somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হে সখা, দুঃখ কাকে বলে? তুমি কি তাকে চেনো? আমি চিনি।

০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দুঃখের সাথে প্রথম পরিচয় বেশ ছোট বয়সেই। সে গল্পে যাওয়ার আগে একটা মজার তথ্য দেই- আজ ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একটা পোস্টে দেখলাম দুঃখকে কাটিয়ে ওঠার জন্য নাকি শরীরের কোনো একটি উপাদান ব্যাপক পরিশ্রম করে, মানে কোনো একটা জৈব উপাদান তখন কঠোর পরিশ্রম করে যখন আমাদের মন খারাপ থাকে, আমরা কষ্টে কিংবা দুঃখে থাকি। ঐ সময় ঐ উপাদানের প্রবল চেষ্টা থাকে আমাদের সুখী করে তোলার জন্য। মানে দুঃখ নিছকই মনোবৃত্তীয় ব্যাপার নয় এর স্পষ্টত শারীরিক প্রভাব আছে। ডিটেইলে পড়িনি, আজকাল লেখার মতো পড়ার প্রবণতাও ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। সেও এক দুঃখ বটে। তবে যাহোক, আজকের গল্পে আসি।
জীবনে প্রথম দুঃখকে জেনেছিলাম ছোট বয়সেই। বয়স তখন ৬ বছর। ঘটনা ১৯৯৬ সালের। আমাদের বাসা ছিল ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের কোনো একটা জায়গায়- বর্তমানে সেটা এতটাই আমূল বদলে গেছে যে ঐ বাসা এবং জায়গা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আমাদের বাসাটা ছিল একতলা। চারপাশে দেয়াল, উপরে টিনের চাল। একটাই ঘর। বাবা, মা, বোন আর আমি থাকি। আমি সবার ছোট। ঐ ঘরটা থেকে বের হয়ে একটু হেঁটে গিয়ে- ছিল রান্নাঘর। রান্নাঘরটা বেশ বড়ই ছিল এবং এই পুরো বাসাটা কেবল আমাদেরই ছিল মানে রান্নাঘর কারো সাথে শেয়ার করতে হতো না কিন্তু পানির ব্যবস্থা ছিল না। পানি আনতে হতো একটু দূরে ফ্ল্যাট বাসা থেকে। মানে এই ঘরটা যে মালিকের তার আরেকটু দূরে ফ্ল্যাট বাড়ি ছিল সেখান থেকে পানির লাইন দেয়া হতো এবং দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে পানি সংগ্রহ করে আনতে হতো। মা কলসি ভরে ভরে পানি নিয়ে আসতো এবং বড় একটা কালো রঙের ‘মটকা’য় (এক ধরনের বড় পানি রাখার পাত্র) ভরে রাখতো। তা দিয়ে চলত সারাটা দিন। কেন যে মায়ের পানির আনার এই কষ্টটা আমি বুঝতাম। আমার খারাপ লাগতো। কখনো কখনো মা আমাকে কোলে নিয়ে ঐ পানি আনার জায়গায় নিয়ে যেত, তারপর লাইন ধরে দাঁড়িয়ে একে একে সবাই পানি সংগ্রহ করত। খুব যে বুঝতাম পুরো ব্যাপারটা তা নয়- কেবল মায়ের কষ্টটা একটু একটু টের পেতাম। তবে এই মায়ের কষ্টটাকে বুঝতে পারাটাকে কিন্তু ‘দুঃখ’ বলে অভিহিত করছি না। মানুষের জীবনে নানা রকম দুঃখ থাকে, দুঃখকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, সেটা যার যার নিজের ব্যাপার কিন্তু কোনো একটা বিশেষ ঘটনা ছাড়া, বিশেষ মুহূর্ত ও বিশেষ অনুভূতি ছাড়া একজন ব্যক্তি বলে উঠতে পারে না যে, এই যে এই যে এইটা হলো প্রকৃত দুঃখ। এটা বলার জন্য মানুষকে অনেক রকম পরিস্থিতি, মুহূর্ত ও অনুভূতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। আমার ক্ষেত্রে বোধ হয় খুব ছোট বয়সেই এই বিশেষ মুহূর্তটা ঘটে গিয়েছিল এবং যার কারণে দুঃখকে আমি বেশি সহজে চিনতে পারি, ভালোও বাসি হয়তো।
আমাদের ঐ সময়গুলো আসলে পরিবারের জন্য বেশ কঠিন একটা সময় ছিল। সেসব তখন বুঝতাম না, বড় হতে হতে দেখে শুনে বুঝেছিলাম। বাবা সহজে বুঝতে দিতে চাইতেন না। বাবা সবসময় মাকে বলতেন, ছেলে-মেয়েদের অভাব চেনাতে হয় না, তাহলে তাদের হৃদয়টা ছোট হয়ে যায়। আমি বাবার এই কথাটার সাথে কোনোদিন একমত ছিলাম না। অভাব-অনটনকে যত কম বয়সে চেনা যায়, মেনে নেওয়া যায় ততই মঙ্গল। আর হৃদয় বড় বা ছোট হওয়াকে আমি অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে তুলনীয় মনে করি না। বাবা তখন সংসার চালাতো মূলত টিউশনি করে। বাবা তার জীবনের অর্ধেকটাই কাটিয়েছিলেন নানা রকম অভিজ্ঞতা অর্জনের ভেতর দিয়ে। সংসারী ছিলেন না। বিয়েটাও করেছিলেন পরিবারের চাপে। তবে ছেলে মেয়ে হওয়ার পর তিনি অনেকটাই বদলেছিলেন। অন্তত ছেলে মেয়েকে বড় করা, তাদের পড়াশুনা যেন ভালো মতো হয় সে ব্যাপারে তিনি সদা সচেতন থাকতেন। ঐ সময়ে টিউশনি দিয়ে সংসার চালালেও ইংরেজিতে পারদর্শী ও বাংলা, গণিতে দক্ষ হওয়ায় তিনি ভালো বেতনের টিউশনিই পেতেন এবং বন্ধু-বান্ধবের সূত্রে ধনীলোকের সন্তানদের পড়াতেন। একদিনের ঘটনা। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেদিনটার কথা। সন্ধ্যাবেলা বাবা বাসায় ফিরলেন। এবং এসে জানালেন টিউশনি থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীরা তাকে ধরে সব টাকা নিয়ে গেছে। ঐদিনই একটি টিউশনির টাকা পেয়েছিলেন এবং সেটা বেশ ভালো পরিমাণের। তার এই কথা আশেপাশের প্রতিবেশিরাও শুনলেন এবং তারা এসে সান্ত্বনা দিলেন তাকে। ঐদিন আমি প্রথম দেখেছিলাম বাবার চোখে জল। এবং জানি না কেন অজান্তে আমিও কেঁদেছিলাম। অন্যসময় তো বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতাম, চোখের জল, নাকের জল এক করতাম কিন্তু তখন কাউকে কিছু বলিনি। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম এবং আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সম্ভবত মা কিংবা দিদি কিংবা অন্যকেউ সেটা লক্ষও করেনি। সেদিন বুকের ভেতর যে কষ্টের জন্ম হয়েছিল সেটাকেই আমি নাম দিয়েছি ‘দুঃখ’। আমি দুঃখ বলতে আসলে এটাকেই বুঝি। দুঃখ নিজে নিজে পাওয়া যায় না, অপরের কষ্টকে যখন নিজের কষ্ট বলে মনে হয় তখন তাকে দুঃখ বলে। বাবার ঐদিনের অনুভূতিটা সত্যি বলতে ঐদিন পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি কিন্তু তার কষ্টটা আমার ভেতর সঞ্চারিত হয়েছিল দুঃখ হয়ে। আমি সেদিন দুঃখকে প্রথম চিনেছি। তবে ভাগ্যের কি দারুণ উপহাস! বাবার এই টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঐ টিউশনির লোকেরা জানতে পেরেছিল, বাবাই হয়তো জানিয়েছিল। তারপর দু’তিনদিন পর একজন আন্টি আমাদের বাসায় এসে মায়ের কাছে আবার টাকাটা দিয়ে গিয়েছিল। তার মানে ছিনতাই থেকে যে ক্ষতিটা বাবার হয়েছিল তা হয়তো ম্যানেজ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু মাঝখান দিয়ে আমি দুঃখকে চিনেছি। এই দুঃখকে চেনা দারুণ ব্যাপার। বাবা কোভিডে মারা যান ২০২০ সালের ২ আগস্ট। সেদিন হাসপাতাল থেকে বাবার মৃতদেহ গ্রহণের সময় যে কষ্ট অনুভব করেছিলাম, সম্ভবত সেই কষ্টকে অন্য কোনো কষ্টের সঙ্গে তুলনা করা চলে না।
সুব্রত দত্ত
শেখেরটেক, আদাবর, মোহাম্মদপুর
৫ আগস্ট ২০২৬
রাত ৯টা ১৫মিনিট

