somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চন্দ্রবিন্দুর সম্মান

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি দিনটির জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম। অবশেষে আগামীকাল তার মুখোমুখি হবো।

সমাজের সাথে আমার সাংঘর্ষিক সম্পর্ক। বহুদিন ধরে। দিনতারিখ গুনে বলতে পারবোনা। কেবল এটুকু বলতে পারি, আমি মনেপ্রাণে একটি চূড়ান্ত পরিণতি চাইছি। দম আটকে যাওয়া যাপনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি।

আব্বার ঘরের বড় ঘড়িটা সবসময়েই জোরে বেজে উঠে। আমি বেশ অন্যমনস্ক থাকি। তাই চমকে যাই। আর চমকে যেতো আম্মা। আম্মার কথা যতোবারই ভাবি, বিস্মিত হই। একজীবনে অগুনতিবার বিস্মিত হতে দেখেছি তাকে। আমার বড় ভাই মায়ের স্বভাব পেয়েছে। লোকে এমনটাই বলে। লোকের অবশ্য বলার শেষ নেই।

গতো দুইদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এমনটা শেষ কবে দেখেছি বলতে পারিনা। পাড়ার বয়োঃবৃদ্ধ কালো কুকুরটিকে কিছুদিন হলো দেখছিনা? সেও কি………

মনে আছে সেদিনও বেশ বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমি বাইরেই জুতাজোড়া খুলে রাখছিলাম। ঘরে ময়লা জুতা নিয়ে ঢুকলে আমার শান্তশিষ্ট আম্মা বাড়ি মাথায় তুলতে সময় নিতোনা। জুতাজোড়া রাখছিলাম, একটি অস্ফুট শব্দ কানে আসলে কৌতূহলী হয়েছিলাম।

পরিচিত বন্ধুবান্ধদের যতোটা সম্ভব এড়িয়ে চলি। দুই বছর হয়ে গেলো। নিজে থেকে শেষ দেখা করেছিলাম শাফায়েতের সাথে। তার বাসায় গিয়েছিলাম। অনেক কথা হয়েছিলো। বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিলো, শরীর জুড়ে কেউ হাজার হাজার আঁচড় কেটে দিয়েছে। তারপর থেকে নিজের ঘরকে অবলম্বন করে বেঁচে আছি। আর কিছু বইপত্র। সরকারী চাকরীর।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত ছোট কাকা আমাদের সাথে থাকতো। গমগম করে হাসতো ছোট কাকা। যেনো সমগ্র পাড়ার সকলের হাসি সে একাই হাসছে। ছোট কাকার সাথে আব্বার বনিবনা হতোনা কখনো। ছোট কাকা বড় ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধার কার্পণ্য করতোনা। কিন্তু নিজস্ব মূল্যবোধের ব্যাপারে অনড় ছিলো। ছোট থাকতেই তা বেশ টের পেতাম। কাকা তার প্রতিটা খাতায় একটা কথা লিখে রাখতো। ‘চন্দ্রবিন্দুর সম্মানের প্রতি সকলে আকৃষ্ট হয়না।’

বাইরে বৃষ্টি একটু থেমেছে। ফ্যানের সুইচ বন্ধ করে দিলাম। পাশের ঘর থেকে আব্বার কাশির শব্দ আসছে। ইদানিং বেশ কষ্ট পাচ্ছেন লক্ষ্য করেছি। নিজে থেকে কিছু বলতে যাইনা। পরিষ্কার বুঝতে পারি টানা দুই বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন আমাকে পর্যাপ্তভাবে নিষ্পৃহ করে তুলেছে। কিন্তু উপায় কী? চন্দ্রবিন্দূর সম্মানের যেই উত্তাপ, তাকে আমি অগ্রাহ্য করতে পারিনি।

