somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

গায়েন রইসউদ্দিন
আমি রইসউদ্দিন গায়েন। পুরনো দুটি অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করতে না পারার জন্য আমি একই ব্লগার গায়েন রইসউদ্দিন নামে প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছি এবং আগের লেখাগুলি এখানে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আবার প্রকাশ করছি।

যে জাতির ভাষা নেই, সে জাতির আশা নেই (একটি দীর্ঘ পরিক্রমা) প্রথম পর্ব

০৩ রা মার্চ, ২০২১ রাত ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে জাতির ভাষা নেই, সে জাতির আশা নেই (একটি দীর্ঘ পরিক্রমা) প্রথম পর্ব
রইসউদ্দিন গায়েন
বাঙালি একটি সম্প্রদায় বললে ভুল বলা হবে । বাঙালি একটি জাতি । বাঙালি জাতি আজ সারা পৃথিবীতে একটি সুসভ্য জাতি হিসেবে পরিচিতি-লাভ করতে পেরেছে তার ভাষাগুণে । বাংলা শুধুমাত্র একটি সমৃদ্ধ ভাষা নয়, এটি পৃথিবীর মধুরতম ভাষা । এটা শুধু আমার কথা নয়, ইউনেস্কো (UNESCO) স্বীকৃত ।
আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সরকারি শিক্ষাবিভাগে দীর্ঘ ৩৪বছরের কর্মজীবনে (শিক্ষক) বেশিরভাগ সময় কেটেছে দ্বীপাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে । এঁদের অধিকাংশই পূর্ব-বঙ্গীয় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন । তাঁদের সঙ্গে থাকতে থাকতেই তাঁদের মুখের ভাষা আমি অনেকটা রপ্ত করতে পেরেছি । এর ফলে, তাঁদের জীবনের বহু অজানা ইতিহাস জানার সুযোগ হয়েছে । এঁদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ । এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা তখনকার দিনে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন । বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন সামাজিক অধিকারের ক্ষেত্রেও। কেউ কেউ আমাকে প্রশ্ন করেন-‘আপনি বাঙালি না মুসলমান?’ প্রশ্নটা আমাকে হতবাক করেছিল । কারণ আমরা জানি আলো-র বিপরীতার্থক শব্দ অন্ধকার, ভাল-র বিপরীত মন্দ, কালো-র বিপরীত সাদা । তাই বলে দাদা-র বিপরীত তো আর কাদা হতে পারে না । তাই, এককথায় উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম-‘বাঙালি আর মুসলমান’ কাকে বলে আপনি যদি দয়া করে আমাকে একটু বুঝিয়ে দেন, তাহলে উত্তর দেওয়া সহজ হয় । এবার ভদ্রলোক সবিনয় বললেন-‘না, না, মাস্টার মশাই—ঘটনা হইছে কি, আমাগো পোলাপানরা আপনার নাম কয়, আমাগো মতন দ্যাশছাড়া মানষের লইয়া কত গান লেখছেন, শুইন্যা পরানডা কাইন্দ্যা ওঠে নিজের দ্যাশের লগে’। তাই আপনারে জিগাইলাম ! মনে কিছু কইরেন না’। আমি সসম্মান তাঁকে বললাম—‘না, না, আমার মনে করার কিছু নেই—তবে, আমরা যেহেতু শিক্ষক, তাই ভাষা-সংশোধন করার দায়িত্বও অনেকটা আমাদের । আপনার প্রশ্ন যদি এমন হতো—‘আপনি হিন্দু না মুসলমান? অথবা আপনি কি বাঙালি না অ-বাঙালি?’তাহলে উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সহজ হতো । যাহোক, আপনার কথায় আসি । ‘রইসউদ্দিন’ নাম শুনলেই তো বোঝা যায় যে এটি একজন মুসলমানের নাম । তবে, আমার নামের শেষে ‘গায়েন’ কেন হল,(?) এ-প্রশ্ন আপনার মনে আসতেই পারে, তাই হয়তো আপনি এরকম প্রশ্ন করেছেন । আমার সহজ উত্তর এই—‘রইসউদ্দিন’ কীভাবে হল, আর ‘গায়েন’ কীভাবে এল— তা’ আমি জানি না । আমাদের পূর্ব-পুরুষরা হয়তো ভাল বলতে পারতেন’। যা’হোক এখানেই শেষ হ’ল প্রশ্নোত্তর পর্ব ।
আমার অন্তর্বেদনার কারণ এটাই যে বাঙালি জাতির একজন ভাল মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে, ‘রইসউদ্দিন গায়েন, হিন্দু না মুসলিম?’ এই প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় আজও !
