somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি সৃষ্টির আদেশ দিলাম

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৩:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কয়েক হাজার বছর আগে এক কবিরাজ এমিউলেট হাতে মন্ত্রপুত দাবী করলেন তিনি কঠিন কঠিন রোগের নিরাময় করতে পারেন। মন্ত্র সম্বিলিত চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বেশ কিছু বইও লিখে ফেললেন। যার প্রথম মন্ত্রটি,"আমি সৃষ্টির আদেশ দিলাম।" পাগলাটে কোবরেজ কারো অসুখ সারাতে পেরেছিলো কি না জানি না, তবে বলতে হয় তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তার বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় ছিলো, ২০০০ বছর পরও কোনো ম্যাজিসিয়ান তার যেকোনো জাদুর শুরুতেই তার মন্ত্র উচ্চারন করে,"আব্রা কা ডেব্রা!" হিব্রুতে এর অর্থ "আমি সৃষ্টির আদেশ করলাম।" বাইবেল অনুসারে ঈশ্বর বলেছিলেন,"লেট দেয়ার বি লাইট!" ইসলাম অনুসারে আল্লাহ বলেছিলেন,"হও!" কোবরেজের কি পরিমান আত্মবিশ্বাস!

কখনো কখনো ভাবি প্রায় অর্ধ শত বছর আগে যে মানুষটি ততকালীন রেসকোর্স ময়দানে আঙ্গুল উচিয়ে সবার মনে স্বাধীনতার আগুন জ্বালয়ে দিলেন, তিনি কি সত্যি জানতেন আসলেই স্বাধীনতা আসবে কিনা! যদি আমরা হেরে যেতাম, তার লাশও এদেশে ফিরতো না। সত্যি এটাই হতো যারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে এক হাতে গ্রেনেড, আরেক হাতে ভাঙ্গা রাইফেল তুলে এগিয়ে গিয়েছিলেন তাদেরকে এখন গাদ্দার বলে অভিহিত করা হতো। নির্দিস্ট দিনে শেখ মুজিবের নাম মীরজাফরের কাতারে ফেলে স্মরন করিয়ে দেয়া হত এই বাঙ্গালী গাদ্দারী করেছে তাদের ধর্মভাইদের বিরুদ্ধে, এরা রাস্ট্রদ্রোহী। বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে কেরানির পদে চাকরি পেয়ে দু'বেলা ভাত খাওয়ার নিশ্চয়তা পেতাম সেখানে উর্দু জানা কলেজ পাশ কেউ ম্যানেজার হয়ে ছড়ি ঘুড়াতো দিব্যি। অথচ একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে যে স্ফূলিঙ্গ ছড়ালো, তাকে কি বলা যায়?

চায়ের দোকানের আড্ডায় কতশত মানুষ বসে। এসব চা আমার পেটে সহ্য হয় না। এত কড়া মিস্টি, কন্ডেন্সড মিল্কের ছোয়ায় এমন একটা স্বাদ ধারন করে, চায়ের আসল স্বাদ কেমন সেটা ভুলে যাই। আমি চা খাবো, শরবত নয়। মানুষের সাথে কথা বলার লোভ প্রচন্ড আমার। অফিসের কথাগুলো মেকি লাগে। সবার মধ্যে ব্যাস্ততা। প্রেজেন্টেশন শেষ হবার আগেই মোবাইলে ম্যাসেজ দেখার পায়তারা, ৫ টা বাজার আগেই ব্যাগ গুছিয়ে উবারের জন্য দাড়িয়ে থাকা। এখানে খুজে পাওয়া যায় না স্বতঃস্ফূর্ততা। এরা মুদির দোকানে চা খাওয়াটা একটু তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখে।

"কক্সবাজারটা শেষ কইরা ফেলাইলো। এগুলারে জায়গা দিয়া সর্বনাশ করছে? দেশের মানুষ খাইতে পায় না, রোহিঙ্গা নিয়া পইড়া আছে সবাই", চায়ের কাপটা দিয়েই সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিলো। আমি একটু শান্তমত বসলাম। এই সময়টা সবাই ঘরে ফেরে, তাই বেঞ্চগুলো ফাঁকা। সন্ধ্যা যত ঘন হয়, আশেপাশে ভিড়তে থাকে ভ্যান চালক, রিক্সা চালকের দল। তারা খুব একটা কথা বলে না। রিক্সা ভ্যান ফেরত দিয়ে পাউরুটি পুরোটা মুখে চেপে ধীরে ধীরে চায়ের কাপটা শেষ করে। অনেকের জন্য এটাই দিনের প্রথম খাবার, কারো কারো জন্য রাতের শেষ খাবার। কথা বলার ফুরসত কম। কথা বলতে জানে না এটাও ভুল। তারা কথা বলতে ভয় পায়।"চাচা, বাড়ি কই?" আমার প্রশ্নটা শুনে চমকে গেলেন। গলা খাকাড়ি দিয়ে লাজুক হাসিতে,"রাজশাহী।"

