আমার বন্ধুমহলে মুহিতের চেয়ে কিপটুস আর একটি নেই। হাত দিয়ে যদি একটা ফুটো পয়সা গলানো যায়! ওর এমনি স্বভাব- সবাই মিলে হই হই করে কোন রেস্টুতে খাওয়া কি পিকনিক- কথা উঠলেই ঠিক টিউশনি, পার্ট টাইম জব, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা বাহানার তো আর দুনিয়ায় অভাব নেই।ঐ যে কথায় বলে না মানুষের বিধিদত্ত দুটার বাইরের তিননম্বর হাতটা হলো অজুহাত? মুহিত শালা ঠিক তার উদ্ভাবনী বুদ্ধিতে একটা না একটা বের করে পিছলে যাবেই সময়মত।
ওর বেশভুষাই দেখা যাক-সেই এক ধ্যাধ্ধেড়ে চপ্পলজোড়া, মলিন খানদুই শার্ট, রং মরে যাওয়া জিন্স ।সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে কোনদিন দেখলাম না নতুন একটা কিনেছে। কেপ্পন কাহিকা।
রকিব মজা করে বলে ও চাকরির ইন্টারভিউতেও এই জিনিস লাগিয়ে যাবে দেখিস..
অথচ ওর যে টাকা নেই তা কিন্তু না। আমি নিজের চোখে ওকে একরাশ টাকা গুনতে দেখেছি। অনেক কিছুর সাথে যোগ আছে ওর। টিউশনি ছাড়াও কোচিংএ ক্লাস নেয়, কাগজে লেখে, কোন একটা মার্কেটিং কাজ জানি করে হপ্তায় দিন দুই- নানা কাজে কম তো পায় না সে।
কিন্তু 'দোস্ত তুই আজ টাকা পাইলি, খাওয়াবি না? 'বলে আবদার খেপামো মাঠে মারা গেছে বরাবর ।
'আরে বাদ দে তো , ও হল গিয়ে বেয়ারিং পোষ্ট। উল্টো নিতে হলে টাকা খসাতে হবে।' উল্টা দিকের খাট থেকে কবীরটা কি হাসাতেই না পারে! উচ্চস্বরে উল্লাস হররা ফোটে আমাদের গলায় গলায়।
তবে এবার আর ওর ছাড়ান নেই। বিশ্বকাপের জ্বরে পুরো ক্যাম্পাস, চত্বর , ক্লাসরুম ,হল , মায় স্যার ম্যাডামরাও কাঁপছেন। আমরা তো ফাউ।
আমাদের ভার্সিটির ছাত্রসমাজের অলিখিত অবিসংবাদিত স্বঘোষিত নেতৃদ্বয় হারুন ভাই আর শাহিন ভাই যথাক্রমে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার 'দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক' ।
দুইজনে সম্পর্কটা বরাবরের সাপে নেউলে। এইই কারণ বা যাই হোক ওরা ম্যারাডোনা পেলে শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে।কিংবা হালনাগাদে বলা চলে- মেসি নেইমার !
তায় আবার এক পড়াশুনা ছাড়া মিছিল মিটিং, প্রতি পক্ষের ছেলেছোকরার মাথা ফাটাফাটি, চাঁদাবাজি , টেন্ডার দখল হেন কাজ নেই যাতে ওদের উৎসাহ নেই।আমাদের রাজনীতির উজ্জ্বল ভবিষ্যতদের এইসব সহশিক্ষণ-'এক্সট্রা কারিকুলারে'ই সময় বেশ কেটে যায় !
বিশ্বকাপ শুরু হবার ঠিক ঠিক আগ দিয়ে দুপুরে হারুন ভাই এলেন , গুনিগুনতিতে সব ব্রাজিল সমর্থকদের চাঁদা দুশ করে দিতে হবে বলে ফরমান জারি করে চলে গেলেন।
মুহিত ব্রাজিলের সাপোর্টার না বলে মাফ পেয়ে গেল, কিন্তু এ আর কতক্ষণ?
রাতে শাহিন ভাই বলে গেলেন যারা যারা হারুন ভাইকে চাঁদা দেয়নি সমতা ভারসাম্যের হিসেবে তাকে আড়াইশো করে তুলে দিয়ে যেন আসে।
এরা আমেরিকানদের মত সোজা সাপটা নীতির মানুষ। হয় তুমি আমার সাথে নয়তো আমার শত্রুর - সুতরাং 'অব্রাজিলিয়ান'দের প্রতি শাহিন ভাইয়ের রায়ই হল গিয়ে চুড়ান্ত আদেশ।
আর চাঁদার দরটা বেশী হবার যুক্তি বোধহয় হারুন ভাইয়ের স্যাঙাতদলের চেয়ে তার নিজ মান ও তামঝাম বেশী করে তোলা- শুরুতেই একদান এগিয়ে থাকা যাকে বলা হয়।
আমাদের মুহিত বেচারার অধিক শোকে হয়ে যাবার অবস্থা হলো। আহারে! ঐ সময় ব্রাজিলের সমর্থক বনে গেলে এই বাড়তি হ্যাপাটা তো আর থাকতো না!
