আজকাল শিয়া এবং তথাকথিত 'সুন্নি' (আসলে ওয়াহাবি) দের মধ্যে সারা পৃথিবীতেই সফলভাবে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে শিয়া-ওয়াহাবী উভয়ের কমন শত্রু।
ব্রিটিশের ডিভাইড অ্যান্ড রুল।
শিয়াদের ধর্মবিশ্বাস বিষয়ে কেউ যখন লিখবে, তখন সে হয় পক্ষে লিখবে, নয়ত বিপক্ষে। এই লেখাটা এই কারণে বিষয়টা বোঝায় সাহায্যকারী হতে পারে যে, লেখার সময় পক্ষ-বিপক্ষ থেকে সরাসরি ফ্যাক্টের বিষয়গুলো আলোচনা হবে এবং শিয়া ও সুন্নির সরাসরি গোড়া থেকে আলাপ শুরু হবে।
লেখাটা ম্যাচিউর্ড মনোভাবে আসবে। অর্থাৎ, অকারণ আবেগ পরিহার করা হবে এবং অকারণ দলাদলির কথাবার্তা পরিত্যাগ করে ইসলামের অতি অভ্যন্তরের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হবে। এবং সংক্ষেপে অতি দ্রুত বিষয় পরিবর্তন করা হবে।
প্রথমেই ইসলামের মতভেদ বিষয়ক। আমি তো রেফারেন্সওয়ালা না। বুখারি সহ অণ্তত পাঁচটি সহিহ গ্রন্থের হাদিস, ইসলামে ৭৩ মতভেদ হবে, এবং একটি হবে পূর্ণ সঠিক আর তারা হল রাসূল দ. ও তাঁর সঙ্গী-অনুসারীদের দল।
আরো এক সঠিক হাদিস অনুসারে, রাসূল দ.'র গৃহবাসীগণ তথা তাঁর মহান জামাতা, মহান কন্যা ও তাঁদের দুই পুত্র এবং আল্লাহ ও রাসূল দ. যাদের যাদেরকে আহলে বাইত বলেছেন, সেই রাসূল দ.'র বংশধরগণ, তাঁর স্ত্রীগণ এবং সালমান ফার্সি রা. সহ কয়েকজন সাহাবা - এই আহলে বাইতগণই নূহ আ.'র কিশতি স্বরূপ, যে এতে অারোহণ করবে, মুক্তি পাবে, যে আরোহণ করবে না, ধ্বসে যাবে।
শিয়া মনোভাব তৈরি হয় তিন ক্ষেত্রে-
১. সাইয়্যিদি আলী রা. কে যাঁরা খিলাফাত ও ইমামাত এর একমাত্র যোগ্য উত্তরসুরী মনে করেন অথবা ওই অবস্থায় (তিন খলিফা যাবার পর) একমাত্র উত্তরাধিকারী মনে করতেন, তারাই আলী রা.'র অনুসারী বা শিয়া ছিলেন। এই অবস্থানে সাহাবা রা. গণের সাথে সাহাবা রা. গণের মতভেদ হতো যেখানে উভয়ই সঠিক। অর্থাৎ, ওই সাহাবা ও ওই তাবিয়িদের শিয়া বলা হলেও তাঁরা সর্বমান্য এবং সঠিক, যা পরবর্তীতে গ্রহণীয় নয়।
২. হাজারো বছর ধরে আরব কোন সক্ষম জাতি ছিল না। একদিকে ইরানের পারসিক সাম্রাজ্য আরেকদিকে ইতালির রোমান সাম্রাজ্য ছিল হাজারো বছর ধরে পৃথিবীর সবচে বড় এবং ক্ষমতাবান দুই সাম্রাজ্য এবং এ উভয়ের মধ্যবর্তী দক্ষিণমুখী অঞ্চল ছিল আরব।
আরবদের শাসনের অধীনে আসা সাবেক রোমান সাম্রাজ্যের অংশ যেমন সিরিয়া এবং সাবেক পারসিক সাম্রাজ্যের অংশ যেমন বর্তমান ইরাক এই উভয় অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের উপর প্রাধান্য চায়। এই প্রাধান্য চাইবার অংশ হিসাবে নিজ নিজ অঞ্চলের গভর্নর/খলিফা হজরত আলী রা. ও হজরত আমীর মুআবিয়া রা. কে তারা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের সম্মানিত জামাতা করে নেয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে।
