হে রাসূল দ., আপনি বলুন, আমার নবীত্বের ঋণ তোমরা শোধ করতে চাইলেও পারবে না, বরং আমার নিকটতমজন (দের সম্মান, আনুগত্য, কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে তা তা নূ্নতম পরিশোধ্য)।
ইসলাম ধর্মে পরকালীন অনন্ত সুখের আবাস বা জান্নাত বলে একটা কনসেপ্ট রয়েছে। ইসলাম ধর্মে যারাই বিশ্বাস করেন, তারাই এই ইসলামিক হ্যাভেন বা জান্নাতের কনসেপ্টে বিশ্বাস করেন। আর শিয়া সুন্নি ওহাবী নির্বিশেষে সবাই বিশ্বাস করেন যে, প্রথম মানবের যুগ থেকে মানবের সর্বশেষ পর্যন্ত যত অগুণতি মানুষই আসুক, তাদের মধ্যে যারাই মহান স্রষ্টা ও তাঁর সকল প্রেরিতদের প্রতি বিশ্বাসী, তারা সবাই এই জান্নাত এ যাবে, তা পাপের জন্য জাহান্নামে পোড়ার পর হোক, বা সরাসরি। এবং সবাই, এই বিশ্বাসটা রাখেন (সুন্নি নামধারীরা বুখারি থেকে শুরু করে ৫০ এর বেশি হাদিস গ্রন্থ থেকে, শিয়া নামধারীরাও) যে, এই যে জান্নাত, যেখানে লক্ষ লক্ষ নবীর আবাস হবে, যেখানে লক্ষ লক্ষ সাহাবীর আবাস হবে, যেখানে অযুত নিযুত কোটি ভালমানুষের আবাস হবে, সেই জায়গার সমস্ত নারীর অধিকারী হলেন ফাতিমাতুয যাহরা বিনতে মুহাম্মাদ নাম্নী একজন। এবং যত পুরুষ থাকবে, তাঁদের অধিকারী হবেন হাসান ইবনে আলী ইবনে আবি তালিব ও হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবি ত্বালিব নামের দুইজন সহোদর।
হে আহলে বাইতে রাসূল দ. (রাসূল দ.'র গৃহবাসী নিকটতমজন)! আল্লাহ আপনাদের পবিত্রই রাখতে চান। আর তিনি সব ধরনের অপবিত্রতার সংস্পর্শ থেকে আপনাদের সযত্নে দূরে রাখতে চান।
আশুরার ধারণা, এই জান্নাতের অধিকারী তিনজনের পরিবার বিষয়ক ধারণা। এই পরিবারের তিনজন সদস্য, আলী ইবনে আবি তালিব, ফাতিমা বিনতে রাসূল, হাসান ইবনে আলী দশই মুহাররামের আগেই ইহধ্যাম ত্যাগ করেন।
নিশ্চই আমি আপনাকে দান করেছি অনন্ত কল্যাণ! কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আপনার প্রভূর প্রতি নামাজ পড়ুন ও কুরবানী করুন। নিশ্চই যারা আপনাকে নির্বংশ বলছে তারা পূর্বাপর পিতৃমাতৃপরিচয়হীন নিশ্চিহ্ন।
তাদের বাকি পরিবার বলতে একেবারে কম কিছু ছিল না। হাসান ইবনে আলী রেখে গেছেন পুত্রকন্যা। হুসাইন ইবনে আলী স্বয়ং বর্তমান। বর্তমান তাঁর স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও মাত্র এক বছরের ছোট বোন।
এই যে পরিবার, ইসলাম ধর্মের কনসেপ্টে গৃহীত সমগ্র জান্নাতের অধিকারী এই পরিবারের বাকী সদস্যদের চরম অবমাননাকরভাবে গণহত্যার সম্মুখীন হবার দিবস হল দশই মুহাররাম।
