somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুভি রিভিউ-লাইভ ফ্রম ঢাকা (Live from Dhaka) আমাদের রঙিন শহরের সাদা-কালো গল্প

৩০ শে মার্চ, ২০১৯ বিকাল ৪:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটা খোড়া লোক। শেয়ারবাজারে দরপতন। প্রেমিকার সাথে অসুস্থ সম্পর্ক। ড্রাগ এ্যাডিক্টেড ভাই। পাওনাদার... “আমি আর নিতে পারতেছি না, আমি তো একটা মানুষ!”
নিতে না পারলেও নিতে হবে। তেতে ওঠা এই শহর না দিয়ে ছাড়বে? ১২ মিলিয়ন মানুষ একে অপরের সাথে লেগে আছে রাত-দিন, শহর কি আসতে বলেছিলো আপনাদের? ভালো লাগে না, বমি আসে, হাসিমুখ নেই, সুন্দর স্পর্শ নেই, বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন? দূষিত বাতাস বুকে ঢুকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে? পালান! বরফের দেশে চলে যান। রাশিয়া? হলো না। মালয়েশিয়া? তাই সই! প্রেমিকাটা বমি করে মরে যাক, ড্রাগ এ্যাডিক্ট ভাইটা খুপড়ি ঘরে মুখে কষ জমে পড়ে আছে। এখনই তো যাবার সময়! কিন্তু এই শহরের প্রতিহিংসা থেকে বাঁচা কি অত সহজ?
হ্যালো, ঢাকা থেকে লাইভ বলছি...
লাইভ ফ্রম ঢাকা একটি বিষণ্ণ, গুমোট, এবং অনেকটাই বিমূর্ত চলচ্চিত্র। সাদাকালো এই সিনেমাটিতে সাদা কম, কালো বেশি। চরিত্র কম, দৃশ্যকল্প বেশি। মূল চরিত্র সাজ্জাদ গাড়ি চালিয়ে এখানে ওখানে যায়, একে ওকে ফোন করে, একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটে, তবে প্রতিবারই কিছু না কিছু নতুন চরিত্র যুক্ত হয়। এই যেমন শেয়ার মার্কেটে দরপতনের খবর চলছে টিভিতে, রেডিওতে বলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মারপিটের খবর, গাড়ির হর্ন, ট্রেনের হুইসেল, লঞ্চের ভেঁপু, সবসময় আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, এই শহরে প্রাণ নেই, এই শহর জাদুর শহর না।
সিনেমাটির বাজেট শুনেছি মাত্র ১০ লাখ টাকা ছিলো। ভালো সিনেমা বানাতে চাইলে যে বাজেট সমস্যা না, দরকার ভালো চিত্রনাট্য এবং সিনেমা সেন্স, লাইভ ফ্রম ঢাকা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ্যাটমোসফিয়ারিক ইন্ডি ফিল্ম যেমন হয়, যে ধারা চলছে, এটা তার বাইরের কিছু না। তবে এ্যাটমোসফিয়ার তৈরি করতে তো দক্ষতা লাগে, ফিল্ম সেন্স লাগে, সেটা পরিচালকের আছে। কম সাদা এবং বেশি কালোর গথিকতা, এবং চলমান ইন্ডাসট্রিয়াল সাউন্ড এই ছবির আবহ তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে, আর বিশেষ কিছু দৃশ্য দিয়েছে বাড়তি উৎকর্ষ।
যেমন- সাজ্জাদের বাসার জানালা দিয়ে হঠাৎ তুষারপাত হতে দেখা; সে তখন রাশিয়া যাবার স্বপ্নে বিভোর ছিলো। সেখানে বরফ পড়ে। ঢাকার মত প্রেসার কুকার না!
আরেকটি- বাসায় খাবার খেতে খেতে হঠাৎ টেবিলে এক অদ্ভুত মেয়ের দেখা মেলে। যে বিচিত্রভাবে তাকিয়ে থাকে সাজ্জাদের দিকে। একটু পরে তার হাত দেখা যায়, শেকল পরানো। সাজ্জাদ চেপে ধরে আছে অত্যন্ত জিঘাংসায়। এই মেয়েটা রেহানা (সাজ্জাদের প্রেমিকা) না। হয়তো বা সাজ্জাদের প্রাক্তন, যার কাছে সাজ্জাদ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, অথবা সে অবিশ্বস্ত ছিলো সাজ্জাদের প্রতি। হয়তো বা এখান থেকেই সাজ্জাদের মনোবিকলনের শুরু। রেহানাকে কারো সাথে হেসে কথা বলতে দেখলে সে সইতে পারে না, ফোনে কার কার সাথে কথা বলছে তাতেও ভীষণ নজরদারি।
সিনেমায় সীমাবদ্ধতা ছিলো বাজেটের, তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু কৌশলী হতে হয়েছে পরিচালককে। নিউজ ব্লুপারস, রাস্তার শব্দ, যানবহনের হর্ন দিয়ে তিনি গল্প বলিয়েছেন, গল্প বলিয়েছেন গান দিয়েও! আজম খানের “হয়তো বা এই দিন, থাকবে না চিরদিন” কী সুন্দর মিলে যায় গল্পের সাথে! পাওনাদার দুবার সাজ্জাদের বাসায় আসে, দুবারই আজান হচ্ছিলো। এর মানে কী? সরল অর্থ- আজানের সময় পাওনাদার আসে। গভীর অর্থ- সাজ্জাদের দুঃসময়ে স্রষ্টার কিছুই এসে যায় না।
শেষের দিকে কিছু জিনিস একটু বেশি পুনরাবৃত্তিক এবং ক্লিশে লাগছিলো, তবে একদম শেষটা স্তব্ধ করে দেয়ার মত। পরিচালক কোন কম্প্রোমাইজ করেন নি দর্শকের সাথে, নিজের সাথে, সিনেমার সাথে। যা দেখতে গিয়েছিলাম, তাই দেখেছি। তৃপ্ত হয়েছি। এটা টেলিফিল্মের মত সিনেমা না, বাংলাদেশী স্ট্যান্ডার্ডে ভালো সিনেমাও না। এটা একটা ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ডের সিনেমা, যা আমরা টরেন্ট থেকে ডাউনলোড করে দেখে আইএমডিবিতে রেটিং দেই।
দুর্বল দিক বলা যায় সাজ্জাদের ভাই মাইকেলের অভিনয় এবং সংলাপ প্রক্ষেপন। একজন বেপরোয়া মাদকাসক্ত যুবকের জায়গায় তাকে খুব বেশি সতেজ লেগেছে, সংলাপ অনেক জায়গাতেই অস্পষ্ট। এটা অবশ্য সাজ্জাদের বেশ কিছু সংলাপেও পাওয়া গেছে।
তবে সবচেয়ে বড় অতৃপ্তি হলো ট্রেইলারের সেই সংলাপ "এই বালের শহরে সবকিছুই উলটাপালটা! ১২ মিলিয়ন মানুষ সারাক্ষণ একে অপরের সাথে কুত্তার মত ঘেউ ঘেউ করে। এত মানুষের ঘাম, রক্ত, আর গুয়ের গন্ধে আমার বমি আসে।" না থাকা।
পরিচালক কেন বাদ দিলেন এটি? নাকি সেন্সর বোর্ডের মাতবরি?

