কেউ কেউ থাকেন যারা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চান ঠিক মুখের ভাষাই লেখা উচিত। তা নিয়ে তর্ক-বির্তকের শেষও নেই। আঞ্চলিক ভাষায় ইতিমধ্যে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস লেখাও হয়ে গেছে। সেগুলোর আবার কয়েকটা বেশ খ্যাতিও অর্জন করেছে। তাই আঞ্চলিক ভাষাকে লিখিত ভাষায় রূপদানের যৌক্তিকতা বা অযৌক্তিকতা এখনো অমীমাংসিত। কিন্তু চিরায়তভাবেই যে ধারায় আমরা অধিকাংশ চলে আসছি। তাহলো আমাদের কথ্য ভাষা এবং লেখ্য ভাষা কিছুটা স্বতন্ত্র পথেই চলে। ‘আমি এহন ভাত খামু না’ মুখে বলে দিলেও লিখে জানতে গেলে লিখব ‘আমি এখন ভাত খাব না’। আমার কাছে কথ্য রূপটার লিখিত রূপটা গ্রহণীয় নয়। কারণ, এই কথাটি একেক জন একেক ভাবে বলবে এবং উচ্চারণের ব্যাপক তারতম্যও হবে। ভাষা গঠনের সময় থেকেই কিন্তু দেখা যায় আমাদের উচ্চারণ এবং বানানের কিছু বৈসাদৃশ্য দিক রয়েছে। সেগুলোর কারণ কী? সেগুলো কী কোন অযৌক্তিক কারণে সৃষ্ট হয়েছে? ভেবে দেখার অনেক কিছু আছে। পৃথিবীতে তো সাড়ে তিন হাজারের উপরে ভাষা আছে। কিন্তু সেসবের মধ্যে বাংলার অবস্থান কত জানেন? কেবল মাথাগুণে অর্থাৎ ভাষাভাষী জনসংখ্যার পরিসংখ্যানেই নয়, ভাষার ভৌত গঠন, ভাষার আন্তঃশৃঙ্খলা ইত্যাদির দিক থেকেও বাংলা অনেক এগিয়ে। কারণ কী জানেন? কারণ বাংলা ভাষার গঠনশৈলি অনেকাংশেই বৈজ্ঞানিক পথ অনুসরণ করেছে। আর তা কিন্তু মূলত লিখিত ভাষাকে ভিত্তি করেই। আঞ্চলিকতার পার্থক্য কিন্তু বাংলায় অনেক। জেলায় জেলায় এমনকি গ্রামে গ্রামেও হয়তো আঞ্চলিকতার ভিন্নতা দেখা যেতে পারে। একই শব্দ বহু মানুষ বহু ভাবে উচ্চারণ করছে। শিক্ষিত সমাজ পরিহাস করে অথচ এটাকে অশুদ্ধ বলার সুযোগ নেই। এটা ভাষার বৈচিত্র্য। তবে এটাই যখন লিখিত ভাষায় নিয়ে আসা হয় তখন কিন্তু ভাষার আন্তঃশৃঙ্খলায় ব্যাঘাত ঘটার সম্ভবনা দেখা দেয়। কীভাবে? ধরেন একই শব্দ দু’জন মানুষ দু’বানানে লিখলো। ভুল বা ঠিকটা কিন্তু বের করা কঠিন হবে কারণ দু’জনে দুজনের উচ্চারণের ভিত্তিতে বানানটি লিখেছে। বলবেন, বানান দিয়ে কী হবে, অর্থ বুঝলেই তো হলো। কিন্তু আদৌ তা সম্ভব নয়। বানানের সামান্য পার্থক্য অনেক সময়ে অর্থের বিশাল পার্থক্য সৃষ্টি করে। ধরেন, মন আর মণ শব্দটি। অর্থ দুটো তো জানেনই, পার্থক্য দেখেছেন?
গত ২৯ জুলাই ২০১৮ তারিখে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় (হত্যাকাণ্ডে) দুই শিক্ষার্থী নিহত হয় এবং আরো আহত হয় অনেক জন। সেটাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা গণ-আন্দোলনের ডাক দেয়, যার স্মরণকালে বড় ধরনের আন্দোলনে রূপ লাভ করে। এই ঘটনার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুরাবস্থার চিত্র তুলে ধরে। নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত তার সৃষ্টি করে। বর্তমানে যারা এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে, যারা দশম শ্রেণিতে পড়ছে তাদের চিন্তাজগৎ, কর্মকাণ্ড এবং স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা রয়েছে শিক্ষকতার দরুন। তাতে এই ধরনের বৃহৎ আন্দোলন ঘটার সম্ভাবনার কথাও কোনোদিন ভাবতে পারিনি। অথচ তারা ধারণার ভিতে লাথি মেরে ভেঙে দিলো সব মিথ্যার প্রসাদ। ওরা বাঙালি, ওরা বাংলাদেশি- সেটা প্রমাণ করতে মাত্র ২/৩টি দিন লাগলো। প্রতিবাদে সোচ্চার হলো, পুলিশের লাঠির বাড়ি খেলো কিন্তু দমল না। সত্যি এই আন্দোলনকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রপাগাণ্ডা হিসেবে চালানোর সুযোগ নেই, একদম সাদামাটা দাবি, যৌক্তিক দাবি। সরকারের সুচিন্তিত এবং সাবধানী পদক্ষেপই এর দ্রুত সমাধান ঘটাতে পারবে।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এ দাবি এখন মানুষের মুখে মুখে। কতটুকু পাব জানি কিন্তু অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন আর দুর্নীতির নরকে গড়া সড়ক ব্যবস্থাপনা ভিতে প্রবল আঘাত হেনে এই আন্দোলন। সাধুবাদ শিক্ষার্থীদের।
