somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ : আমাদের তরুণদের করণীয়

০৪ ঠা জুন, ২০২১ সকাল ১০:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইসলামের নামে যাঁরা সন্ত্রাস করছেন, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে এমনকি মানুষ হত্যা করছেন, তাঁদের উদ্দেশে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার জন্য নিবেদন করছি—এক. মানুষ আল্লাহর অত্যন্ত ভালোবাসার সৃষ্টি। মহান রব ফেরেশতাদের আপত্তি উপেক্ষা করে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি বলে ঘোষণা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর আপনার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন তারা বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত আপনার গুণকীর্তন করছি এবং আপনার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি (আল্লাহ) বললেন, নিঃসন্দেহে আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩০) মহান স্রষ্টা মানুষকে এতটাই ভালোবেসেছেন যে তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর অবয়ব দিয়েছেন মানুষকে। সব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।’ (সুরা : ত্বীন, আয়াত : ৪)। মহান আল্লাহ ভালোবাসার সৃষ্টি মানুষের জীবন, মর্যাদা, সম্পদ ও সম্মান সুরক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। একজন মানুষ হত্যা করাকে গোটা মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য অপরাধ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষ হত্যা কিংবা জমিনে সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করল সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল, আর যে মানুষের প্রাণ বাঁচাল, সে যেন সকল মানুষের প্রাণ বাঁচাল।’ (সুরা: মায়িদা, আয়াত : ৩২) রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আসমান-জমিনের সমস্ত অধিবাসী একত্রে মিলিত হয়েও যদি একজন মুমিনকে হত্যা করার কাজে অংশগ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (তিরমিজি : ১৩৯৮) মানুষ হত্যা এতটাই ভয়ংকর অপরাধ যে হত্যার অপরাধের ক্ষেত্রে অসীম দয়ার আধার মহান রবের কাছেও ক্ষমা পাওয়ার আশা ক্ষীণ। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বলেন, ‘যেসব বিষয়ে কেউ নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পরে তার ধ্বংস থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় থাকে না, সেগুলোর একটি হচ্ছে অন্যায়ভাবে রক্ত প্রবাহিত করা (অর্থাৎ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা)।’ (বুখারি : ৬৮৬৩) মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি গুনাহ আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেবেন। তবে দুটি গুনাহ আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন না। প্রথমটি হচ্ছে, কোনো মানুষ কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা, অপরটি হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করা।’ (নাসায়ি : ৩৯৮৪) রাসুল (সা.) তাই বলেছেন, ‘আমার পরে তোমরা একে অপরকে হত্যা করে কাফির হয়ে যেয়ো না।’ (বুখারি : ১২১) দুই. কেউ হয়তো আমার যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত করে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলবেন, রাসুল (সা.)-কে গালমন্দ, অপমান, অবমাননার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় ও সাহাবিদের জামানায় রাসুল (সা.)-কে অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হাদিসের উদ্ধৃতি বিষয়ে কোনো মুসলমানের দ্বিমত করার সুযোগ নেই। কিন্তু এ কথাও তো সত্য, রাসুল (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে কাফির, ইহুদি ও মুনাফিকদের নির্যাতনে রক্তাক্ত হয়েও ধৈর্য ধারণ করেছেন। তারা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে উপহাস করেছে, মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, কষ্ট দিয়েছে, পাথর ছুড়ে মেরেছে। তারা বলেছে, তিনি জাদুকর, পাগল, নিন্দিত ব্যক্তি। তারা তাঁকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলেছে যে তিনি কবি বা গণক। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘দেখুন, ওরা আপনার জন্য কেমন সব উপমা দেয়। ওরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। অতএব, ওরা পথ পেতে পারে না।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল : ৪৮)। এত কিছুর পরও রাসুল (সা.) ধৈর্য হারাননি, তাদের হত্যা করেননি। তিন. হত্যা-সন্ত্রাস করে কি রাসুল (সা.) ও তাঁর প্রিয় সাহাবিরা (রা.) ইসলাম প্রচার করেছেন? মানুষ হত্যা করে, সন্ত্রাস করে কি ইসলামের কোনো উপকার হয়েছে? কখনো যাচাই করে দেখেছেন ইসলামের নামে উগ্রবাদকে কত শতাংশ মুসলমান সমর্থন করে? বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক সময় এমনকি স্বজনরাও নিহত উগ্রবাদীর মৃতদেহ গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। উগ্রবাদিতার কারণে বাংলাদেশের মানুষ কি ইসলামের আদেশ-নির্দেশের প্রতি আরো অনুরক্ত হয়েছে? সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, ধর্ষণ, বলাৎকার, পর্ন ছবি দেখা, কিশোর গ্যাংস্টার—এসব বন্ধ হয়েছে? বাস্তবতা হলো, এসব বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি জরিপ বলছে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। তাই সন্ত্রাস নয়, শান্তি