
আমার কাছে মনে হয়, আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক একান্তই ভালোবাসার। যেখানে সম্পর্কটা হৃদ্যতার, রাজা-প্রজার মতো অবস্থান হলেও সেখানে ভালোবাসাটাই মুখ্য। এ কারণে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘প্রত্যেকেই তোমাকে তার নিজের জন্য কামনা করে, একমাত্র আমি তোমাকে শুধুই তোমার জন্য ভালোবাসি’। এখানে মানুষের ভালোবাসা আর আল্লাহর ভালোবাসার মধ্যে একটা তফাৎ দেখা যায়।
প্রবাদপ্রবচনে শোনা যায়, ‘যে আল্লাহর জন্য আল্লাহ তার জন্য। কেউ তাকে হেঁটে কাছে পেতে চাইলে তিনি দৌঁড়ে এসে আগলে নেন।’ বিশুদ্ধ হাদিসের ভাষাও অনেকটাই এমন, ‘যে আমার দিকে হেঁটে আসে আমার রহমত তার কাছে দৌঁড়ে দৌঁড়ে পৌঁছায়।’ আল্লাহর ভালোবাসার কাছে মানুষের ভালোবাসা নস্যি। আল্লাহ বলেন, ‘যে আমাকে ভালোবাসে আমি তার কান হয়ে যাই যে কানে সে শোনে, আমি তার চোখ হয়ে যাই যে চোখে সে দেখে, আমি হাত হয়ে যাই যে হাতে সে ধরে, আমি তার পা হয়ে যাই যে পায়ে সে চলে।’ এ ভালোবাসা যে কতটা নিঃস্বার্থ, মোহমুক্ত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ঠিক এই ভালোবাসার কারণে আল্লাহ ও তার মাখলুকের মধ্যকার ভালোবাসার মধ্যে কোনো শরিক তিনি পছন্দ করেন না। বিষয়টা শুধু পছন্দ-নাপছন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শরিককারীকে কখনো ক্ষমা করবেন না মর্মে আয়াতও নাযেল করেছেন।
আল্লাহর এই গুণ-বৈশিষ্ট্য আমি নারীজাতির মধ্যে পেয়েছি। তারাও তার স্বামীর প্রতি ভালোবাসার মধ্যে কোনো শিরকত পছন্দ করে না। নবীপত্নীদের মাঝেও এই বৈশিষ্ট্য ছিল। যদিও নবীপত্নীদের সকলে মাসনা, সুলাসা, রুবাআ ছিল। তবুও ভালোবাসা প্রদানের ক্ষেত্রে সকলেই ছিল প্রতিযোগীসম। কে কার চেয়ে ভালোবেসে এগিয়ে থাকবে, এমন মৌনপ্রতিযোগিতা পাওয়া যায় হাদিসের পাতায়।
এ যুগে এসে সেই প্রতিযোগিতা এখন একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এখন নারীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতে প্রতিযোগিতার মাঠে রাজ করতে চায়। প্রতিদ্বন্দ্বি থাকলে তাদের নাজুক মন ঈর্ষাকাতর হয়ে ওঠে। এমনটা হয়ত নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্যই হয়। এর বাইরে কোনো কারণ দেখি না।

কিছুদিন আগে ‘মাসনা সুলাসা রুবাআ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের জন্ম হয়েছে। সেখানে পুরুষদের বহুবিবাহে অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। যদিও গ্রুপের সঞ্চালক তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, বহুবিবাহ নিয়ে সমাজে প্রচলিত ঘৃণার মনোভাব দূরীকরণেই এর আসল উদ্দেশ্য। যেটা মূলত পশ্চিমারীতি থেকে আমদানি করা।
প্রথমত, ‘বহুবিবাহ’টা অনুপ্রেরণার বিষয় নয়। এটি একটি প্রয়োজনের বিষয়। যার প্রয়োজন হবে, সে একাধিক বিবাহে আবদ্ধ হতে পারে, এমনই ইসলামের বিধান। আর পুরুষ কর্তৃক এই প্রয়োজনেরও নির্দিষ্ট সীমা আছে। তাই বিভিন্ন ফজিলত আর কোরআনের আয়াত দ্বারা কখনোই সাব্যস্ত করা যাবে না যে, ইসলাম বহুবিবাহ করতে নির্দেশ করেছে; বরং সব জায়গাতেই প্রয়োজন হলে একাধিক বিয়ের অনুমতি রয়েছে, সেটাও চারটির বেশি নয়।
যাইহোক, বহুবিবাহকে ইসলাম একেবারে নিষেধ করে দেয়নি প্রয়োজনের খাতিরে। যাতে করে প্রয়োজন দেখা দিলে একাধিক বিবাহ করাটা বৈধরূপে বহাল থাকে। এখানে প্রয়োজনটা কেবল শরীরবৃত্তীয় নয়, বরং এর বাইরে গিয়ে সেটা হতে পারে অসহায়কে আশ্রয়দান, নারীর সংখ্যাধিক্যের কারণে পাত্র সংকট ইত্যাদি। তবে এটি মোবাহ বা বৈধ থাকার ফলে প্রয়োজন ছাড়াও যদি কেউ বহুবিবাহ করে সেটাও জায়েজ হবে। গ্রুপটাতে সবচেয়ে বেশি মিসগাইড হতে দেখেছি, বহুবিবাহকে তারা ইদানীং সুন্নত বলে প্রচার করছেন! কিন্তু আসলেই কি বহুবিবাহ সুন্নত?
