[উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর ঢাকায় কোচিং করতে আসি। এবারের গল্প তিনটিই সেসময়কার ঘটনাগুলোকে নিয়ে। একটি অনুরোধ আছে। তা হল, দয়াকরে গল্পগুলোকে নেতিবাচকভাবে দেখবেন না। আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতাগুলোই বলছি। তার বাইরে কিছুই নয়।]
৭
ফার্মগেটের রাতগুলো
প্রথম প্রথম ঢাকায় এসে যা হয়, আমারও তাই হল। ‘পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’। আমারও পাখা গজালো। কিন্তু কপাল ভালো ছিল তাই মরে যাইনি।
যেহেতু সারা জীবন ছোট একটি শহরে বড় হয়েছি, তাই মনের ভয় কাটেনি তখনও। প্রথম প্রথম খুবই ভয় পেতাম সবকিছু। এরপর বুঝলাম, এত ভয় পেলে জীবন চলে না।
এখন যে সময়ের গল্পটা বলব, সে সময়টা আমার ভয়পর্ব। মানে যখন সবকিছুকেই ভয় পেতাম। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেরোতাম না, মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে হাটতাম ইত্যাদি ইত্যাদি।
রাত প্রায় ১১ টার মত বাজে।বসে বসে পড়াশোনা করছি(তখন পড়াশোনা খুবই কম করতাম)। হঠাৎ আমার রুমমেট এসে বলল, ও নাকি ফার্মগেট থেকে পালিয়ে এসেছে। ওকে নাকি রাস্তায় কোন মেয়ে কি বলেছে! ও ভয়ে দৌড় দিয়ে বেঁচেছে। আমিও বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম, এখন থেকে আর রাতে ঘরের বাহিরেই যাবো না।
নতুন কোথাও গেলে কিভাবে যেন আশেপাশের মানুষগুলোর সাথে আমার ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। কিছু দিন পর, যেভাবেই হোক, আশেপাশের অনেকের সাথেই আমার পরিচয় হয়ে গেল। সবাই একই বয়সের। নতুন রক্ত। তরুণ প্রাণ।
আর একদিনের ঘটনা। তখন রাত প্রায় ১০ টার মত বাজে। হঠাৎ সব বন্ধুরা আমার মেসে চলে আসল। ওদের আবদার, রাতে ফার্মগেট ঘুরবে। আমি তো ভয়ে অস্থির। রুমমেটের কাছে শুনেছি, রাতে নাকি মেয়েরা ফার্মগেটে ভয় দেখায়। আমি তো যাবো না। আবার ভাবলাম, এতদিন ধরে এসেছি। কখনওই তো রাতে ঘুরিনি। এতজন আছি একসাথে। কে আর কি বা বলবে। যাই, ঘুরেই আসি। দেখি না, কি হয়।
সবাই মিলে ছন্দ-আনন্দ সিনেমা হলে সিনেমা দেখলাম। নাইট শো। তাই বেশ ভয় হচ্ছিল। কিন্তু জ্যাকি চ্যানের কাটকাট-মারমার ছবি দেখে ভয় উবে গেল। আবার ভয় ধরল, কারণ, এরপর ভূতের ছবি দেখালো। সে এক ভয়ংকর ভূতের ছবি।
ছবি দেখে বেরোলাম রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বা একটার দিকে। রাতে বের হলে সাধারণত আমি আমার মোবাইল মানিব্যাগ সব ঘরে রেখেই বের হই। তাই ভয় তেমন থাকে না। তবে আজ কিভাবে কিভাবে যেন নোকিয়া ১১০০ মডেলের মোবাইলটা নিয়ে চলে এসেছি। তাই, ভয় বাড়তে থাকল!
এরপর শুরু হল আমাদের ফার্মগেট ঘুরে বেড়ানো। আমি আগে এত রাতে কখনওই বের হইনি। তাই বুঝতেই পারলাম না, কেন এত রাতে বেশ ক’জন মেয়ে মানুষ, কেউ বোরখা পড়ে, কেউ বেশ সেজে-গুজে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা কেনই বা দাঁড়িয়ে আছে, কি বা চায়, আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি আরও অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, শুধু আমরাই নয়, এত রাতেও অনেক মানুষ আশে-পাশে ঘোরাঘুরি করছে। অবশ্যই এরা সব ব্যক্তিগত কাজ করার জন্যই এসেছে। আমি চুপিচুপি ও ভয়েভয়ে আমার রুমমেটকে বললাম, তোকে কোন মেয়েটা ভয় দেখিয়েছে বলতো, আজ একটা হেস্তনেস্ত করেই যাবো!
