আনন্দ সিনেমা হলের সামনে মিতা দাঁড়িয়ে আছে, তাও প্রায় দু’ঘন্টা হয়ে গেল।কিন্তু ওপাশ থেকে মোবাইল তোলার কোন শব্দ কানে আসছে না,মাথার ওপর ভোঁ ভোঁ করছে জৈষ্ঠ্যের কাঠ ফাটা রোদ।পুড়ছে শহর,পুড়ছে মানুষ।সেই পোড়া গন্ধ গায়ে নিয়ে হাজার খানেক লোকের মাঝখানে মিতা অপেক্ষা করছে প্রফেসর আরিফের জন্যে।হুম,প্রফেসর সাহেব অবশেষে ফোন তুললেন।ভারী কন্ঠ আরো ভারী শোনালো তার—কে,মিতা ,বলো।কেমন আছো তুমি?
এ এক অদ্ভূত যন্ত্রনা।যে তাকে অপেক্ষা করতে বলেছে বেলা তিনটায়,সে বিকেল পাঁচটায় ফোন ধরে যদি দিনকালের খবর জানতে চায় তাহলে উত্তরে কি বলা উচিৎ ।
তাই তেমন কিছুই না বলে মিতা জিজ্ঞেস করলো-তুমি কি এখনো ক্যাম্পাসে?
-হুম,দুপুরে চোখ লেগে গিয়েছিল।তোমার ফোন পেয়েই উঠলাম।তোমার মিটিং শেষ ?
প্রশ্নটা শুনেতো আরো মনটা খিঁচিয়ে গেলো-স্যার ,আমার মিটিং ছিল বেলা একটায়।তিনটায় আপনার কাওরানবাজার থাকার কথা ছিল।এখন বাজে বিকেল পাঁচটা।
-ওহ,ডিয়ার ।আমি ভুলেই গিয়েছিলাম,মনে ছিল না সত্যি বলছি।
মিতার আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছে না।এমনিতেই ঘামে ভিজে জবু থবু অবস্থা ,তাই কোন কিছু না বলেই ফোন রেখে দিল।হাতে ভারী এক খানা ব্যাগ,ওতে স্যারের জন্যে বিরানী আর গরুর মাংস ভুনা আছে।খুব যত্ন করেই রান্না করেছে মিতা,নিজের হাতে।ছুটির দিন বলতে ওই এক শুক্রবার,মানুষটা একা একা থাকে ;কি খায় না খায়।তাই ঠিক করেছিল দুপুরের খাবারটা এক সাথে বসেই সেড়ে নেবে,কিন্তু অতি ভুলো মনা প্রফেসর তা আর হতে দিল কোথায়।মিতা ভালো করেই জানে-এই প্রফেসরের হাত ধরে কোন দিন সে সমুদ্রে পা ভেজাতে পারবে না।তাকে প্রস্তাব দিলেই উত্তর হবে-না মিতা,আমিতো ছুটি নিতে পারবোনা,সামনে ছেলে মেয়েদের পরীক্ষা ।আর যদি কোন রকম ভার্সিটি বন্ধ থাকে তাহলে উত্তর হবে এমন-ওফ ডিয়ার ,আমারতো অনেক খাতা দেখা বাকী,এগুলো সময় মতো জমা না দিলেতো ওরা পাশ করতে পারবে না।
মাঝে মাঝে মিতা জানতে চেয়েছে-আমি কি আপনার বিশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একজন,নাকি তার বাইরে কেউ?
হো হো করে হেসে উত্তর দিয়েছে আরিফ-তুমিযে কি বলো,তুমিতো আমার সব চেয়ে ইস্পেশিয়াল ,দেখোনা তুমি ডাকলেই কেমন দৌড়ে চলে আসি।
আরিফ যে তাকে সময় দেয় এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই,কিন্তু দুই ঘন্টার মধ্যে এক ঘণ্টাই স্যার ব্যস্ত থাকেন তার প্রিয় ছাত্র ছাত্রীদের ফোনে।কার কবে কি পরীক্ষা ,কার পি এইচ ডি আটকে আছে,কার ভর্তি সমস্যা।মিতা খুব ভালো করেই জানে ,এইযে এতো আগ্রহ নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে তার কিছুই প্রফেসর মনে রাখবে না।ছাত্রদের পরীক্ষার খাতায় সব কিছু মিলিয়ে যাবে।কিন্তু এই খাবার হাতে নিয়েতো আর ঘরে ফেরা যাবে না,একশটা প্রশ্ন করবে মা।প্রশ্নের উত্তর দিতে এখন মিতার খুব ক্লান্ত লাগে।হাতের ব্যাগটা সে ছুঁড়ে দিল ডাস্টবিনে।
সে রাতে এক ফোটা ঘুম এলোনা,অনবরত ম্যাসেজ আসছে ফোনে।সবি আরিফের পাঠানো,তাতে “সরি” লেখা আছে,”মাফ করো” লেখা আছে।আছে কবিতার অনেক শব্দ মালা।কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারনে কিছুই তেমন স্পর্শ করছেনা মিতার।কারন মিতা জানে,আরিফ এই কাজটির পুনরাবৃত্তি আবার করবে।সঠিক সময়ে ফোন না তোলার অভ্যেস তার অনেক পুরোন।তারপর যাও বা ধরবে সেই চির চেনা কন্ঠে হাসি দিয়েই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবে-কেমন আছো মিত?গলা শুনে মনে হবে ,অনেক দিন পর দু’জনের কথা হলো।এবার কেবল কুশল বিনিময় শুরু।
রাত যতো গভীর হচ্ছে,চাঁদটা যেন ক্রমশ রূপের ভাঁজ খুলে দিচ্ছে।শফেদ ঝলমলে আলোর বিচ্ছুরণ ছুঁয়ে দিচ্ছে মিতার চোখ –মুখ-ঠোঁট ।না বলতে পারা কান্নারা বাদল হয়ে ঝড়ে পড়ছে ক্রমশ,মিতা সেই নদীতে ডুবে থাকে সমস্ত রাত্রী।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