নিশ্চই এ রাসূল দ. আপন ইচ্ছা ও বাসনা থেকে কোন কিছুই বলে থাকেন না। যা-ই বলেন, তা সরাসরি ওয়াহয়ি হয়ে থাকে। ... আর যারা পার্থক্য স্থাপন করবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল দ.'র মধ্যে নিশ্চই তারা অক্ষয় (হাক্বা) অস্বীকারকারী (ক্বাফিরুনা)।
ক্বাবার প্রধান সংরক্ষক আব্দুল মুত্তালিব। আব্দুল মুত্তালিব- মহা অনুসন্ধানীর (মহান স্রষ্টা) দাস। এই প্রধান সংরক্ষকের এক পুত্র আব্দুল্লাহ। আল্লাহর দাস। আরেক পুত্র আবু ত্বালিব। আবু ত্বালিব শব্দের অর্থ অনুসন্ধানীর পিতা। আবু ত্বালিবের সন্তান সম্ভবা স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ এক সন্ধ্যায় ক্বাবা ঘরের ভিতরে আলো প্রজ্বলিত করার জন্য গেলে সেই পবিত্রতম ঘরের ভিতরেই জন্ম দেন এক সন্তানের। জন্মের পর প্রথম তিনদিন সেই শিশু চোখ খোলেননি। প্রথম চোখ খোলেন এবং তাকান মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ'র কোলে থেকে চেহারার দিকে। মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ- সবিশেষ প্রশংসিত যে জন আল্লাহর পক্ষ থেকে কর্মসম্পাদনকারীর পুত্র। বাবার দেয়া অন্য একটা সুন্দর নাম রহিত হয়ে যায় শিশুর। আলী- সুউচ্চ, আলী-সুসম্মানিত... এ নামেই তিনি পরিচিত।
হে প্রভু, আপনার ভালবাসায় আমি উৎসর্গীকৃত। প্রভু, আপনার জন্য হওয়ায় আমাকে হত্যা করা হোক, তারপর আবার জীবিত করা হোক। আবার আমার প্রাণপাত করা হোক, আবার জীবিত করা হোক। আবারও আমার প্রাণপাত করা হোক, আবারো জীবিত করা হোক।- রাসূল দ.
দশ বছর বয়স তাঁর। এই সময়, তেরো বছরের প্রায়-নিরবচ্ছিন্ন গুহা-ধ্যানে থাকা মুসলিমদের মধ্যে কথিত রাহমাতাল্লিল আলামীন বা সৃষ্টিতে যত জগত আছে, সমস্ত জগতসমূহের প্রতি স্রষ্টার প্রেরিত করুণা হিসেবে ভবিষ্যতে যাঁকে নির্দেশিত করা হবে, সেই সর্ববিশ্বাস্য বা আল আমিন অদৃশ্যের সংবাদজ্ঞাত বা নবী হবার কথা জানান, এবং পুরুষ ও শিশুদের মধ্যে সর্বপ্রথম আলী ইবনে আবি তালিব তাঁর অনুসারী হন।
হাসান ও হুসাইন রা. আমার উম্মতের প্রতি আমার আমানত!
নবী মুহাম্মাদ দ.'র পুত্ররা অকালে চলে গেলেন। ইব্রাহিম রা. যাবার পর গ্রহণ লেগে গেল সূর্যেও। রাসূল দ. বোঝালেন, না, কারো চলে যাবার জন্য সূর্যে গ্রহণ লাগে না।
নবীদের পুত্রগণ নবী হয়েই থাকেন প্রায়শ। করুণাসমষ্টির পুত্রগণ জীবিত থাকবেন, আর নবী হবেন না, তাই বা কীভাবে হয়?