আর দলের নামে কি আসে যায় ? অন্তত হাড়কেপ্পনের কাছে?
এ তো আর আমাদের বিএনপি আলীগ না যে জেরটা সারা বছরের ক্লাস কাম কাজ বাদ দিয়ে টানতে হবে?
বিশ্বকাপ শেষ , সমর্থন ও শেষ। বললেই হত তখন..
সে যাক , একেই বলে অতি চালাকের গলা দড়ি। পড়েছো বাবা বিপদে, এখন তোমার এই বাড়তি খরচ নিতেই হবে বাছাধন।
আমরা একটু কপট সহানুভূতি দেখাই , হাজার হলেও আমাদেরই তো ইয়ার দোস্ত। মনের খুশি বাইরে কেমনে দেখাই?!
তা রাগ তো আমাদের হতেই পারে। গত ডিসেম্বরে সবাই মিলে বান্দরবান রাঙামাটি গেলাম। সবাই ছিল , বাদ পড়লো একমাত্র মুহিত। কেন ? কেন আবার- চাঁদা দেবার ভয়ে।
এসবতো ফান প্রজেক্ট। কিন্তু সেবার যখন রাশেদ জন্ডিসে পড়লো তখন আমাদের সাথে ওকে দেখতে পর্যন্ত যায় নি। চিন্তা করা যায়? গেলে খাবার ফলমূলে যদি কিছু গচ্চা দিতে হয়!? কারো বার্থডে এমনকি ভার্সিটি ডোনেশন প্রোগ্রামে ওকে পাওয়া যায় না - এমনই কিপটার কিপটা সে।ইতিহাসবিখ্যাত (কিংবা কুখ্যাত!) কারুণকেও হারবার প্রতিভা আছে আমাদের মুহিতের।
অতীতের বাসী কথা থাক,ঐ যে কথায় বলে কিপটার ধন পিঁপড়েতে খায় ব্যাটার এখন ঠিক সে-ই অবস্থা।
মজা টিপ্পনি হাসি তামাশাতে আমাদের রুমে সেদিনকার জমায়েত ভাঙে।
রাতে্ব সচরাচর ঘুমটুম ভাঙে না আমার । এদিন তলপেটে বেমক্কা একটু তাগিদে ভেঙে গেল, বের হয়ে গণ বাথরুমের দিকে রওয়া দিতে দেখি কোনের টিভি কাম কমন রুমটাতে একটা আলো টিম টিম করে জ্বলছে।
পায়ে পায়ে কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেলাম। হু হুহ, বিশ্বকাপ হোক আর যাই হোক , এখন মিড চলছে।কালকেও একটা পরীক্ষা আছে... এর মধ্যে এত রাতে টিভি রুমে কে বসে থাকবে?
দেখলাম ,মুহিত বসে আছে।মাথা হাঁটুতে গোঁজা হলেও চিনতে পারলাম। অবাক লাগছে দারুন।
'কিরে এত রাতে কি করিস? একি তুই কাঁদছিস নাকি ?হায়রে সামান্য দুই আড়াইয়ের জন্য এত্ত শোক, ব্যাটাছেলে হয়ে কেঁদে কেটে যে ভাসিয়ে দিচ্ছিস ! ? যাহ আমি তোকে ওটাকাকয়টা খয়রাত করে দেবনে।' বলি এক মুখ হাসি নিয়ে।
'ঠাট্টা না । আমি আজ পর্যন্ত কবে তোদের কাছ থেকে কটাকা নিয়েছি বল?'গম্ভীর হয়ে ওঠে মুহিত ।একই সাথে একটু বিব্রত মুখ মোছে সে।
'আমার কাছে দুশ টাকা মাত্র না। অনেক কিছু ।'
' কতটা তা জানিস? '
নিশুতি শীতল হিম হিম রাত হঠাৎ উষ্ঞতা ছড়ায় চির শান্ত সুবোধ ছেলে মুহিতের মধ্যে।
ওকে এরকম তেতে উঠতে আগে দেখিনি কখনও ।
'আমার বাপ রিকশাওয়ালা,- ছিল।'
বোমাটার আঘাত যথেষ্ট লাগে আমার। আমার এক বন্ধু রিকশাওয়ালার ছেলে!?
আমার মনের ভাবটা কি বোঝে মুহিত?