সুন্নত বলতে আমি স্বতন্ত্র সুন্নতের কথা বলছি। প্রয়োজন ও অবস্থা অনুপাতে কখনো ওয়াজিব, কখনো সুন্নত আর কখনো মুস্তাহাব হওয়াকে বুঝাচ্ছি না। কারণ এই ধরণের বিধান স্বতন্ত্র বিধান নয়। এগুলো অবস্থার অনুপাতে নির্ণীত হওয়া বিধান। যেমন, অবস্থার অনুপাতে কখনো মদ বা শুকর খাওয়াও আপনার জন্য ওয়াজিব হয়ে যেতে পারে। এটা তো ধর্তব্য না। বরং স্বাভাবিক হুকুম বর্ণনার সময় বিষয়ের স্বাভাবিক অবস্থাটাই লক্ষ্যণীয় হয়। তো ডান হাতে খাওয়া যেমন স্বতন্ত্র সুন্নত, বহুবিবাহ সে রকম সুন্নত কিনা, সেই প্রশ্নটাই আমি এখানে করতে চাচ্ছি। আমি যতটুকু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখেছি, বিবাহসংক্রান্ত সব জায়গায় শুধু বিবাহকে সুন্নত বলা হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে, ‘বিবাহ আমার সুন্নত।’ এটা হচ্ছে স্বতন্ত্র বিয়ের বিধান। বহুবিবাহের সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই। সাধারণ বিবাহ আর বহুবিবাহ কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দুইটা জিনিস। একটাকে আরেকটার সাথে যেন কেউ গুলিয়ে না ফেলেন সেজন্যই তো এক বিয়ে করেই সারাজীবন কাটিয়ে দিলেও তার ক্ষেত্রে বলা হয়, তিনি বিবাহের সুন্নতটা আদায় করেছেন।
তাছাড়া, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত সুন্নতের কাজে উৎসাহ দিতেন। অনেক ক্ষেত্রে এর ফজিলতও বর্ণনা করতেন। বহুবিবাহের জন্য না তিনি উৎসাহ দিয়েছেন, না এর ফজিলত বর্ণনা করেছেন। বরং উপরে বলা সেই একই হাদীসে যেটা দেখতে পাই সেটা হলো, নবীজী বলেছেন, ‘তোমরা অধিক সন্তানদানে সক্ষম ও স্নেহপরায়ণ নারীকে বিয়ে করো। কারণ আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মতের উপর গৌরব করবো।’
এখানে লক্ষণী হলো, এখানে উম্মতের সংখ্যা বেশি হওয়ার জন্য তিনি বিবাহের কথা বলতে গিয়ে অধিক সন্তানদানে সক্ষম মহিলাকে বিয়ের কথা বলছেন। একাধিক বিয়ের কথা কিন্তু বলেননি।

যারা এই ভয় দূর করতে পারবে তারাই কেবল ‘মাসনা সুলাসা রুবাআ’ করার যোগ্যপুরুষ। অার এই ভয় দূরীকরণ যার যার স্বেচ্ছার্থে। সুতরাং স্বেচ্ছার্থক কাজে অনুপ্রেরণা কতটুকু যৌক্তিক, তা রীতিমত ঝগড়ার বিষয়।
থাক, ঝগড়ার বিষয়ে গেলাম না। কথা হলো, সমাজে একটি জায়েজ আমল কিভাবে ‘ঘৃণা’র হলো! উত্তর ওই একটাই, আল্লাহর যে ভয়ের ব্যাপারটা কোরআনে উল্লেখ আছে, সেটার ওপর আমল হয়নি। কারণ, যদি ভয়ের বিষয়টি মেনে একটি বিবাহে সন্তুষ্ট থাকত, অথবা ভয়কে জয় করে চারবিয়ে করত, তাহলে এটি কোনো দিন ঘৃণিত হত না। যারা সমাজে এখনো চার বউয়ের মাঝে ইনসাফ করে চলেছে, এমনকি চার বিয়ে করে বিনা ঝগড়াঝাটিতে দিনাতিপাত করা দাম্পত্যকে এখনো সমাজের লোক ভালো চোখেই দেখে। মন্দ বা ঘৃণার চোখে দেখে কেবল ওই দাম্পত্যকে, যারা ভয়কে উপেক্ষা করে একাধিক বিয়ে করেছে আর ঝগড়া হয়েছে তাদের নিত্যনৈমর্ত্তিক ব্যাপার।