খেটে খাওয়া মানুষের এমন লজ্জিত হাসি এত কিউট হয়,"পদ্মা সেতু দেখছেননি?" কি যেনো ভাবলেন উনি,"জব্বর সেতু বানাইছে। দেখতে যাওনের ইচ্ছা আছে।" কথা বলতে বলতেই রুটি চা শেষ করে ফেললেন। সালাম দিয়ে বললেন আসি। সবাই নীড়ে ফিরছে। কেউ ফেরে খালি হাতে, কেউ ফেরে দুটো টাকা নিয়ে। নতুন দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। এসব মানুষের কাছে স্বাধীনতা, বিজয় দিবস অর্থহীন, অর্থহীন পদ্মাসেতু তৈরী হলো কি হলো না। তারা রাস্তা দেখলেই একটা রিক্সা, ভ্যান নিয়ে নেমে পড়ে। দুটো টাকার জন্য গনগনে রোদে মানুষ টেনে বেড়ায়। আমি রিক্সাতে আরাম করে বসে দেখি চালকের আসনে যিনি প্যাডেল টানছেন শীর্ন দুটি পা দিয়ে, ঘন্টার পর ঘন্টা, সে কস্টটা আমার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়। পুরোটা দিন ঘন্টার পর ঘন্টা রিক্সা টানছে, কখনো দিনের রিক্সা জমা দিয়ে রাতেও বের হতে হয়। হাজার টাকা জমা দিয়ে কোন কোন দিন রিক্সা নিয়েও ফিরতে পারে না। বিনা ঘোষনায় রাস্তা বন্ধ করে মিউনিসিপ্যালিটির গাড়ি এসে রিক্সা গুলো তুলে নিয়ে যায় তখন ঘাড়ে জমা হয় আরও কিছু দেনা। সেই দেনা আর পেটের ক্ষুধা নেভাতে একদিন নেমে পড়ে চুরি ডাকাতি ছিনতাইয়ে। যদি ধরা পড়ে তাহলে ক্রশফায়ার, যদি না পড়ে, কালোজগতের নেশা গ্রাস করে। এভাবেই আমাদের স্বাধীনতা মূল্য হারায়। আজ হতে অর্ধশত বছর আগে যে মানুষটা এব্রাকা ডেব্রার মতো সবার মনে জাদু ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনিও প্রতিদিন লক্ষ কোটি বার হেরে যান।

আমরা সবাই স্টেজে দাড়িয়ে থাকা সঙ সাজা নকল জাদুকর- আব্রা কা ডাব্রা
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৩:০৭
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯


ভূমিকা
সকল নবি ও রাসুল প্রতি সালাম ও দুরুদ পর
দাউদের সুরে, মূসার পথে, ঈসার প্রেমের বাণী
মুহাম্মদের মরু পেরিয়ে শুনেছি যুগের ধ্বনি
কৃষ্ণের বাঁশি, বুদ্ধের ধ্যান, সুফির অন্তর সন্ধান
যোগীর তপে, মরমীর গানে খুঁজেছি... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৪১



ফারাজা তাবাসসুম খান-
আজ বুধবার, ৮ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ইংরেজি ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৬। বহু আগে একটা বই পড়েছিলাম- 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'। প্রধান চরিত্রের নাম- হাজারি ঠাকুর। সে বাস্তববাদী, সহজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরোনামহীন কবিতা-০৭

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে
সমুদ্রের গান শোনা,
অথবা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে
মেঘের ভেলায় হারিয়ে যাওয়ার
কত যে ইচ্ছে—স্ব-যত্নে পুষে রেখেছিলাম
মনের গহীনতম কোণে!

কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে—
অকারণ কাঁপা আঙুলে
একটি খুদে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম
তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×