somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গরুর মাংস ৬৫০ টাকা !

০৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৩ রাত ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সপ্তাহ জুড়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ ও মাংস ব্যবসায়ীদের মাঝে নাটক মঞ্চস্থ হলো। নাটকের সূত্রপাত খলিল নামের রাজধানীর শাজাহানপুরের এক মাংস ব্যবসায়ী কে কেন্দ্র করে।যেখানে বর্তমানে মাংসের বাজার দর প্রতি কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা সেখানে খলিল ডিসকাউন্ট দিয়ে ৫৯৫ টাকায় দরে প্রতি কেজি মাংস বিক্রি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন । খলিল কিন্তু তার ফর্মুলা গোপন করেন নাই সরল -হৃদয়ে তিনি তা সবার কাছে তুলে ধরেছেন। ৮০০ টাকা কেজিতে মাংস বিক্রি করলে তিনি দিনে ৩ থেকে ৪ টি গরু জবাই দিতে পারতেন । এখন ৫৯৫ টাকায় মাংস বিক্রি করাতে তিনি প্রতিদিন ৫-৭ মণ ওজনের ৩৫ থেকে ৩৭ টি গরু জবাই দিতে পারছেন । খলিলের মাংসের দোকানে বাধা ধরা কোনো নিয়ম নেই যে কেউ যে কোনো পরিমাণ মাংস ক্রয় করতে পারে এমনকি গরিবদের জন্য তিনি ২৫০ গ্রাম মাংস বিক্রি করেন। কেজিতে লাভ কমে আসলেও সব মিলিয়ে মাংস বিক্রি করে আগের তুলনায় অনেক বেশি লাভ হচ্ছে তার।

খলিল এর ব্যবহার করা ফর্মুলা কে অর্থনীতির ভাষায় ( Average Cost ) AC বা বাংলায় গড় খরচ এর সূত্র বলা হয়। মোট খরচ কে উৎপাদনের পরিমান দিয়ে ভাগ করলে গড় খরচ নির্ণয় হয় । বিষয়টা আরো সহজ করে তুলে ধরি খলিলের মাংসের দোকানের ভাড়া ,কারেন্ট বিল ,কর্মচারীদের বেতন ,পরিবহন খরচ সহ আনুষাঙ্গিক খরচের সাথে লাভ যোগ করলে যে পরিমাণ দাঁড়ায় তাকে মোট জবাই করা গরুর সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে খলিলের মাংসের দোকানের গড় খরচ নির্ণয় হবে। বুঝার সুবিধার্থে আমরা একটি কাল্পনিক সংখ্যা ধরে আগাই ধরুন খলিলের মাংসের দোকানের মোট খরচ দিনে ২০ হাজার টাকা। এখন খলিল যদি দিনে ৪ টি গরু জবাই দেয় তাহলে গড় খরচ দাঁড়াবে (২০ হাজার / ৪ ) ৫,০০০ টাকা আবার মোট জবাই করা গরুর সংখ্যা যদি বেড়ে দিনে ৩৫ টি হয় তখন তার গড় খরচ দাঁড়াবে ( ২০ হাজার / ৩৫) ৫৭১.৪২ টাকা পার্থক্যটা নিশ্চয়ই আপনাদের সামনে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। এই ফর্মুলা ব্যবহার করে খলিল বাজারদর থেকে কম মূল্যে মাংস বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ফর্মুলা ব্যবহার করে কি অন্যান্য মাংস ব্যবসায়ী খলিলের মতো কম মূল্যে মাংস বিক্রি করতে সক্ষম হবে ? স্পষ্ট উত্তর না , সেটা কখনই সম্ভব না। কারণ এলাকার মাংস ব্যবসায়ী দিনে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনটি গরু জবাই করতে পারে এর বেশি পুঁজি সংগ্রহ করা তাদের জন্য কঠিন।অন্যদিকে স্থানীয় এলাকা ভিত্তিক মাংস ব্যবসায়ী দিনে দুই বা তিনটি গরুর মাংস বিক্রির পর নতুন ক্রেতা খুঁজে পাবে না। ফলে স্থানীয় ছোট মাংস ব্যাবসায়ীদের পক্ষে গড় খরচ কমিয়ে আনা অসম্ভব । যদি তাদের কম মূল্যে মাংস বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় তখন তারা লোকসানের সম্মুখীন হবে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই লোকসান থেকে বাচার জন্য তখন তারা মাংসের সাথে হাড্ডি ও চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে বিক্রি করবে। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে ভোক্তারা খুব একটা লাভবান হবে বলে মনে হয় না।

মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমন্বয় করে মূল্য নির্ধারিত হয়। মূলত গরুর মাংসের চাহিদা কমার কারণেই মাংসের বাজার দর এখন নিম্নমুখী ।এক দিকে ক্রেতারা ৮০০ টাকা কেজি দরে গরুর মাংস ক্রয় করতে আগ্রহী না অন্য দিকে হরতাল অবরোধের কারণে বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠান এর সংখ্যা ইদানিং কমে এসেছে । সে জন্য বর্তমানে হাটে পাইকারদের কাছে চাহিদার তুলনায় গরুর যোগান বেশি। সাধারণত হাটে এক দিন গরু রাখলে পাইকারদের গরুর খাবার ও অন্যান্য খরচ বাবদ বাড়তি ১০০০ টাকা খরচ করতে হয়। সেই জন্য অনেক পাইকার লাভ ছাড়াই গরু বেঁচে দিচ্ছেন। যেহেতু বাজারে গরুর ক্রয় মূল্য কম সেই জন্য অনেক মাংস ব্যাবসায়ী নির্ধারিত মূল্য থেকে কম মূল্যে মাংস বিক্রি করতে পারছেন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এভাবেই চাহিদা ও যোগানের সাথে সমন্বয় করে বাজারদর নির্ধারিত হয় ।

যখন কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাভাবিক ভাবে মাংসের বাজার দর নিম্নমুখী এমনকি খলিলের এর সাথে তাল মিলিয়ে অনান্য ব্যবসায়ীরাও মাংসের মূল্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তখন হঠাৎ করে ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের সরব হয়ে উঠার পিছনে রহস্য কি তা ঠিক বুঝতে পারলাম না। তারা মাংস ব্যাবসায়ী, ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন , সুপার স্টোর সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডেকে মাংসের মূল্য নির্ধারণে মিটিং শুরু করলো। প্রেস ও মিডিয়া মিটিংয়ের হৈ চৈ হট্টগোল দেইখা মনে হইলো মঞ্চ নাটক দেখতাছি। মাংস ব্যবসায়ীদের এক পক্ষ বলছে শাজাহানপুরের মাংস ব্যবসায়ী খলিল এর জন্য তারা ব্যবসায় লস খাচ্ছেন। আরেক পক্ষ বলছে খলিল মাংসে অতিরিক্ত হাড় ও চর্বি দিয়ে দাম কমিয়েছে। অন্য দিকে খলিল বলছে আপনারা ব্যবসা না করতে পারলে আমার কি দোষ। ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ বলছে যারা খলিল কে হয়রানি করছে তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করা হবে। যে সব মাংস ব্যাবসায়ী মিটিং এর সময় খলিলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল তাদের দোকানে ভোক্তা কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করে । মিটিং এ সিদ্ধান্ত হয় উৎপাদন ও বিপননের সাথে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন ও মাংস ব্যাবসায়ীরা গরুর মাংসের মূল্য নির্ধারণ করবে । সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন ও মাংস ব্যাবসায়ী সমিতির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ৭ ডিসেম্বর থেকে জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত গরুর মাংস ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হবে এবং নির্বাচনের পর মাংসের দাম আবার সমন্বয় করা হবে। এ সময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় , প্রতি কেজি গরুর মাংসে ৭৫০ গ্রাম মাংস, ২০০ গ্রাম হাড় ও ৫০ গ্রাম চর্বি থাকবে। এছাড়া 'রিজেক্ট' গরুর মাংস তারা বিক্রি করবে না।