তাঁকে বলা হল, অলুক্ষণে। নির্বংশ। নির্বংশ শব্দচয়নকারীদের পূর্বাপর বংশপরিচয়হীন ঘোষণা করে জানানো হল, তাঁকে এমন বংশ দেয়া হবে, যা অনন্ত, এজন্য যেন তিনি উৎসর্গ করেন।
সৃষ্টজগতসমষ্টির উপর করুণারূপে বর্ষিত মহানবী আপন কন্যা, স্বর্গবাসিনীদের অধিকারিণীর জন্য যোগ্যতম পেলেন আলী ইবনে আবি তালিব রা. কে। তাঁদের প্রথম সন্তানের নাম রাখা হল মহাবীর ও নবীর পিতৃব্য হামজা রা.'র নামে। দ্বিতীয় সন্তানের নামও অসাধারণ। কিন্তু সেই নাম দুটি পরিবর্তিত হলো নবী দ.'র দ্বারা। বললেন, আল্লাহ তাঁদের হাসান বা সুন্দর এবং হুসাইন বা সৌন্দর্যের আধার হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তাঁর চলে যাবার সাত বছর আগে হাসান, ছ বছর আগে হুসাইন এবং পাঁচ বছর আগে যাইনআব আসেন। যাইনআব- পিতার সৌন্দর্যে সুশোভিত।
হে আবু হুরাইরা রা., আমার নিকটতমজনের মধ্যে হাসান ও হুসাইন রা. প্রিয়তম।
স্বয়ং আলী রা., ইমাম হাসান রা. তাঁদের পুত্রদের নাম রেখেছিলেন বিগত তিন খলিফার সাথে নামাঙ্কিত করে। নবী পরিবার রা. কারামুক্ত হবার পর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বারবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন আবু বাকার রা'র বংশধরদের সাথে যাঁকে রাসূল দ.'র কন্ঠে বলা হয় নবীগণের পর সর্ব্বোত্তম পুরুষ। উমার রা.'র বংশধরদের সাথে যাঁর বিষয়ে রাসূল দ. বলেছেন আমার পর কেউ নবী হলে উমার রা. হতেন, উমার রা. কে স্বয়ং শয়তানও ভয় পায়। এই তিন খলিফার পরিবারকেই রাসূল দ.'র সবচে প্রিয় ও সবচে নৈকট্যপ্রাপ্তদের মধ্যে পেয়ে রাসূল পরিবার রা. তাঁদের সাথে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
আলী রা. তিন খলিফারই ছোট্ট কলেবরের মজলিশে শূরা বা ক্যাবিনেট বা মন্ত্রীপরিষদের সদস্য ছিলেন। তিন খিলাফতই চলেছে সকল বর্তমান ও ভবিষ্যত খলিফার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।
চার খলিফার মধ্যে তিনজনই মহামহিম শাহাদাতের সুধা পান করেন। দুই বা তিনজনই মসজিদে, দুজন কুরআন পড়া অবস্থায় এবং আলী রা. নামাজরত অবস্থায় আহত হয়ে। তিনজনের মধ্যে অন্তত দুজনই রোজা রাখা অবস্থায়।
স্বয়ং উমার ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিআল্লাহু আনহুও শহীদ হন খলিফা থাকা অবস্থায় ১০ ই মুহাররাম। পরবর্তীতে ১০ ই মুহাররাম মহামহিম তাবিয়ি তাপসী রাবেয়া বসরী রা. ও প্রত্যাগমন করেন।
হাসান ও হুসাইন রা. বেহেস্তবাসী সমস্ত তরুণদের অধিকারী। ফাতিমা রা. সমস্ত বেহেস্তবাসী নারীদের নেতৃস্থানীয়া।... বেহেস্তে সবাই তরুণ রূপে যাবে।
তৃতীয় খলিফা উসমান রা. কে মসজিদে ঘেরাও করে হত্যা করা হলে তাঁর গোত্রের আমীর (যুদ্ধর ক্ষেত্রে জেনারেল এবং যুগপৎ আঞ্চলিক গভর্নর।) মুআবিয়া রা. এই হত্যার বিচার দ্রুত দাবি করেন। মুআবিয়া রা. রাসূল দ. সহ প্রথম-দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলিফার নিযুক্ত জেনারেল কাম গভর্নর ছিলেন। আলী রা. সেনাবাহিনীর আংশিকের বিচার প্রথমেই না করে আইন ও শাসন সংহত করার পর বিচারের পদ্ধতি অবলম্বন করেন। এ বিষয়ে মতভেদ নিয়ে আমীর মুআবিয়া রা.'র সাথে আমীর উল মু'মিনীন খলিফাতুল মুসলিমীন মাওলা আলী রা.'র সাথে যুদ্ধ পর্যন্ত হয়। এই মতভেদকে প্রায় সম্পূর্ণ উম্মাহর সুন্নিরা সত্যের দুই প্র্রক্রিয়ার মধ্যে মতভেদ আকারে দেখে থাকেন। শিয়ারা মুআবিয়া রা. কে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত হিসাবে দেখে থাকেন। সুন্নিদের বেশ কিছু মতধারা সকল খলিফা রা. কে সসম্মানে দেখেও মুআবিয়া রা. কে ভ্রান্ত হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু মূল সুন্নি মতধারা এই দুজনকেই সত্যপন্থী হিসাবে দেখেন।
