somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফেলে যাওয়া পত্রিকা //

২৬ শে মার্চ, ২০১৬ রাত ৯:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


অন্য সবার যেখানে এক কিলো যেতে লাগে প্রায় দশ মিনিট সেখানে হেলাল মাত্র পাঁচ মিনিটেই পুরো রাস্তা কাবার করতে পারে।জটিল জ্যাম বা দম বন্ধ করা ধোঁয়া কোনটাই তাকে ঠিক কাবু করতে পারেনা ,সে হেঁটে চলে আপন গতিতে।বিয়ের পর এই কারণে কম বিপত্তি ঘটেনি,অনেক সময় দেখা গেছে রুমু-ঝুমুর মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছে ; মফস্বলের রাস্তা ভাঙ্গা -চোড়া ,ডাক্তার বলে দিয়েছে বাচ্চা হবার কিছু দিন আগ অব্দি রিক্সায় ওঠা যাবে না। হেলাল অফিস থেকে ফিরে শায়লাকে নিয়ে ঠিকি ডাক্তারের চেম্বার পর্যন্ত গিয়েছে , খুব যত্ন করে বউয়ের হাত নিজের মুঠোতে রেখে হাঁটি হাঁটি পা পা করে চেম্বারে পৌঁছে গেছে।কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রামে যখন দেখা গেল একটি না হেলাল সাহেব দু দুটো মেয়ের বাবা হতে যাচ্ছে-এই শুনে সে বেশ লাফাতে লাফাতেই বাড়ি ফিরে এলো।পথের মধ্যে যে বৌটা দাঁড়িয়ে আছে সে কথা সে দিব্যি ভুলে গেছে। ছোট বোন মনে করিয়ে দিল-ভাইয়া, ভাবীকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?হাসপাতালে ভর্তি করে দিলে বুঝি?কথার উত্তর কি দেবে , হেলালের গলা শুকিয়ে কাঠ।
স্বামীর সাথে বাইরে ঘুরতে যাবার ইচ্ছে সে দিনই শায়লা বাদ দিল,এমনিতেই ছোট চাকরী ।বাড়ি ভর্তি দেবর-ননদ,সবাই কলেজের ছাত্র-ছাত্রী।প্রেম করে বিয়ে করার এই এক যন্ত্রণা -বিয়ে করতে যে বাড়ি ঘর দেখতে হয় সেই হুঁশ ছিল না শায়লার।তবে এটা সত্য,জোরে হাঁটা ছাড়া হেলালের আর কোন বাজে অভ্যেস নেই।রাত করে কোন দিনই সে বাড়ি ফেরে না, ভুলেও একটা সিগারেটে টান দেয় না, বন্ধের দিন বন্ধু- বান্ধব নিয়ে মেতে ওঠে না।এই যে এক সাথে দু দুটো মেয়ে হলো ; শায়লা কিন্তু রাত জেগে বসে থাকেনি, বুকের দুধে ওদের পেট ভরতো না ;তাই দুই জনের মুখে দুটো ফিডার দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়তো।রাত জেগে বাচ্চাদের প্রস্রাবের কাঁথা বদলাতো হেলাল ,রুমু ঘুমালে জেগে থাকতো ঝুমু -আবার ঝুমু ঘুমালে জেগে থাকতো রুমু।পালা করে সারা রাত হাঁটতো সে বারান্দায়।
এই দুই বোন ছোট বেলায় এক সাথে না ঘুমালেও বাকী সব কাজ এক সাথেই করে। কে কতো সেকেন্ড আগে জন্মেছে তা নিশ্চিত করে যদিও ডাক্তার বলতে পারেনি ধারনা করা হয় যার হাইট একটু বেশী সেই বড়।আর বড় যে সেই রুমু।যমোজ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বেশীর ভাগ দেখা যায় দুই জনের আচরণ দুই রকম।কিন্তু রুমু ঝুমু এক সাথে একই ধরণের জামা পড়লে হেলাল নিজেই গুলিয়ে ফেলে রুমু কোনটা আর ঝুমু কোনটা ।দুজনই খুবই শান্ত প্রকৃতির, কোন বাড়তি চাহিদা তাদের নেই,বাইরে গেলে বাবা-মার কাপড় দোকানীর সামনে টেনে ধরে না ,কেউ বাড়ি এলে চিৎকার করে বায়না ধরে না।শখের মধ্যে তাদের একটাই-পত্রিকা পড়া। হেলাল অফিস থেকে ফেরার সময় যে পত্রিকাটা আনেন সেটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখা ।অবশ্য এই অভ্যেস হেলালই তাদের করেছে,আজকাল বাচ্চারা কেবল ফেইসবুকে মুখ গুঁজে থাকে।তাদের মধ্যে সৃষ্টিশীল কিছু নেই, হেলাল সাহেব মনে মনে চাচ্ছিলেন তার মেয়ে দুটো বই পড়ুক, পড়ে পড়ে বিশ্বকে জানুক।বিষয়টা তাই ঘটেছে, মেয়েরা সারাদিন খুব একটা টেলিভিশন দেখে না, বিকেল বেলা কিছু নাস্তা খেয়ে অপেক্ষা করতে থাকে বাবার হাতের পত্রিকাটার জন্য।
