somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্পঃ প্রতিশোধ

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১০:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বিকেলের শেষ ভাগে বোরাপাড়ার রাস্তার সামনের দিকে গেলে একটা অদ্ভুত দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। একটু টাকার লোভে কাঙ্গাল একদল মেয়েকে মুখে এক দলা পাউডার আর ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপষ্টিক মেখে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটা হয়তো ভদ্র সমাজের গ্রহনযোগ্য হবে না তবে আশার বিষয় হচ্ছে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। আমাদের ভদ্রসমাজের ভদ্রতাবোধ বড়ই বিচিত্র। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সেটা একটু একটু করে খসে পড়তে শুরু করে। বোরাপাড়া বাজারের ব্যস্ততার সাথে আবার ভদ্রলোকদের ভদ্রতাবোধের একটা ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক আছে। গাণিতিক ভাবে লিখলে ইকুয়েশনটা দাঁড়ায় এরকম-

F α 1/X

এখানে X হচ্ছে ভদ্রলোকদের ভদ্রতাবোধ এবং F হচ্ছে বোরাপাড়া বাজারের ব্যস্ততা।

একাসারিতে গোটা ত্রিশেক ঘর নিয়ে পাড়াটা । পাড়ার একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরটা সুরভীর। এই মুহূর্তে সে বারান্দায় বসে সাজসজ্জায় ব্যস্ত, হাতে একটা ছোট আয়না যার উল্টোপাশে চিত্রনায়িকা শাবনুরের ছবি। সামনে একটা বাটিতে রাখা কিছু বরইয়ের আচার। এই মুহূর্তে তার সকল মনযোগ আবর্তিত হচ্ছে একটা ফেয়ার এণ্ড লাভলির শীর্ণ কৌটাকে ঘিরে। সর্ব শক্তি দিয়ে সেখান থেকে কিছু একটা আজ সে বের করেই ছাড়বে।

পাড়ার সদর দরজা দিয়ে বছর ত্রিশের এক যুবককে আমরা ভিতরে প্রবেশ করতে দেখি। যুবকের নাম হেকমত আলী। পেশা গ্রামে গঞ্জে ও লোকাল ট্রেনে তাবিজ বিক্রি। এই মুহূর্তে তার গায়ে একটা ময়লা চেক শার্ট ও কোমর থেকে নিচের অংশে একটা সিরাজগঞ্জী লুঙ্গি। যুবকের গা দিয়ে একটা মৃদু গন্ধ ভেসে আসছে, সম্ভবত সারাদিন গোসল করা হয়নি। সদর দরজা দিয়ে ঢুকে সোজা সুরভীর ঘরের সামনে চলে যায় হেকমত। হেকমতকে দেখেও না দেখার ভান করে সুরভী। অবহেলাটাকে পাত্তা না দিয়ে বারান্দায় একটা পিঁড়ি নিয়ে ধুপ করে তাতে বসে পড়ে হেকমত এবং মুখে একটা সতেজ হাসি ধরে রেখে মোলায়েম কন্ঠে বলে- কেমন আছস সুরভী ?

সুরভী এক দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ হেকমতের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর এক ঝটকায় কাঁধে রাখা হেকমতের হাতটাকে সরিয়ে দিয়ে কর্কশ ভঙ্গীতে উত্তর দেয়- এতদিন কোন মাগীরে হান্দাইছিলি হারামাজাদা? আজ মনে পড়ছে আমার কথা?

সুরভীর মুখে খিস্তি শুনে হেকমতের হাসির ঝলক আরো খানিকটা বাড়ে।

-কি যে কস না তুই ? তোর কথা কি মনে না পইড়া পারে? কয়দিন নসুন্দিতে থাইকা আইলাম। পকেটেও টাকা পয়সা নাই ঐ কারনে আহি নাই?

-আইজকা কি টাকা নিয়া আইছস নাকি টাকা ছাড়া? দুই দিনের দুইশ দুইশ চারশ টাকা বাকি? আইজকা কিন্ত টাকা না দিলে তোরে ঘরে তুলুম না?

সুরভীর মুখটা শক্ত হলেও অন্তরটা নরম এই তথ্যটা হেকমত জানে। যদিও আজ তার মুখটাকে একটু বেশিই শক্ত বলে মনে হচ্ছে তবু হাল ছাড়ে না হেকমত। কণ্ঠটাকে আরো খানিকটা মোলায়েম করার চেষ্টা করে সে।

-এমন করিছ না সুরভী। তাবিজ বেইচা সারাদিনের কামাই ১০০ টাকা। ৫০ টাকা দিয়া দুপুরে খাইছি, আর ৫০ টাকা আছে। আল্লার কছম লাগে সামনের সপ্তায় তোর সব টাকা শোধ কইরা দিমু ।

