ের ছলা পরামর্শ ছাড়া যেন একটা কদম ফেলে না। একে বারে বাপকা বেটা। একটু আধটু পারিবারিক দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে করতে কখন যে সম্পূর্ণ পরিবারে ভারটাই তার কাধে উঠে গেছে তা সে টের পায় নি। তাই এক ছেলে ও মেয়ে কে নিয়ে সাফিয়া অনেকটা নিভার্র ছিল। কিন্তু একটি অপকর্ম তার সারা জীবনের তিল তিল করে গড়া সংসারে ভিত নড়বড় করে দিল। নিমিষেই তার সংসার পিরামিডের ধবংশ হতে যাচ্ছে দেখে তার বৈধব্য যন্ত্রণা উপচে ওঠল। অনেক দিনের সুপ্ত আগ্নেয় গিরি যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠল। সাফিয়া মেয়ে পারুলকে আলিঙ্গন করল। সে কখনো ভাবেনি এই ঘাটঘর, এই দোকান, এই ছেরাজুলের ভিটা ছেড়ে আবার তাকে পূর্বের ঠিকানা বা অন্যত্র কোথাও চলে যেতে হবে। পুত্রসম আশ্রয় দাতা ছেরাজুলের সব উপকার গুলো তার কাছে ছলনাময় ঠেকল। কারন লাইন উপড়ে সুখের ট্রেনকে লাইনচ্যুত করার মূল হোতা ছেরাজুল।


সাফিয়া হাঁটছে আর তার একমাত্র মেয়ে পারুল কে নিয়ে তার কল্পনা দানা বাঁধছে। শৈশব থেকেই মা ও ভাইয়ের ছায়ায় মেয়েটি বড় হয়েছে । গল্প আড্ডা, কেচ্ছা কাহিনী, মারামারি, রাগারাগি, ইত্যাদিতে বাবার শূন্যতা টা কখনো বুঝতে দেয় মাইনু। স্কুলের কোন টিচারের স্বভাব কি রকম সন্দীপ স্যার কিভাবে সিগারেট খায় কোন মেয়েটি সুন্দর বা অসুন্দর ইত্যাদি গদগদ করে তার ভাইয়াকে বলতেই হবে। কোন কিছু পেটে রাখে না। সব ভাইয়ার সামনে উগরে দেয়। মাইনু সব সাই দিয়ে যায়। ভাই বোনের গল্প গুজব ও মান অভিমান দেখে অনেক সময় ছেরাজুলের হিংসা হতো। একচালা ঘরের নিচে দুটো পরিবার কেউ কার কথা কানে না নিয়ে পারে না। তাছাড়া ছেরাজুল দোকানের মালিক হলেও ব্যবসা সুলভ আচার আচরনের কারনে কাস্টমাররা মাইনু কেই মালিক মানতো বেশি। তাই লোকজনের সাথে তার লেন দেনের সম্পর্কও সুগভীর। এতে করে মাইনুর প্রতি ছেরাজুলের সন্দহের দানা বাধতে পারতে পারতো। কিংবা তার সাথে বচসা মনো মালিন্য হতে পারতো। কিন্তু একচালা ঘরের মধ্যে দু’জনের বাস, ব্যবসায় শরিকদারি, সর্বোপরি আশ্রয় দাতা ভাই হিসেবে যাকে বছর বছর ধরে বিশ্বাস করে আসছে সেই ছেরাজুলের মধ্যে পশুত্বের ভাব যে প্রকট হবে তা মাইনু কখনো ভাবে নি। বোনের প্রতি ছেরাজুলের দৃষ্টিভঙ্গি এমন চরম পরিবর্তন মাইনু মেনে নিতে পারে নি।

সন্ধ্যার লগ্ন । সমগ্র আকাশ রক্তের মতো লাল হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পরেই একঝাঁক চাম চিকায় আকাশ ভরে গেল। তারপর সীমানার ওই পারের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। সাফিয়া দোয়া-দরুদ পড়ছে যেমনি করে তার স্বামী সীমান্তে গরু চালান করার সময় দোয়া পড়তো।

তিন জনই হাঁটছে। মা ও পারুুুুলের কিছু কাপড় ছোপড়ের একটা আধপুরানো ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে মাইনু হাত দশেক দুরে । সামনে কোন বাঁধার সম্মুখীন এখনো পর্যন্তু হয়নি। তবে মাথায় একটা নির্ঘুম রাতের দৃশ্যপট বার বার ভেসে উঠতেছে। সেই ছেরাজুলের দোকনের স্যাঁত স্যাঁতে বিছানায় শুয়ে টার্গেট নটে চোখ রেখে নির্ভুল নিশানা ঠিক করার রাত।




















সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১১ রাত ৯:৪৬
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×