somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ফাঁদ

২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আজ সারাদিন অঝর ধারায় বৃষ্টি, থামার কোনো লক্ষণ নেই। যশোর-নড়াইল মহাসড়কের রূপগঞ্জের এক নির্জন ফিলিং স্টেশনের একপাশে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আতিক।

রাত এখন আড়াইটা। চারপাশ শুনশান নীরব। আতিকের শেষ সিগারেটটা টানা শেষ। চোখে মুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ। ঠিক সেই মুহূর্তে হেডলাইটের আলোয় বৃষ্টি চিরে একটি কালো প্রাডো এসে থামল আতিকের বাইকের ঠিক সামনে।

গাড়ি থেকে একজন পরিপাটি ভদ্রলোক নেমে এলেন। গায়ে দামি কোট, চোখে চশমা। কিন্তু লোকটার চোখে-মুখে চরম আতঙ্কের ছাপ। তিনি সোজা এগিয়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন


-"ভাইয়া, একটু সাহায্য করবেন প্লিজ! আমি খুব বিপদে পড়েছি।"


— "কী সমস্যা?" আতিক কৌতূহলী চোখে তাকাল।



— "বুঝতে পারছি না... ব্রিজের পর থেকেই রিয়ারভিউ মিররে দেখছি পেছনের সিটে কেউ বসে আছে। নামতে বললেও নামছে না, কোনো উত্তরও দিচ্ছে না। চোখের দিকে তাকালে বুক কেঁপে উঠছে! লোকটাকে আমার গাড়িতে রাখতে চাই না... বড় অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে!"

আতিক সামান্য হেসে লোকটাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল
-"ইন্টারেস্টিং! আপনার কি মনে হয়, ভূত? হা হা হা! চলুন তো দেখি, পুরুষ মানুষ এত ভয় পেলে চলে? তা এত রাতে কোথা থেকে আসছেন?"

লোকটি কোনো উত্তর দিল না। ভয়ে তার স্বাভাবিক বোধ সম্ভবত কাজ করছে না।

লোকটি কাঁপতে কাঁপতে রিমোট দিয়ে গাড়ি আনলক করলো। আতিক গাড়ির দরজার কাছে গিয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালালো। ভেতরে আলো ফেলে বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। না, কিচ্ছু নেই! সিট একদম খালি!

আতিক নিজের মনেই খানিক মুচকি হাসল। লোকটা হাঁ করে তাকিয়ে আছে, মুখটা চরম বিব্রত।

— "একটানা ড্রাইভিং করে মন-মগজ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আপনার," আতিক আরও যোগ করল, "এসব আপনার চোখের ভুল। ভালো কথা, সিগারেট হবে একটা? যেকোনো ব্র্যান্ড হলেই চলবে।"

লোকটি সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। আতিক একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল

"ঠিক আছে, আপনি নিশ্চিন্তে যান। আর কোনো সমস্যা হবে না আশাকরি ।"

লোকটি অস্পষ্টস্বরে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠে দ্রুত স্পিডে বেরিয়ে গেল।

গাড়িটা অন্ধকারে মেলাতেই আতিকের চোখের ভাষা বদলে গেল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দ্রুত ডায়াল করল।

— "বস? টার্গেট বের হয়েছে। কালো প্রাডো, নম্বর ৪৭৬১। ও একা। নহরকান্দির দিকে যাচ্ছে। দ্রুত পজিশন নিন।"

ওপাশ থেকে উত্তর এল, "গুড জব। তুই দূরত্ব বজায় রেখে পিছু নে। বাজারে ঢোকার মুখে ঘেরাও করব।"

আতিক হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে বাইক স্টার্ট দিল।

বৃষ্টির তীব্রতার মধ্যে ৪০-৫০ স্পিডে বাইক চালিয়ে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ এগোতেই আতিক দেখল—রাস্তার পাশে জঙ্গলঘেরা ফাঁকা জায়গায় প্রাডো গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিন বন্ধ!

একজন পেশাদার খুনির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। হঠাৎ লোকটা এই নির্জন জায়গায় গাড়ি থামাল কেন? এটা কি কোন ফাঁদ?