এখন আপনি বলতে পারেন, ‘একাধিক বিয়ের কথা তো আল্লাহ তায়ালাই সর্বপ্রথম বলেছেন। আল্লাহ প্রথমে ‘মাসনা-সুলাসা-রুবাআ’ বলেছেন তারপরে একটি বিবাহের কথা বলেছেন।’
আসলে কোরআনে যে 'ফানকিহু' (তোমরা বিবাহ কোরো) নির্দেশসূচক ক্রিয়ার সাথে ‘মাসনা সুলাসা রুবাআ’র কথা বলা হয়েছে, তাতে বিয়ে করার সীমা বোঝাতে গিয়ে দুই, তিন, চারের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ একের পর যে দুই, একথা আলাদাভাবে বলার কিছু নেই। তাই একের উল্লেখ ছাড়াই দুই তিন চার সংখ্যা বলে বিয়ে করার একটি প্রান্তসীমা আঁকা হয়েছে।
দেখুন, কেউ যদি বলে তুমি চারটি পর্যন্ত বিয়ে করার অনুমতিপ্রাপ্ত। এর অর্থ কিন্তু একটি বিয়ে করো, তারপর প্রয়োজনে আরো তিনটি বিয়ে করো। তাই বলে আয়াতের অর্থ এই নয় যে, তুমি দুইটি বিয়ে করো, অথবা তিনটি, অথবা চারটি। বরং বলা হয়েছে, তুমি দুটি, তিনটি অথবা চারটি পর্যন্ত বিয়ে করো।
আর দ্বিতীয়তম বিবাহ করতে গেলে অবশ্যই আপনাকে প্রথম বিবাহ সম্পন্ন করতেই হবে। তাই এখানে প্রথম বিবাহের কথা উল্লেখ করেননি। এমনটি নয় যে, আগে মাসনা সুলাসা রুবাআ, তারপর ওয়াহেদা বা এক। কারণ, 'ফানকিহু' বা বিয়ে করার নির্দেশ সরাসরি মাসনা, সুলাসা, রুবাআ নয়, বরং ফানকিহুর মাফউল হলো 'মা তবা লাকুম মিনান নিসা' আর ‘মাসনা সুলাসা ও রুবাআ’ হলো তার ব্যাখ্যা। অতএব, মাসনা সুলাসা ও রুবাআ আগে তারপর এক, কথাটি কোরআনের অলঙ্কারশাস্ত্রের পরিপন্থী।

এটা সত্যি যে, মুসলিম সমাজে বহুবিবাহকে বাঁকাচোখে দেখার ভাইরাসের আমদানি হয়েছে পশ্চিমা সমাজ থেকে। সেখানে এটাকে ভালো চোখে দেখা হয় না। অথচ এক নারীর স্থলে শত নারীগমন আবার তাদের সমাজে তেমন নিন্দনীয় নয়। বরং সেটাকে ব্যক্তি স্বাধীনতার মোড়কে পরিয়ে হালাল ও স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি পঁচে গেলে যা হয় আরকি!
সর্বশেষ এককথায় বহুবিবাহের বিষয়ে শরীয়তের যে মনোভাব আমার সামনে পরিস্ফুট হয়েছে তা হলো, বহুবিবাহ মোবাহ বা বৈধ একটি বিষয়। ফজিলতপূর্ণ স্বতন্ত্র কোন সুন্নত নয়। এটি প্রলুব্ধ করে নানানভাবে উৎসাহ দেওয়ার মতো বিষয়ও নয়। তবে কোথাও যদি এই বিধানকে অজ্ঞতার কারণে অস্বীকার করা হয় বা বাঁকাচোখে দেখা হয় তাহলে তা আলোচনার ও বুঝানোর মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। অজ্ঞতাকে দূর করতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