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।


সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:২৩
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তাসালসুল (অনন্ত পশ্চাদগমন), প্রথম সৃষ্টি ও ‘আকল’: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি সতর্ক অনুসন্ধান

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৭


ভূমিকা
সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের অন্যতম প্রাচীন প্রশ্ন হলো,সবকিছুর শুরু কোথায়? যদি প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুর অস্তিত্বের জন্য তার আগে আরেকটি সৃষ্ট বস্তুর প্রয়োজন হয়, এবং সেই নির্ভরতার ধারা কখনো শেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরিয়ম খাতুন জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৮



মরিয়ম খাতুন। মাত্র ১৯ বছরের একটি মেয়ে। ৭৫ বছরের বুইড়া পাঁঠা গাজী নজরুলের লালসার শিকার হয়ে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে। শুধুমাত্র একটি ছোটখাটো চাকুরী সুপারিশের জন্য গিয়েছিল। তখনই ১৯... ...বাকিটুকু পড়ুন

⌛️ সক্রেটিসের আত্মানুসন্ধান

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৫



প্রাচীন গ্রিক দর্শনের মহান পুরুষ সক্রেটিসের আত্মানুসন্ধান বা "নিজেকে জানো" তত্ত্বটি মানুষের ভেতরের ঘৃণা, গোঁড়ামি এবং অজ্ঞানতা দূর করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। সক্রেটিসের মতে, মানুষের সমস্ত নৈতিক স্খলন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো, পকেট খালি হলো সাধারণ মানুষের!

লিখেছেন ওয়াদুদ সোহেল মোল্লা, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩


জীবনটা আজকাল বড় অদ্ভুত নিয়মে চলছে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় এক রকম থাকে, আর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি দুনিয়াটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। গতকাল রাত বারোটা এক মিনিট থেকে জ্বালানি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্যামিলি কার্ডের স্বার্থে তেলের দাম বৃদ্ধি মেনে নিতে হবে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৯


দীর্ঘ সতেরো বছর পর আমরা পেয়েছি একটি নির্বাচিত সরকার । অনেকে ভালোবেসে ইহাকে জনগণের সরকার বলে থাকেন । জনগণের সরকারের উপর একটু আস্থা রাখুন । সরকারকে সময় দিন ;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×