‘জন্ম হউক যথা-তথা, কর্ম হউক সার’—কথাগুলি আমরা বলি বটে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এই কথাগুলির মান রাখতে পারি না আমরা । এটাই আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ।
হিন্দু বা মুসলিম, মানুষের ধর্মীয় মতবাদের পরিচয় হতে পারে, কিন্তু এটা কখনো তার জাতির পরিচয় নয় । আর কোনো একটি মতবাদ জাতির চেয়ে বড় হতে পারে না । ভাষা একটি জাতির সবচেয়ে বড় পরিচায়ক । আরও স্পষ্ট করে বলতে হয় ভাষাই হল একটি জাতির প্রাণ । বাঙালি জাতির বৈশিষ্ট্য মূলত তার ভাষায় । সাংস্কৃতিক অঙ্গণে, ধর্মাচরণে বিভিন্নতা থাকলেও, একই ভাষায় আমরা কথা বলি—তাই আমরা বাঙালি । কবির কথায়-‘মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান’!
জীবনের দীর্ঘ সময় আন্দামানে থাকার সুবাদে, এক বিশাল বাঙালি জনগোষ্ঠির ভাষা কীভাবে ধীরে ধীরে হিন্দি-আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে, আমি আমার অনেক লেখায় তা প্রকাশ করেছি, তার পুনরাবৃত্তি এখানে করতে চাই না । শুধু একথাই বলতে চাই, এই বিশাল জনগোষ্ঠির ভাষা-মৃত্যু মানে, আন্দামানে একটি জাতির অপ-মৃত্যু । যেভাবে, একের পর এক, বাংলা-মাধ্যম স্কুলগুলি হিন্দি-মাধ্যমে রুপান্তরিত হয়ে আসছে, যেভাবে বাংলামাধ্যম স্কুলগুলিতে হিন্দিমাধ্যমের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে, তা’ যে বাংলা-বিনাশের অপকৌশল, বুঝতে অসুবিধে হয় না । সরকারি ভাষা এখানে হিন্দি ও ইংরেজি । তৃতীয় স্থানে জনকন্ঠ’র ভাষা বাঙলা স্বীকৃত হওয়া বাঞ্ছনীয় । কিন্তু তা যাতে বাস্তবায়িত না হয়, তার জন্য আছে ভাষাশক্তি সংগঠিত না হতে দেওয়ার নানা সরকারি কৌশল ।
ভাষা কিভাবে কলুষিত হচ্ছে দেখা যাক—‘কী খাবি রে, মনা ? জংলিঘাটের বাজারে যাইয়া দেহি—‘ভিন্ডি’ আশি ট্যাহা কিলো আর ‘লোবিয়া’ ষাট ট্যাহা গাট্টা, ‘লৌকি’ পঞ্চাশ ট্যাহা কিলো, দুই খান ‘আন্ডা’র দাম চোদ্দ ট্যাহা । ‘খীরা’-র কিলো কয় পঁচাত্তর ট্যাহা, ‘মির্চি’ আর খাওন লাগব না, কয় দুই’শ ট্যাহা, ‘মার্সা ভাজি’ তাও এক-গাট্টার দাম চল্লিশ ট্যাহা । আর বাজারে যাওন লাগব না, ফ্যানে-ভাতে খাইয়া থাহো । (এখানে বাংলা কথ্যভাষা আলোচ্য নয়)
(শব্দার্থ—ভিন্ডি মানে ঢ্যাঁড়শ, লোবিয়া—বরবটি, লৌকি—লাউ, আন্ডা—ডিম, খীরা—শশা, মির্চি—লঙ্কা, মার্সা ভাজি—নটে শাক ।)
এভাবে অসংখ্য অ-বঙ্গীয় শব্দ’র (মূলত হিন্দি) অনুপ্রবেশ ঘটছে । এ-বিষয়ে আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে । মিশ্র সংস্কৃতির মাঝে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে আমাদের জয়ী হতেই হবে—কারণ ভাষাই আমাদের প্রাণ, একটি জাতির প্রাণ— যে কথা আমি আগেই বলেছি। এবার, আমার লেখা একটা কবিতা বা গানের কথা শুনুন—
‘মাতৃভাষার দুর্দশা’
মাতৃভাষার দুর্দশা আর সইতে পারি না
মনের কথা সাজিয়ে গুছিয়ে কইতে পারি না ।
লোকে বলে আন্দামান তো বঙ্গভূমি নয়—
হিন্দি আমায় শিখতে হবে, করি কী উপায় ?
বাংলা কথা কইয়া আমি হোটেলে ভাত পাইলাম না—
খাইতে পাইলাম না ।।
আধা হিন্দি কইলে কে বা অর্থ খুঁজে পায়—
পুরা হিন্দি কইলে আবার অর্থ বুঝা দায় ।
দেগা,দেগী,হোগা,হোগীর অর্থ কিছুই বুঝলাম না—
কিছুই বুঝলাম না ।।
ঢ্যাঁড়শে কয় ভিন্ডি, আবার লাউরে কয় লৌকী
শশারে কয় খীরা আবার লঙ্কারে মির্চি ।
নটে শাকরে মার্সা ভাজি, ছোলা খাইয়া কয় চানা ।
সইতে পারি না, আমি কইতে পারি না ।।
অফিসে কয় হিন্দি কথা, বাজারে হিন্দি
পূজায় শুনি হিন্দিতে গান, বাড়িতে হিন্দি ।
দাদা, দিদি, মাসি, পিসি, হিন্দি ছাড়া বলে না।
সইতে পারি না, কিছু কইতে পারি না ।।
হিন্দি যে সরকারি ভাষা শিখতে হবে ভাই—
তাই বলে কি মাতৃভাষায় করবো রে জবাই !?
গায়েন বলে, মাতৃভাষার মর্মব্যথা বুঝলি না !
কিছুই বুঝলি না ।।
(ক্রমশঃ চলবে)

