“তুমি তোমার জীবন আমি আমার জীবন
দুজন দুজনার আলাদা জীবন
কেউ জানেনা”
ববিতা ও জাফর ইকবাল অভিনীত “অবুঝ হৃদয়” ছবির এই গানটি সহ
সকাল এবং দুপুরের বোরিং ৪৫ মিনিটের জার্নিকে আনন্দদময় করে তুলতে ট্রেনের বগির শেষের দিকে পাটাতনকে ড্রাম বানিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কিছু বিশেষ গান করে থাকে। সাটলের বিশেষ গান নামেই পরিচিত এই গান গুলো। আর এভাবে সাটলের বিশেষ গান গুলোর মাধ্যমেই শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার ৪৫ মিনিট জার্নিটাকে আনন্দঘন করে তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র।
এই সাটল ট্রেনে অনেক প্রেমের জন্ম আবার অনেক প্রেমের ভাঙ্গন। কেউ নায়কের মত চেহারা নিয়েও তার মনের মানুষ খুঁজে পায়না। আবার কেউ ছ্যাবলা হয়েও পেয়ে যায় বিভাগের সুন্দরীটাকে । তাইতো নায়ক চেহারার সেই বেচারার কথা ভেবে মান্না দে’র সুরে সবাই গেয়ে উঠে--
“নায়ক নায়ক চেহারা কাঁধেতে ঝুলানো ব্যাগ
মুছে যাবে মফিজ (ছদ্ম নাম) ভাইয়ের নামটা
একটা প্রেমেও তার দিল না তো কেউ সাড়া
পেল না তো লেসুমির দাম টা”
অনেকের লেশুমির লেশ মাত্র না থাকলেও মনের দুঃখে সিগ্যারেট টানতে থাকে কম্পারমেন্তে বসে। পোলাপাইন তারেও ছাড়েনা। গেয়ে উঠে-
“ছিগ্রেট খাওয়া শিখাইসিল পাশের বাড়ির ছেরি
চরিত্রটা নষ্ট হইল এখন করি চুরি”
অনেকের প্রেম যেমন হয় তেমনি অনেকের প্রেম ভাঙ্গেও। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন এক পোলার কারনে একজনের প্রেম ভেঙ্গে গিয়েছিল। আর তাকেই বাঁশ দেয়ার জন্য ট্রেনে বসেই পোলাপাইন মিছিল ধরেছিল—
“মেয়ের বাপের দালালেরা
হুঁশিয়ার সাবধান”
বেচারা বুঝেছে কিনা জানিনা। তবে আর কেউ যে এরকম কাজে এগিয়ে আসবেনা সেটা মিছিলের আবহাওয়া দেখেই বুঝা গিয়েছিল।
আবার ছ্যাঁক খাওয়া আবুলকে নিয়ে ভুপেন হাজারিকার “আমি এক যাযাবর” এর সুরে গেয়ে উঠে “আমি এক গাঁজাখোর”। সাটল ট্রেন শহরের বটতলী থেকে ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এর নাম্বার গেইট এ থামে বলে ঠিক সেভাবেই বানানো হয় আমি এক যাযাবর গানটি----
“আমি বটতলী হতে এক নাম্বার পর্যন্ত
গাঁজার সব পোটলা খেয়েছি,
ভার্সিটির ওই শহীদ মিনারে
কত গড়াগড়ি দিয়েছি।
আমি রাত্রি বেলায় গাছের মাথায়
তিনটে সূর্য দেখেছি,
লেডিস হলের সামনে গিয়েতে
দাদুর দৌড়ানি খেয়েছি”।
অথবা একই গানের আরেক অন্তরা-
“অনেক মেয়েকে অফার করেছি
ছ্যাঁক খাইনি কম,
তাই গাঁজার কল্কি যেখানে দেখেছি
নিয়েছি কয়েক দম।
আমি দেখেছি অনেক সুবিধাবাদী
মেয়েলোকদের সারি,
দৃষ্টি তাদের কার আছে বেশি
বাড়ি গাড়ি টাকা কড়ি।
আমি দেখেছি অনেক ছেলেরা যখন
প্রেম করিবার তরে,
প্রেমেতে মনটা ভরে না তাদের
ছ্যাঁকাতে কষ্ট বাড়ে।
এমনি ছ্যাঁকা খেয়ে খেয়ে মোর