সাবেক রোমান কিন্তু মুসলিম হওয়া সিরিয়রা (লেভ্যান্ট) চায় আমীর মুআবিয়া রা. খলিফা হোন এবং তাঁর মাধ্যমে সাম্রাজ্যতে তাদের প্রাধান্য থাক যেহেতু তারা সাম্রাজ্যের প্রাধান্যের গুরুত্ব সম্পর্কে হাজারো বছর যাবত ওয়াকিফহাল। একইভাবে ইরাকি অঞ্চলের (দজলা-ফোরাত অববাহিকা) মানুষ চায় আলী রা. কে প্রাধান্যে চাইতে। যদিও আলী রা. নি:সন্দেহে সর্বাধিক অগ্রগণ্য কিন্তু সেই অগ্রগণ্য থেকে বেশি প্রাধান্য পায় তাদের জাতীয়তাবোধ।
এভাবেই, শিয়া মনোভাব মূলত পারসিক/ফার্সি জাতীয়তাবাদের প্রোডাক্ট। অর্থাৎ, শিয়া মনোভাব ফার্সি জাতীয়তাবাদ এবং পাশাপাশি আহলে বাইতের ভালবাসায় সিক্ত।
এরই প্রমাণ স্বরূপ বলা যায়, শিয়ারা মাত্র ৩ জন অথবা বড়জোর একশো জনকে (মতভেদ সাপেক্ষে, শিয়াতেও মতভেদ রয়েছে) সাহাবা হিসাবে স্বীকৃতি দেন। এই তিনজনের একজন হলেন সালমান ফার্সি রা. যিঁনি ফার্সি, অথচ রাসূল দ.'র দেড় লক্ষ সাহাবী এবং পাঁচ লক্ষ তাবিয়ির প্রায় সবাইকে পথভ্রষ্ট বলা হয়।
৩. কিছু মানুষ বাহ্যিক পড়ালেখার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে আসেন এবং আহলে বাইতে রাসূল দ.'র ভালবাসা বলতে শুধু শিয়া মনোভাবকেই গ্রহণ করেন। এই ধরনের প্রচুর উদাহরণ সারা পৃথিবীতেই ছড়ানো আছে।
এবার শিয়াদের কিছু ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে সরল দৃকপাত করা যাক-
১. শিয়াদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, (যেহেতু শিয়াতেও মতভেদ আছে) মাওলা আলী রা.'র নবী হওয়ার কথা ছিল এবং জিব্রাঈল আ. রাসূল দ.'র কাছে চলে আসার কারণে রাসূল দ.ই নবী হয়েছেন। কিন্তু শিয়ারা নবুয়্যতে বিশ্বাস স্থাপন করেন ও রাখেন, এই বিষয়টা আমাদের বিবেচনায় রেখে এগুতে হবে।
২. শিয়ারা সিদ্দিকে আকবর রা., ফারুকে আজম রা. এবং যুন নূরাইন রা. এই তিন মহান খলিফাকে সম্পূর্ণ পথভ্রষ্ট, অন্যায়কারী, অন্যায় শাসক এবং সম্পূর্ণ পথচু্ত মনে করেন তাই শুধু না, মূল ধারার মতভেদে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, সিদ্দিকে আকবর রা. এবং ফারুকে আজম রা.'র উপর যে কোন মানুষের যে কোন পাপ প্রথমে আপতিত হয়।
৩. শিয়ারা মনে করেন আলী রা., ফাতিমা রা. ও হাসান-হুসাইন রা. গণের সম্মান এবং সক্ষমতা এবং অধিকার অন্য সকল সাহাবার থেকে ঊর্দ্ধে। আহলে বাইতের হিসাবে তাদের এই বিশ্বাস সম্পূর্ণ সঠিক। খলিফা হিসাবে মাওলা আলী রা.'র পাশাপাশি বাকি তিন খলিফা অত্যন্ত অগ্রসর এই বিশ্বাস তাদের নেই।
৪. আশারায়ে মুবাশশারা তথা বেহেশতের দশ সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবাকে পথভ্রষ্ট মনে করেন।
৫. রাসূল দ.'র প্রায় সকল সম্মানিতা স্ত্রীকে পথভ্রষ্ট মনে করেন, যা কুরআনের সরাসরি বিপরীত। রাসূল দ.'র সকল গৃহিণী আহলে বাইত- কুরআন অনুসারে, কুরআন অনুসারে তাঁরা সকলে সকল মুসলিমের মাতা।