লাইভ ফ্রম ঢাকা দেখতে দেখতে মনে পড়ছিলো Requiem For A Dream এর ভাগ্যাহত চরিত্রগুলির কথা, মনে পড়ছিলো Eraserhead এর আবহ, তবে সবশেষে সিনেমাটি আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নামক একজন প্রতিভাবান পরিচালকেরই, যিনি সিনেমা তৈরি করতে জানেন।

প্রথম প্রকাশ এখানে
এছাড়াও আছে মুখ ও মুখোশ ওয়েবম্যাগে
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০১৯ বিকাল ৪:১০
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না : পুুণ্যময় মুহররমের শিক্ষা

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ৯:৪৭



কৈফিয়ত:
দশ মুহররম গত হয়ে চলে গেছে আমাদের থেকে। মুহররমের আজ ১৪ তারিখ। হ্যাঁ, সময় পেরিয়ে যাওয়ার কিছুটা পরেই দিচ্ছি এই পোস্ট। পোস্ট লিখে রেখেছিলাম আগেই। কিছুটা ব্যস্ততার জন্য কম্পিউটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অটোপসি

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১২:৩২

যে পাহাড়ে যাব যাব করে মনে মনে ব্যাগ গুছিয়েছি অন্তত চব্বিশবার-
একবার অটোপসি টেবিলে শুয়ে নেই-
পাহাড়, ঝর্ণা, জংগলের গাছ, গাছের বুড়ো শিকড়- শেকড়ের কোটরে পাখির বাসা;
সবকিছু বেরিয়ে আসবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব গাঁথা আমাদের ইতিহাস : ঘটনাপঞ্জি ও জানা অজানা তথ্য। [১]

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:১৮


আমার এ পোষ্টটি সবার ভালো না ও লাগতে পারে । যাদের মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা সর্ম্পকে বিন্দু মাত্র শ্রদ্ধাবোধ বা আগ্রহ নাই তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার পথে পথে- ১৪ (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:২৩



ঢাকা শহরের মানুষ গুলো ঘর থেকে বাইরে বের হলেই হিংস্র হয়ে যায়। অমানবিক হয়ে যায়। একজন দায়িত্বশীল পিতা, যার সংসারের প্রতি অগাধ মায়া। সন্তনাদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা- সে-ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রলীগ নিয়ে শেখ হাসিনার খোঁড়া সমাধান!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:২৫



Student League News

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, ছাত্র রাজনীতির দরকার ছিলো না; ছাত্ররা ছাত্র, এরা রাজনীতিবিদ নয়, এরা ইন্জিনিয়ার নয়, এরা ডাক্তার নয়, এরা প্রফেশালে নয়, এরা শুধুমাত্র ছাত্র;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×