somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

[বুক রিভিউ] পশ্চিমের চোখে প্রাচ্যকে দেখার তত্ত্ব : একটি নেতিবাদীচর্চার উপাখ্যান

২৮ শে আগস্ট, ২০১৭ দুপুর ১২:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বইয়ের নাম : পশ্চিমের চোখে প্রাচ্যকে দেখার তত্ত্ব
লেখক : ড. মুস্তফা সিবাঈ
অনুবাদ : কামরুল হাসান নকীব
প্রচ্ছদ : ইসমাঈল আহমদ
প্রকাশনী : হোয়াইট লেটারস পাবলিকেশন্স


বইটি এর আগেও নেড়েচেড়ে দেখেছি, পড়েছি, গায়ে-গতরে কোথাও একটু-আধটু কাচিও চালিয়েছি, রাতযাপনের সঙ্গী করে নির্ঘুম থেকেছি রাতকে রাত। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে বইটি আজকেই হাতে পেলাম। মূলত আজকেই বইটির ঘরোয়া রিলেজডেট। মোড়ক উন্মোচন শব্দটা বললাম না, খুবসম্ভবত অনুবাদক ঘটা করেই প্রাচ্যতত্ত্বের ওপর নাতিদীর্ঘ একটি আলোচনা রেখে আমাদের সামনে গ্রন্থটির বস্ত্রবিচন করবেন। আমি সেই আলোচনার শ্রোতা হওয়ার ইচ্ছা রাখি।
আসলে এই প্রাচ্যতত্ত্ব কী, কোত্থেকে এলো, এসব আপেক্ষিক আলোচনা। চাঁদের আলোর নিজস্বতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, এসব প্রাচ্যতত্ত্ব এবং প্রাচ্যতত্ত্ববিদদেরও নিজস্ব সংজ্ঞায়ন নিয়েও রয়েছে বিশাল প্রশ্ন ও তথ্যের আকড়। আসলে প্রাচ্যতত্ত্ব একটি প্রকল্প। এর সাথে সরাসরি জ্ঞানের সম্পর্ক থাকলেও নিগূঢ়ে রয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগলিক এমনকি সামরিক লক্ষ্য, যা পাশ্চাত্যের শাসকচক্ষুর অনুগত প্রজা বানিয়ে রাখে প্রাচ্যকে।
প্রাচ্যবাদী প্রকল্প ছিল একটি ধুরন্ধরময় পদক্ষেপ। প্রাচ্যের পরাধীনবিমুখ জনগণরা যখন পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি চাইল তখন পাশ্চাত্য কিছু রাষ্ট্রকে স্বাধীনতার এমন কমলালেবু খাওয়ায়, যেটির হলদে চামড়া স্বাধীনতার হলেও ভেতরের কোষগুলো ছিল পরাধীনতার। অর্থাৎ, সেখানকার অধিবাসীদের কথিত স্বাধীনতা পাবে, অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মতো তারাও গণতন্ত্রের ধুম্রজালের খেলা খেলতে পারবে। কিন্তু এসব রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ, শিক্ষা ও মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে সেই স্বাধীনচেতা মানুষের মস্তিষ্ক ইউরোপের তুলনায় হীনম্মন্যতা ও স্নায়ুবিক পর্যদুস্ততার শিকার করে রাখবে। পরিকল্পনার ছক এঁটে ব্যাপারটা এমন দাঁড় করাল, যেন স্বাধীন হয়েও তারা মস্তিষ্কের দাসত্ব থেকে মুক্তি না পায়।
সে সময়ে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ প্রাচ্যদেশগুলোর ওপর নজরদারি রাখলেও গোটা রাজ্যে তখন মুসলিম শাসন কার্যকর ছিল। তুর্কি শাসন ছিল সময়ের নামজাদা। গোটা পৃথিবীর মুসলিম শাসনের সেরেতাজ মনে করা হত তুর্কিকে। কারণ, হারামাইন শরীফের ওপর তুর্কির অভিভাবকত্বের হাত ছিল। এই তুর্কি শাসনের সাথেই ইউরোপের খ্রিষ্ট শাসনগুলো আশতাব্দি লড়াই চলতে থাকে। কিন্তু সবসময়ই তুর্কির কাছে মাথানত ছিল ইউরোপের। ইতিহাস এসব যুদ্ধকে ‘ক্রুসেড’ নামে স্মরণ করে। বারবার পরাজয়ের গ্লানি একটা সময় ইউরোপীয় শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এ কারণে তারা প্রতিশোধের নেশায় রণাঙ্গণে বিজয়মালার আশা ছেড়ে দিয়ে চিন্তাগত আগ্রাসনের পথ অবলম্বন করে। প্রচার মাধ্যম, মিডিয়া, শিক্ষার দাঁত দিয়ে চিরশত্রুর মোকাবিলায় মরণকামড়ের কূটকৌশল গ্রহণ করে। পাশাপাশি প্রাচ্যের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি গবেষণা করে একে মুসলমানদের মধ্যে মগজধোলাইয়ের হাতিয়ার বানিয়ে নেয়। ইতিহাস এদের নাম দিয়েছে—প্রাচ্যতত্ত্ববিদ। অর্থাৎ এ সংগ্রাম পাশ্চাত্যের গবেষকদের প্রাচ্যকে জানার, আবিষ্কার করার এবং এ বিষয়ক জ্ঞানচর্চা করার একটি বিশেষ ধারা। এর দ্বারা গবেষককে বুদ্ধিবৃত্তির পথ দেখায়। বিশেষ করে যখন কেউ তার পরিচিত গণ্ডি ছেড়ে অন্য দল বা সমাজকে পাঠ করতে যায়।
