somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কম মসলায় ভালো রান্না

১৭ ই আগস্ট, ২০২১ বিকাল ৩:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শুরুর কথা

উপন্যাসের পর্দায় দৃশ্যমানরূপ চলচ্চিত্র। হাল আমলে নির্মিত হচ্ছে ওয়েব সিরিজ। বিনোদনের এই কনিষ্ঠ মাধ্যমটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। খুব বেশি না হলেও উপন্যাস থেকে যেমন বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, তেমন ওয়েব সিরিজের গল্পও বেছে নেওয়া হচ্ছে সাহিত্য থেকে। ভালো গল্পের দুর্দিনে এটি ভালো পদক্ষেপ।
তবে পর্দায় উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ অনেকাংশে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়। অনেক সময় চরিত্রগুলোর নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। দৃশ্যায়নের সুবিধার্থেই মূলত এমনটা করা হয়। সাহিত্যকর্ম থেকে ওয়েব সিরিজ নির্মাণ কঠিন কাজ বটে। তবে এধরনের নির্মাণে চরিত্র নিয়ে খেলা যায়।

সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’ মুক্তি পেয়েছে সম্প্রতি। বাংলাদেশি থ্রিলার লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এটির লেখক। এর চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন স্বয়ং পরিচালক।

এর আগেও সৃজিত উপন্যাস থেকে ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের গোয়েন্দা উপন্যাস ‘ফেলুদা ফেরত’ নির্মাণ করেছিলেন গত বছর। হিন্দিতেও একই লেখকের ‘রে’ অমনিবাস সিরিজের দুটি পর্ব পরিচালনা করেছেন তিনি। সে হিসেবে ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’ ওয়েব প্ল্যাটফর্মের জন্য সৃজিতের তৃতীয় কাজ। তো এবার রবীন্দ্রনাথের রেস্তোরাঁয় সৃজিতের রান্না কেমন হলো—চলুন জেনে নেওয়া যাক।


প্রেক্ষাপট

সুন্দরপুর গ্রামের রেস্তোরাঁ, যার নাম ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’। এটির কর্ণধার মুশকান জুবেরি। যিনি আগাগোড়া রহস্যাবৃত একজন নারী। তিনি এতটাই রহস্যাবৃত যে, স্থানীয় পুলিশের বড়কর্তারা তার এক ফোনে তটস্থ থাকেন। এমনকি স্থানীয় বিধায়কও তার কথা ফেলতে পারেন না।

রেস্তোরাঁর রান্নার সুনাম গ্রাম ছাড়িয়ে কলকাতা অবধি পৌঁছে গেছে। দূর থেকে মানুষ আসে এখানে খেতে। তবে রহস্যঘেরা এই রেস্তারাঁর রহস্য উদঘাটনে সুন্দরপুর আসেন নিরুপম চন্দ। সেখানে তিনি পুলিশের ইনফরমার (তথ্যদাতা) আতর আলীর দেখা পান। দিনে পাঁচ শ টাকার বিনিময়ে তিনি নিরুপম চন্দকে মুশকান জুবেরি সম্পর্কিত তথ্য দিতে রাজি হয়ে যান।

প্রথমে নিরুপম নিজেকে ‘মহাকাল’ পত্রিকার সাংবাদিকের ছদ্মবেশ নেন। যদিও পরে সেটি প্রকাশ পেয়ে যায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জেরায়। তার কথা অবশ্য মুশকান জুবেরি-ই জানান। তারপর ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনা। শেষটা জানতে অবশ্যই পুরো সিরিজটি দেখতে হবে।


অভিনয়

এই সিরিজে বাঘা বাঘা অভিনয়শিল্পীর সমন্বয় ঘটিয়েছেন পরিচালক। আজমেরি হক বাঁধন, রাহুল বোস, অনির্বাণ ভট্টাচর্য, অঞ্জন দত্ত, অনির্বাণ চক্রবর্তী, রজত গঙ্গোপাধ্যায়—প্রত্যেকেই প্রমাণিত অভিনয়শিল্পী।