৬. তাঁরা বিশ্বাস করেন, কুরআনের দুটি আয়াত বাদ দেয়া হয়েছে, কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, কুরআনের একটি সূরা বাদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া তাঁরা বর্তমান কুরআনের পুরোটাকেই মানেন, শুধু দুটি আয়াত যুক্ত হয়েছে এমনটা মনে করেন।
৭. চার মাজহাবের সকল ইমাম, সকল পথপ্রদর্শক, ৫০+ হাদীসের গ্রন্থের সকল ইমাম সবাইকেই পথভ্রষ্ট মনে করেন। সকল হাদীসগ্রন্থকে পথভ্রষ্ট মনে করেন। শিয়াদের নিজস্ব হাদীসগ্রন্থ রয়েছে যার মধ্যে আলী রা.'র লেখা হিসাবে প্রচলিত নাহজুল বালাগা- যে গ্রন্থে সত্যি আলী রা.'র কিছু লেখা রয়েছে- মানেন। শিয়ারা ইমামগণের গ্রন্থকে হাদীস হিসাবে বিবেচনা করেন।
৮. তাঁরা বিশ্বাস করেন, মাওলা আলী রা. প্রথম, ইমাম হাসান রা. দ্বিতীয় এবং ইমাম হুসাইন রা. কে তৃতীয় ধরে মহামহিম তাবিয়ি আলী ইবনে হুসাইন জাইনুল আবিদীন রা, কে চতুর্থ ধরে পরবর্তী বংশধারায় আরো আটজন সহ মোট বারোজন ইমাম এসেছেন। এই বারোজনের মধ্যে সর্বশেষজন ইমাম মাহদি রা. এখনো আসেননি অথবা তিনি এসেছেন কিন্তু আপন পিতার/ কোন আপনজনের জানাজার পর পাহাড়ে অদৃশ্য হয়েছেন বারো বছর বয়সে এবং তিনি ফিরে আসবেন সময়মত।
বলা বাহুল্য, এই বিশ্বাসগুলো প্রায় সম্পূর্ণ সঠিক। অসঠিকত্ব শুধু এই বিষয়গুলোতে- তিন খলিফাকে সেই বারোজনে অন্তর্ভুক্ত না বিবেচনা করা।
৯. কোন কোন শিয়া বিশ্বাস, (অধিকাংশ) এমন যে, বারো ইমামগণের কাছেও ওয়াহি আসত এবং তা কিতাব আকারে এবং সেই হিসাবে তাঁরা নবী বা নবীর সমতুল্য। অবশ্যই আহলে বাইতের ইমামগণের কাছে আল্লাহর বাণী আসতো, তা ওয়াহী নয়, বরং ইলহাম। তা কোন কিতাব নয় এবং নবুয়্যত নয়।
১০. শিয়াদের আরেক বিশ্বাস, বারো ইমাম নবীগণের থেকেও শ্রেষ্ঠতর। এই কথা সাধারণ হিসাবে সত্যি, কারণ রাসূল দ. বারবার বলেছেন, তাঁর উম্মাহর মধ্যে নবীগণ থেকেও উচ্চতর মর্যাদার ব্যক্তিরা আসবেন, কিন্তু তাঁরা অবশ্যই নবী নন। নবীর মর্যাদা নবুয়্যতের মর্যাদা যা ভিন্নতর অন্য সবকিছু থেকে।
১১. শিয়াদের বিশ্বাস, এই বারো ইমাম এবং রাসূল দ. এবং ফাতিমাতুয যাহরা রা. এই চোদ্দজন মা'সুম বা নিষ্পাপ। বিশ্বাস সঠিক, কিন্তু নবীগণ যেভাবে মা'সুম, নবী ভিন্ন অন্য মহানগণ সেভাবে মা'সুম নন। কিন্তু সম্পূর্ণ নিষ্পাপ অবশ্যই। এই চোদ্দজন ছাড়াও উম্মতে মুহাম্মাদীতে আরো অনেক মা'সুম বা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ রয়েছেন।
১২. শিয়াগণ কারবালার ঘটনায় নিহত আহলে বাইত রা. গণের শাহাদাতের জন্য এজিদ এবং তার শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করেন যা সম্পূর্ণ সঠিক।