-তোর কোন কথা শুনুম না, গতবারও কইছস এই কথা, আজ টাকা না দিলে তোরে ঘরে তুলুম না এইটাই ফাইনাল।

-মাইনষের উপর বিশ্বাস হারান পাপ বুঝছস সুরভী, আজ যে ফকির কাইল সে বড়লোক হইবার পারে আবার আল্লায় চাইলে আজ যে বড়লোক কাইল সে পথের ফকির।

শেষ কথাটার পর কয়েক মুহূর্তের জন্য সুরভীকে গভীর চিন্তায় মগ্ন বলে মনে হয় কিন্ত শেষপর্যন্ত তার পেটের চাহিদার কাছে হার মানে হেকমতের দার্শনিকতা। তাইতো অগ্নিমূর্তিতে তার কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হয় - বাইর হ তুই আমার ঘর থাইকা?

হেকমতকে আর কোন অনুনয় বিনয় সুযোগ না দিয়ে ততক্ষণে খাটের নিচ থেকে একটা দা বের করে আক্রমন করার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়েছে সুরভী। দা হাতে দাঁড়ানো সুরভীকে অসুর বধে উন্মত্ত দুর্গা মূর্তি বলে বিভ্রম হয় হেকমতের। অবস্থা বেগতিক দেখে ব্যর্থ শিকারীর ন্যায় মাথা নিচু করে বের হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না তার। জীবনে এই প্রথমবার তাকে দারিদ্রের কাছে পরাজিত বলে মনে হয়।

পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ফুঁকতে ফুঁকতে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় হেকমত। আজ রাতটা তাকে সেখানেই পার করতে হবে। ভাদ্র মাসের প্লাবিত জ্যোছনায় ষ্টেশনের রাস্তার হাঁটার সময় একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের সঙ্গে নুতুন করে পরিচিত হয় হেকমত। ষ্টেশনের পুরোনো ঘরটার সামনে ফাঁকা জায়গায় দুটো কুকুর কুকুরী আদিম লীলা খেলায় মত্ত। আন্দোলিত হেকমত কি যেন ভেবে তাদের দিকে এগিয়ে যায় এবং কোন কিছু না ভেবেই মাদী কুকুরটির কোমর বরাবর কষে একটা লাথি বসিয়ে দেয়। করুণ একটা আর্তনাদ করে আলাদা হয়ে যায় কুকুর দুটো। পুরুষ কুকুরটি হেকমতকে আক্রমণ করতে যেয়েও কোন এক রহস্যময় কারণে পিছু হটে। বিজয়ী হেকমতের ঠোটের কোণায় একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠে, জোছনার রুপালী আলোয় তাকে সুন্দর দেখায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১০:৪৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছোট পোস্ট!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯


জুলাই সনদে স্বাক্ষরের দিন ড. ইউনুস বলেছেন, “এই সনদে স্বাক্ষর করলে আমরা বর্বরতা থেকে সভ্যতায় উন্নীত হবো।”
আর গতকাল উনি বলতেছেন বাঙালি হচ্ছে বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে জালিয়াত জাতি! তো জুলাই সনদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯

তিন শ' এক//
আমার সাহস দেখে, জানি. তুমি খুব রেগে যাবে।
ঘরহীন, সর্বহারা ভালোবাসা জানায় কিভাবে ?

তিন শ' দুই//
চোখের মালিক ঘোর নিঃশ্বতার আঁধারে ডুবেছে;
তবুও বেকুব চোখ সুন্দরের নেশায় ডুবেছে!
...বাকিটুকু পড়ুন

পলাশী ১৭৫৭, বাংলাদেশ ২০২৬ঃ সিরাজের বাহিনি ও বিএনপি

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০



সামনের ইলেকশনে যদি ডিপস্টেট, জামাত ও এঞ্চিপির যৌথ প্রচেষ্টায় 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' বা 'মেকানিজম' হয় (যেটার সম্ভাবনা নিয়ে অনেকেই আলোচনা করছেন অনলাইন-অফলাইন-দুই জায়গাতেই), তবে কি বিএনপি সেটা ঠেকাতে পারবে? পারবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জালিয়াতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪৯



জালিয়াতি -১
কয়েক মাস আগে, লন্ডন থেকে আমার এক আত্মীয় ফেসবুকে ম্যাসেজ করলেন যে, ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের সাথে আমার একটি ফোটোকার্ড ইন্টারনেট দুনিয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আমি চমকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের কোনো বিকল্প নাই ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৩


ঢাকার মিরপুরে পরিচয় গোপন করে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের এক পোড়খাওয়া নেতা টাইম ম্যাগাজিনের তারেক রহমান কে নিয়ে লেখা বাংলা অনুবাদ পড়ছিলেন । প্রচ্ছদে তারেক রহমানের ছবি, নিচে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×