somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

*** বৈশাখের একাল-সেকাল ***

১৫ ই এপ্রিল, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙ্গালীদের অভাবনীয় আনন্দের একটা দিন। সাড়ে চারশত বছর আগে সম্রাট আকবর তার রাজস্ব কর্মকর্তা আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীর পরামর্শে ১৫৫৬ সালের এই দিন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রথম বাংলা সন চালু করেন। ১৬১০ সালে যখন ঢাকাকে সর্বপ্রথম রাজধানী হিসেব গড়ে তোলা হয় তখন রাজস্ব আদায় আর ব্যবসা- বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য পহেলা বৈশাখকে সম্রাট আকবরের অনুকরনে সুবেদার ইসলাম খান চিশতি তার বাসবভনের সামনে সব প্রজার শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ এবং বৈশাখী উৎসব পালন করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই পহেলা বৈশাখ আজো আমাদের কাছে আতুলনীয় আনন্দের একটা দিন।

চিরায়ত বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল “হালখাতা”। এই দিনে রঙ্গীন কাগজে সাঁজানো হয় দোকান-পাট আর ব্যবসায়ীরা মিষ্টি মুখ করায় খরিদ্দারদের। দেনা-পাওনা মিটিয়ে হাসি ফুটে ক্রেতা-বিক্রেতার মুখে।

নদী-মাতৃক এই দেশে দরিদ্র গ্রামবাংলার মানুষ খাবার হিসেবে নিতেন ডাল-ভাত আর নদী পুকুরের সহজ লভ্য মাছ। পান্তা ভাত আলুভর্তা, পোড়া মরিচ ইত্যাদি ছিলো তাদের কোন রকম বেঁচে থাকার জন্য সকালের খাবার। বৈশাখ উপলক্ষে তারই ধারাবাহিকতায় ইলিশ মাছের সাথে পান্তাভাত আর পেয়াজ মরিচের মিলবন্ধনে ভিন্নস্বাধে ভরে উঠতো গ্রামবাংলার বৈশাখী সকাল। ১২ রকমের তরকারী আরা তাজা মাছ দিয়ে তৃপ্তিসহ খাবার খাওয়া ছিলো আমাদের পূর্বপুরুষদের জন্য একটা আনন্দঘন ব্যপার।

রং-বেরংয়ের পিঠা-পায়েশের আয়োজন দেখা যেত বাড়িতে-বাড়িতে। আনন্দের মাত্রা ছাড়িয়ে যেত সবার হৃদয়ের মনিকোঠায় একে অন্যের আতিথীয়তায়। আমাদের ইতিহাস- ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এমন সাড়ে চারশত বছরের বৈশাখ।

বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে উদযাপন, বদলে গেছে আনন্দের ধরন। তাই চাইনিজ অথবা থাই রেস্টুরেন্টে হাজার টাকার পান্তা-ইলিশ দিয়ে শুরু হয় বৈশাখ। বাঙ্গালীর প্রিয় ঈলিশের হালি তাই বৈশাখে হয়ে যায় ৪০ হাজার টাকা, মধ্যবিত্ত সমাজে তাই বামন রাজ্যের চাঁদ হয়ে যায় রূপালী ইলিশ। নববর্ষ উদযাপনের নাম করে একদিনের বাঙালী সেজে কি আমরা গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষের জীবনযাপনকে উপহাস করছি না?

আমাদের কাছে বৈশাখ মানেই এখন “পান্তা ইলিশ” আর “মঙ্গল শোভাযাত্রা” যদিও তার কোনটাতেই আমার কোন আপত্তি নেই ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন পর্যন্ত তা শান্তিপূর্ণ ও অসম্প্রদায়িক। ধর্মনিরপেক্ষতার দৃষ্টিভংগি তে এই মঙ্গল শোভা যাত্রা যদি প্রার্থনা হয় তবে আর তা অসম্প্রদায়িক হয়ে কি করে? শত বছরের মৌলিক সংস্কৃতি মিশে গেছে ভিন্ন উৎসবের মিশ্রনে। শত কোটি টাকার খরচ বেড়েছে তাতে কি যায় আসে? কে কত বড় করে শোভাযাত্রা করতে পারলো? প্রতিযোগীতা তো সেখানে। অথচ মঙ্গল শোভাযাত্রাটি কে বৈশাখী উৎসবের সাথে যুক্ত করেছি ২৬ বছর আগে ১৯৮৯ সাল থেকে।

সাড়ে চারশত বছরের ইতিহাসে শুরু হলো বিবর্তন। স্বকীয়তা হারাতে থাকলো আমাদের বৈশাখ ভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রনে। তাহলে আমরা কি সুখী নই আমাদরে স্বতন্ত্র সংস্কৃতিতে? অনুকরণ করতেই হয় বিদেশী সংস্কৃতিকে?