১৩. শিয়ারা কখনো তিন ওয়াক্তের সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত আদায় করেন যা আমরা অন্য মুসলিমরা করি না, যদিও তা রাসূল দ.'র সুন্নাহ হিসাবে সঠিক।
১৪. অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আশহাদুআন্না মুহাম্মাদার রাসূলআল্লাহ বলার পর আযানে তাঁরা আশহাদু আন্না আলী ওয়ালিউল্লাহ বলেন। কথা সঠিক হলেও তা আযানে অকারণ সংযোজন।
১৫. শিয়ারা সাময়িক বিবাহ তথা মু'তা বিবাহে বিশ্বাস রাখেন যা অন্য ধারার মুসলিমরা রাখেন না। সাময়িক বিবাহ ইসলামে রদ হয়ে গেছে।
১৬. আলী রা. ও আহলে বাইতে রাসূল দ. গণকে জীবিত এবং সাহায্য প্রদানে সক্ষম মনে করেন, যা সম্পূর্ণ সঠিক।
১৭. তাঁদের তারাবীর নামাজের ধরণ ভিন্ন।
১৮. তাঁরা বুক চাপড়ে আহলে বাইতে রাসূল দ.'র শাহাদাত দিবসের স্মরণসমূহে শোক পালন করেন, নিজেদেরকে আহত করেন, ইমাম হুসাইন রা.'র প্রতীকী কবর নিয়ে মিছিল করেন, বাদ্য করেন, ইমাম হুসাইন রা.'র ঘোড়া দুলদুল এর প্রতীকী ঘোড়া সাজান, কখনো ছাগলের বাচ্চাকে আঘাত করে 'আবু বকর' নামের প্রতি কটাক্ষের মাধ্যমে প্রতীকীভাবে আয়িশা সিদ্দিকা রা. কে আঘাত করার অনুকরণ করেন, শোকগাঁথা গান- যার প্রতিটা কাজই সজ্ঞানে করা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং নিষিদ্ধ। কিন্তু জিঘাংসামূলক নয় এমন শোকগাঁথা, বুক চাপড়ানো ইত্যাদি কাজে কোন সমস্যা নেই।
১৯. এছাড়াও অনেক ধরনের সংস্কার প্রচলিত রয়েছে শিয়া বিশ্বাসে যার কোনই ভিত্তি নেই। তবে, আহলে বাইতে রাসূল দ. গণের স্মৃতিময় বস্তুসমূহ, তাঁদের মহামহিম মাজারসমূহে তাঁরা যে শ্রদ্ধা ও আদব প্রদর্শন করেন, সেসবকে শিরক বলা সম্পূর্ণরূপে বাড়াবাড়ি এবং বড় পাপ।
আশা করি এটুকুই শিয়া মতবাদের সাথে সাধারণ প্রচলিত অন্যান্য ইসলামি মতবাদের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। আহলে বাইতে রাসূল দ.'র ভালবাসার বিষয়ে শিয়াদের কোনপ্রকার দোষদুষ্ট করা যাবে না। তাদের ভুল যা, তা বাড়াবাড়ি, অন্যকে দোষারোপে, আহলে বাইতে রাসূল দ.'র প্রতি ভালবাসায় কোন সমস্যা নেই।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আহলে বাইতে রাসূল দ. গণ কোন সাধারণ মুসলিম নন বা এমনকি আর সব সাহাবাগণের সাথেও তুলনীয় নন। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিবারের নামাজে আমরা আহলে বাইতে রাসূল দ. গণের উপর সালাত আদায় করি। তাঁদের উপর সালাত আদায় না করলে চলে না। সুতরাং তাঁদের বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা এবং সঠিকভাবে জানা আমাদের উপর সর্ব্বোচ্চ কর্তব্য।
শিয়া থেকে ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভিন্নতা আমাদের ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝতে সহায়তা করছে কিনা, সেই ভাবনাটাই কার্যকর, আরসব অকার্যকর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