আলী রা. তাঁর হত্যাকারীকে (গুপ্তচর, কথিত পালিত পুত্র/পুত্রসম) সম্ভব হলে ক্ষমা করতে আর তা না হলে কিসাস বা রক্তপণের কারণে একবার আঘাত করতে (তাতে নিহত হোক বা না হোক) আদেশ করে যান।
ইমাম হাসান রা. আমীর মুআবিয়া রা.'র সাথে সন্ধি করেন যুদ্ধ এড়ানোর জন্য। সন্ধির শর্ত হয় আমীর মুআবিয়া রা. কোন মনোনীত উত্তরাধিকারী রেখে যাবেন না। ইমাম হাসান রা অথবা ইমাম হুসাইন রা. মনোনীত হবেন।
ইমাম হাসান রা. কে অভিশপ্তর গুপ্তচররা বিষপ্রয়োগে শহীদ করে। ইমাম হাসান রা.ও তাঁর হত্যাকারীর নাম বলে যাননি এবং তাকে ক্ষমা করতে বারবার আদেশ করে যান।
চিরায়ত অভিশপ্ত ক্ষমতায় আরোহন করলে তার বংশীয় প্রাচীণ প্রতাপ ও অসাধারণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এর মাধ্যমে সে সব ধর্মের এবং সব অঞ্চলের-সাম্রাজ্যের অ্যাম্বাসেডরদের তার মন্ত্রিপরিষদে স্থান দেয়- যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করার নামান্তর।
এদের শরীরের মাংস, আমার শরীরের মাংস। এদের প্রবাহিত রক্ত আমার প্রবাহিত রক্ত। এদের সাথে যার ভালবাসা, আমার সাথে তার ভালবাসা। আর জেনে রাখো, আল্লাহর সাথে আমার ভালবাসা। হে আল্লাহ, এদের প্রতি ভালবাসা পোষণকারীদের আপনিও ভালবাসুন।
ক্ষমতারোহী শাসকের অন্যতম প্রধান পরামর্শদাতা বা উজিরে আজম ছিল আহলে কিতাব। সে তিনটা পরামর্শ রাখে ক্ষমতারোহণের পরপরই-
১. ক্ষমতায় থাকতে হলে প্রথমেই রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে রাসূল দ. ও তাঁর পরিবারের প্রতি আন্তরিকতা রাখে এমন সমস্ত মানুষকে সরাতে হবে। এদের একজনও থাকলে ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব। এতে ধার্মিকদের সরিয়ে দিলে ক্ষতি নেই, কারণ ধার্মিক দিয়ে ক্ষমতা চলে না, ভোগীদের দিয়ে ক্ষমতা চালানো অধিকতর সহজ হয়। আর ভোগীদের দিয়ে ক্ষমতা চালালে তাতে ক্ষমা ও ভালবাসা নয়, ভীতি ও আতঙ্ক তৈরি করাই প্রধান উপজীব্য হয়।
২. রাসূল দ.'র বংশের একজন মানুষও বাকী থাকলে কখনোই ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হবে না। কারণ তাঁদের উপস্থিতিই মানুষের চালিকাশক্তি হবার জন্য যথেষ্ট।
৩. অতীতে বনি ইসরাঈলেও কোন সাম্রাজ্যেই স্বয়ং নবী ছাড়া আর কেউ আল্লাহর কিতাব অনুসারে শাসন করেননি। পারেননি। স্বয়ং নবীরা ছাড়া কেউ পারবেও না। কুরআন বড় পবিত্র। এর নীতি-নিয়মে যদি পরিবর্তন আনা নাই যায়, অন্ততপক্ষে সুন্দর কাপড়ে মুড়ে তা উপরে উঠিয়ে রাখতে হবে।
ইমাম হুসাইন রা., উমার রা.'র সন্তান আবদুল্লাহ রা. এবং (সম্ভবত) জুবায়ের রা.'র সন্তান আবদুল্লাহ রা.- এই তিনজন সর্বদিক দিয়ে যোগ্য ছিলেন পুরো হিজাজ বা মূল আরবে। মদীনার এই তিন মহাসম্মানিতকে মদীনার গভর্নরের ঘরে ডেকে আনুগত্যের শপথ অথবা তৎক্ষণাৎ হত্যার আদেশ দেয়া হয়।
মদীনার গভর্নরের নৈতিকতায় বাঁধা পড়ে। তিনি সম্মানিত তিন অতিথিকে হিজরত করে যাবার অনুরোধ করেন। উমার রা.'র সন্তান আবদুল্লাহ রা. মদীনা থেকে মক্কাতে হিজরত করেই ২০০০ এর বেশি মানুষকে অত্যাচারের বিপক্ষে বাইআতবদ্ধ করেন।
হে হাসান-হুসাইন রা., তোমাদের জন্য আমার বাবা-মা ও উৎসর্গীকৃত হোন!
