
আরএসএস কি সত্যিই ফ্যাসিবাদী?
কোনো কোনো মহলে আরএসএস-কে ফ্যাসিস্ট বলা হয়ে থাকে। এ দাবির সারবত্তা কতটা? কাউকে ফ্যাসিস্ট বলা হয় কেন? আরএসএস বা বিজেপি-কে ফ্যাসিস্ট বলার আগে দেখে নিতে হবে ফ্যাসিস্ট কথাটার মানে কী, আর তাদের ধারণাগুলির সঙ্গে “সঙ্ঘ” পরিবারের কাজকর্ম মেলে কিনা।
ফ্যাসিবাদ বলতে বোঝায় ১৯২০-র দশকে ইউরোপে জনপ্রিয় হওয়া কিছু বিশ্বাসগুচ্ছ—অনেক সময় আবার একে অপরের সঙ্গে মেলে না। জার্মানির যোহানেস গুটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মার্ক ট্রিশ-এর কথা অনুসারে, কোনও দল বা সংগঠন নিম্নলিখিত ধারণাগুচ্ছ (বা এর কিছু অংশ) মেনে চললে তাকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়া যায়—
১) “জাতির প্রাচীন গৌরবে” ফিরে যাওয়ার তত্ত্ব প্রচার—যা হিটলার করেছিল;
২) স্তর-বিভাজিত, সামরিক ধরণের কর্পোরেট সামাজিক সংগঠন—অর্থাৎ হিটলারের আদলে গেস্টোপো বা এসএস বাহিনি এবং তার নানা স্তর;
৩) নেতাকে প্রায় পুজো করা—যা এখন ভারতের মিডিয়ার কল্যাণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে করা হচ্ছে (কিন্তু আসল চালক হলেন আরএসএসের নেতা)।;
৪) জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতার ডাক দেওয়া;
৫) “পূর্ণ কর্মসংস্থান”-এর ডাক দেওয়া;
৬) আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদী বিদেশ নীতি।
ডঃ ট্রিশ-এর কথা অনুসারে, এ সবগুলি পয়েন্ট মিললে তবেই সমস্যা দেখা দেয়, তবে প্রথম তিনটি পয়েন্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরএসএস এবং বিজেপি বা ভিএইসপি-র মত তার ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলি কি এইসব ধ্যানধারণা মেনে চলে? দুঃখের বিষয়, এর উত্তর হল হ্যাঁ। প্রাচীন তথাকথিত হিন্দু জাতির “গৌরবোজ্জ্বল ভারতীয় প্রথা”-য় ফিরে যাওয়া হল তাদের প্রধান বিশ্বাস, প্রধান পথ। আরএসএস প্রতিদিন তার সামরিক ধরনের শাখা বা জমায়েতে তাদের কর্মী ও সমর্থকদের এই শিক্ষাই দেয় যে হিন্দুদের “সর্ব-প্রাচীন জাতি ভারতবর্ষ” ছিল বিশ্বে “সর্বশ্রেষ্ঠ”; তার অধিবাসীরা “সুখী, সমৃদ্ধিশালী ও ধার্মিক”। সঙ্ঘের নেতারা কখনোই এটা বলতে ভোলেন না যে ভারতের সব সমস্যার শুরু হল তখনই, যখন হিন্দুদের “অনৈক্যের ফলে” মুসলমান ও তারপর ব্রিটিশ আক্রমণকারীরা ভারতে হানা দেয় ও এই “পবিত্র ভূমি” দখল করে নেয়। সঙ্ঘ পরিবারের দীর্ঘকালীন লক্ষ্য হল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে “অখন্ড ভারত” গড়ে সেই “প্রাচীন গৌরবোজ্জ্বল যুগ” ফিরিয়ে আনা। অখন্ড ভারতের অর্থ “হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী” ও “গান্ধার থেকে ব্রহ্মদেশ”, অর্থাৎ উত্তরে তিব্বত থেকে ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, অর্থাৎ বার্মা, লাওস, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া। সারা বিশ্বের হিন্দুদের সংগঠিত করে তাদের “ঐক্যের” এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে হবে।
আরএসএস সত্যিই একটি স্তর-বিভাজিত সামরিক ধরনের সংগঠন, যা তার কর্মীদের সেনাদলের কায়দায় প্রশিক্ষিত করে।
আরএএস-এর একজন সর্বোচ্চ নেতা আছেন—‘সরসঙ্ঘচালক’। ইনি নির্বাচিত নন। প্রকৃতপক্ষে আরএএস-এর কোনও নেতাই নির্বাচিত নন—এই সংগঠনের ভিতরে নির্বাচনের কোনও ব্যবস্থাই নেই। সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ, বিনা প্রশ্নে পালন করা হয়। তাছাড়া সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ কেশবরাও বলিরামরাও হেডগেওয়ার, দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বিখ্যাত সর্বোচ্চ নেতা মাধবরাও সদাশিবরাও গোলওয়ালকর বা “গুরুজী”—এদের যেভাবে প্রায় দেবজ্ঞানে ভক্তির সঙ্গে স্মরণ করা হয় তা প্রায় পূজার সামিল। এ দুজনকে আরএসএস অবতারের মর্যাদা দেয়। আরএসএস-এর অফিসে, তাদের দোকানে এদের ছবি পাওয়া যায়, সঙ্ঘের কর্মীদের বাড়ির দেওয়ালে এদের ছবি শোভা পায়। এদের জীবন সম্পর্কে নানা গল্প—প্রায়শ অতিরঞ্জিত—আরএসএস-এর শিবির ও অন্যান্য জমায়েতে নিয়মিতভাবে বলা হয়। এদের জীবন ও কাজের ওপর প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা আহ্বান করা হয়, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধগুলি পুরস্কার পায়। (ক্রমশঃ)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



