
হস্তিশিশু আদরিণী। মায়ের সাথে বনবাদাড় ভেঙে চষে বেড়ায় মুক্তির আনন্দে। এ আনন্দে ছেদ পড়ল একদিন। শিকারিদের হাতে ধরা পড়ল সে। পায়ে শক্ত শিকল পরিয়ে বিক্রি করে দেয়া হলো সার্কাস পার্টির কাছে। সার্কাসের পশুপালক তাকে ছ’ফুট লম্বা লোহার শিকল দিয়ে বিরাট থামের সাথে বেঁধে রাখল।
বনের মুক্ত প্রাণী আদরিণী বন্দী হয়ে গেল ছ’ফুট ব্যাসার্ধের বৃত্তের মাঝে। কিশোরী আদরিণীর কাছে এ এক অসহ্য যন্ত্রণা। বারবার জোরে টান মেরে শিকল ছিঁড়ে ফেলতে চেষ্টা করতে থাকে। চেষ্টায় লাভ হয় না কিছুই। শুধু পা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। ব্যথা ও যন্ত্রণায় কাতরাতে হয়। রক্তাক্ত পায়ে টান পড়লে ব্যথা আরও বাড়ে। শিকল ছেঁড়ে না। মুক্তিও মেলে না। আস্তে আস্তে তার বিশ্বাস জন্মাতে লাগল, এ শিকল ভাঙা যাবে না। ভাঙতে গেলে ব্যর্থতাই আসবে, ব্যথাই বাড়বে।
আদরিণী বড় হতে লাগল। কিন্ত শিকল সে ভাঙতে পারল না। আস্তে আস্তে তার মুক্তির আকাঙ্খাও মন থেকে বিলীন হয়ে গেল। তার পৃথিবী সীমিত হয়ে গেল ছ’ফুট শিকলের বৃত্তের মাঝে। পায়ে একটু টান পড়লেই বোঝে তার সীমানা শেষ। এতেই সে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। এখন আর শিকল বাঁধার জন্যে মোটা শক্ত কাঠের গুঁড়ির প্রয়োজন হয় না। ছাগল বাঁধার ছোট খুঁটি হলেই চলে। পরিণত বয়সে বিশাল দেহ ও বিপুল শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আদরিণী তার দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ধারণার নিগড়েই আটকে থাকল। এক ঝটকায় খুঁটি থেকে নিজেকে মুক্ত করার শারীরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও তার মনে বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে যে, এই ছ’ফুট ব্যাসার্ধের বৃত্তই তার পৃথিবী। এটাই তার বিধি। এটাই তার নিয়তি। যখনই তার পায়ে একটু টান লাগে তখনই সে ধরে নেয় এর বাইরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সার্কাস দলের সাথে সে নানা জায়গায় যায়। শেখানো খেলা দেখায়। একটি ছোট খুঁটিতেই এখন তাকে বেঁধে রাখা হয়।
সার্কাসের তাঁবুতে আগুন লাগল একদিন। সার্কাসের লোকজন যার যার জীবন নিয়ে পালাল। আগুন নেভানোর পর দেখা গেল অনেক কিছুর সাথে আদরিণীও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পায়ের সেই শিকল রয়েছে। খুঁটি পুড়ে গেছে। পর্যাপ্ত শারীরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ভ্রান্ত বিশ্বাসের বন্দী আদরিণী মুক্ত হওয়ার কোন চেষ্টাই করে নি।
আদরিণীর এই কাহিনী কোন বানানো গল্প নয়। যাঁরা সার্কাসের দল দেখেছেন, তাঁরা খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন সার্কাসের বিশালকায় হাতিগুলোকে এভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সার্কাসের বহু হাতি এভাবেই মারা গেছে অগ্নিকাণ্ডে।
হতভাগিনী এই হাতির মতই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বন্দী নরনারীর সংখ্যা আমাদের সমাজে মোটেও কম নয়। কত ধরণের ভ্রান্ত বিশ্বাস যে আমাদের মাঝে রয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। যেমন : আমার পোড়া কপাল.... , এত দায়িত্ব পালনের যোগ্য আমি নই...., সে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করেছে, তার সাথে প্রতিযোগিতায় আমি পারব না....., এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো মুশকিল.... , জীবনটা আমার দুঃখে-দুঃখেই যাবে.... , বড় কিছু করা আমার কপালে নেই...., আমার কপালে সুখ সয় না...... , আমার এই অসুখ ভাল হবে না....
এরকম হাজারও নেতিবাচক ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের নিগড়ে আমরা বন্দী জীবন যাপন করছি।
কোয়ান্টাম মেথটের আত্মনির্মান থেকে নেয়া।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