আহলে বাইতে রাসূল দ. কখনোই ক্ষমতারোহণের সপ্রক্রিয়া চেষ্টা করেননি। (মার্সিয়া মিছিল বিষয়ক পোস্টের কমেন্ট দ্র.)। ইমাম হুসাইন রা.ও করেননি। কিন্তু অত্যাচারীর অধীনে আনুগত্য স্বীকার করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। আর অত্যাচারীর বিরুদ্ধে কিছু না বলা বা না করাও তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল।
আলী রা.'র পূর্বতন রাজধানী ছিল কুফায়। কুফা সাবেক হাজার বছরের সাম্রাজ্য পারসিক/সাসানীয়র অংশ। আমীর মুআবিয়া রা.'র প্রাদেশিক শাসনকেন্দ্র ছিল বর্তমান সিরিয়ার দামেশকে, যা রোমান বাইজাইন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সাসানীয় ও বাইজাইন্টাইন সাম্রাজ্য হাজারো বছর যাবৎ পৃথিবীর এই অংশের সবচে বড় শক্তি। ইসলামের উন্মেষের সাথে ধীরে ধীরে কুফা ও দামেশক মুসলিম খিলাফাতের অন্তর্গত হয়।
কিন্তু পারসিক ও রোমক সাম্রাজ্যের জনজীবন বহুলাংশে ইসলাম গ্রহণ করলেও হাজারো বছরের আঞ্চলিকতা ও ক্ষমতার প্রভাব তৈরির ও বলয় প্রস্তুত করার মানসিকতা থেকে সরতে পারে না।
ফলশ্রুতিতে, আঞ্চলিক ক্ষমতায় রাজধানীর বলয়ে থাকার আশায় সাবেক রোমকরা দামেশকে আমির মুআবিয়া রা. ও তার বংশধরদের সম্পূর্ণ সমর্থন করতে থাকে।
এদেরই বিপরীত জনজীবন হিসাবে কুফা ও আশপাশের মানুষরা আলী রা. ও তাঁর বংশধারাকে সার্বিক সমর্থন জানাতে শুরু করে। যা শুধু ক্ষমতাবলয়ের সমর্থন হিসাবে প্রতিপণ্ন হয় বারবার প্রতিজ্ঞাভঙ্গের নিদর্শনের মাধ্যমে।
এঁদের সাথে যার শত্রুতা আমার সাথে তার শত্রুতা। এঁদের সাথে যার যুদ্ধ, আমার সাথে তার যুদ্ধ।
কারবালা ও কারবালার তথাকথিত যুদ্ধের নামে পারিবারিক, গোষ্ঠীগত গণহত্যার বিষয়ে কিছু লিখতে পারছি না। বহুবার চেষ্টা করেছি। পৈশাচিকতা কারবালার গোত্রীয় গণহতার কাছে কিছু নয়। যা পড়ার পর সুস্থ থাকা যায় না, তা লেখার মত যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে নাহয় এবার নাই গেলাম। এই পোস্ট বহু আগের ড্রাফট। অপারগতা ক্ষমা করবেন।
নিচে কিছু গুরুত্ববহ হাদীস এবং কারবালার শহীদগণের নাম ও পরিবারের পরিচয় দেয়া হল-
আমার এই সন্তান (হুসাইন রা.) সাইয়্যিদের সাইয়্যিদ (নেতৃস্থানীয়দেরও নেতৃস্থানীয়)।
হে উমার রা., বলবেন না, আমার এই দুই সন্তান আমার কাঁধে চড়ে কী দারুণ বাহন পেয়েছে, বরং বলুন, আমি কী অসাধারণ যাত্রি পেয়েছি!