ও সম্প্রীতিকে পাথেয় করে হিদায়াত ও সংশোধনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। রাসুল (সা.) জাহেলি শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য জোরজবরদস্তি, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করেননি। রাসুল তাঁর সাহাবিদের (অনুসারীদের) আত্মঘাতী হওয়ার, চোরাগোপ্তা হামলার শিক্ষা দেননি। বরং সুন্দর ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, আল্লাহর পথে আহ্বান, আত্মগঠন ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। আপনারা তাহলে কার অনুসরণ করছেন? আল্লাহর আইন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হলে তা শুধু আল্লাহর কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথেই করতে হবে। ইসলামের নামে কোনো শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। বরং ইসলামের নামে উগ্রতার কারণে দেশে-বিদেশে টুপি-দাড়িওয়ালা মানুষ শুধু সন্দেহ আর অবিশ্বাসেরই শিকার হচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে হামলা, অপমান, অবহেলা ও বিদ্রুপের শিকার হচ্ছে। ইসলামের নামে বোমাবাজি, হত্যা, সন্ত্রাস আর আত্মহননের কারণে মসজিদে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, সীমিত সময়ের জন্য মসজিদ খোলা থাকছে। ফলে মসজিদভিত্তিক ইসলামী জ্ঞানচর্চা বন্ধ হয়ে গেছে।
সন্ত্রাস পৃথিবীব্যাপী পরিচিত, বহুল আলোচিত শব্দ। সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ এবং মানবতার প্রতি চরম হুমকি। রাজনৈতিক কারণে হোক বা অন্য কোন ব্যাপারে স্বার্থসিদ্ধি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার নিমিত্তে বোমা বিস্ফোরণ, অপহরণ, ভয়-ভীতি বা গুপ্ত হত্যার মত ঘৃণ্য কাজই হলো ‘সন্ত্রাসবাদ’; যা সভ্য সমাজে সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়। সন্ত্রাসের কোন ধর্মীয় ভিত্তি নেই, ইসলাম ধর্মে এটি ঘৃণ্যতম কাজ। ভীতি তথা ফিতনা সৃষ্টি হত্যার চাইতেও মারাত্মক। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সব মানুষের প্রাণ, সম্পদ, মর্যাদা অত্যন্ত পবিত্র। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করল।’
জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে বা অস্ত্রের বলে ইসলামের আদর্শ কোথাও প্রচারিত হয়নি। ইসলাম টিকে আছে এবং টিকে থাকবে তার কালজয়ী আদর্শ, অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে পারস্পরিক সহ-অবস্থান, সহিষ্ণুতা, মানবিক আচরণ ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। ইসলামে সন্ত্রাসের ঠাঁই নেই, প্রকৃত মুসলমানরা কখনও সন্ত্রাস করতে পারে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। তাই এর অনুসারীরা মানুষ হত্যা করতে পারে না, সম্পত্তি বিনষ্ট করতে পারে না। শুধু তাই নয়, কোন মুসলমান নিছক রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ তো দূরের কথা, অন্য কোন প্রাণীও হত্যা করতে পারে না।
নিজ ধর্মের ইমাম ও অন্য ধর্মের পুরোহিতদের হত্যা, হুমকি, বোমাবাজি, আতঙ্ক সৃষ্টি, বিদেশীদের জিম্মি বানিয়ে হত্যার মত সন্ত্রাসবাদের দূরপ্রসারী প্রভাব তো আছেই, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও ব্যাপক। যেমন এতে বিশ্ববাসীর কাছে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা যায়। বিদেশীরা মনে করে ইসলাম সন্ত্রাসী ধর্ম এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম সহ্য করতে পারে না। ইসলামের দাওয়াতী তৎপরতা বাধাগ্রস্ত করা সন্ত্রাসীদের আরেকটি উদ্দেশ্য।
নাম, টুপি-দাড়ি, হিজাব, বোরকা-জিলবাব মুসলমানদের পরিচয় ও ঐতিহ্য বহন করে। বিদেশ বিভূঁইয়ে বসবাসরত মুসলমান নারী-পুরুষ এই ঐতিহ্য লালন ও ধারণে ভীতিসন্ত্রস্ত হচ্ছেন। পথে অপদস্থ হওয়ার বহু ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছে।
যে দেশে বিদেশী ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও দাতাসংস্থার পরামর্শক সন্ত্রাসীদের হাতে মারা যায়, স্বাভাবিকভাকে সে দেশে বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বিদেশী সাহায্য বাধাগ্রস্থ হয়। এতে দেশের ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি হয়। তখন জঙ্গিদমনে সহায়তা দানের প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গি তৎপরতা আগে নির্দিষ্ট কতিপয় দেশে বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। ইদানিং পশ্চিম এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত সশস্ত্র লোকেরা হামলা করার জন্য মার্কেট, হোটেল, গণপরিবহণের স্টেশন, বিমান বন্দর, ধর্মীয় উপাসনালয় বেছে নেয়। আত্মঘাতী বোমার আঘাতে নিজেও উড়ে যায় অন্যদেরকেও উড়িয়ে দেয়। এখন পৃথিবীর কোন জায়গাই আর নিরাপদ নয়। সবাই ঝুঁকিতে। সন্ত্রাসবাদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক নেই। ধর্মকে ব্যবহার করা হয় স্বার্থ হাসিলের জন্য। ধর্ম এখানে মূল অবলম্বন নয় আনুষঙ্গিক মাত্র। কেউ নিজেদেরকে সুন্নি, মুজাহিদ, আল্লাহর পথের যোদ্ধা, হকপন্থী, তাগুতের যম, বখতিয়ারের তলোয়ার, সালাহুদ্দিনের ঘোড়া, তিতুমীরের কেল্লা, খিলাফত প্রতিষ্ঠার সৈনিক ইত্যাদি পরিভাষায় পরিচয় দিলে খোঁজ খবর নিতে হবে, চালাতে হবে অনুসন্ধান। উৎস কোথায়, উদ্দেশ্য কী? ইসলামের মৌল আদর্শ-শিক্ষার সাথে তাঁদের কর্মতৎপরতার সাদৃশ্য ও বৈশাদৃশ্য কী? জানতে হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামদের মহিমান্বিত জীবনধারার সাথে তাদের কর্ম প্রয়াস ও তৎপরতার মিল আছে কি না। কেউ যদি কপালে ‘আল্লাহু আকবার’ ব্যাজ লাগিয়ে অথবা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে সশস্ত্র অভিযান চালায় তাৎক্ষণিক পুলকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিভাষার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিলে সমূহ বিপদে পড়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। আমাদের মনে রাখতে হবে হযরত আলী (রা.)