কিন্তু ‘আন্দোলনের ভাষা’ নিয়েও কিছুটা চিন্তা কিন্তু করতে হয়। আন্দোলনের ধরন-ধারনও বিবেচনা করে দেখতে হয়। বাংলাদেশে ৫২’, ৬৯’, ৭১’, ৯০’-এ বড় বড় আন্দোলন হয়েছিল। পোস্টার,ব্যানার, প্লেকার্ড-এ ছেয়ে গিয়েছিল দেশ। সেগুলো দেখুন, সেগুলোর গুণগত মান এবং বাঙালি ভাষাবোধ, সৌন্দর্য ও পরিমিতিবোধ দেখুন। সেগুলো কিন্তু কোন অংশে কম বড় আন্দোলন ছিল না। রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এনেছিল সেই আন্দোলনগুলো। পুলিশ ও প্রশাসন বরাবরের মতোই আচরণ করেছিল সেসময়েও। কেউ একজনকে বলতে দেখলাম, পুলিশের নির্মম লাঠির বাড়ি যদি আপনি খাইতেন, তবে আপনার মুখেও দু’চার গালি বের হয়ে আসতো, তা প্লেকার্ডে লিখলে দোষ কী? হুম, ঠিক বলেছেন, লাঠির বাড়ি খাইনি বলে যে আমি বড় বেশি অন্যায় করে ফেলেছি তা কিন্তু নয় আবার খাইনি বলে যে লেখার অধিকার হারিয়েছি তাও নয়। পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলোতেও আন্দোলনকারীরা মার খেয়েছে, গালিও দিয়েছে কিন্তু সেটা কথ্যরূপেই থেকেছে। যেসব গালি-গালাজ শুনলে আমরা অনেকেই চুপসে যাই, সেসব গালিগালাজ কিন্তু বাংলা ভাষায় আজ যুক্ত হয়নি, বহু আগে থেকেই যুক্ত, আমাদের দাদার দাদাও হয়তো ব্যবহার করতেন। সেসব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই আমার। যার খুশি ব্যবহার করুক কিন্তু তাই বলে মুখের গালিকে কলমের কালিতে নিয়ে এলে, নিজের মুখেই কালিমা লেগে যায়। আবার অনেক মানুষেরই শ্লীলতা-অশ্লীলতাবোধ ঠিকমতো নেই, তারা অশ্লীলতাকে পছন্দ করে, অশ্লীলতার যেটুকু স্বীকৃতি পায়, সেটুকু প্রদর্শনীতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। ধরুন না, কথা কথায় ‘বাল’ শব্দটা ব্যবহার খুব প্রচলিত ছিল এখন সেখানে ‘ফাক’ শব্দটাই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু প্রথমটার থেকে পরেটা অধিকতর খারাপ। অথচ জানেন এদুটোর আগে কি ব্যবহৃত হত? ‘ধুর’ শব্দটা। এখন খুব কম মানুষই এই শব্দটা জানে। এমনিভাবে শ্লীলতা থেকে আমরা অশ্লীলতায় প্রবেশ করি। কথায় আছে ভাষার ব্যবহার মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। সেখানে অশ্লীল শব্দ মুখ থেকে যদি লেখায় এসে পৌঁছায় তবে তার পরিণামটা কী হতে পারে? জানি অনেকেই আমরা লেখাটা পড়ে বিরক্ত হবেন। দেশের এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে সড়কে বাস-চালকরা একের পর এক খুন করে চলছে, নৈরাজ্য চলছে, তখন আমি বুদ্ধিজীবীর মতো পুচ্ছ নাচাচ্ছি! ছি! আচ্ছা আপনার কথা মানলাম, খুব বেমানান কথাই আমি বলছি। আপনার কাজী নজরুল ইসলামকে চিনেন তো? জানেন তিনি কেমন স্বভাবের মানুষ ছিলেন? তিনি চরম বিদ্রোহী ভাবাপন্ন মানুষ ছিলেন। যেখানে অন্যায় সেখানেই তিনি প্রতিবাদ করতেন। ডানে-বামে দেখে, ভেবে-চিন্তে প্রতিবাদ করার ধৈর্য তাঁর ছিল না। কথা বলার সময় হয়তো, রেগে গেলে তিনিও গালি দিতেন কিন্তু তাঁর সাহিত্য দেখুন, ভাষার সৌন্দর্যবোধ দেখুন। চরম বিদ্রোহের চরণগুলোও তিনি কত সাবলীল ও শ্লীল ভাষাতে লিখেছেন। তাই মনে রাখবেন, আন্দোলন, প্রতিবাদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, আঘাত-পাল্টাঘাত সবই ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনীয় এবং অনিবার্য কিন্তু তাই বলে ভাষার যথেচ্ছার ব্যবহার, শ্লীলতা-অশ্লীলতাবোধ লঙ্ঘন যুক্তিযুক্ত হয় না। এই আন্দোলনে যেসব ভাষার ব্যবহার পরিলক্ষিত, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে ঐসব ভাষার স্বীকৃতি দান করেছে এবং এখন থেকে যেখানে খুশি সেখানে ঐ ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যাবে।
আন্দোলনের উদ্দেশ্য মহৎ কিন্তু উপজাত হিসেবে যদি ভাষার শ্লীলতাহানি ঘটে তবে তা দুঃখজনক।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১৮ সকাল ৯:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


