গতকাল এর ১ম পর্ব দিয়েছিলাম। কেউ দেখতে চাইলে এই লিঙ্কে ১ম পর্ব যেতে পারেন। আজ এর ২য় বা শেষ পর্ব দিলাম।
সময় গড়িয়ে যেতে লাগলো তার আপন গতিতে। দেখতে দেখতে ছাত্রজীবন শেষ হয়ে এলো। এবার শুরু হলো আসল জীবনযুদ্ধ। এবারের সংগ্রাম, একটি চাকুরীর সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম একটি আশ্রয়ের সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম একটি…। যাইহোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।
অরকুটঃ

এসএমএসঃ

আমরা ব্যক্তিগত জীবনে হরহামেশা আমাদের পরিচিতজনকে এসএমএস করে থাকি। বিশেষ করে যেসব কথা সরাসরি বলতে অস্বস্তি লাগে বা গুছিয়ে বলতে অসুবিধা হয় সেসব ক্ষেত্রে এর জুড়ি মেলা ভার। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছেই এসএমএস সেবা বেশ জনপ্রিয়। তবে আমার ধারণা এটি প্রেমিক-প্রেমিকাদের নিকট সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়।
ফেসবুকঃ

২০০৮ সাল। তখনো ই-মেইলেই আছি। হটমেইলের পাশাপাশি ইয়াহুতেও একটা আইডি খোলায় ভালই কাজ চলছিল। এ সময় চারিদিকে ফেসবুকের রমরমা অবস্থা। সবাই একে বলে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তো, এক কলিগের অনুরোধে ফেসবুকে একটা আইডি খুলেও ফেললাম। আইডি খুলেই চক্ষু চড়কগাছ!! হায় হায়! কমেন্টস, সুন্দর সুন্দর ছবি, পুরানো বন্ধুদের আবার নতুন করে ফিরে পাওয়া, চ্যাটিং, খুঁচাখুঁচি (পোক) ইত্যাদি কত ধরণের সুবিধা। সাথে আছে মেসেজিং সুবিধা। আরো দেখলাম এখানে ব্যবহারকারীরা তাদের নিজস্ব প্রোফাইলকে বিভিন্ন ধরনের ফটো, ভিডিও, এবং তথ্য দ্বারা নিজের ইচ্ছামত সাজাতে পারেন। ফেসবুক ব্যবহার করে তাদের প্রত্যেকের প্রোফাইলে একটি "Wall" আছে, যেখানে সবাই মন্তব্য প্রেরণ করতে পারে। মুলতঃ এই Wall Posting কে Public Conversation বলে আখ্যায়িত করা যায়।
আমি খুব দ্রুত এর প্রেমে পড়ে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর বন্ধুদের প্রায় সবাইকে হারিয়েই ফেলেছিলাম। আসলে কঠিন বাস্তবতার চাপে পড়ে সবাই দিশেহারা হয়ে ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে যে যার ভবিষ্যতের পথ তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ঠিক এ সময়ে ফেসবুক আমাদের জীবন ধরণই পাল্টে দিল। এক বন্ধু সুদূর আমেরিকাতে আছে, নো প্রব্লেম; একজন বিলেতে আছে, সো হোয়াট; একজন পঞ্চগড় আছে, কুছ পরোয়া নেহি। শুধু কস্ট করে ফেসবুকে একটা আইডি খুললেই কেল্লা ফতে। কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও কোন সমস্যা নেই। খোঁজ- দ্য সার্চ। মানে সার্চ করে বের করো। কি তাজ্জব ব্যাপার। এত এত সুবিধা যে এখন ফেসবুক না হলে আমার চলেই না। উঠতে বসতে খেতে এমনকি ঘুমাতেও গেলেও ফেসবুক। এখনো তীব্র গতিতে এগিয়ে চলছে ফেসবুকের গাড়ি।