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০২১ রাত ১:৩১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মায়া বড় কঠিন বিষয় !

লিখেছেন মেহবুবা, ১২ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০


মায়া এক কঠিন বিষয় ! অনেক চেষ্টা করে জয়তুন গাছ সংগ্রহ করে ছাদে লালন পালন করেছি ক'বছর।
বেশ ঝাকড়া,সতেজ,অসংখ্য পাতায় শাখা প্রশাখা আড়াল করা কেমন আদুরে গাছ !... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন-উচাটন

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১৩ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:৫০


তিড়িং বিড়িং ফাল পাড়ি,
যাচ্ছে রে মন কার বাড়ি?
পুড়ছে তেলে কার হাঁড়ি,
আমি কি তার ধার ধারি!

পানে চুনে পুড়ল মুখ,
ধুকছে পরান টাপুর-টুপ;
তাই বলে কি থাকব চুপ?
উথাল সাগর দিলাম ডুব।

আর পারি না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভয়ংকর সেই খবরের পর… সন্তানের হাতটা শক্ত করে ধরুন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৩ ই মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫

আজ সকালে খবরটি পড়ে আমার মনটা একদম ভেঙে গেল। ভাবতেই ভয় লাগছে—আমাদের সন্তানদের আমরা আসলে কতটা অরক্ষিত পরিবেশে বড় করছি! ছোট্ট একটি নিষ্পাপ শিশু, যে পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনতেই শেখেনি, তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু খতরে মেঁ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


শুধুমাত্র মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে শুভেন্দু। তার বক্তব্যের মূলপ্রতিপাদ্য হলো হিন্দু খতরে মেঁ! আশ্চর্যের বিষয় হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা নাকি মুসলিমদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, কিছুদিন পরেই নাকি পশ্চিমবঙ্গ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩০

দিনগুলো কেমন যেন দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে!
দেখতে দেখতে মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে,
এইতো সেদিন থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করলাম,
আর এদিকে দেখি চার মাস শেষ হয়ে পাঁচ মাস চলছে। অথচ আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×