
শীত আসতে না আসতেই যশোহরের গ্রাম অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি ঘরে কলাই আর চাল কুমড়া দিয়ে বড়ি বানানোর ধুম পড়ে যায়।
এটি বেশ শ্রমসাধ্য কাজ।সময়ও লাগে প্রচুর। গ্রামীন ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ডাল ও কুমড়ার তৈরি বড়ি।
বড়ি তৈরির উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয় কালো কলাই (ঠিকরি কলাই) ও চাল কুমড়া। অনেকে চাল কুমড়া ছাড়াও মুলা ,পেঁয়াজ ও পেঁপেকে ব্যবহার করে থাকে।
বাজার থেকে কিনে অথবা নিজ জমিতে উৎপাদিত কলাই প্রথমে কুলায় ঝেড়ে পরিষ্কার করা হয়। তারপর পাথরের জাঁতায় মাড়াই করে সূক্ষ্মভাবে পরিষ্কার করে নিয়ে, আবহাওয়া ভালো বুঝলে কলাই পানিতে ভেজানো হয়। এই ভেজানোর প্রক্রিয়া সকালের দিকে শুরু করা হয়।
তারপর দুপুরের খাওয়া সেরে সেই ভেজানো কলাই চটের বস্তায় ডলে ডলে পরিষ্কার করা হয়। তারপর পুকুরের পানিতে কলাই ধোয়া হয়। কখনই টিউবয়েলের পানিতে কলাই ধোয়া হয় না । টিউবওয়েরের পানিতে আয়রন থাকাতে বড়ি লালচে হয়ে যায়। দেখতে বাজে দেখায়।
যাহোক কলাই ধোয়ার পরেও কোন কোন কলাইয়ের গায়ে সবুজ খোসা থেকে যায় সেগুলো হাতে করে চাল বাছাই করার মতো বাছতে হয়। এক্ষেত্রে এই বাছায়ের কাজে ছোট বড় পাড়াপ্রতিবেশি সবাই অংশগ্রহণ করে এবং বেশ হৈ হৈ রৈ রব পড়ে যায়।
এরপর বাকি রইলো বড়ি তৈরির আরেক উপাদান চালকুমড়া। প্রথমে কুমড়োটাকে বঠি দিয়ে মাঝ বরাবর দু ফালি করে নেওয়া হয়্ তার পর বুকের নরম অংশ থেকে বীজগুলোকে আলাদা করে ঝিনুক দিয়ে কুরে নেওয়া হয়।
সব প্রক্রিয়া শেষে সন্ধ্যার একটু পরে বা মাঝরাত্তিরে ঢেকিতে কুটে পেস্ট করা হয়।তবে ইদানিং ডেকির স্বল্পতার কারনে অনেকে মিল থেকে কুটে আনে। তবে মিলে কোটা বড়ির স্বাদ ততটা ভালো হয় না।অনেক আগে আরেকটি প্রক্রিয়া দেখতাম শহর অঞ্চলে । শিল পাটায় বেটে বড়ি দেওয়া হতো।
যাহোক বড়ি কুটে সারারাত খোলা আকাশের নীচে শিশিরে রেখে দেওয়া হয়। খুব সকালে উঠে সেই কুটা বড়ি হাত দিয়ে দীর্ঘক্ষণ ফেনাতে হয়।
মিশ্রণ ঠিকভাবে হয়েছে কি না তা দেখার মহিলারা মাঝে মাঝে বড়ির আকৃতি করে পানির পাত্রে ছেড়ে দিলে তা যদি ডুবে যায় তবে আরও ফেনাতে (নাড়াচাড়া করতে) হয়, আংশিক ভাসলে বড়ি তৈরি উপযোগী হয়েছে বলে মনে করা হয়।
তারপর বাড়ির ছাদে বা উচু স্থানে সুতি মশারী, পরিষ্কারপাতলা কাপড় কিংবা প্লাস্টিকের জ্বাল দড়ির উপর ওই ফেনানো উপকরণটি হাতের সাহায্যে বড়ি আকৃতি করে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়।
এবং মাঝে মাঝে রোদে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে ৫/৬ দিন ভাল করে রোদে শুকাতে হয়।পরিষ্কার আবহাওয়া এবং তীব্র শীতে বড়ি বানালে সেই বড়ি স্বাদযুক্ত হয় বেশি।
মেঘলা ও ঘন কুয়াশা থাকলে বড়ি গন্ধ ও লাল হয়ে যায়। সে গুলি সহজে সিদ্ধ হয় না। খেতেও ভাল লাগে না। ভালোভাবে শুকিয়ে মুখ আটানো পাত্রে সংরক্ষণ করলে ১২ থেকে ১৪ মাস পর্যন্ত খাওয়া যায়।তবে গরম পড়ে গেলে বড়ি ততটা স্বাদ লাগে না।
বড়ির সাথে ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছ, বেগুণ, হাঁস, মুরগীর ডিম বেশ মজাদার খাবার।বেগুন দিয়ে বড়ি অথবা বড়ি আর আলুর ঝোল খুব সুস্বাদু খাবার।
©রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০২০ রাত ৯:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