ওমর রা.'র পুত্র আবদুল্লাহ রা.: হে কুফাবাসী, তুমি মশা মারা গেলে তার রক্ত গায়ে লাগলে হজ্বের কী হবে জিজ্ঞেস করছ, অথচ ইবনে রাসূলের রক্ত তোমাদের গায়ে লেগে রয়েছে, তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ করোনি!
প্রতিবার আলী রা., ফাতিমা রা., হাসান-হুসাইন-যাইনআব রা.'র বাসার সামনে দিয়ে যাবার সময় রাসূল দ.! ও পরবর্তীতে আবু বাকার রা.: আসলামু আলাইকুম ইয়া আহলে বাইতে রাসূল দ.! আল্লাহ আপনাদের সমস্ত অপবিত্রতা থেকে দূরে রাখতে চান! তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে নামাজ প্রতিষ্ঠিত করুন।
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত অবস্থায় 'পঞ্চম খলিফা' এজিদের বংশধর মহান শাসক দ্বিতীয় উমার ইবনে আবদুল আজিজ রা.: এই তরুণকে এত সম্মান দেখানোয় আপনারা (মন্ত্রিপরিষদ) অবাক হচ্ছেন কেন? এই হাদিস কি আপনাদের জানা নেই, যে ফাতিমা রা. কে খুশি করল সে তো আমাকেই খুশি করল। আর যে তাঁকে কষ্ট দিল সে তো আমাকেই কষ্ট দিল। আর নিশ্চই বনু হাশিমের প্রত্যেককে পরকালে ক্ষমা করিয়ে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে? আমি এজন্যই তাঁকে (ইমাম হুসাইন রা.'র বংশধর) ক্ষমা করিয়ে নেয়ার অনুরোধ করেছি। আর আমার এই আচরণ কি ফাতিমা রা. কে তুষ্ট করার মত নয়?
হুসাইন আমা হতে, আমি হুসাইন হতে।
হে আলী রা., আল্লাহ এঁদের নাম রেখেছেন হাসান ও হুসাইন, তাই আপনার দেয়া নাম প্রত্যাহার করুন।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা., হাসান ও হুসাইন রা. কে অনিন্দ্য ফুলের সাথে রাসূল দ. কে তুলনা করতে শুনেছি।
ও আলী রা.! (ঝর্ণার পাশে খেলতে থাকা) আমার এই দুই ছেলের প্রতি খেয়াল রাখুন, আর সূর্যতাপ বেড়ে যাবার আগেই তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনুন।
মাঝরাতে রাসূল দ. কে ঘর থেকে বেরুনোর সময়ও হাসনাইন করিমাইন রা. কে বুকে নিয়ে বেরুতে দেখা যায় এবং তিনি পরিচয় করিয়ে দেন, এরা হলেন আমার সন্তান; আর আমার সন্তান ফাতিমারও সন্তান হাসান ও হুসাইন রা.।
আমি আমার পরিবার নিয়ে এসেছি। (আলী-ফাতিমা-হাসান-হুসাইন রাদ্বিআল্লাহু আনহুম)। এবার তোমাদের যত অভিশাপ দেয়ার দিতে পার।
সর্বশ্রেষ্ঠ ও আমার সবচে প্রিয় দরুদ হচ্ছে এই, যা আমিও সালাতে পড়ি এবং তোমরাও পড়ো,
হে আল্লাহ, আপনি সালাত বর্ষণ করুন সম্মানিত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ও তাঁর বংশধরদের উপরে, যেমন করে সালাত বর্ষণ করেছেন সম্মানিত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর বংশধরদের (নবী দ.'র পূর্বপুরুষ) উপরে, নিশ্চই আপনার প্রশংসা সর্ব্বোচ্চ।
হে আল্লাহ, আপনি শুভকামনা (বারিক) বর্ষণ করুন সম্মানিত মুহাম্মাদ দ. ও তাঁর বংশধরদের উপর যেমন করে আপনি শুভকামনা বর্ষণ করেছেন সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম আ. ও তাঁর বংশধর (রাসূল দ.' ও মাওলা আলী রা.'র পূর্বপুরুষ) দের উপরে, নিশ্চই আপনার প্রশংসা সুউচ্চ।
