somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্যক্তিসত্তা, অস্তিত্ব এবং নিজস্বতার সুনির্দিষ্টকরণই হোক লেখালেখির প্রাক-প্রাথমিক প্রস্তুতি

২৯ শে মে, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা অনেকেই লেখি। লেখালেখির ভেতর একটা অকৃত্রিম সুখ আছে। লেখালেখির প্রথম শর্ত অক্ষরজ্ঞান। মোটামুটি যেকোনো একটি ভাষার অক্ষরকে আয়ত্ত করেই লেখালেখি শুরু করা যায়। সেদিক বিচারে লেখালেখি অত্যন্ত সহজ। কিন্তু আদৌ তা সহজ কিছু না। অনেক পড়াশুনা জানা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি অকপটে স্বীকার করেন, না ভাই এই লেখালেখি আমার কর্ম না। সত্যি বলতে ব্যাপারটা অত সোজা না। অনেকেই তো লেখেন, কিন্তু ক’জন লেখক খ্যাতি পান! এর কারণ অনেকগুলো। প্রথমত ভাষার সৌন্দর্য সম্পর্কে জ্ঞান। বিষয়টা ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব বা বাগর্থতত্ত্বকে অতিক্রম করে এমন কিছু, যে তা কেবল চর্চা ও চিন্তার মাধ্যমে অর্জন করা যায়। দেখবেন যারা ভালো লেখক বলে খ্যাত তারা প্রায়শই ব্যাকরণিক নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করে লেখেন কিন্তু তবু তাদের লেখা সুখপাঠ্য বোধ হয়, এর কারণ তাদের ভাষিক শক্তি। ভাষা ব্যবহারের একটা শক্তি থাকে। ভাষার আছে ভার ও ধার। দুটোকে আয়ত্ত করা চারটেখানি কথা না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালে পড়েছিলাম ‘ব্যক্তিভাষা’ বা ‘ইডিওলেক্ট’ বিষয়টা। অর্থাৎ প্রতিটি ব্যক্তিরই স্বতন্ত্র ভাষা আছে। বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের অনেকেরই ভাষা বাংলা হলেও, ব্যক্তিসত্তাগত জায়গা থেকে আমাদের ভাষার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভিন্নতা রয়েছে। সেটা সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত যারা লেখালেখিতে আসক্ত, তাদের। এতে তার লেখালেখির গুণগতমান বৃদ্ধি সম্ভব হয়। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে আমার একটা কোর্স ছিল ‘সৃষ্টিশীল সাহিত্য’, যাতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সৃষ্টিশীল রচনার একটি পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হয়েছিল। মোটমাট মাত্র ৮জন শিক্ষার্থী ছিলাম। ক্লাস নিতেন শ্রদ্ধেয় হিমেল বরকত স্যার। সবাই সবার লেখা পড়তাম। আলোচনা-সমালোচনা হত। এক বন্ধু আমার একটা ছোট্ট গল্প খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছিল। ৬৪ লাইনের গল্পটিতে সে শতাধিক অব্যয় শব্দ খুঁজে বের করেছিল। আমি দেখে অবাক হই। স্যার জানান, লেখালেখির ক্ষেত্রে অব্যয় শব্দ ব্যবহার এক ধরনের দুর্বলতা। একটি বাক্যকে সংশয়াপন্ন করে তোলে অব্যয় শব্দ। বাক্যের অন্তর্নিহিত শক্তিও লোপ পায় অব্যয়ের কারণে। এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল আমার কাছে। অবশ্য নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টাটা আর করা হয়নি। আরেক বন্ধু আমার বাক্যগঠনের ধরনকে খুব শক্তিশালী বলেই বিবেচনা করেছিল। হ্যাঁ হতে পারে অব্যয় শব্দ দিয়ে শক্তিশালী বাক্য নির্মাণ করাও সম্ভব। এসব কিন্তু একেবারে ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাপার। মনের ভাব প্রকাশের জন্য তত্ত্বকে এড়ানো অনুচিত।