মুশকান জুবেরি চরিত্রে বাঁধনকে বাংলাদেশ থেকে উড়িয়ে নেওয়া হয় কলকাতায়। সিরিজটির পাঠকরা এই চরিত্রে জয়া আহসানকে খুব করে চেয়েছিলেন। যতটুকু জানি, লেখক নিজেও তাকে আশা করেছিলেন। আবার পাওয়লি দামের কথাও শোনা গিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত বাঁধনের ওপর ভরসা রাখেন সবাই। তিনি সেই ভরসার প্রতিদানও ঠিকঠাক দিয়েছেন। তবে সেটা কেবলই ‘পাশ মার্কস’ বলা যায়।
বাঁধন চেষ্টা করেছেন নিজেকে ভেঙে মুশকান জুবেরিরূপে হাজির হতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। সংলাপ বলার ধরন, শারীরিক ভাষা—সবকিছুতেই ঘুরেফিরে বাঁধনকেই প্রতিনিধিত্ব করেছে। মুশকান জুবেরিকে সরিয়ে রেখে যদি বাঁধনকে সামনে আনা হয়, তাহলে ভালো অভিনয় করেছেন বলা যায়। তবে তার মুখ থেকে বলা ‘কোনো প্রমাণ ছাড়া আপনি কি শুধু অনুমানের ভিত্তিতে ভদ্রমহিলাদের ছেলেধরা উপাধিতে ভূষিত করেন?’—সংলাপটি নিজস্ব ভঙ্গিতে শ্রুতিমধুর ছিল।

এছাড়া পুরো সিরিজ জুড়ে বাঁধনের সৌন্দর্যের প্রশংসা না করলে অন্যায় হয়ে যাবে। সুতরাং টলিউডের নির্মাতারা বাঁধনকে নিয়ে আলাদা করে ভাবতে পারেন।

রাহুল বোস ভালো অভিনেতা। এখানে তিনি যতটুকু অভিনয় দরকার ততটুকু করেছেন। এক কথায় পরিমিত অভিনয় করতে দেখা গেছে তাকে। মাটি চাপা দেওয়া আতর আলীকে বাঁচাতে মাটি খোঁড়ার দৃশ্যে রাহুলের ‘এক্সপ্রেশন’ দারুণ ছিল। শেষদিকে মুশকান জুবেরির বাড়িতে বিষ খেয়ে সোফায় যেভাবে ছটফট করছিলেন সেটিও চোখে লেগে থাকার মতো।

এই সিরিজের ‘প্রাণ ভোমরা’ ছিলেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। চরিত্রের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হয়ে বাংলাদেশি উচ্চারণে কথা বলার যে চেষ্টা করেছেন তাতে তিনি সফল বলা যায়। মাটি চাপা দেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি পর্ব জমিয়ে রেখেছিলেন তিনি। শেষ দৃশ্যের আগে তার অনুপস্থিতি শূণ্যতার সৃষ্টি করেছে। এমন দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য অনির্বাণ স্যালুট পেতেই পারেন।

এদিকে অপ্রিয় হলেও সত্য, অঞ্জন দত্তকে এই সিরিজে ‘জাস্ট অপচয়’ করা হয়েছে। যে কয়েকটি দৃশ্যে তার উপস্থিতি ছিল সেগুলোতে অভিনয়ের তেমন সুযোগ না থাকলেও ঠিকঠাক উতরে গেছেন। সিরিজের জৌলুস বাড়াতেই হয়ত তাকে অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে তার অভিনয় নিয়ে বেশিকিছু না বলাটাই শ্রেয়।

এর বাইরে অন্য যারা বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারা ভালো অভিনয় করেছেন। তাদের মধ্যে গোরখোদক চরিত্রে অভিনয় করা ফালু (আসল নাম মনে পড়ছে না) বেশ ভালো অভিনয় করেছেন।


পরিচালনা ও চিত্রনাট্য

সৃজিত মুখার্জী পশ্চিমবঙ্গের মহারথী নির্মাতাদের একজন। দারুণ কিছু সিনেমা তার ঝুলিতে আছে। সেই সিনেমাগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে কিছুটা মার খেয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’ ওয়েব সিরিজটি। খুবই দুর্বল চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি। অযাচিত টেনে টেনে প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য বাড়িয়েছেন। সেজন্য মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, ছিল কিছু অসঙ্গতিও। উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হয়ে যাবে বিষয়টি।

আতর আলীর সঙ্গে যখন নিরুপম চন্দের দেখা হয়। ফোন নম্বর আদান-প্রদান হয় তখন আতর আলী জানিয়েছিলেন, তার মোবাইলের ডিসপ্লেতে সমস্যার কারণে কোনো নম্বর দেখা যায় না। কোনো নম্বর ডায়াল করে কল করতে পারেন না। তাই প্রয়োজনে নিরুপম চন্দকেই তাকে কল করতে হবে।