-এর জামানায় ধর্মীয় উগ্রগোষ্ঠী খারিজী সম্প্রদায় ‘ইনিল হুক্মু ইল্লালিল্লাহ’ শ্লোগান দিয়ে বিদ্রোহ করেছিল। মুসলিম বিশ্বে তারা সমূহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাঁদের হাতে বহু মুসলমান শাহাদত বরণ করেন। হযরত আলী (রা.)-কে শহীদ করার পর ঘাতক আবদুর রহমান ইবন মুলজিম উচ্চৈঃস্বরে আল্লাহ আল্লাহ যিকির করছিল।
সন্ত্রাসবাদের যারা মূলহোতা তারা দূর থেকে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তাদের অর্থের অভাব নেই। দুনিয়াজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক। তাদের পরিচয় কী তদন্ত ছাড়া স্পষ্ট করে বলা যাবে না। তবে আঁচ করা যায়। এক দিন তাদের মুখোশ খসে পড়বে। তরুণ ও যুবকরা তাদের টার্গেট। মানুষ চেতনা ও আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়। বৃদ্ধদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত তরুণদের মন মগজে চেতনা-আবেগ থাকে অধিক সক্রিয়। পবিত্র জিহাদের ডাক, তাগুতের উৎখাত, জান্নাতের প্রত্যাশা, খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে সামনে রেখে বাছাইকৃত তরুণদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং তুলে দেয়া অস্ত্র, বোমা ও গ্রেনেড। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসজনিত দুঃসাহসিকতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলমানের ছেলেরা বুঝতে পারে না যে তারা অন্যের হয়ে কাজ করছে। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি ও মিডিয়া প্রচারণা চালাত যে, মাদরাসার ছাত্রগণ সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িত। তাঁদের মতে যেহেতু অধিকাংশ মাদরাসার ছাত্র সমাজের দরিদ্র শ্রেণী থেকে উঠে আসা; সহজেই মোহনীয় টাকার হাতছানি তাদের সন্ত্রসবাদের সাথে যুক্ত করে। তাঁদের এ অভিযোগে সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা ও কাল্পনিক। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, এখন সন্ত্রাসী তৎপরতার সাথে যুক্ত তরুণরা সমাজের অতি বিত্তশালীদের সন্তান, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে উত্তীর্ণ ও দেশ-বিদেশের নামি-দামী সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া। এখন এর কী জবাব আছে? আমরা মনে করি সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতার জন্য কোন বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়।
কূটনৈতিকপাড়া নামে খ্যাত ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গিদের হাতে ২০জন দেশী-বিদেশী প্রাণ হারানোর ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত, বেদনাহত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। পবিত্র রামাযান মাসে নিরীহ মানুষদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেউ সহজে মেনে নিতে পারেননি। ইতালীর যেসব ব্যক্তি আমাদের দেশে গার্মেন্টস ব্যবসার সাথে জড়িত এবং ঢাকার মেট্রোরেলের পরামর্শক হিসেবে জাপানের যেসব প্রকৌশলী কর্মরত আমরা তাঁদের জিম্মি বানিয়ে জবাই করে দিলাম। তাঁরা তো কোন পক্ষ-বিপক্ষের লোক নয়, অপরাধী নয় বরং উন্নয়ন সহযোগী। এ হত্যাকাণ্ড কোন ধর্ম, আদর্শ, নৈতিকতা ও রাজনীতির মাপকাঠিতে পড়ে না। এর ফলে ইসলাম ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে ভুলবার্তা গেছে- কোন সন্দেহ নেই। পবিত্র ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদগাহের অনতিদূরে পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে দুজন কনস্টেবলসহ চার ব্যক্তি প্রাণ হারালেন। ঈদের দিনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম। কারা আমার দেশের কম বয়সী তরুণদের হাতে অস্ত্র দিয়ে ইসলামের চেহারা কালিমা লিপ্ত করার প্রয়াস চালাল তাদের খুঁজে বের করে আইনের হাতে সোপর্দ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক দোষারোপের পুরনো খেলায় মেতে উঠলে প্রকৃত অপরাধী গা ঢাকা দেবে, নির্দোষ মানুষ শাস্তি পাবে।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মত নিহত জঙ্গিদের মৃতদেহ তাদের পরিবার নিতে আগ্রহী হয়নি। এমনকি শোলাকিয়ায় নিহত আবিরের জানাযায় কেউ শরীক পর্যন্ত হয়নি। জনৈক তত্ত্বাবধায়ক ইমামতি করে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেন। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, এদেশের মানুষ এসব জঙ্গি কর্মকাণ্ড পছন্দ করে না।


সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে কখনও কখনও দুএকটি মুসলিম নামধারী গ্রুপ নিজেদের ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করে। কিন্তু আসলেই কি তারা মুসলিম? নাকি মুসলমানের ছদ্মবেশে অন্য কেউ? তারা তো এমনও হতে পারে যে, কোন পক্ষের হয়ে কাজ করার জন্য তাদের তৈরি করা হয়েছে। বিশেষত ইসলাম এবং মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসের দায়ভার চাপিয়ে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা নিজেদের দায়মুক্ত করবার চেষ্টা করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াবার কাজটি কৌশলে চালিয়ে তার লক্ষ্য হাসিল করতে চাচ্ছে? সম্প্রতি প্রকাশিত লোনওয়াচডটকমের রিপোর্ট দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে জান-মালের যে ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে তার জন্য ইসলাম বা এর অনুসারীরা দায়ী নয়। দায়ী অন্য কেউ। অন্য কোন পক্ষ। আগামীদিনের বিশ্ব নিশ্চয়ই প্রকৃত সন্ত্রাসীদের চিনতে সক্ষম হবে।