হেলাল তার চির চেনা শহরের ওলি গলি ধরে হেঁটেই চলেছে । চৈত্রের হালকা বাতাস এসে মাঝে মাঝে তার এলো মেলো চুল ছুঁয়ে দিচ্ছে ,হঠাত মনে হলো এক দলা ধূলো উড়ে আসছে দূর থেকে। অভ্যাস বশত ডান হাতের পাতা দিয়ে দু’চোখ ঢেকে ফেললো আর ওমনি তার মনে হলো-পত্রিকা নেই। সেকি ,অফিস থেকে বের হবার সময়তো হাতেই ছিল ।ফিচার পাতাসহ পত্রিকাটা গোল করে হাতের মুঠোয় নিয়ে বের হয়েছে ,তাহলে কি বাসেই ফেলে এসেছে ?ঠিক মনে করতে পারছে না হেলাল ।বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো।সারাটা দিন মেয়ে দুটো এই ফিচার পাতা দেখার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকে।তেমন কিছুই না -কোন মডেল কি পোশাক পড়লো, কোন নায়িকা কি সিনেমা করছে কিংবা এই গরমে কোথায় ঘুরতে যাবেন-এই সব হাবি জাবি।কিন্তু এই সব হাবি জাবি মেয়ে দুটো খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে ,পছন্দের ছবি কেঁচি দিয়ে কেটে পড়ার টেবিলে লাগিয়ে রাখে। পত্রিকা কিনতে এলেও তারা সেগুলো বিক্রী করেনা ,স্তূপের পর স্তূপ বানায় ঘরের এক কোনে।ঘর ময়লা হচ্ছে বলে শায়লা বহুবার বকা ঝকা করেছে ,কিন্তু কোন ভাবেই তারা পত্রিকা বিক্রী করবে না, তা যতোই পুরনো হোক।
হেলাল এবার উল্টো পথ ধরলো,পথে কোথাও পত্রিকাটা পড়ে গেল কিনা। নীচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগলো।ওদিকে ঝড় উঠেছে ভীষন, দোকান গুলো একটা একটা করে ঝাপি টেনে দিচ্ছে।তবু হেলাল হেঁটেই চলেছে-কোথাও যদি আজকের পত্রিকাটা কিনতে পাওয়া যায়।রাত নয়টা, এই সময় বাস স্ট্যান্ডের দোকানে সমস্ত পত্রিকা শেষ হয়ে যায়।এমন তো হতেই পারে কোন শপিং সেন্টারে কোন কোন দোকানের মালিক এই পত্রিকাটাই রাখতে পারে।বাবার মন,বার বার মেয়ে দুটোর মুখ ভেসে উঠছিল।মলীন দু’জোরা চোখ বলে দিচ্ছে-আজ,পত্রিকাটা আনতে ভুলে গেলে বাবা।হেলাল জানে তারা কোন দিন অভিযোগ করে কিছুই বলবেনা।যদি দেখে বাবার হাত খালি ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করবে -আজ পত্রিকা আনোনি বাবা?ওই একটি প্রশ্নই হেলালের দুনিয়া এদিক ওদিক করে দেবে।
শপিং মলের ভেতরে ঢুকে একটা উপকার অবশ্য হলো-বাইরের বাতাসের তীব্রতা তাকে আর আঘাত করতে পারলো না।সে পকেট থেকে রুমাল বের করে ধূলো মুছে নিল, পাশের ক্যান্টিন থেকে এক গ্লাশ পানিও খেয়ে নিল ।এখনো বেশ কয়েকটা দোকান খোলা আছে।কথা নেই বার্তা নেই অর্নামেন্টসের দোকানে ঢুকে পত্রিকা চাওয়াটা অনেকটা হাস্যকর হলেও সে তাই করলো। দোকানী প্রথমটা অবাক হলেও,পরে বললেন -আমরা পত্রিকা রাখিনা ,তবে আপনি ওই ওষুধের দোকানে খোঁজ নিতে পারেন।হেলাল প্রচন্ড আশা নিয়ে এগিয়ে গেল-আসলে হয়েছে কি,অফিস থেকে ফেরার পথে পত্রিকাটা যে কোথায় ফেলেছি ঠিক বলতে পারছিনা।আপনি কি ...পত্রিকাটা রাখেন? বিক্রেতা তাকে আরো অবাক করে দিয়ে বললেন-ভাই ,আমি সকালেই পেপারটা পড়ে বাড়িতে পাঠায় দেই, সারাদিন বৌ বসে বসে পেপার পড়ে।
রাত খুব বেড়ে গেছে, ভীষন ক্লান্ত লাগছে নিজেকে।মোবাইলে চার্জ শেষ, শায়লা নিশ্চই আজ খুব টেনশন করবে।এতো রাত তার কোন দিন হয় না ,কিন্তু পত্রিকা না নিয়ে ফিরতে তার ইচ্ছে করছেনা মোটেও।কলেজ পড়ুয়া দুটো মেয়ে কখনো কোন দিন বায়না ধরেনি , কান্না-কাটি করে অস্থির করেনি সেই ছোট বেলাতেও একটা খেলনার জন্য।কোন দিন আবদার করে বলেনি-বাবা,আমাদের কক্সবাজার বেড়াতে নিয়ে চলো।হেলালের স্বল্প আয়ের সংগতি শায়লা যেমন বুঝেছে তেমন বুঝতে পারে তার ফুটফুটে দুটো মেয়ে।এদের করুন চোখের মায়া ভরা চাহনী সে কিভাবে সহ্য করবে ? যেভাবেই হোক , আজ রাতের মধ্যে একটা পত্রিকা তাকে জোগাড় করতেই হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০১৬ রাত ৯:৫০
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছোটগল্প - চক্ষুহীন লোকটি