আতিক বাইকের লাইট নিভিয়ে দূরে দাঁড়াল। পকেট থেকে কোল্ট ডাবল-অ্যাকশন রিভলভারটা বের করে সেফটি ক্যাচ অফ করল। তারপর নিঃশব্দে গাছের আড়াল নিয়ে এগোতে লাগল প্রাডোর ড্রাইভিং সিটের জানালার দিকে। পাম্পের পজিশন সুবিধাজনক ছিল না বলে আগেরবার সুযোগ মিস হয়েছিল, এবার আর কোনো ভুল নয়।

কাছে গিয়ে আতিক চকিতে ভেতরে আলো ফেলল—ভেতরে কেউ নেই! গাড়ি সম্পূর্ণ খালি!

ঠিক তখনই আতিকের ঘাড়ের পেছনের রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। বিপদের গন্ধ পেয়েই সে বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু তার আগেই মাথার পেছনে অনুভব করল একটা ঠান্ডা, কঠিন ধাতব স্পর্শ!

পিস্তলের নল!

একই সাথে একটা চেনা, বরফের মতো ঠান্ডা গলার কণ্ঠ কানের কাছে ভেসে এল
- "ধন্যবাদ ভাই! পাম্পের নাটকটা ভালোই করেছিলে। তবে পকেট থেকে রিভলভারটা বের করতে একটু বেশিই দেরি করে ফেললে। পাম্পে সুযোগটা হাতছাড়া করার জন্য আফসোস হচ্ছে নিশ্চয়?"

আতিকের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তে হিম হয়ে গেল!

পেছন থেকে ফিসফিস করে উঠে এল শব্দগুলো
— "গাড়ির পেছনের সিটে ভূতের নাটকটা না করলে কি আর তুই আসল টার্গেট ছেড়ে আমার পিছু নেওয়ার জন্য এত সহজে ফাঁদে পা দিতিস? নহরকান্দি ব্রিজে তোদের পুরো গ্যাং আমার আসল প্রাডো আর বডিগার্ডদের ওপর হামলা চালাতে গিয়ে অলরেডি পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছে। ওটা ছিল 'ডিকয়', আর আমি? আমি অন্য এক সাধারণ গাড়িতে তোর পিছু পিছু এখানেই আসছিলাম।"

ঘাড় ঘুরিয়ে স্ট্রিটলাইটের আবছা আলোয় আতিক দেখল—সেই দামি কোট পরা চশমা পরিহিত রায়হান সোবহান। চশমার নিচে তাঁর চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, সেখানে জ্বলছে এক নির্দয় ও বিজয়ী শিকারীর চোখ!

পিস্তলের নলটা আতিকের মাথায় আরেকটু চেপে ধরে রায়হান বললেন

-- "অস্ত্রটা আস্তে নিচে ফেলো আর বাইকে ওঠো। পেছনের সিটে আমি বসব—তবে এবার চালক তুমি, নির্দেশক আমি। চলো, সোজা থানায় যাওয়া যাক!"
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সবাইকে একসঙ্গে লড়তে হবে এর কোনো বিকল্প নেই।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৩৫

সবাইকে একসঙ্গে লড়তে হবে এর কোনো বিকল্প নেই।
যারা ভাবছেন ঘরে বসে থাকলেই সবকিছু আপনাআপনি হয়ে যাবে, তারা ভুল ভাবছেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

Out of the frying pan into the fire- কড়াই থেকে অগ্নিকুণ্ডে!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫২



Out of the frying pan into the fire- কড়াই থেকে অগ্নিকুণ্ডে!

ইংরেজি প্রবাদ “Out of the frying pan into the fire”- অর্থাৎ এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরও বড় বিপদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩



চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

উনি আমাদের ভবেরচর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়টা শুধু পোস্ট অফিসের প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের এক আন্তরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীরব আত্মপক্ষ।

লিখেছেন রাজা সরকার, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০

নীরব আত্মপক্ষ।

স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনের মাসুল বাঙালি হিন্দুকে গুণে গুণে দিতে হয়েছিল ব্রিটিশকে । বাকিটা মুসলিম লীগ ও নেহেরুইয়ান কংগ্রেস মিলে যা করার করে গেছে। এবং পরবর্তীকাল থেকে মুসলিম... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই সমাজ- ৭২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৩



দেশের সরকার অযোগ্য অদক্ষ হলে, জনগনের শান্তি থাকে না।
দেশের জনগন সারাদিন কাম কাজ করে। অফিসে নানান রকম যন্ত্রনা পোহায়। নানান জক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। অফিসে থাকে না... ...বাকিটুকু পড়ুন

×