তাহলে আমাদের করণীয় কী? কেবল মাত্র সরকার বা রাষ্ট্র একার পক্ষে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষদের এ ব্যাপারে সংগঠিত করতে হবে। সামাজিক শক্তিগুলোকে একতাবদ্ধ করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা যে কোন উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শক্তি। সমাজে ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে যাতে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হত্যাকাণ্ড, বোমাবাজি বা আতঙ্ক ছড়াতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমাদের সন্তান-সন্ততি কোন উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত হচ্ছে কি না সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং জড়িত হয়ে পড়লে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিনিধিত্বশীল বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সংকট মোকাবেলায় রাজনৈতিক সংলাপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। ওলামা-মাশায়েখ সামাজিক শক্তির প্রতিনিধি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সর্বশ্রেণীর ওলামা ও মাশায়েখদের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক প্লাটফর্মে জমায়েত হয়ে মিথ্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যের বিকল্প নেই-এই সত্য যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করা যায় ততই মঙ্গল। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভার আয়োজন ও ক্ষুদ্র-বৃহৎ পুস্তিকা ও জার্ণাল প্রকাশের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরতে পারলে এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ব্যবস্থা করা গেলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। সন্ত্রাস ও জিহাদ যে এক নয় এ কথা আলিম, ইমাম ও খতিবগণ ওয়ায ও মসজিদের বয়ানে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। জিহাদের পবিত্র চেতনাকে সন্ত্রাসের উম্মাদনার সাথে গুলিয়ে ফেলা হবে মারাত্মক ভ্রান্তি। ইসলামে উগ্রপন্থা নেই, মধ্যমপন্থা অনুমোদিত। জিহাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বিধান। জিহাদের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি আছে। জিহাদের নামে আল্লাহ তায়ালা নারাজ, অসন্তুষ্ট ও ক্রোধান্বিত হন এমন কোন কর্মকাণ্ড শরীয়ত অনুমোদন করে না।
নাস্তিকতাকে যারা বেছে নিতে চায়, তাদের উদ্দেশে বলছি, ইসলামে ধর্মের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি বলুন, আপনার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ২৮) তবে নাস্তিকতার নামে কোনো ধর্মের স্রষ্টা, নবী-রাসুলকে আক্রমণ করা প্রচলিত আইন অনুযায়ীই অপরাধ। আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় আইনে মত প্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার নামে ইচ্ছাখুশি সব কিছু করা যাবে না। কারণ মত প্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার সঙ্গে বিশেষ কর্তব্য ও দায়িত্ব জড়িত থাকায় কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচার-প্রচারণা, যা বিভেদ, শত্রুতা অথবা সহিংসতা উসকে দেয়, তা নিষিদ্ধ।
ইসলামের শান্তি, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা ও মানবাধিকারের মৌলিক বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে ব্যাপকভাবে। মুসলিম দেশে অমুসলিমকে হত্যা করা, আতঙ্কগ্রস্থ করা, সম্পদ বিনষ্ট করা, উপাসনালয়ের ক্ষতি করা মহাপাপ। তাঁদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। এসব অধিকার যারা কেড়ে নিতে চায় তারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী। এ কথাগুলো ব্যাখ্যা সহকারে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তরুণদের বোঝাতে হবে উগ্রবাদ ইসলামে শুধু নিষিদ্ধই নয়, এটি ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়ংকর অপরাধ ও পাপ। কারণ ইসলাম অন্যায়ের প্রতিবাদ অন্যায় পদ্ধতিতে করতে অনুমতি দেয় না। ইসলাম একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি প্রদানের অনুমতি দেয় না। সর্বোপরি ইসলাম কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীকে বিচার বা শাস্তির দায়িত্ব নিজে গ্রহণের অনুমতি দেয় না। আশার কথা, সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গিবাদে জড়িতদের ফিরিয়ে আনতে ও পুনর্বাসনে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেকে আত্মসমর্পণ করে জঙ্গিবাদী তৎপরতা থেকে ফিরে আসায় উগ্রবাদ এখন প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