শম্পা বেণী দুলিয়ে প্রাণ খুলে হাসতো। লালবাগের কেল্লায় এখান থেকে সেখানে হাঁটতে হাঁটতে সে গলা খুলে হাসতো। পরিপার্শ্বের প্রতি আমার বিব্রত স্বভাবকে সে তোয়াক্কাই করতোনা। মাঝেমাঝে চিন্তা করতাম, স্বার্থপর বোন আর লম্পট দুলাভাইয়ের সাথে বসবাস করেও সে এতোটা প্রাণোচ্ছল থাকে কীভাবে? শম্পার হাসিতে আমি আমার ছোট কাকাকে দেখতে পেতাম। চারপাশের অসহনীয়তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেষ্টা করে যাওয়া। চন্দ্রবিন্দুর সম্মানের কাছে বশ্যতা স্বীকারের স্বচ্ছস্ফটিক অনীহা।

আম্মার সাথে ছোট কাকার দূরত্ব ছিলো। কিন্ত আম্মা ছোট কাকাকে প্রশ্রয় দিতো। দিব্যি বুঝতে পারতাম। বড় ভাই, বাবার আদর্শে বড় হওয়া মানুষ। ঔপনিবেশিক মধ্যবিত্তের মূল্যবোধে দীক্ষিত। নিয়ম-শৃঙ্খলা, সামাজিক প্রতিষ্ঠার সিঁড়িগুলো একের পর এক অতিক্রম করে যাওয়া, পরিচিত মহলে শ্রদ্ধেয় হবার প্রাণহীন জড় পরিণতিকে আলিঙ্গন করে নেওয়ার মাঝে যেই মূল্যবোধ সাফল্যকে চিহ্নিত করে।

শম্পার কথা ইদানিং অনেক কম মনে হয়। আমি বুঝতে পারছি, দিনে দিনে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছি। সমাজের সাথে দোস্তি করার পথে ক্রমশই উন্নতি করছি, বেশ টের পাই। রিটেন পরীক্ষা দিয়ে যখন এক্সাম হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, নিশ্চিত ছিলাম ভাইভায় আমার ডাক পড়বেই। আম্মা ছাড়া আমার প্রতি এতো আস্থা আর কারোর ছিলোনা। বউ-সন্তান নিয়ে বাসা ছেড়ে যেওয়ার সময়ে আমার প্রতি বড় ভাইয়ের চাহনী আজীবন ভুলতে পারবোনা। যেনো আমার কপালে অসম্মানিত হবার পরিণতি চিরকালের জন্য মোহরাঙ্কিত।

সেই দিনটির পর থেকে আমি কোন অস্ফুট শব্দ শুনতে পেলেই চমকে উঠি। যেনো কোন বিপদ আমার পথে ওত পেতে রয়েছে। বৃষ্টিস্নাত ময়লা জুতাজোড়া বাইরে রেখে ধীরে ধীরে ঘরে আসছি। অস্ফুট শব্দটা এবারে পরিষ্কার। আব্বার কন্ঠস্বর চিনতে কখনোই ভুল হতোনা আমার। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তার বন্ধ ঘর থেকে নারী কন্ঠের সংকোচপূর্ণ হাসি শোনা যাচ্ছিলো। আম্মা সদ্য বিধবা হওয়া বোনের বাড়িতে গিয়েছিলো। নারী কন্ঠটি শুনতে পাবার পরে পা টিপে টিপে রান্নাঘরে গিয়েছিলাম। অজস্র ময়লা বাসনকোসন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঘর মোছার বালতির সাথে আরেকটু হলে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতাম। গ্যাসের চুলা নিভিয়ে দিয়েছিলাম।

এই ঘটনার এক মাসের মধ্যে আম্মা কোত্থেকে এনড্রিন যোগাড় করেছিলো কে জানে। নাকি সিদ্ধান্তটা অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিলো? কেবল এক্সিকিউশনে বিলম্ব? বলতে পারিনা। আম্মার ডেডবডির পাশে আব্বার শূন্য চোখ দেখে আপ্লুত হবার কোন কারণ ছিলোনা। কতোটা সঠিক ছিলো আমার অভিব্যক্তি তা দিন পনেরো পরে ঠিকই বুঝেছিলাম। পানি খেতে রান্নাঘরে যাবো, দরজা ঠিকভাবে খুলতে না খুলতেই দেখি সদ্য ঘরের কাজে যোগ দেওয়া আঠারো বছর বয়সী মেয়েটির সাথে আব্বা ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিমায় কথা বলছে।

আগামীকাল এক নতুন ইঙ্গিতের সূচনা হবে। আমি ঠিক করে রেখেছি, ছোট কাকার যে হাতঘড়িটা এতোদিন ধরে পরে এসেছি তা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে ঘড়িহীন অবস্থাতেই ভাইভায় যাবো। ব্যাপারটা সিম্বলিক। চন্দ্রবিন্দুর সম্মানকে আমি অগ্রাহ্য করতে পারিনি। এমন একটি অনিবার্য দিনে কিভাবে ছোট কাকাকে নিজের সাথে বহন করি?