প্রাচ্যবাদের বিশেষ ও প্রধান ধারা হলো ইসলামকেন্দ্রিক। ইসলাম নিয়েই তার নেতিবাদীচর্চা আর এ চর্চার মধ্য দিয়ে তারা ইসলামকে বিকৃত করা, হেয় করা এবং দণ্ডিত করার কাজ করতে চায়। তাদের মধ্যে যেসব গবেষক ইসলাম ও মুসলিম চিন্তা নিয়ে কাজ করেছে তারা ইসলামসংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় অনেক শব্দ-পরিভাষার সচেতন ও উদ্দেশ্যপূর্ণ বিকৃতি ছড়িয়েছে। এসব পরিভাষার অশুদ্ধ ও বিকৃত ব্যবহারের মধ্য দিয়েই তারা মুসলিমদের যাপন ও আচরণকে ইসলাম বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের তরফ থেকে এসব নেতিবাদীচর্চার প্রতিক্রিয়ায় যেসব জ্ঞানতাত্ত্বিক কাজ হয়েছে, তা খুব বেশি না হলেও কম নয়। এক্ষেত্রে ড. মুস্তফা সিবাঈ রচিত কিছু গ্রন্থ গড়বিচারে শীর্ষচারী। বয়ানের ভিন্নতায় মুস্তফা সিবাঈ সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে নিজেকে আলাদা করে প্রকাশ করেছেন। সর্বোপরি, তিনি এসব প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের সাথে থেকে তাদের থেকে এমন অনেক তথ্যের আকড় বানিয়েছিলেন, যার সারসংক্ষেপ ‘পশ্চিমের চোখে প্রাচ্যকে দেখার তত্ত্ব’ বইয়ে ছেপে গেছেন। যদিও মুস্তফা সিবাঈর তুখর কর্মময় জীবনের ফিরিস্তি তাকে বিস্তর সময় দেয়নি, তাই অনেক ডকুমেন্ট মাঠে মারা গেছে, তারপরও এই বইয়ে মোটামুটি সব তথ্য-উপাত্তের নির্যাস রেখে তিনি কীর্তিমান হয়েছেন। এজন্য ‘অরিয়েন্টালিজমের নাড়িনক্ষত্র’ অনুবাদী নামটি আমার কাছে যথার্থই মনে হয়েছে।
বইটি পড়লে প্রাচ্যতত্ত্ব নিয়ে কারা কাজ করেছে, কারা এর গোড়ায় ছিল, কারা ছিল নিগূঢ়ে, তার তথ্য এবং তাদের উৎসজ্ঞানের প্রতিপাদ্য কী ছিল, তার সরল জবানবন্দি পাবেন। আরও পাবেন প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের কোন্ রচনা ইতিহাসে ‘কালজয়ী’ স্বাক্ষর রেখেছে, অথচ তাতে রয়েছে প্রভূত গলদ উপাদান। যেসবের পাঠ আপনার মনে নিছক প্রশ্নই তুলবে না, সুযোগে আপনার ইমানের ভীতও নাড়িয়ে দিবে। তাই বক্ষমান বইটি সবাইকে পড়ার একপ্রকার অনুরোধই করব। কারণ, ইতিহাসের স্বচ্ছ আয়নায় যাতে আপনার হারানো অতীতকে দেখে নিজের বর্তমান অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন, তারপর যদি কিছুটা টনক নড়ে যে, আসলেই যে পথে আপনি দাঁড়িয়ে, তার গন্তব্য কোথায়?
বক্ষমান গ্রন্থ সম্পর্কে আরেকটি তথ্য আমি বোকার মতো এড়িয়ে গেছি। বইটি যদিও অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন প্রাকটিক্যালি লেখালেখির সাথে একযুগ পেড়িয়ে আসা প্রচারবিমুখ তরুণ আলেম কামরুল হাসান নকীব। কিন্তু বইটি পড়ে অনুবাদ মনে হয়নি একটুও। মৌলিক রচনার মতো স্বাচ্ছন্দে গড়গড় করে এগিয়েছে শব্দগাঁথুনির গতি। অনেকটা বৈঠকি ঢংয়ের গদ্যভাষা আর গল্পের টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়ার মতোই অনুবাদে পাঠকের মনে জোশ সৃষ্টি করতে পারায় অনুবাদকের মুন্সিয়ানা আলাদা প্রশংসার দাবি রাখে। জানতে পেরে খুশিই হয়েছি, অনুবাদক ড. মুস্তফা সিবাঈর আরেকটি বইয়ের কাজে হাত দিয়েছে, তার অনুবাদের হাত আশাপ্রদ। গতিমন্থর হলেও কাজে স্বকীয় ধাঁচ আছে। মূলের সাথে মিশে যাওয়ার প্রবণতা আছে। এটি তার অনুবাদের স্বতন্ত্র দিক। অনুবাদে অনেকটা সরল হলেও তরল নয়, গোগ্রাসে গিলে ফেলার মতো নয়, ধীরে ধীরে জাবর কেটে খাওয়ার মতো, ‍বুঝে পড়ার মতো। হয়ত এই কারণে প্রাথমিক পাঠকরা হোচট খেলেও খেতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০১৭ দুপুর ১২:৩৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আশা রাখি: কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ রাষ্ট্রপতি হবেন