ইসলামের নামে যাঁরা সন্ত্রাস করছেন, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে এমনকি মানুষ হত্যা করছেন, তাঁদের উদ্দেশে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার জন্য নিবেদন করছি—এক. মানুষ আল্লাহর অত্যন্ত ভালোবাসার সৃষ্টি। মহান রব ফেরেশতাদের আপত্তি উপেক্ষা করে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি বলে ঘোষণা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর আপনার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন তারা বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত আপনার গুণকীর্তন করছি এবং আপনার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি (আল্লাহ) বললেন, নিঃসন্দেহে আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩০) মহান স্রষ্টা মানুষকে এতটাই ভালোবেসেছেন যে তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর অবয়ব দিয়েছেন মানুষকে। সব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।’ (সুরা : ত্বীন, আয়াত : ৪)। মহান আল্লাহ ভালোবাসার সৃষ্টি মানুষের জীবন, মর্যাদা, সম্পদ ও সম্মান সুরক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। একজন মানুষ হত্যা করাকে গোটা মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য অপরাধ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষ হত্যা কিংবা জমিনে সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করল সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল, আর যে মানুষের প্রাণ বাঁচাল, সে যেন সকল মানুষের প্রাণ বাঁচাল।’ (সুরা: মায়িদা, আয়াত : ৩২) রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আসমান-জমিনের সমস্ত অধিবাসী একত্রে মিলিত হয়েও যদি একজন মুমিনকে হত্যা করার কাজে অংশগ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (তিরমিজি : ১৩৯৮) মানুষ হত্যা এতটাই ভয়ংকর অপরাধ যে হত্যার অপরাধের ক্ষেত্রে অসীম দয়ার আধার মহান রবের কাছেও ক্ষমা পাওয়ার আশা ক্ষীণ। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বলেন, ‘যেসব বিষয়ে কেউ নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পরে তার ধ্বংস থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় থাকে না, সেগুলোর একটি হচ্ছে অন্যায়ভাবে রক্ত প্রবাহিত করা (অর্থাৎ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা)।’ (বুখারি : ৬৮৬৩) মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি গুনাহ আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেবেন। তবে দুটি গুনাহ আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন না। প্রথমটি হচ্ছে, কোনো মানুষ কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা, অপরটি হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করা।’ (নাসায়ি : ৩৯৮৪) রাসুল (সা.) তাই বলেছেন, ‘আমার পরে তোমরা একে অপরকে হত্যা করে কাফির হয়ে যেয়ো না।’ (বুখারি : ১২১) দুই. কেউ হয়তো আমার যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত করে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলবেন, রাসুল (সা.)-কে গালমন্দ, অপমান, অবমাননার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় ও সাহাবিদের জামানায় রাসুল (সা.)-কে অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হাদিসের উদ্ধৃতি বিষয়ে কোনো মুসলমানের দ্বিমত করার সুযোগ নেই। কিন্তু এ কথাও তো সত্য, রাসুল (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে কাফির, ইহুদি ও মুনাফিকদের নির্যাতনে রক্তাক্ত হয়েও ধৈর্য ধারণ করেছেন। তারা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে উপহাস করেছে, মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, কষ্ট দিয়েছে, পাথর ছুড়ে মেরেছে। তারা বলেছে, তিনি জাদুকর, পাগল, নিন্দিত ব্যক্তি। তারা তাঁকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলেছে যে তিনি কবি বা গণক। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘দেখুন, ওরা আপনার জন্য কেমন সব উপমা দেয়। ওরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। অতএব, ওরা পথ পেতে পারে না।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল : ৪৮)। এত কিছুর পরও রাসুল (সা.) ধৈর্য হারাননি, তাদের হত্যা করেননি। তিন. হত্যা-সন্ত্রাস করে কি রাসুল (সা.) ও তাঁর প্রিয় সাহাবিরা (রা.) ইসলাম প্রচার করেছেন? মানুষ হত্যা করে, সন্ত্রাস করে কি ইসলামের কোনো উপকার হয়েছে? কখনো যাচাই করে দেখেছেন ইসলামের নামে উগ্রবাদকে কত শতাংশ মুসলমান সমর্থন করে? বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক সময় এমনকি স্বজনরাও নিহত উগ্রবাদীর মৃতদেহ গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। উগ্রবাদিতার কারণে বাংলাদেশের মানুষ কি ইসলামের আদেশ-নির্দেশের প্রতি আরো অনুরক্ত হয়েছে? সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, ধর্ষণ, বলাৎকার, পর্ন ছবি দেখা, কিশোর গ্যাংস্টার—এসব বন্ধ হয়েছে? বাস্তবতা হলো, এসব বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি জরিপ বলছে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। তাই সন্ত্রাস নয়, শান্তি ও সম্প্রীতিকে পাথেয় করে হিদায়াত ও সংশোধনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। রাসুল (সা.) জাহেলি শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য জোরজবরদস্তি, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করেননি। রাসুল তাঁর সাহাবিদের (অনুসারীদের) আত্মঘাতী হওয়ার, চোরাগোপ্তা হামলার শিক্ষা দেননি। বরং সুন্দর ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, আল্লাহর পথে আহ্বান, আত্মগঠন ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। আপনারা তাহলে কার অনুসরণ করছেন? আল্লাহর আইন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হলে তা শুধু আল্লাহর কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথেই করতে হবে। ইসলামের নামে কোনো শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। বরং ইসলামের নামে উগ্রতার কারণে দেশে-বিদেশে টুপি-দাড়িওয়ালা মানুষ শুধু সন্দেহ আর অবিশ্বাসেরই শিকার হচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে হামলা, অপমান, অবহেলা ও বিদ্রুপের শিকার হচ্ছে। ইসলামের নামে বোমাবাজি, হত্যা, সন্ত্রাস আর আত্মহননের কারণে মসজিদে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, সীমিত সময়ের জন্য মসজিদ খোলা থাকছে। ফলে মসজিদভিত্তিক ইসলামী জ্ঞানচর্চা বন্ধ হয়ে গেছে।