টুইটারঃ

আর একটা কথা। টুইটারের সদস্যরা অন্য সদস্যদের টুইট পড়ার জন্য নিবন্ধন করতে পারেন। এই কাজটিকে বলা হয় অনুসরণ করা বা follow করা। কোনো সদস্যের টুইট পড়ার জন্য যারা নিবন্ধন করেছে, তাদেরকে বলা হয় follower বা অনুসারী। আমার টুইটারে একটা আইডি থাকলেও তেমন ব্যবহার করা হয় না। কারণ আমরা বেশী কথা বলি।
এছাড়াও আরো কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আছে যেগুলোর বেশ জনপ্রিয়তা আছে। যেমন মাইস্পেস, হাইফাইভ ইত্যাদি। আমি এগুলো ব্যবহার করি না বিধায় বিস্তারিত আলোচনা এড়িয়ে গেলাম।
একটা সময় যখন মানুষের চিঠি আদান-প্রদানের ব্যবস্থা ছিল না তখন মানুষ নাকি কবুতরকে পোষ মানিয়ে যোগাযোগের কাজ চালাত। একদিন মানুষ চিঠির আদান-প্রদান পদ্ধত শিখল। একাধারে কয়েক শতাব্দী ধরে চিঠির রাজত্ব চলল। কালক্রমে সাধের ডাকঘরে শ্বশানের নিরবতা বিরাজমান প্রায়। কিছু সরকারী কাজ-কারবার ছাড়া এর মূল্য সামান্যই। টেলিগ্রাম, ফ্যাক্স সেবা পেরিয়ে এলো ই-মেইল সেবা। এক ঝটকায় এর জনপ্রিয়তা হলো আকাশচুম্বী। বেশ কয় বছর ধরে এটি মানুষের মাঝে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিল। এখনো ই-মেইলের গুরুত্ব একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তবে জনপ্রিয়তায় অবশ্যই বেশ পিছিয়ে পড়েছে। কালক্রমে ঝড়ের বেগে আগমন ঘটল ফেসবুক আর টুইটারের। এই দুটি সামাজিক যোগাযোগ সাইট পুরো বিশ্ব এক নিমেষে নিজেদের পকেটে পুরে নিল। মোটাদাগে এখন সারাবিশ্ব দুইভাবে বিভক্ত। একদলে ফেসবুক অন্যদলে টুইটার। অবশ্য ইনস্টাগ্রামের কথা না বললে খুব অন্যায় হবে। বেশ কয়েকটি উন্নত দেশে ফেবু-টুইটার ছাড়িয়ে ইনস্টাগ্রাম বেশী জনপ্রিয়।
এরপর কি?
কবুতর গেল, চিঠি, টেলিগ্রাম এলো; চিঠি-টেলিগ্রামের প্রয়োজনীয়তা প্রায় নিঃশেষ করে দিয়ে এলো ই-মেইল; তাও টিকলো না। ই-মেইলকে পেছনে ফেলে আমাদের মাঝে হাজির হলো ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রাম। এরপর কি? সময়ই তা বলবে। সময় হলো পাগলা ঘোড়া। সবাইকে ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে চলাই তার কাজ। যার উত্থান হয়, তার পতন হয়। এই সূত্র মানলে ফেসবুকেরও তো পতন হওয়ার কথা। একটা ইংরেজি প্রবাদ আছে, History repeats itself. কথাটি কি ফেসবুকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে? ফেসবুকের দাপটে যেমন হারিয়ে গিয়েছিল অরকুট, তেমন ‘এলো-র দাপটে ফেসবুকও কি হারিয়ে যাবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে?