আমার অবস্থা বুঝতে পেরে ও বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল। আমাদের রাতের অভিযান শেষ হল গভীর রাতে। ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটল তারপর।
পরদিন সকালে দেশের নামকরা একটি দৈনিক পত্রিকা খুললাম। পত্রিকার শিরোনাম ছিল, ফার্মগেটে রাতভর পতিতাবৃত্তি বা এসব কিছু নিয়ে। প্রথম পাতায় বিশাল আকারের একটি ছবি। উপর থেকে ফটোগ্রাফার যেন গোটা এলাকাটাকেই ছবিতে আনার চেষ্টা করেছেন।
আমার ভয়ের মাত্রা কোন পর্যায়ে সে আশাকরি বোঝাতে হবে না।আমি খুটিয়ে খুটিয়ে প্রতিটি মানুষকে চেনার চেষ্টা করতে লাগলাম। সর্বনাশ, কাল রাতে তো আমিও ওখানে ছিলাম। যদি কোনভাবে আমার ছবি এসে যায়! তখন আমি কি করব!
আমি অনেককে দ্বারা চেনানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে ছবি দেখে কেউেই বলতে পারল না, সেখানে আমাদের কারও ছবি আছে।
বুকে তখন বিশাল রকমের বেঁচে যাওয়ার আনন্দ। তারপরও মনে শান্তি নেই। বাড়িতে ফোন করলাম। সবাই বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলল। মনে হল না যে কিছু হয়েছে। আসলেই তো কিছু হয়নি। খামোখাই ভয় পাচ্ছি।
আমি এতবড় একজন ছেলে। আমাকে কি বাচ্চাদের মত এভাবে ভয় পাওয়া মানায়?
৮
কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা
ঢাকায় কোচিং করতে এসে অসাধারণ কিছু ব্যাপারের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। যেমন, ঢাকায় এসে আমি প্রথম দেখলাম, এক গ্লাস জল পানের জন্য মানুষ কত সংগ্রাম করে। প্রায়ই বিদ্যুৎ চলে যায়। আমি থাকতাম রান্নাঘরের মত ছো্ট্ট একটি ঘরে। ওতে দু’জন থাকতাম বেশ কষ্ট করে। গরমের মধ্যে নরকচুল্লীর মত ঘরে বসে থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল।
খুব কাছেই বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স। পায়ে হাটলে দশ মিনিটের পথ। শুধু বিদ্যুৎ চলে গেলে নয়, যখন মন চাইত, তখনই চলে যেতাম বসুন্ধরায়। যেয়ে এসি’র মধ্যে আরাম করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কখনও ইনফিনিটি বা ওয়ানম্যান এর শো-রুমে ঢুকতাম। একটি শার্ট হয়ত খুব পছন্দ হয়ে যেত। দাম শুনতাম। দাম শোনার পর, শুধু ওই শার্ট নয়, নতুন করে ওই দিন আর কোন কিছু পছন্দ করার ইচ্ছেও চলে যেত।
পরের দিন আবারও যেতাম বসুন্ধরায়। একবার ২০০ টাকা দিয়ে বসুন্ধরা থেকেই একটি সানগ্লাস কিনলাম। আমার যেহেতু চোখের সমস্যা, তাই সাধারণ সানগ্লাস আমি পড়ে থাকতে পারি না। তারপরও কিনলাম। সে সানগ্লাস জিন্স প্যান্টের পকেটে ঝুলিয়ে বেশ ভাব নিয়ে হেটে হেটে আমার খুপরি ঘরটিতে ফিরলাম। এসে দেখি, আমার সানগ্লাসটা নেই। কখন পড়ে গেছে, বুঝিনি।
ঢাকায় এসেছি, একদিন তো চাইনিজ খেতেই হয়! গ্রিনরোডে একটি চাইনিজ খাবারের দোকানে আমি আর আমার রুমমেট আতিক ভয়ে ভয়ে ঢুকলাম। আলো আঁধারী পরিবেশ। মিষ্টি সুরের একটি গান বাজছে। খাবার অর্ডার দেবার সময় বারবার করে দেখতে লাগলাম, সবচেয়ে কমদামী কি খাবার আছে। নুডুলস্ আছে। কমদামী হবে, কিন্তু কত দাম জানা নেই। আগে খাই, দাম পরে দেখা যাবে।
অনেকটা সময় নিল খাবার আসতে। বিশাল পরিমান নুডুলস্ আমাদের সামনে রাখা হল। সাথে আরও কত রকমের উপকরণ!