সন্ত্রাস পৃথিবীব্যাপী পরিচিত, বহুল আলোচিত শব্দ। সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ এবং মানবতার প্রতি চরম হুমকি। রাজনৈতিক কারণে হোক বা অন্য কোন ব্যাপারে স্বার্থসিদ্ধি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার নিমিত্তে বোমা বিস্ফোরণ, অপহরণ, ভয়-ভীতি বা গুপ্ত হত্যার মত ঘৃণ্য কাজই হলো ‘সন্ত্রাসবাদ’; যা সভ্য সমাজে সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়। সন্ত্রাসের কোন ধর্মীয় ভিত্তি নেই, ইসলাম ধর্মে এটি ঘৃণ্যতম কাজ। ভীতি তথা ফিতনা সৃষ্টি হত্যার চাইতেও মারাত্মক। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সব মানুষের প্রাণ, সম্পদ, মর্যাদা অত্যন্ত পবিত্র। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করল।’
জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে বা অস্ত্রের বলে ইসলামের আদর্শ কোথাও প্রচারিত হয়নি। ইসলাম টিকে আছে এবং টিকে থাকবে তার কালজয়ী আদর্শ, অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে পারস্পরিক সহ-অবস্থান, সহিষ্ণুতা, মানবিক আচরণ ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। ইসলামে সন্ত্রাসের ঠাঁই নেই, প্রকৃত মুসলমানরা কখনও সন্ত্রাস করতে পারে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। তাই এর অনুসারীরা মানুষ হত্যা করতে পারে না, সম্পত্তি বিনষ্ট করতে পারে না। শুধু তাই নয়, কোন মুসলমান নিছক রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ তো দূরের কথা, অন্য কোন প্রাণীও হত্যা করতে পারে না।
নিজ ধর্মের ইমাম ও অন্য ধর্মের পুরোহিতদের হত্যা, হুমকি, বোমাবাজি, আতঙ্ক সৃষ্টি, বিদেশীদের জিম্মি বানিয়ে হত্যার মত সন্ত্রাসবাদের দূরপ্রসারী প্রভাব তো আছেই, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও ব্যাপক। যেমন এতে বিশ্ববাসীর কাছে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা যায়। বিদেশীরা মনে করে ইসলাম সন্ত্রাসী ধর্ম এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম সহ্য করতে পারে না। ইসলামের দাওয়াতী তৎপরতা বাধাগ্রস্ত করা সন্ত্রাসীদের আরেকটি উদ্দেশ্য।
নাম, টুপি-দাড়ি, হিজাব, বোরকা-জিলবাব মুসলমানদের পরিচয় ও ঐতিহ্য বহন করে। বিদেশ বিভূঁইয়ে বসবাসরত মুসলমান নারী-পুরুষ এই ঐতিহ্য লালন ও ধারণে ভীতিসন্ত্রস্ত হচ্ছেন। পথে অপদস্থ হওয়ার বহু ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছে।
যে দেশে বিদেশী ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও দাতাসংস্থার পরামর্শক সন্ত্রাসীদের হাতে মারা যায়, স্বাভাবিকভাকে সে দেশে বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বিদেশী সাহায্য বাধাগ্রস্থ হয়। এতে দেশের ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি হয়। তখন জঙ্গিদমনে সহায়তা দানের প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গি তৎপরতা আগে নির্দিষ্ট কতিপয় দেশে বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। ইদানিং পশ্চিম এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত সশস্ত্র লোকেরা হামলা করার জন্য মার্কেট, হোটেল, গণপরিবহণের স্টেশন, বিমান বন্দর, ধর্মীয় উপাসনালয় বেছে নেয়। আত্মঘাতী বোমার আঘাতে নিজেও উড়ে যায় অন্যদেরকেও উড়িয়ে দেয়। এখন পৃথিবীর কোন জায়গাই আর নিরাপদ নয়। সবাই ঝুঁকিতে। সন্ত্রাসবাদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক নেই। ধর্মকে ব্যবহার করা হয় স্বার্থ হাসিলের জন্য। ধর্ম এখানে মূল অবলম্বন নয় আনুষঙ্গিক মাত্র। কেউ নিজেদেরকে সুন্নি, মুজাহিদ, আল্লাহর পথের যোদ্ধা, হকপন্থী, তাগুতের যম, বখতিয়ারের তলোয়ার, সালাহুদ্দিনের ঘোড়া, তিতুমীরের কেল্লা, খিলাফত প্রতিষ্ঠার সৈনিক ইত্যাদি পরিভাষায় পরিচয় দিলে খোঁজ খবর নিতে হবে, চালাতে হবে অনুসন্ধান। উৎস কোথায়, উদ্দেশ্য কী? ইসলামের মৌল আদর্শ-শিক্ষার সাথে তাঁদের কর্মতৎপরতার সাদৃশ্য ও বৈশাদৃশ্য কী? জানতে হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামদের মহিমান্বিত জীবনধারার সাথে তাদের কর্ম প্রয়াস ও তৎপরতার মিল আছে কি না। কেউ যদি কপালে ‘আল্লাহু আকবার’ ব্যাজ লাগিয়ে অথবা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে সশস্ত্র অভিযান চালায় তাৎক্ষণিক পুলকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিভাষার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিলে সমূহ বিপদে পড়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। আমাদের মনে রাখতে হবে হযরত আলী (রা.)-এর জামানায় ধর্মীয় উগ্রগোষ্ঠী খারিজী সম্প্রদায় ‘ইনিল হুক্মু ইল্লালিল্লাহ’ শ্লোগান দিয়ে বিদ্রোহ করেছিল। মুসলিম বিশ্বে তারা সমূহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাঁদের হাতে বহু মুসলমান শাহাদত বরণ করেন। হযরত আলী (রা.)-কে শহীদ করার পর ঘাতক আবদুর রহমান ইবন মুলজিম উচ্চৈঃস্বরে আল্লাহ আল্লাহ যিকির করছিল।