'কিরে তোর মানে লাগলো নাকি একথা জেনে? আর তো মিশতে চাবি না আমার সাথে, আমি তোদের মাঝে মিল খাই না, তাই না? '
'আমার রিকশাওয়ালা বাপটা যখন অ্যাক্সিডেন্টে পড়লো তখন থেকে তার ঔষুধ খরচা , নিজে পড়া মায় তিনটা ছোট ভাইবোনসহ পুরো সংসার কাঁধে নিয়ে চলতে হয় আমার।'
'তোর বাবা ডাক্তার, রাশেদের ব্যাংকার, হাসানের বাপটাও নামী প্রাইভেটের লেকচারার।তোদের হাতে টাকা নয় ছয় করা কিই বা এমন ব্যাপার ? শ দুইশ টাকা তো হাতের ধুলাময়লার সমান ।'
'আর আমার- আমার পুরো মাস চলে মাত্র হাজার টাকায়। তুই- তোরা জানিস? খাবার , ফিস, বাসভাড়া।সব স-ব কিছু। পাঁচটা টিউশানির বাকি প্রতিটা পাই পয়সা দেশে পাঠাই । না হলে বাসায় হাড়ি চড়বে না , বুঝতে পারবি তোরা? বড়লোকের নন্দদুলালেরা?'
আমি ওর এই 'বিশেষ বিশেষনে'ও এখন রাগ করতে পারি না, বরং হতবাক হয়ে যাই।
কিভাবে জানবো তোর এ অবস্থা? বলেছিস কোনদিন ? আর বন্ধু বলিস আমাদের ? -কথাগুলো মনের মধ্য পাকায় কিন্তু মুখে আনার জোর পাই না।
'মাত্র হা-জা-র টাকা? ??!!!'
এই মুহুর্তে আমার পরনের এই ঘরে পরবার শার্টটাও তো এর চেয়ে বেশী দামি। বারতিনেক পরে এখন বাইরে পড়তে লজ্জা লাগে, ফেড ফেড মনে হয়।
এই তো গত পরশু হাশ পাপি থেকে একজোড়া জুতা কিনেছি দুই হাজারে।'দুই'- মূল সংখ্যাটার পিছনে আরো গোটাতিনেক শূন্য আমার কাছে বিশেষ কোন মানেই রাখে না। আরো ক'ধাপ চড়িয়ে নতুন শখ চেপেছে একটা ম্যাকবুকের জন্যে । আবার একটা আই ফোন আমার চাই -ই। হাতের মুঠিতে অ্যাপলের আশ্চর্য এই খেলনাটা না হলে জীবনটাই বৃথা বলে মনে হচ্ছে।স্যামসাং গ্যালাক্সি এখন সবার হাতে হাতে চলছে, আমার আর ওতে পোষায় নাকি?
আর আমারই বন্ধু, এত ক্লোজ একজন বন্ধু, রাস্তার অচেনা অজানা গরীব কোন শর্টফিল্মের চরিত্র না, সে মাস চালায় হাজার টাকায়? হাজার টাকায় আমার দিন যায় না , মাস চালানো এই মাগ্যির ঢাকায় সম্ভব?কিভাবে??
আমি চুপ করে থাকি।দীর্ঘ সময়।
ভারি রহস্যময় রাতের এই সময়টা। ছাপোষা কেরানি কবি হয়ে উঠতে পারে, কোদলে স্বামীটি হয়ত সারাদিনের ঘর্মক্লান্ত বউটিকে হারানো যৌবনকালের মত দুটি আবেগী ভালোবাসার কথা বলে ফেলে। যেমন আমি আমার মুখচোরা বন্ধুর এতদিনের চেপে রাখা আত্নপরিচয়ের রহস্য তারই অকপট মুখ থেকে জেনে ফেললাম...।
কাল কি হবে ? আমি কি সামান্য 'রিকশাওয়ালার পোলা'র সাথে একটু সূক্ষ অদৃশ্য দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করবো আমাদের তথাকথিত সামাজিক বিভাজনের সূত্র মেনে নিয়ে? দিনে দিনে যে বিভেদ একদিন যোগাযোগের সুতাটাকে কেটে দেবে নিপুনভাবে । ব্যবধানটা আস্তে ধীরে বাড়ালে হয়ত এমনভাবে কৌশলের সাথে আমাদের বন্ধুতা কাটবে যে দুজনের কেউই সেই কাটবার সঠিক মুহূর্তটাও ধরে উঠতে পারবো না।
অথব... প্রকাশ্য আলাদা হয়ে যাব? অবজ্ঞা করতে শুরু করবো? হাসি মশকরা করবো ওর 'স্ট্যাটাস' নিয়ে?
আমাদের মত ঘরের ছেলেরা ওদের সাথে মেশে না, মিশতে হয় না।
নাকি রসায়নের সব কটা সূত্র কে একধারে অবহেলায় সরিয়ে রেখে তেলে জলে মিশ খেয়ে যাবো মুহিতের গুপ্তকথা জেনে ফেলবার আগের ঠিক একমুহূর্ত আগেকার সেকেন্ডগুলোর মত?
হয়ত তার চাইতেও কিছু বেশী.. আপন??!!
আর যাই হোক না কেন, রুমের দিকে ফেরত যাত্রায় মনে মনে ঠিক করে নিলাম, আমাদের মুহিত কে কঞ্জুস আর বলবো না আমি কখনোই।
রেজওয়ানা আলী তনিমা
জুলাই ০৭, '১৪ ইং।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