না, আমি খোদ নিজেকে কেন্দ্র করে বাঁচতে চাই। মৃত আম্মা, দ্বিচারী আব্বা, আত্মকেন্দ্রিক বড় ভাই, লম্পট দুলাভাইয়ের সাথে ইলোপ করা ডিসিভিং শম্পা, দীপ্যমান হয়ে এতোকাল ধরে স্মৃতিতে জাগরূক হয়ে থাকা অসফল কিন্তু দৃঢ়চেতা ছোট কাকা- এদের সকলকে আমি অতিক্রম করে যাবো। অক্ষর হিসাবে চন্দ্রবিন্দুকে অতোটাও আর অকিঞ্চিৎকর মনে হয়না।

বাইরে আবারো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পাশের ঘর থেকে আব্বার কাশির দমক ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আধশোয়া ছিলাম। ঘুমাতে যাবার আগে আয়নায় নিজেকে দেখে নিলাম। জানালার পেছনে হাত দিতে শক্ত কী একটা পেলাম।

আয়নাটা ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেলে মনে হলো, আগামীকাল থেকে চন্দ্রবিন্দুকে অবলম্বন করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবো। নিঃসংকোচে।


সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ২:২৭
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রিলেশনশিপ

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:২৩

রিলেশনশিপ
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

কোনো রমণীর সাথে রিলেশনশিপে
জড়াইনি বলে প্রতিদিন-ই শুনতে হয়
উপহাস, ঠাট্টা, বিদ্রূপ, পরিহাস, তাচ্ছিল্য
ও ব্যঙ্গ কতো কথা, খুব খারাপ লাগে
সারাদিন তা কানে খালি বাজে
পালাতে ইচ্ছে করে বিমর্ষ, লাজে!

বয়স হয়ে গেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

'তুমি আমাকে এটা কোন ধরনের হোটেলে নিয়ে এলে?'

লিখেছেন এমএলজি, ১৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

এ লেখাটি ম্যাচিউর পাঠকদের জন্য। সে কারণে reader discretion is advised, অর্থাৎ, অস্বস্তি লাগলে পড়বেন না।

ব্যবসায়িক কাজে চায়না গেলেন হাজি মামুন (ছদ্মনাম)।

পঞ্চাশোর্ধ বয়সের সংসারী মানুষ তিনি। ঘরে পরহেজগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:২২



আজ শুক্রবার। শুক্রবার মুসলমানদের জন্য বিশেষ একটি দিন।
আজ বাংলা আষাঢ় মাসের ৫ তারিখ। যদিও বর্ষাকাল। আজ আকাশে মেঘ নেই। বরং রোদ উঠেছে। রোদের তাপ ভালোই। শাহেদ পথে বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফিনটেঁক কোম্পানী রিপাবলিক ইউরোপকে ছেড়ে দেওয়ার সত্য ঘটনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩

বাংলাদেশের আইটি ফার্মগুলোর মাঝে আমার ফার্মই তাঁর ইঞ্জিনিয়রাদের সবচেয়ে বেশি বেতন দিতো। আমার সিনিয়র রুবি অন রেইলস ব্যাকএন্ড ডেভেলপার ছিলো রিফাত। বয়স ৩০, সেই বয়সেই সে মাসে পেতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে এসো পূর্ণিমায়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



তুমি ছাড়া ভালো লাগে না পূর্ণিমা চাঁদ, তুমি লুকিয়ে চন্দ্রিমার হলুদ বর্ণে। মায়াবী জোছনা মাখা রাত সবই যেন নিস্ফল, মন যেন হারিয়েছে আঁধারে সব সময় কাঁদে। চারিদিকে যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×