জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর যে, দেশগুলো সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলে আশংকা করা হয় বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম জার্মান ওয়াচ গ্লোবাল ক্লাইমেট রিক্স ইনডেক্স (সিআরআই) ২০১১ এর মতে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লেই কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে দক্ষিনাঞ্চলীয় উপকূলের একটি বিরাট অংশ বঙ্গোপসাগরে তলিয়ে যাবে । এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির স্থর ক্রমাগত লবনাক্ত হবে এবং দুই থেকে আড়াই কোটি জনগোষ্ঠি তাদের বাসভূমি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বস্তুতে পরিনত হবে। বাংলাদেশের তিন ভাগের দুই ভাগ এলাকাই সমূদ্রপুষ্ঠের চেয়ে পাঁচ মিটারেরও কম উঁচু। এরকম অবস্থায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়া কেবল বন্যায় নয়, লোনা পানির আগ্রাসনের ফলে ফসলী জমি ধ্বংস হওয়া। এমন হলে দুই কোটি কৃষক তাদের পেশা হারিয়ে উদ্বস্ততে পরিনত হবে আর ভিড়াক্রান্ত শহরে এসে ভীড় জমাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতি গ্রস্থ দেশের তালিকা তৈরি হচ্ছে বার বার এতে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই এক নম্বরে। বাংলাদেশের নদী ভাঙ্গা মানুষের আর্তনাদ, সাইক্লোনে সব হারানো মানুষের হাহাকার, বন্যায় ক্ষতি গ্রস্থ মানুষের প্রতিবেদন দেখানো হয়েছে পৃথীবির বড় বড় মিডিয়া গুলোতে তাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশ গুলোর ঘুম ভাঙ্গেনা। তারা তাদের ভোগ বিলাসের জন্য কার্বন নির্গমন করেই যাচ্ছে আর তার ফলশ্র“তিতে বাংলাদেশের মতো স্বল্পন্নোত দেশের মানুষের ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েই চলছে প্রতিনিয়ত। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর ঘুম ভাঙ্গতে পারছি না হয়তো তাদের সে ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য আমাদের যা করেতে হবে আমরা তা করছি না। ফলে আমরা বন্যার ঝুকিতে প্রথম, সুনামির ঝুকিতে তৃতীয়, ঘূর্ণী ঝড়ের ঝুকিতে ষষ্ঠ আর সমুদ্রপৃষ্ঠ ১৭ শতাংশ তলিয়ে যাবার ঝুকিতে। প্রায় ৩০০ বছর ধরে যে হারে সারা বিশ্বে শিল্পায়ন ও নগরায়ন হয়েছে এবং তাতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সহ যে পরিমান গ্রীনহাউজ গ্যাস পৃথিবীর বায়ু মন্ডলে নির্গত হয়েছে অবিলম্বে এ গ্যাস প্রশমনের উদ্যোগ নেয়া না হলে সর্বগ্রাসী এ প্রভাব ছড়িয়ে পরবে সর্বাত্র। আর এর প্রভাবে বৃদ্ধি পাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, ওজনস্থর পাতলা হয়ে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র বৃষ্টি পাত, ক্ষরা, টাইফুন ও হ্যারিকেনসহ মৌসুমি ঘূর্ণীঝড়, মেরুঅঞ্চলে বরফ গলন। পৃথিবীর ৯০% বরফই জমে আছে মেরুঅঞ্চলে যা গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। “বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিেশ্ব্ আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট দূযোগের মাত্রা গত দুই দশকে প্রায় চারগুন বেড়েছে। ১৯৮০ এর দশকে আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটেছে বছরে ১২০ টি আজ তা গিয়ে পৌছেছে ৫০০ টিতে। বন্যা বেড়েছে ৬ গুন, ঝড় ৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪০ টি। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৪ প্রাকুতিক দূর্যোগের কারনে ক্ষতিগ্রস্থ লোকসংখ্যা ছিল প্রতি বছরে ১৭৪ মিলিয়ন সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৫ সাল নাগাদ দূর্যোগের কারনে ক্ষতিগ্রস্থ লোক সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে আরো ৫৪% তা হবে বছরে ৩৭৫ মিলিয়ন।
জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে ১৯৯৭ সালে কিউটো প্রটোকলের মাধ্যমে গ্রীনহাউজ গ্যাস কমানোর যে কার্যকারী পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা এতো বছর পর ও খুব একটা আলোর মুখ দেখেনি। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত স্থীর রাখার যে সিদ্ধান্ত তা কার্যকরী করার কোন লক্ষন এখনও দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ডারবান সম্মেলন ২০১১ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরন হ্রাস করার লক্ষে আইনগত ভাবে বাধ্যকারী একটি চুক্তি প্রস্তুত করার কাজ এবছর থেকে শুরু হবে। চুক্তির খসড়া চুড়ান্ত হবে ২০১৫ সালে আর বাস্তবায়ন হবে ২০২০ সালে। এ যেন ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেল’ অবস্থা।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বহুদিন থেকে সতর্ক বানী প্রদান করে আসলে ও শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো গায়ের জোরে তা অস্বীকার করে আসছিল। বিজ্ঞানীদের বিরতিহীন চাপের ফলে ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় শহরে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনে ইউনাইটেড ন্যাশনাস ফ্রেম ওয়ার্ক কনভেনশন অব ক্লাইমেট চেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হলেও মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের বিরোধীতার মুখে কোন কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহন করা যাইনি কিন্তু আশার কথা হলো যে এবার ১৭ তম ডারবান সম্মেলনে সবচেয়ে বেশী কার্বন নিঃসরনকারী তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতকে একটি “লিগ্যাল রুফ বা আইনী ছাদ” এর নিচে একত্র করা সম্ভব হয়েছে। কার্বন নিঃসরনকরী সব দেশই এই চুক্তির কাঠামোর আওতায় আসতে সম্মত হয়েছে।
স্বল্পোন্নত কোনর দেশের পক্ষে একক ভাবে এ ধরনের সম্মেলনকে প্রভাবিত করাটা অসম্ভব। এ জন্য জোট বাধতে হবে অন্য স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর সাথে। বাংলাদেশ এখন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছ। আর তাই এখনই সময় গর্জে ওঠার আওয়াজ তোলার। সচেতন সমাজ, গবেষক, মিডিয়া ও কুটনৈতিক মিশন সবার এক হয়ে কাজ করার। সর্বোচ্চ ক্ষতি পূরনের জন্য সোচ্চার হবার । জলবায়ু তহবিল কার পেটে যাবে আমলা, কনসালটেন্ট , এনজিও নাকি জনগনও সুফল পাবে সে ব্যাপারটাও সরকারকে দেখতে হবে। তা না হলে বৈষিক ক্ষমতার লাগাম দেশের উপর আরো বেশী চেপে বসতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শুধু গ্রীনহাউজ গ্যাস না আমরা নিজেরা ও অনেক দায়ী। বাধ দিয়ে নদীর গতি পথ রোধ করা হচ্ছে নদীগুলোকে শিল্পবজ্যের নালায় পরিনত করা হচ্ছে। এ থেকে মুনাফা লুটছে প্রভাবশালী নেতারা। বনাঞ্চল বিনাশ করে গড়েতোলা হচ্ছে কলকারখানা, ইট ভাটা। একটি দেশের মোট ভূভাগের ২৫% বনভূমি থাকা জরুরী। সেখানে আমাদের দেশে ১৭% কাগজে-কলমে থাকলেও বেশ কিছু বনভূমি বেদখল হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের কাছে সকল জনগণের প্রত্যাশা এটাই যেন সারাদেশে গ্রাসকৃত বনভূমি উদ্ধার করে নতুন বনভূমি সৃষ্টি করা আর পরিবেশ দূষণকারীদের উপযুক্ত বিচারের ব্যবস্থা করা। সামাজিক শ্রেণী বৈষম্য, লুটেরা রাজনীতি, দূবৃত্ত ক্ষমতায়ন, জনবিচ্ছিন্ন আমলা তান্ত্রিক জটিলতা এসবের বাহিরে এসে সবাইকে পরিবেশ সুরক্ষার ব্যাপারে সক্রিয় ও সচেতন হয়ে উঠতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের প্রিয় পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