লিখেছেন অপলক , ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৪০



আমার দেখা সকল রাষ্ট্রপতিগন ছিলেন ডায়াবেটিকস রোগীদের মত। যাদের রাজনৈতিক জীবনীশক্তি ছিল না বললেই চলে। প্রধানমন্ত্রীর অলিখিত আজ্ঞাবহ মাত্র। ফর্মালিটি আছে কিন্তু কাজের স্বকীয়তা ছিল না। কোন আইকোনিক ডিসিশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৫৬৩৫-৩৬

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৪৯

মন কথনিকা-৫৬৩৫
খেতে খেতে গেল জীবন, নজর যে নাই স্বাস্থ্যের পানে
খেয়ে গেছি যা পেয়েছি, যা পেয়েছি বামে ডানে
বাড়লো চর্বি, কমলো যে জোর, শান্তি হারাই পদে পদে
এই না জীবন পার করতে চাই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাত ৮ টায় বিপণিবিতান-দোকানপাট বন্ধের নির্দেশ | দেশজুড়ে বইছে গণতন্ত্রের সু-বাতাস

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:৩৫



দেশজুড়ে বহু বহু করে বয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্রের সু-বাতাস, চারিদিকে পতপত করে উড়ছে গণতন্ত্র নামক শান্তির পতাকা- সারা বংলায় এমন শান্তিময় পরিবেশ স্বাধীনতা পরবর্তীকালের ইতিহাসে আর দেখা যায়নি কখনো; এরই ধারাবাহিকতায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০০১ সালেও বিএনপিকে ডোবানোর দায়িত্ব নিয়েছিল টুকু!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৫১


ভয়াবহ লোডশেডিং। মধ্যরাতে ঢাকবাসীর হাঁসফাঁস। হঠাৎ করে এতো লোডশেডিং হওয়ার কোন কারণ নেই অথচ মধ্যরাতে ভয়াবহ লোডশেডিং। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকেনা বললেই চলে। গ্রামে বিদ্যুৎ যাওয়ার সময় আছে কিন্তু আসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বাষ্ট্রপতি নির্বাচন নাকি রাষ্ট্রীয় খরচে তামাশা!!!

লিখেছেন শাহিন-৯৯, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


বাংলাদেশে সম্মানিত রাষ্ট্রপতি (হবু)


নির্বাচন, এই শব্দটি শুনা মাত্র যে বিষয়টি আমাদের মাথায় আসে তা হচ্ছে ভোট প্রদানের যোগ্য ভোটারদের স্বাধীন ভোটের মাধ্যমে একজন যোগ্য ব্যাক্তিকে দায়িত্ব অর্পণের জন্য নির্বাচিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×