লিখেছেন ফাহমিদা বারী, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩




মি পারসনস যখন হোটেল থেকে বের হলেন, ভিক্ষুকটি তখন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।

সে ছিল একজন অন্ধ ভিক্ষুক। অন্ধদের চিরাচরিত সাদা ছড়ি ছিল তার হাতে। সেটা দিয়ে সামনের পথটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মন কথনিকা-৬৩৮৯-৯০=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫৫

মন কথনিকা-৬৩৮৯
সকাল সকাল উঠে দেখি, চোখের মাঝে ঘুমের পাহাড়
চোখ মেললেই ঘুমরা ছড়ায়, চোখের মাঝে ক্লান্তির বাহার
রাত বারোটায় ঘুমোতে যাই, ফযর বেলা উঠে পড়ি
পাঁচ ঘন্টা ঘুম মাত্র ঘুমাই, না ঘুমিয়ে ক্লান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১২

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

/শুধু তাই না, তারা খোলাখুলি ভাবেই আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা ও জঙ্গী আতঙ্কের অর্থনীতিতে এক নির্বোধজীবি আত্মভোলা জাতির আয়না

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩

এক

বুদ্ধিজীবিরা নাকি জাতির বিবেক! তা সে তো ভালো কথা। কিন্তু সাধারণত যা ভালো তা যখন খারাপ তখন সাধারণত তা খুবই খারাপ। একটা জাতির সবচেয়ে মজার কিন্তু করুণতম দৃশ্য হলো তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্র ব্যর্থদের দায়িত্ব নেয় নাকি ব্যর্থতার সংজ্ঞাই রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত হয়???

লিখেছেন সুব্রত দত্ত, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪

আমাকে যারা চেনেন অথবা আমার অন্যান্য লেখা যাদের পড়া আছে তারা জানেন আমি একজন নিহিলিস্ট। একজন নিহিলিস্ট ‘রাষ্ট্রধারণা’য় বিশ্বাসী নয়। রাষ্ট্র সম্পর্কে সে উদাসীন। আমি নিজেও রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×