আসাদুল্লাহিল গালিব আলীউল মুরতাদ্বা রাদ্বিআল্লাহু আনহুর সন্তানদের মধ্যে:
ইমাম হুসাইন সালামুল্লাহি আলাইহি অগুণতি আক্রমণকারীর দ্বারা আহত ও আক্রান্ত হন এবং সিমার দিলজাওসার হাতে শহীদ হন।
আবুল ফজল আব্বাস রা. শহীদ হন ইয়াজিদ বিন রুকাদ, হাকীম বিন তুফায়ল ও সালেহ বিন ওয়াহাব এর দ্বারা।
আবদুল্লাহ ইবনে আলী রা. শহীদ হন হানি আল হাজরামির হাতে।
জাফর রা. শহীদ হন হানির হাতে।
উসমান ইবনে আলী রা. শহীদ হন খুলি বিন ইয়াজিদ ও আবানি আল দারিমির হাতে।
মুহাম্মাদ ইবনে আলী রা. শহীদ হন আবানি আল দারেমির হাতে।
আবু বাকার ইবনে আলী রা.।
আবদুর রহমান ইবনে আলী রা.।
আবদুল্লাহ রা.- আলী ও লায়লা রাদ্বিআল্লাহু আনহুমার পুত্র।
ইমাম হাসানুল মুজতাবা রাদ্বিআল্লাহু আনহুর সন্তানদের মধ্যে:
আবু বকর ইবনে হাসান রা. শহীদ হন আবদুল্লাহ ইবনে আকাবার হাতে।
আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান রা. হারমালার হাতে শহীদ হন।
শহীদ হন ক্বাসিম (বন্টনকারী) ইবনে হাসান রা. উমার বিন সাদের দ্বারা।
ইমামে আলী মাক্বাম সাইয়্যিদুনা হুসাইন রাদ্বিআল্লাহু আনহুর সন্তানদের মধ্যে:
আলী আকবর (সুউচ্চ সুমহান) ইবনে হুসাইন ইবনে আলী সালামুল্লাহি আলাইহি শহীদ হন মুররাহ বিন মুনকিজ ও হাশিম বিন নামিরের হাতে।
কারবালার শিশু আবদুল্লাহ ইবনে হুসাইন রা. (আলী আসগর) শহীদ হন হারমালা ইবনে কাহিলের হাতে।
সাকিনাহ্ বিনতে হুসাইন রা., অভিশপ্তের কারাগারে দামেশক এ নিহত হন চার বছর বয়সে।
বিনতে সাইয়্যিদাতুন নিসা যাইনাব রাদ্বিআল্লাহু আনহা'র পুত্রদের মধ্যে:
আউন ইবনে আবদুল্লাহ বিন জাফর রা.
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ বিন জাফর রা.।
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ বিন জাফর রা., হাফসা রা.'র কন্যা খাউসা রা.'র পুত্র।
আব্বাস ইবনে আলী রা'র সন্তানদের মধ্যে:
ক্বাসিম রা.।
আল ফাদ্বল ইবনুল আব্বাস রা.।
কারবালার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বমোট ১০৪ জন শহীদের নাম পাওয়া যায় যাঁদের মধ্যে আলী রা.'র কমপক্ষে ১৯ পুত্র-দৌহিত্র-দৌহিত্রী রয়েছেন।
হে হুসাইন রা., আমি আপনার পদতলের ধূলা নিজের পোশাক দিয়ে পরিষ্কার করে কমই করছি, যা রাসূল দ. আমাকে জানিয়েছেন তা আশপাশের অন্যেরা ঠিকভাবে জানলে তারাও আপনার পদতলের ধূলা পরিষ্কারকে সর্ব্বোচ্চ কর্তব্য ধরে নিতেন। (সর্ব্বোচ্চ সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী, যাঁর বর্ণনার উপর পুরো হাদীসশাস্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সেই সাহাবী বৃদ্ধ আবু হুরাইরা রা., রাসূল দ.'র প্রত্যাগমনের অনেক পরে ইমাম হুসাইন রা.'র সামনে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে তাঁর পায়ে লেগে থাকে ধূলা পরিষ্কারে উদ্যত হলে ইমাম হুসাইন রা. তাঁকে বিরত করেন এবং আবু হুরাইরা রা.'র সম্মানের কথা বলেন। তখন তিনি এ কথা বলেন।)