সব খেয়ে শেষ করতে পারলাম না। প্যাকেট করে নিলাম কিছু, পরে রুমে যেয়ে খাওয়া যাবে।
বিল আসল ২৯০ টাকা! আমার পকেটে ছিল ১০০ টাকা। আমি তা বের করে দিলাম। আমার কাছে আর নেই। একথা শুনে আতিকে চোখজোড়া বড় হয়ে গেল। কেমন করে জানি না, আতিক পকেট থেকে অনেক কষ্টে, অনেকগুলো ভাঁজ খাওয়া দুটো একশ টাকার নোট বের করল। ভালোই বেঁচে গিয়েছিলাম। নইলে কিছু একটা জমা দিয়ে আসতে হত অথবা দৌড় দিয়ে পালাতে হত ।
ধীরে ধীরে সাহস বাড়তে লাগল আমার। মাঝরাতে যেয়ে ফার্মগেটের পার্কটাতে শুয়ে থাকতাম। গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় একা হাটাহাটি করতাম। একদিন পত্রিকায় দেখি, আমি ইন্দিরা রোডের যে রাস্তাটি দিয়ে গতকাল রাত ১টায় হেটেছি, ঠিক সেখানেই রাত ১.১৫ মিনিটের দিকে ভয়াভয় ছিনতাই হয়েছে। এরপর থেকে গভীর রাতে একা হাটাহাটি বন্ধ করে দিই।
আমি খুবই তৃপ্ত, কারণ আমার মেস জীবনের বন্ধুরা যদিও পড়াশোনা কম করত, তারপরও তারা প্রায় সবাই বেশ ভালো ভালো জায়গায় আছে। আমার রুমমেট আতিক ঢাকা ডেন্টাল কলেজে পড়ে। অন্যরাও দেশের নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই পড়ছে। অনেকের সাথেই অনেকদিন ধরে কথা হয়না। তারপরও ওদের স্থান আমার কাছে একেবারেই আলাদা। ওদেরকে আমি কখনওই ভুলতে পারব না।।
৯
বাবার ঘড়ি
ঢাকায় কোচিং করতে আসার অল্প কিছুদিন আগে আবার বাবা মারা যান। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষত তখনও দগদগে। আমি বাবার মোবাইলও নিতাম। ঘড়িও নিতাম। বাবা বলতেন, একটি নাও। অন্তত একটি আমাকে দাও। আমি কিছুই বলতাম না। শুধু বেরোনোর সময় দুটোই নিয়ে চুপচাপ চলে যেতাম। কাছে মোবাইল থাকাটা তখন বেশ মর্যাদার ব্যাপার আমার কাছে!
বাবা মারা যাবার পর দুটোই আমার হয়ে যায়। আর কেউ আমার কাছে এসবের ভাগ চাইত না।
আমি হাতে বাবার ঘড়িটাই পড়ে থাকতাম। অনেকেই বলত, আমি এমন বয়স্ক মানুষের ঘড়ি কেন পড়ি। আমি কিছুই বলতাম না, শুধু বলতাম, এ ঘড়ি আমি ছাড়তে পারব না।
তখন ভর্তি পরীক্ষার সময় চলে এসেছে। আমিও পরীক্ষা দেবার চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছি। মেসের এক বন্ধু এসে বলল, বন্ধু, আমার আজ দশটায় পরীক্ষা, তুমি তোমার ঘড়িটা কি দেবে? দিলে খুব উপকার হত। ঘড়ি ছাড়া পরীক্ষাটা খারাপ হয়ে যেতে পারে।
আমি খুব কম মানুষকেই জীবনে ‘না’ বলেছি। সে তালিকায় আমার সে বন্ধুটি ছিল না। আমি আমার হাত থেকে বাবার ঘড়িটা খুলে দিলাম। কষ্ট হল। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, আবার তো পাবই। এত কষ্ট কেন পাচ্ছি।
পড়াশোনার চাপেই হোক বা যেকারণেই হোক, আমার মনেই ছিল না যে বাবার ঘড়িটা আমার হাতে নেই। একদিন হাতের দিকে তাকিয়ে বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগল। হাতের যে জায়গাটায় ঘড়ি পরতাম, সে জায়গায় একটি সাদা আস্তরণ পড়েছে। আমার বাবার হাতেও ঠিক একই রকমের একটা দাগ হয়ে গিয়েছিল। এ ঘড়িটি নিয়মিত পড়াই ফলেই এ দাগ।
সাথে সাথেই গেলাম সে বন্ধুটিকে খুঁজতে। সে বন্ধুটি নেই। সে তার সবকিছু নিয়ে গ্রামের বাসায় চলে গেছে। আমি জানিনা, তার বাসা কোথায়। তার মোবাইল নাম্বারও আমার কাছে নেই। শুধু আমার কাছে কেন, কারও কাছেই নেই। কারণ, ও তখন মোবাইল ফোন ব্যাবহার করত না।
ঘড়িটা হারিয়েই গেল। জানিনা, ঘড়িটা আজও চলে কি না। বা নষ্ট হয়ে গেলে কোথায় কিভাবে পড়ে আছে। খুব জানতে ইচ্ছে করে। ঘড়িটাকে নিয়ে যে আমার অনেক স্মৃতি।
বাবার মোবাইল ফোনটাও আমি আমার বড় বোনকে দিয়ে দিই।
তবে হ্যা, বাবার সোনালী রঙ্গের চশমার ফ্রেমটা এখনও আমার কাছে আছে। আমি ওটা বেশ যত্ন করেই রেখেছি। ওটা আমার কাছে কেউ চায় না। বা কেউ চাইলেও আমি তাকে দেবো না। আমি তাকে ‘না’ বলতে পারব। আমি নিশ্চিত ।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