যেহেতু কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই মাংসের বাজার দর কমতির দিকে যাচ্ছে তাই বলাই যায় চাহিদা ও যোগান এর সাথে সমন্বয় করে বাজার নিজে থেকেই সংশোধন হয়ে একটা লেভেলে স্থির হতো । কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল আগে বাজার নিয়ন্ত্রণ না করে ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। অপেক্ষা করলে হয়তো মাংসের বাজার দর এখন যেই লেভেলে আছে তার থেকেও নিচে নেমে আসতো।আগেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রেস ডেকে মিটিং আয়োজন করার ফলে বাজার তার স্বাভাবিক গতিপথ থেকে সরে গেছে। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগানের সমন্বয়ে মূল্য নির্ধারিত হয় এখানে চাপ প্রয়োগ করে কিংবা ব্যাবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে মূল্য নির্ধারণ করতে গেলে তা হবে অপরিপক্ক পদক্ষেপ।

লক্ষ করে দেখুন শাজাহানপুরের মাংস ব্যাবসায়ী খলিল কোনো নির্দেশনা ছাড়াই নিজে উদ্যোগে ৫৯৫ টাকা দরে প্রতি কেজি মাংস বিক্রি শুরু করেছিলো । পরবর্তী সময়ে ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ উপাদান ও বিপণনের সবাইকে একত্রিত করে তাদের উপর মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেয় তখন তারা মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় ইলেকশন পর্যন্ত প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করবে।আমার কাছে তো মনে হয় এখানে ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ উল্টা নতুন সিন্ডিকেট এর জন্ম দিলো । আগেই তো ভালো ছিল মাংস ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা করে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৫৯৫ টাকা পর্যন্ত নামিয়ে এনেছিলেন। যেহেতু ভোক্তা কর্তৃপক্ষ এদেরকে এক সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখিয়ে দিয়েছে তাই সামনের দিন গুলোতে মাংস ব্যবসায়ীদের মাঝে প্রতিযোগিতা দেখা যাবে বলে মনে হয় না।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৪ রাত ৯:০৪
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইমাম মাহদী (আ.) আসার আগ পর্যন্ত মুসলিম জাতি কি করবে?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সকাল ১১:১০



সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৫ ও ৬৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৫। হে নবি! মু’মিন দিগকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ কর। তোমাদের মধ্যে কুড়িজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুইশতজনের উপর বিজয়ী হবে।তোমাদের মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা ভাষার ত্রাতা গুরু মওলানা আকরম খাঁ সম্পর্কে ব্লগারদের ধারণা স্বচ্ছ নয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ দুপুর ১:০৭






ছবিঃ ১৯৭১ সালের ১৪ই ও ১৬ই মার্চ, দৈনিক আজাদ সম্পাদকীয়।

কয়েক দিন আগে ব্লগার গেছো দাদা তার একটি পোস্টে ভাষা শিল্পী মওলানা আকরম খাঁ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার বন্ধু রতন

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ বিকাল ৩:৫২


আমাদের বাড়ি থেকে এক বাড়ি পরেই রতনদের বাড়ি। সে আমার ছোটোবেলার বন্ধু। একসাথে প্রাইমেরি স্কুলে পড়ালেখা করেছি। সে ছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। বিকেলে খেলাধুলা করতাম যেমন, দু'জন ভিসিআর দেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বুক রিভিউ অথবা আমার চিন্তাব্যাখ্যার ব্যায়াম সিরিজঃ ১

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ বিকাল ৪:০৮



বইয়ের নামঃ অহেতুক আলেবালে জলসেচনে ক্ষতি নাই
কবিঃ আদনান আলী
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
প্রকাশকঃ চন্দ্রবিন্দু


‘বুক রিভিউ’ নামক শব্দ যুগলের পেছনে ছায়ার মত যে শরীরী চিত্রকল্প জেগে উঠতে পারে সেটাকে বাংলা ভাষার শক্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১১:১৯



১৯৭৫ সালে ১১ জানুয়ারি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বলেনঃ বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রধান, বাংলাদেশ সামরিক একাডেমীর অধ্যক্ষ ও আমার ক্যাডেট ভাইয়েরা, আপনারা সকলেই আমার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×