সন্ত্রাসবাদের যারা মূলহোতা তারা দূর থেকে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তাদের অর্থের অভাব নেই। দুনিয়াজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক। তাদের পরিচয় কী তদন্ত ছাড়া স্পষ্ট করে বলা যাবে না। তবে আঁচ করা যায়। এক দিন তাদের মুখোশ খসে পড়বে। তরুণ ও যুবকরা তাদের টার্গেট। মানুষ চেতনা ও আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়। বৃদ্ধদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত তরুণদের মন মগজে চেতনা-আবেগ থাকে অধিক সক্রিয়। পবিত্র জিহাদের ডাক, তাগুতের উৎখাত, জান্নাতের প্রত্যাশা, খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে সামনে রেখে বাছাইকৃত তরুণদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং তুলে দেয়া অস্ত্র, বোমা ও গ্রেনেড। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসজনিত দুঃসাহসিকতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলমানের ছেলেরা বুঝতে পারে না যে তারা অন্যের হয়ে কাজ করছে। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি ও মিডিয়া প্রচারণা চালাত যে, মাদরাসার ছাত্রগণ সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িত। তাঁদের মতে যেহেতু অধিকাংশ মাদরাসার ছাত্র সমাজের দরিদ্র শ্রেণী থেকে উঠে আসা; সহজেই মোহনীয় টাকার হাতছানি তাদের সন্ত্রসবাদের সাথে যুক্ত করে। তাঁদের এ অভিযোগে সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা ও কাল্পনিক। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, এখন সন্ত্রাসী তৎপরতার সাথে যুক্ত তরুণরা সমাজের অতি বিত্তশালীদের সন্তান, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে উত্তীর্ণ ও দেশ-বিদেশের নামি-দামী সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া। এখন এর কী জবাব আছে? আমরা মনে করি সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতার জন্য কোন বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়।
কূটনৈতিকপাড়া নামে খ্যাত ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গিদের হাতে ২০জন দেশী-বিদেশী প্রাণ হারানোর ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত, বেদনাহত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। পবিত্র রামাযান মাসে নিরীহ মানুষদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেউ সহজে মেনে নিতে পারেননি। ইতালীর যেসব ব্যক্তি আমাদের দেশে গার্মেন্টস ব্যবসার সাথে জড়িত এবং ঢাকার মেট্রোরেলের পরামর্শক হিসেবে জাপানের যেসব প্রকৌশলী কর্মরত আমরা তাঁদের জিম্মি বানিয়ে জবাই করে দিলাম। তাঁরা তো কোন পক্ষ-বিপক্ষের লোক নয়, অপরাধী নয় বরং উন্নয়ন সহযোগী। এ হত্যাকাণ্ড কোন ধর্ম, আদর্শ, নৈতিকতা ও রাজনীতির মাপকাঠিতে পড়ে না। এর ফলে ইসলাম ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে ভুলবার্তা গেছে- কোন সন্দেহ নেই। পবিত্র ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদগাহের অনতিদূরে পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে দুজন কনস্টেবলসহ চার ব্যক্তি প্রাণ হারালেন। ঈদের দিনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম। কারা আমার দেশের কম বয়সী তরুণদের হাতে অস্ত্র দিয়ে ইসলামের চেহারা কালিমা লিপ্ত করার প্রয়াস চালাল তাদের খুঁজে বের করে আইনের হাতে সোপর্দ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক দোষারোপের পুরনো খেলায় মেতে উঠলে প্রকৃত অপরাধী গা ঢাকা দেবে, নির্দোষ মানুষ শাস্তি পাবে।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মত নিহত জঙ্গিদের মৃতদেহ তাদের পরিবার নিতে আগ্রহী হয়নি। এমনকি শোলাকিয়ায় নিহত আবিরের জানাযায় কেউ শরীক পর্যন্ত হয়নি। জনৈক তত্ত্বাবধায়ক ইমামতি করে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেন। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, এদেশের মানুষ এসব জঙ্গি কর্মকাণ্ড পছন্দ করে না।
সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে কখনও কখনও দুএকটি মুসলিম নামধারী গ্রুপ নিজেদের ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করে। কিন্তু আসলেই কি তারা মুসলিম? নাকি মুসলমানের ছদ্মবেশে অন্য কেউ? তারা তো এমনও হতে পারে যে, কোন পক্ষের হয়ে কাজ করার জন্য তাদের তৈরি করা হয়েছে। বিশেষত ইসলাম এবং মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসের দায়ভার চাপিয়ে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা নিজেদের দায়মুক্ত করবার চেষ্টা করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াবার কাজটি কৌশলে চালিয়ে তার লক্ষ্য হাসিল করতে চাচ্ছে? সম্প্রতি প্রকাশিত লোনওয়াচডটকমের রিপোর্ট দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে জান-মালের যে ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে তার জন্য ইসলাম বা এর অনুসারীরা দায়ী নয়। দায়ী অন্য কেউ। অন্য কোন পক্ষ। আগামীদিনের বিশ্ব নিশ্চয়ই প্রকৃত সন্ত্রাসীদের চিনতে সক্ষম হবে।
