শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি যে রেললাইনের দোরগোড়ায় আমার ঝুপড়ি ঘর হলেও কোনদিন মনের খায়েশ মেটানোর অভিপ্রায়ে রেলগাড়ীতে ওঠা হয়নি আমার।
এ কথা শুনে ভাবতে পারেন এটা আবার কোন কথা হলো? এ আর এমন কি ব্যপার টুক করে রেলগাড়ীতে উঠে পড়লেই তো হলো।
টুক করে রেলগাড়ীতে কতই তো উঠি কিন্তু বাবুরা অনেক সময় রেগে গালাগাল করে নামিয়ে দেন,তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন। আর এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে রেলগাড়ী চড়াকে কি রেল ভ্রমণ বলে?
আমি সেই অর্থে রেলগাড়ী চড়াকে বোঝাতে চেয়েছি যেমনটি সবাই মিলে দুরে কোথাও বেড়াতে যায় আত্নীয় পরিজন নিয়ে।
আত্নীয় পরিজন!
কথাটা শুনতে বেশ।কিন্তু আমার নিজের আত্মীয় পরিজন বা আপনজন বলতে এ পৃথিবীতে কেউই নেই।
বাবা কোথায় থাকে কি করে বা করতেন তা জানি না। জানা সম্ভবও না কোনকালে,তো সেই সূত্রে কোন আত্নীয় থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
আর মা? সে তো পাগলী ছিল তাকে সবাই দুলু পাগলী বলে ডাকতো। এমন অদ্ভুত নাম তার কি করে হলো তা না জানতে পারলেও এটুকু অনুমান করতে পারি যে সে পাগলামির সময় মা দুলে দুলে গান গাইতো।তাই তার নাম দুলু পাগলী।
সেই দুলু পাগলীর কখনও বিয়ে হয়েছিল কিনা কেউ সেটা বলতে না পারলেও তার গর্ভে আমি হয়েছি এটা কিন্তু সবাই জানে। তাই জ্ঞানত দুলুই আমার মা।
সেই মা আমায় জন্ম দিলেন ঠিকই কিন্তু পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে জন্ম হয়নি আমার।বোঝাতে পারলাম না হয়তো।আসলে জন্মের থেকে আমার দুই পা নেই।
অদ্ভুত!
এটাই নিয়তি। আরেকটু বড় যখন হলাম তখন একটা দূর্ঘটনায় আমার ডান চোখে খোঁচা লাগলো। কী যে যন্ত্রণা বলে বোঝাতে পারবো না আমি। দিনগুলো অনেক কষ্টে গেছে।
অনেকদিন লেগে ছিল ক্ষত শুকাতে।ক্ষত তো শুকালো।কিন্তু আমি একচোখে দৃষ্টি হারালাম।
বাবুমশাইরা নিজের কথা অনেক বললাম।প্রতিদিনই বলি বলতে হয়।আজ আর বলতে পারছি না বাবুমশাই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে।পেট জ্বলে যাচ্ছে। খুব খিদে পেয়েছে।খুব....
গতকাল থেকে কিছু খাইনি,শরীর জুড়ে প্রচন্ড জ্বর আর ক্লান্তি।একটু সাহায্য চাইছি।
দুটো টাকা অথবা কিছু খাবার হবে কি বাবুমশাইরা?
হঠাৎ একজন মোটাসোটা লোক আমার দিকে তেড়ে এলো।
-নাম! নাম বলছি।
-নামবো কেন আমি কি করেছি অমন করছেন কেন?
-নামতে বলছি নেমে যা।
-একটু কিছু সাহায্য করুন।আমার পা নেই এক চোখ অন্ধ। আমি অক্ষম মানুষ। একটু সাহায্য চাইছি...
ওকি? একি করছেন? আমায় মারছেন কেন? কি করছি আমি? চুরি তো করিনি? আমি লুলা অক্ষম মানুষ একটু দয়া করবেন তা না আমায় মারছেন।কেন মারছেন? এ কেমন বিবেক আপনাদের?
তারা আমায় মারতে মারতে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিলেন। কে একজন বলল,
-কোন কমন সেন্স আছে এই বেহায়াগুলোর? করোনা নিয়ে উঠেছে ট্রেনে এই রাস্কেলগুলোর জন্য তো করোনা ছড়াচ্ছে।
কি করে বোঝাই এদের আমি যে আমার করোনা হয়নি। একটু জ্বর হয়েছে। আর খুব খিদেও পেয়েছে।
একটু সাহায্য চাইছি বাবুমশাইরা।......
আমি পরবর্তী ট্রেনের অপেক্ষা করতে লাগলাম... যদি কিছু খাবার অথবা টাকা মেলে।
ক্ষুধার জ্বালার মত নিষ্ঠুর কিছু এই পৃথিবীতে নেই। এ কথা কি করে বোঝাই.........
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০২২ সকাল ৯:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