ফাতিমা ও তার পরিবারের প্রতি বিদ্বেষপোষণকারী যদি মাক্বামে ইব্রাহীম ও ক্বা'বার কোণা (যেখানের মর্যাদা সর্ব্বোচ্চ এবং যেখানে কথিতভাবে সবার পাপ মাফ হয় এবং আল্লাহর সবচে নৈকট্য পাওয়া যায় স্থানের মর্যাদায়) এই দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এমনকি নামাজরত অবস্থায় সিজদা দিয়ে সিজদায় মারাও যায়, তবু তার উপর জাহান্নাম ওয়াজিব অবস্থায় থাকবে।
হে সমবেত সৈন্যবাহিনী! কিসাস বা হত্যা করার মত কোনও অপরাধ আমি বা আমার পরিবার কি করেছি কখনো? আমি কি কখনো কোনও মিথ্যা কথা বলেছি? কখনও কারো সম্পদ বা সম্মানের বিন্দুমাত্র অধিকার হরণ করেছি? আমি কি কখনো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল দ.'র বিধানের বাইরে কাজ করেছি? ঠিক কোন্ কারণে তোমরা আমাদের পানীয় জল অবরুদ্ধ করে রাখছ? এখনো (হিজরতের ৬০ বছর পর) রাসূল দ.'র সাহাবা রা. গণ কেউ কেউ জীবিত আছেন। তোমরা যদি জেনে না-ই থাকো, তাঁদের কাছে জেনে নাও, আহলে বাইতে রাসূল দ.'র উচ্চতা ও অধিকার কোথায়। জেনে নাও, হুসাইন না হলে পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তে মহান প্রতিপালকের রাসূলের আর কোন দৌহিত্র তোমরা পাবে না। তোমাদের মধ্যে কি আল্লাহর রাসূল দ.'র উম্মতের একজনও অবশিষ্ট নেই? তোমাদের মধ্যে কি একজনও মুসলিম অবশিষ্ট নেই?
ইয়া মুহাম্মাদা দ.! ইয়া রাসূল আল্লাহ দ.! আসুন, দেখে যান, আপনার পরিবারের সবাইকে ধূলার উপর নিহত করে শিরশ্ছেদ করে দেহের উপর ঘোড়া চালিয়ে বিকৃত করা হয়েছে। আপনার পুত্রদের সবাইকে লুপ্ত করা হয়েছে। আপনার কন্যাদের ঘোমটাবিহনীভাবে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইয়া মুহাম্মাদা! ইয়া রাসূলআল্লাহ!
এজিদের মন্ত্রণাপরিষদ! নিজেদের চোখ অবনমিত রাখো! যাকে দেখার চেষ্টা করছ, ভুলে যেও না, তিনি পাঁচ বছর প্রভুর রাসূল দ.'র কোলে প্রতিপালিত। আলী ইবনে আবি তালিব ও ফাতিমাতুয যাহরা'র সন্তান। লজ্জা করো, লজ্জা করো! -যাইনআব রা.'র সেবিকা।
নূহ আ.'র উম্মতের জন্য মহাপ্লাবনের সময় ওই তরী যেমন, আমার উম্মতের জন্য আমার আহলে বাইত তেমনি। যে এর আশ্রয়ে যাবে, রক্ষা পাবে, যে যাবে না, ধ্বংস হয়ে যাবে।
হে হাসান ও হুসাইন রা., তোমাদের পবিত্র দেহ থেকে আমি সব সময় জান্নাতের সুঘ্রাণ পাই।
এক বছর চল্লিশ দিন পর, মুক্ত নবী পরিবার রাদ্বিআল্লাহু আনহুম কারবালায় মহামহিম শহীদদের পবিত্র বিচ্ছিন্ন মাথা নিয়ে উপস্থিত হন। এবং কবরস্থ করেন!
কৃতজ্ঞতা ও উৎসর্গ: সহব্লগার নিয়েল হিমুভাই। এই পোস্টটা বহুদিন ড্রাফটে ছিল, করার ইচ্ছা ছিল না। তাঁর কথাতে লিখে রেখে দিয়েছিলাম। এবারো চেষ্টা করলাম, পারলাম না কারবালার বিষয় বা আহলে বাইতে রাসূলিল্লাহর প্রতি তীব্র পৈশাচিকতার বিষয়ে লিখতে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে এপ্রিল, ২০১৪ সকাল ৯:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