যাই হোক, আমার আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি নিজেকে লেখক হিসেবে প্রকাশ করার পূর্বে আমাদের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া জরুরি।
সাধারণত অনেকেই লেখালেখি শুরু করার পূর্বে নিজেকে এমন কেউ মনে করেন, যে মুক্তমনা, সৃজনশীল এবং নিরপেক্ষ। এইসব বিশেষণগুলো কিন্তু আদৌ অত সহজ না যতটা আমরা ভাবি। মুক্তমনা বলতে আসলে কী বোঝায়? সৃজনশীল হওয়ার জন্য কী যোগ্যতা থাকা জরুরি? নিরপেক্ষ অবস্থান বলতে কি আদৌ কোনো অবস্থান আছে? সেসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এবং বর্তমান কর্মজীবনের আলোকে বলতে পারি নিজেকে এসব ভাবা প্রচণ্ড বোকামি এবং ভণ্ডামিও বটে। পৃথিবী যে গতিতেই চলুক, তার তাল-লয় যেমনই হোক না কেন, নিজের অবস্থান সুনির্দিষ্টকরণটা জরুরি। বর্তমানে দেখা যায় এমবিএ, ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারি পড়া শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার নিয়ে আত্মদ্বন্দ্ব কম কিন্তু মানবিক অনুষদের শিক্ষার্থীরা সরকারি-বেসরকারি-ব্যাংক-বিসিএস-হাবিজাবি হাজারও চাকরির পিছে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্যারিয়ারকে ক্যারি করতে পারছে না। কারণ একটা, সে সুনির্দিষ্ট পথ নেয়নি। চাকরির ক্ষেত্রেও নানা গ্রুপিং, শ্রমিকপক্ষ, মালিকপক্ষ ইত্যাদি ঝুট-ঝামেলা থাকে সেখানে নিরপেক্ষরা ভণ্ডামির মাধ্যমে লাভবান হলেও অপরের কাছে রাত-দিন গালি খেয়ে থাকেন, তার থেকে কোনো একটা পক্ষ অবলম্বন করাই তার জন্য উত্তম। ফেসবুকসহ ভার্চুয়াল জগতের সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে অনেককেই লিখতে দেখি। এক একটা ঘটনা ঘটে আর তারা কিবোর্ড টিপাটিপি শুরু করে- নিজের নিরপেক্ষতা দাবি করে লিখতে গিয়ে দেখা যায় তাদের এক একটি ঘটনায় এক এক রকমের অবস্থান এবং কখনোসখনো তা পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে। নিজে বোঝে না কিন্তু পাঠক এসব ঠিক বোঝে, লেখক হিসেবে তারা যতটা প্রতিষ্ঠা পায় তার থেকে ফাউল বা আঁতেল হিসেবে পরিচিতি পায় বেশি।

তাই আমি মনে করি শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে এসেই পারিপ্বার্শিক বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তির নিজস্ব রুচি-পছন্দ ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিয়ে নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা, অস্তিত্ব ও নিজস্বতা ঠিক করে নেয়া উচিত। [যদিও তা অবশ্যই পরিবর্তনশীল থাকব্]

যেসব বিষয়গুলো সর্বপ্রথম ঠিক করা প্রয়োজন-
১। আমার ধর্মীয় বিশ্বাস [আমি আস্তিক নাকি নাস্তিক? আস্তিক হলে আমি কেমন? স্বধর্মপ্রাণ নাকি ধর্মনিরপেক্ষ? প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম পালনকারী নাকি আধ্যত্মবাদে/সূফিবাদ/মরমীবাদ ইত্যাদিতে আগ্রহী?]
২। আমার রাজনৈতিক আদর্শ [আমি ডানপন্থী নাকি বামপন্থী? গণতন্ত্রে আমার আস্থা আছে? সমাজতন্ত্র বা সা্ম্যবাদ নিয়ে আগ্রহ আছে কি? নাকি আমি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী? নাকি এন্টি-ক্যাপিটালিস্ট? গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলে আমার গণতন্ত্রটা ঠিক কোন জাতের?]
৩। শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে আমার অবস্থান [আমি কি শিল্পকে শিল্পের জন্য বিবেচনা করি নাকি শিল্প মানুষের জন্য, সেটা ভাবি।?]
৪। মৌলবাদ ও তার বিপরীত অবস্থান [মৌলবাদকে আমি ঠিক কীভাবে দেখি? মৌলবাদ বিষয়টা আসলে কী? আমি কি মৌলবাদী? আচ্ছা মৌলবাদের বিপরীত অবস্থানটা কীরূপ? সেটা সুবিধাবাদ নয়তো? ]
৫। আমার লেখালেখির উদ্দেশ্য কী? সেটা কি কেবল লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা নাকি সমাজজীবনে প্রভাব ফেলা?

এসব প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে লেখালেখি শুরু করা উচিত বলে আমি মনে করি। আমি নিজেও উত্তর খুঁজছি। কয়েকটা পেয়েছি। বাকিগুলো পাব বলে অাশা রাখি।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৪২
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবুও বেঁচে আছি

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১৫

এই নিথর নগ্ন শরীরের প্রতিটা পল্লবের করুণ আর্তচিৎকার
পৃথিবীর মাটি ভেদ করে কোনদিনও
ওই মৃত কানে পৌঁছাবে না
আমি জেনে গেছি ।

বিপন্ন আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা
দেবতাদের প্রতারণার ফাঁদ আর মিথ্যা প্রলোভনের গল্পগুলি
আমার শুনতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×