একদিনের জন্য নিজেকে বাঙ্গালী বানিয়ে, মুখে রং কালি মেখে, ফ্যশানের ধরন বদলে দিলেই যে বাঙালী হওয়া যায় না তা ভুলে গিয়ে জোর গলায় বলে উঠি “এসো এসো, হে বৈশাখ, এসো এসো”। রবীন্দ্র-নজরুল আর বাঙ্গালীয়ানার পরিচয় নিয়ে সকালটা বৈশাখী আমেজে শুরু হলেও শেষ হবে কেন বিজাতীয় সঙ্গীত দিয়ে? তা আমার বোধগম্য নয়। আনন্দের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে আমাদের এখন আর বাংলা গানে মনে হয় নৃত্যটা জমে উঠে না। তাই বড়-বড় কান ফাটানো স্পিকারে বাজে বিজাতীয় সঙ্গীত “মুন্নির বদনাম” অথবা “বেবী ডল”। উচ্ছাসিত তরুনেদের কেউ কেউ বেছে নেন ট্রাক অথবা ভ্যান, যেখানে তারা ঘুরে বেড়াবেন সারা শহর আর তাদের তীব্রতর শব্দে স্পিকার গুলো নির্দ্বীধায় হিন্দি আর ইংরেজী গানে কান ফাটিয়ে যাবে আশে-পাশের মানুষ গুলোর। উদ্ভট এই আনন্দের নামে মেয়েদের উত্যক্ত করা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, কোন অংশেই আমাদের বৈশাখী উৎসবের অংশ হতে পারে না।

আমাদের অপসংস্কৃতির মিশ্রনে হারাচ্ছি বৈশাখের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্য বন্ধনের মিলন মেলা হয়ে যাচ্ছে বিচ্ছেদের কারণ। অপসংস্কৃতি, নগ্নতা, বেহায়পনা আর উশৃখলতাকে পরিহার করতে গিয়ে বৈশাখী আনন্দকে বর্জন করছেন অনেক্ই, অথচ এই অতিরঞ্জন ১৯৮৯ সালের আগে কোন কালেই বৈশাখী বর্ষবরণের অংশ ছিলো না।

আমরা আসক্ত হয়ে গেছি দলাদলি, মারামারি আর হিংসার মত ঘৃন্য কর্মকান্ডে কারণ আমরা ভুলে গেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই সম্প্রীতি-ভালোবাসা। আমাদের মত করে বদলে দিয়েছি আমাদের সোনালী ইতিহাস । তাই এখন বৈশাখ মানেই কৃত্তিম পান্তা ভাতে ফরমালিন ইলিশ, বৈশাখ মানেই রং বেরংয়ের সাজ, বৈশাখ মানেই পার্টি ডান্স, বৈশাখ মানেই উশৃঙ্খলতা, ইভটিজিং আর নিরাপত্তাহীনতায় নারী সমাজ। এই যদি হয় আমাদের বর্ষবরণ তবে কি আর রইলো সোনালী ইতিহাসের পাতায়। শত বছরের ইতিহাস তাই মলিন করে দিচ্ছি আমরা। আমাদের সমৃদ্ধ স্বতন্ত্র সংস্কৃতির মধ্যে জোর করে মিশিয়ে দিচ্ছি বিজাতীয় সংস্কৃতি। তবে কি শিখবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের কাছে? আসুন না ফিরিয়ে আনি আমাদের নিজেদের ঐতিহ্য কে, কারো ধার করা সংস্কৃতি দিয়ে নয় নিজেদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতিতে, সেই স্নেহ-ভালবাসাময় ভ্রাতৃত্বীতের মিলবন্ধনে। তাহলেই ভালো থাকবো আমরা, আমাদের প্রজন্ম, সংস্কৃতি আর সোনালী অতীত।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ৯:৪০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×