কিন্তু কয়েক দৃশ্য পর মুশকান জুবেরির বাড়ির পাঁচিলে বসে সেই মোবাইল দিয়ে নিরুপম চন্দকে কল দিয়েছেন। তখনই আবার অন্য যখন নিরুপম কলব্যাক করল তখন ডিসপ্লে দেখে কল রিসিভ করেন আতর আলী। এটা কিন্তু বড় ধরনের ভুলের মধ্যেই পড়ে।

গোরখোদক কবর না খুঁড়লে কেউ মরদেহ নিয়ে কবরস্থানে বসে কাঁদে না। বরং নিজেরা দ্রুত কবর খুঁড়ে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া সুপারিটেনডেন্ড অব পুলিশ (এসপি) আর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আর মধ্যে যে পদমর্যাদার যে দূরত্ব সেটা ম্লান করে দেওয়া হয়েছে। ওসির সামনে এসপি এসে দাঁড়লে যে ধরনের পেশাগত সম্মান প্রদর্শন করা হয় তা অনুপস্থিত ছিল।

তাছাড়া ধীরে ধীরে সিরিজের কাহিনি এগোলেও শেষদিকে বড্ড তাড়াহুড়ো করে শেষ টানা হয়েছে। কেন করা হলো—সেটা পরিচালক ভালো বলতে পারবেন।

তবে প্লেন ক্র্যাশ ও তারপরের ঘটনাপ্রবাহের দৃশ্য চিত্রায়নে সৃজিত মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন। শেষে মুশকান জুবেরির বাড়িতে আগুন। প্রস্থেটিক মেকআপে মুশকান জুবেরির বেরিয়ে যাওয়া—এসব চোখ খানিকটা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সবথেকে ভালো লেগেছে সিরিজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্থিতি।

সংগীত ও আবহ, ক্যামেরা, সম্পাদনা ও লোকেশন

পরিচালক রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে ‘রবীন্দ্র আবহ’ তৈরি করেছেন। এটা ভালো সংযোজন। সাসপেন্স দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিল। ক্যামেরার কাজে চোখ জুড়িয়েছে। সম্পাদনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। লোকেশন বাছাইও ভালো লেগেছে।

শেষের কথা

নিঃসন্দেহে সৃজিত মুখার্জী দক্ষ নির্মাতা। দুই বংলার দর্শক তাকে পছন্দ করেন। ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’র প্রথম কিস্তি শেষ। আশাকরছি দ্বিতীয় কিস্তিতে ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো আসেননি’তে সব অপ্রত্যাশিত ভুল শুধরে চমৎকার একটি সিরিজ নির্মাণ করবেন তিনি। সেই অপেক্ষায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০২১ বিকাল ৩:২৬
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লজ্জা !!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১২:০১

গল্পঃ কাছের মানুষ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:১৩



(১)
শরৎ পূর্ণিমার নিশি নির্মল গগন,
মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় পবন।

লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ,
বৈকুন্ঠধামেতে বসি করে আলাপন।

হেনকালে বীণা হাতে আসি মুনিবর,
হরিগুণগানে মত্ত হইয়া বিভোর।

গান সম্বরিয়া উভে বন্দনা করিল,
বসিতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীর অন্যতম দামী খাবার পাখির বাসার স্যুপ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৩৫




পাখির বাসা দিয়ে বানানো স্যুপ চীনে বেশ জনপ্রিয় ও কয়েকশ বছরের পুরনো অভ্যাস। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল-পাখির বাসা দিয়ে রান্না করা স্যোপ এমনই স্বাদ যে, বারবার খেতে ইচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রেমের টানে

লিখেছেন দীপঙ্কর বেরা, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১১:৪৪


ফুলের শোভা পাপড়ি রঙে
মধুর রসে ভরা
ভ্রমর এসে সেই টানেতে
নিজেকে দেয় ধরা।

পাপড়ি মেলে ফুল তো ফোটে
জমায় মধু বুকে
ভ্রমরকে সে ডাকতে থাকে
মিলন মোহ সুখে।

ফুলের রেণু মেখে ভ্রমর
খিলখিলিয়ে হাসে
ফুলের কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার, আমার ভাইদের, বাবা, দাদু বাড়ির সবার নির্যাতনের বিচার চাই

লিখেছেন দয়িতা সরকার, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১:২২

আমাদের দাদু বাড়ি ছোট বেলায় ছিল সিরাজগঞ্জ জেলার দেলুয়া গ্রামে। আমার দাদুর নাম বেলাল সরকার, বাবার নাম আমির হামজা সরকার। ছোট বেলা থেকেই দেখেছি আমাদের বাড়ির প্রত্যেক ছেলে- মেয়েদের মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×