সম্প্রতি এক নতুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা শোনা যাচ্ছে। তার নাম ‘এলো (Ello)। শোনা যাচ্ছে, ভুয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমাতে বা ভুয়া ব্যবহারকারী নির্মূল করতে ফেসবুক ঠিক করেছে, যারা নতুন প্রোফাইল খুলবেন তাদের আসল নাম-ধাম দিয়ে তা খুলতে হবে। এখানেই বাজিমাত করছে ‘এলো’। কারণ, অনেক সেলিব্রিটি অন্য নামে প্রোফাইল খুলতে আগ্রহী। সরাসরি নিজের নাম ব্যবহার করে প্রোফাইল খোলার হ্যাপাও তো কম নয়। কিন্তু ফেসবুকের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। নিয়ম চালু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই ‘এলো যাত্রা শুরু করে। তাদের এত বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে অনেকেই এখন সে দিকে ঝুঁকছেন।
এখন মানুষের রুচি চেঞ্জ হচ্ছে অতি দ্রুত। এক জিনিষে বছরের পর বছর পরে থাকার কোন ইচ্ছে কারুরই নেই। এর মধ্যে অনেকগুলো নতুন নতুন সাইট এসেছে। হয়েছে তুমুল জনপ্রিয়। চলুন কিছু নাম দেয়া যাক। ফেসবুক, টুইটার, লিঙ্কডইন, পিন্টারেস্ট, গুগল প্লাস, ইনস্টাগ্রাম, ভিকে, ফ্লিকার, ভাইন, মিটআপ, ট্যাগড, আস্ক.এফএম, বেবো, ক্লাসমেট ইত্যাদি। উপরের সাইটগুলোর গড়পড়তা ভিজিটকারী ৯০০,০০০,০০০ থেকে ১৫,০০০,০০০ এর মধ্যে। সুত্রঃ উইকিপিডিয়া
কোন সন্দেহ নেই যে, সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোর মধ্যে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল প্লাস, পিন্টারেস্ট বা ভাইন সেরা এবং এগুলো আরো কিছুদিন দাপটের সাথে রাজত্ব করবে। তবে নিঃসন্দেহে এসকল সাইটগুলো সামনের দিনগুলোতে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। নতুন নতুন ফিচার ও সুবিধা নিয়ে উপরের সবগুলোকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে নতুন নতুন সাইট। তেমন আভাস এখনই পাওয়া যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে যে সকল সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো ঝড় তুলবে বলে অনুমিত সেগুলোর কয়েকটি হলো, Secret, Shots of Me, Snapchat, WeChat, We Heart It, Tinder, Bubblews, Whisper, Medium, Nextdoor, Path, Highlight, Mobli ইত্যাদি।
কেমন হবে ভবিষ্যেতের যোগাযোগ মাধ্যমগুলো? এখনই শোনা যায় মানুষ মুখে কথা বললেই ডিভাইস তা লিখিত রুপ দিচ্ছে। সেদিন খুব দূরে নয় যেদিন মানুষের চিন্তাকে লিখিত রুপ দেয়ার যন্ত্র আবিস্কার হয়ে যাবে। সত্যি যদি তাই হয় তবে সেদিন আসলেই প্রলয় ঘটে যাবে বোধহয়।
শেষ কথাঃ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আর এই মাধ্যম হিসেবে ফেইসবুক, টুইটার এর মতো সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো সৃষ্টি করেছে নতুন একধরনের সামাজিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, আমাদের নিত্যকার সামাজিক সম্পর্কগুলোও আর সেই মানবীয় সম্পর্কে নেই। একবিংশ শতাব্দীর এই নব্য ধারা নিয়ে এই মাধ্যমগুলো নামে সোশ্যাল হলেও কাজে কতটুকু সোশ্যাল কিংবা মানুষকে কতটুকু সোশ্যাল করতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। যতই প্রশ্ন থাকুক না। এভাবেই এগিয়ে চলবে সময়ের গাড়ি। সবসময় এভাবেই চলতেই সে অভ্যস্ত। কারণ সময় তো আসলেই পাগলা ঘোড়া। একে বাগ মানানো যায় না। বরং মানুষকেই সময়ের ধারা অনুযায়ী চলতে হবে।
লেখা শেষ করবো আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি-র একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে, তাহলোঃ "Change is the law of life. And those who look only to the past or present are certain to miss the future".
সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
বিঃদ্রঃ লেখাটি তৈরী করতে উইকিপিডিয়া থেকে ব্যাপক সাহায্য নেয়া হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ৯:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