পুড়ে গেছে অন্তর,
তাই বারে বারে গাঁজার টানেতে
চুরুট করেছি পর।
তাই আমি গাঁজাখোর”।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এর ছাত্রছাত্রীদের সবচেয়ে বড় দুঃখ হল এই ভার্সিটি শহরে না হয়ে এত দূরে হল কেন? শহর থেকে দূরে হওয়াতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রান একটু কম। বিশ্ববিদ্যালয় দূরে হওয়ার কারন কি এই উত্তর না মিললেও পাকিস্তান আমলে নির্মিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছাড় দেয়না সেই স্বৈরাচারী আইয়ুব খানকে। তাইতো তারে নিয়ে গান---
“আইয়ুব সরকার বোকা ছিল ভূতে তারে কিলাইছে
দূর পাহাড়ের মাঝে সরকার ভার্সিটি বানাইছে”
ভার্সিটি বানানোর পরে নাকি ভার্সিটির ল্যাট্রিন গুলোতে ঠিকমত পানি আর বদনা পাওয়া যাইত না। সেটা নিয়েও কি গান না বানালে হয়?--
“ভার্সিটির অনেক ল্যাট্রিন বদনাও একটা নাই
বড় কাম সারতে গেলে পানি কোথায় পাই
ভার্সিটির ওই ল্যাট্রিনেতে কাগজ দিয়ে কাম সারসে
দূর পাহাড়ের মাঝে সরকার ভার্সিটি বানাইসে”
নতুন পুরনো মিলিয়ে ৪ টা লেডিস হল। বিকেল বেলা লেডিস হলের সামনে পোলাপাইন যা একটু মজা করে থাকে। তেমনি প্রীতিলতা হলের মালা চিঠি দিয়েছিল তার প্রেমিককে। কিন্তু হল টা কি? আসুন শুনি সাটল ট্রেনের শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়’রা কেমনে মালার প্রেমিককে বাঁশ নামক বেম্বু টা দিয়েছিল---
“মালা আমায় ভালবেসে চিঠি দিয়েছিল,
সেই চিঠি আমার মায়ের হাতে পড়েছিল
মায়ের বকুনি খেয়ে, ভাইয়ের পিঠুনি খেয়ে অবশেষে বললাম
মালা আমার খালা, মালা আমার খালা।
আমায় প্রশ্ন করে প্রীতিলতার মালা
কেন আমি তাকে ডেকেছিলাম খালা”।
না শুধু এরকম প্যাড়ডি গান না এই সাটল ট্রেন জুড়ে আছে অনেকের মনে প্রানে। আজও অনেকে মিস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রান সাটল ট্রেন কে। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছে অনেকে। কিন্তু আজও ও মনের অজান্তে অনেকে গেয়ে উঠে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনবদ্য সৃষ্ট এই গানটি---
“আর ক’টা দিন শেষে ভাসিয়ে ভেলা,
জীবনের তরী বেয়ে উজানে চলা
সাটল ট্রেনের স্রিতি গুলো তাই তুলে রেখ
মনেরি খাতায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিন গুলো যায় যায় হারিয়ে যায়,
উচ্ছল বর্ণালী দিন গুলো হায়
মিলিয়ে যায় হাওয়ায়”
অথবা পিটার,পল, মেরির গাওয়া বিখ্যাত “ফাইভ হানড্রেড মাইলস” এর লাইন----
“ইফ ইউ মিস দ্যা ট্রেন আ’ম অন,
ইউ ওয়িল নো দ্যাট আই এম গন
ইউ ক্যান হিয়ারস দ্যা হইসেল ব্লু অ্যা হানড্রেড মাইলস”
বিঃদ্রঃ- গান গুলোর কার্টেসি সাটল ট্রেন এর বিভিন্ন বগিভিত্তিক গ্রুপ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