তাহলে আমাদের করণীয় কী? কেবল মাত্র সরকার বা রাষ্ট্র একার পক্ষে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষদের এ ব্যাপারে সংগঠিত করতে হবে। সামাজিক শক্তিগুলোকে একতাবদ্ধ করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা যে কোন উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শক্তি। সমাজে ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে যাতে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হত্যাকাণ্ড, বোমাবাজি বা আতঙ্ক ছড়াতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমাদের সন্তান-সন্ততি কোন উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত হচ্ছে কি না সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং জড়িত হয়ে পড়লে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিনিধিত্বশীল বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সংকট মোকাবেলায় রাজনৈতিক সংলাপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। ওলামা-মাশায়েখ সামাজিক শক্তির প্রতিনিধি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সর্বশ্রেণীর ওলামা ও মাশায়েখদের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক প্লাটফর্মে জমায়েত হয়ে মিথ্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যের বিকল্প নেই-এই সত্য যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করা যায় ততই মঙ্গল। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভার আয়োজন ও ক্ষুদ্র-বৃহৎ পুস্তিকা ও জার্ণাল প্রকাশের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরতে পারলে এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ব্যবস্থা করা গেলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। সন্ত্রাস ও জিহাদ যে এক নয় এ কথা আলিম, ইমাম ও খতিবগণ ওয়ায ও মসজিদের বয়ানে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। জিহাদের পবিত্র চেতনাকে সন্ত্রাসের উম্মাদনার সাথে গুলিয়ে ফেলা হবে মারাত্মক ভ্রান্তি। ইসলামে উগ্রপন্থা নেই, মধ্যমপন্থা অনুমোদিত। জিহাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বিধান। জিহাদের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি আছে। জিহাদের নামে আল্লাহ তায়ালা নারাজ, অসন্তুষ্ট ও ক্রোধান্বিত হন এমন কোন কর্মকাণ্ড শরীয়ত অনুমোদন করে না।
নাস্তিকতাকে যারা বেছে নিতে চায়, তাদের উদ্দেশে বলছি, ইসলামে ধর্মের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি বলুন, আপনার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ২৮) তবে নাস্তিকতার নামে কোনো ধর্মের স্রষ্টা, নবী-রাসুলকে আক্রমণ করা প্রচলিত আইন অনুযায়ীই অপরাধ। আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় আইনে মত প্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার নামে ইচ্ছাখুশি সব কিছু করা যাবে না। কারণ মত প্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার সঙ্গে বিশেষ কর্তব্য ও দায়িত্ব জড়িত থাকায় কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচার-প্রচারণা, যা বিভেদ, শত্রুতা অথবা সহিংসতা উসকে দেয়, তা নিষিদ্ধ।
ইসলামের শান্তি, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা ও মানবাধিকারের মৌলিক বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে ব্যাপকভাবে। মুসলিম দেশে অমুসলিমকে হত্যা করা, আতঙ্কগ্রস্থ করা, সম্পদ বিনষ্ট করা, উপাসনালয়ের ক্ষতি করা মহাপাপ। তাঁদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। এসব অধিকার যারা কেড়ে নিতে চায় তারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী। এ কথাগুলো ব্যাখ্যা সহকারে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তরুণদের বোঝাতে হবে উগ্রবাদ ইসলামে শুধু নিষিদ্ধই নয়, এটি ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়ংকর অপরাধ ও পাপ। কারণ ইসলাম অন্যায়ের প্রতিবাদ অন্যায় পদ্ধতিতে করতে অনুমতি দেয় না। ইসলাম একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি প্রদানের অনুমতি দেয় না। সর্বোপরি ইসলাম কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীকে বিচার বা শাস্তির দায়িত্ব নিজে গ্রহণের অনুমতি দেয় না। আশার কথা, সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গিবাদে জড়িতদের ফিরিয়ে আনতে ও পুনর্বাসনে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেকে আত্মসমর্পণ করে জঙ্গিবাদী তৎপরতা থেকে ফিরে আসায় উগ্রবাদ এখন প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০২১ সকাল ১০:১৭
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ০৫ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:২৯

পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় এবং এর ফলে উদ্ভূত আদর্শিক পরিবর্তন কেবল ভারতের একটি প্রাদেশিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪




আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক হাঁটছি, চলছি, পড়ছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কথা ছোট বোনটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৩


দীর্ঘদিন আগে আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটের কোন এক পোস্টে ঘটা করে জানান দিয়ে ফেইসবুক থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। কারণ ছিলো খুব সাধারন বিষয়, সময় অপচয়। স্ক্রল করে করে মানুষের আদ্য-পান্ত জেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×